📄 ১৫. রাসূলুল্লাহ-কে শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা করা
ঈমানের শাখা-১৫: রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা করা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা ঈমানেরই অংশ। কেননা আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলেছেন-
وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ অর্থ : যাতে তোমরা তাঁকে অর্থাৎ রাসূল ﷺ-কে সম্মান ও মর্যাদা দাও এবং সহযোগিতা করো। (সূরা আল ফাতহ-আয়াত : ৯)
একজন মুমিনের নিকট ঈমানের দাবীই হচ্ছে যে সে রাসূল ﷺ-কে সঠিক সহযোগিতা করবে। আল্লাহ বলেন-
فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ অর্থ : অতঃপর যারা তাঁর উপর ঈমান আনায়ন করেছে, তাঁর (অর্থাৎ রাসূলের) প্রতি শ্রদ্ধা রেখেছে এবং তাঁর সাহায্য সহযোগিতা করছে...তারাই কল্যাণ লাভ করেছে। (সূরা আরাফ-১৫৭)
আরো ইরশাদ হচ্ছে-
لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا অর্থ : তোমরা রাসূলকে নিজেদের মধ্যে ডেকে আনাকে এরূপ মনে করো না, যেরূপ তোমরা একে অপরকে ডেকে আনো। (সূরা আন নূর-আয়াত : ৬৩)
এই মর্মে আরো বেশি সূরা হুজরাতে সতর্ক করা হয়েছে-
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تُقَدِّمُوا۟ بَيْنَ يَدَىِ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌۭ يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَرْفَعُوٓا۟ أَصْوَٰتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ ٱلنَّبِىِّ
النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ .
অর্থ: হে ঈমানদারগণ 'তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে বেশি অগ্রসর হয়ে যেও না। আল্লাহকে ভয় কর নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী। নিজেদের কণ্ঠস্বর নবীর কণ্ঠস্বরের চেয়ে উঁচু করো না, নবীর সাথে জোরে কথাও বলো না যেমন তোমরা পরস্পরের সাথে করে থাক। এরূপ করলে তোমাদের আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে, তোমরা অনুভবও করবে না।' (সূরা আল হুজুরাত, আয়াত-১-২)
📄 ১৬. ইসলামের উপর অটল থাকা
ঈমানের শাখা-১৬. ইসলামের উপর অটল থাকা
দ্বীন বা ইসলামের উপর অটল থাকা, এটিও ঈমানের অংশ। আক্ষরিক অর্থেই মুমিন, এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আগুনে পুড়ে শাস্তি গ্রহণে রাজি হতে পারে, কিন্তু কোনো মূল্যেই ঈমান ত্যাগে রাজী হতে পারে না। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-
তিনটি জিনিস যার মধ্যে রয়েছে সে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে-
১. যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সবচেয়ে বেশি প্রিয়।
২. যে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই তাঁর বান্দাকে ভালোবাসে।
৩. যাকে আল্লাহ কুফর থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তারপর সে কুফুরের দিকে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করে, যেমন অপছন্দ করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে। (সহীহ আল বুখারী-১৬ সহীহ মুসলিম-৪৩)
ইমাম মুসলিম আনাস (রাঃ) থেকে নিম্নোক্ত হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন। একবার এক লোক নবী করীম (সঃ)-এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এক উপত্যকা পরিমাণ ছাগল দিলেন। সে তার গোত্রে গিয়ে বলতে লাগলো, 'তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, আল্লাহর শপথ! তিনি বিপুল পরিমাণে দান করেন, দরিদ্রতার ভয় করেন না।' একথা শুনে এক ব্যক্তি নবী করীম (সঃ)-এর কাছে হাজির হলেন, দুনিয়া অর্জন করা ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু যখন সে ইসলাম গ্রহণ করল তখন দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে দ্বীনই তার কাছে প্রিয় বলে মনে হলো।'
📄 ১৭. জ্ঞান অর্জন করা
ঈমানের শাখা-১৭. জ্ঞান অর্জন করা
আল্লাহকে চেনার মাধ্যম হচ্ছে জ্ঞান বা ইলম। এই ইলম অর্জনের মাধ্যম হচ্ছে তিনটি-
১. আল কিতাব বা আল কুরআন, ২. আস সহীহা, শর্ত সাপেক্ষে ইজতিহাদ।
আল্লাহর কিতাব বা আল কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসে ইলম (জ্ঞান) ও আলিম (জ্ঞানী) সম্পর্কে অনেক ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আলিমদের সম্পর্কে বলেছেন-
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ.
অর্থ: আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলিমগণই আল্লাহকে ভয় করে। (সূরা ফাতির-আয়াত: ২৮)
অন্য আয়াতে বলেন-
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَئِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ.
অর্থ: আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। ফেরেশতাগণ এবং যারা জ্ঞানী (অর্থাৎ আলিম) তারাও সততা ও ইনসাফের সাথে এই সাক্ষ্য দিচ্ছে। (সূরা আলে ইমরান-আয়াত: ১৮)
আল্লাহর ওহীই যে জ্ঞান সেই সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেন-
وَ عَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا.
অর্থ : 'তিনি আপনাকে এমন বিষয় জানিয়েছেন যা আপনার জানা ছিল না। মূলত আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বিরাট। (সূরা নিসা-আয়াত: ১১৩)
আল্লাহ আরো বলেন- يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَتٍ. অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে সুউচ্চ মর্যাদা দান করবেন। (সূরা আল মুজাদালা আয়াত: ১১)
আরেক জায়গায় বলা হয়েছে- هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الْأَلْبَابِ. অর্থ: যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা উভয়ে কি সমান হতে পারে? যাদের জ্ঞান বুদ্ধি আছে নসীহত কেবল তারাই গ্রহণ করে থাকে। (সূরা যুমার-আয়াত: ৯)
'সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম বলেছেন- إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُؤُوسًا جُهَالًا فَسُئِلُوا فَافْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا. অর্থ: যখন কোনো আলিম থাকবে না তখন মানুষ মূর্খ জাহিলদের নেতা বানিয়ে নেবে। তাদের কাছে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তারা না জেনেই মতামত দিয়ে দেবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং লোকদেরও পথভ্রষ্ট করবে। (সহীহ বুখারী-১০০ ও মুসলিম-২৬৭৩)
সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে বলা হয়েছে مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيْهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتِ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَ سُوْنَهُ بَيْنَهُمْ
إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِتَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ وَمَنْ بَطَأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعُ بِهِ نَسَبُهُ.
অর্থ: যে ব্যক্তি ইলম (জ্ঞান) অর্জনের জন্য বের হয় আল্লাহ তার জন্য এর মাধ্যমে জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কিছু লোক আল্লাহর ঘরসমূহের কোনো একটিতে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং তার পর্যালোচনায় নিয়োজিত থাকে তখন তাদের উপর প্রশান্তি বর্ষিত হতে থাকে। তাদেরকে রহমতের চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় এবং ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখেন। আর তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের সাথে তাদের কথা স্মরণ (বলাবলি) করতে থাকেন। যার কার্যকলাপ তাকে পিছিয়ে দেবে, বংশমর্যাদা তাকে এগিয়ে নিতে পারবে না। (সহীহ মুসলিম-হাদীস: ২৬৯৯)
📄 ১৮. শিক্ষার প্রসার
ঈমানের শাখা-১৮. শিক্ষার প্রসার
শিক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা এবং বিকাশ ঈমানের অন্যতম শাখা। লোকদের শিক্ষা দান তথা শিক্ষার বিকাশ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ. অর্থ: (আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা) লোকদের মধ্যে উহা প্রচার করো, তা গোপন করে রেখো না। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৭)
অন্যত্রে বলা হয়েছে-
وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوْا إِلَيْهِمْ . 'অর্থ: তারা নিজ গোত্রে গিয়ে লোকদের সতর্ক করুক। (সূরা আত তাওবা: আয়াত- ১২২)
নবী করীম বিদায় হজ্জের দিন লোকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন-
الا لِيُبَلِّغَ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ فَلَعَلَّ بَعْضَ مَنْ يُبَلِّغُهُ يَكُونُ أَوْ عَى لَهُ مِنْ بَعْضِ مَنْ سَمِعَهُ . অর্থ: 'সাবধান! তোমাদের উপস্থিত ব্যক্তিগণ অবশ্যই অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে আমার এ কথা পৌঁছে দেবে। এখানকার ব্যক্তিগণ যাদের কাছে আমার কথা পৌঁছাবে, তারা হয়ত উপস্থিত শ্রোতাদের চেয়ে অধিকতর সংরক্ষণকারী হবে। (সহীহ আল বুখারী-৪৪০৬, সহীহ মুসলিম-১৬৭৯)
সুনানে আবু দাউদে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম বলেছেন-
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ الْجَمَهُ اللَّهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَّارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. অর্থ: 'কাউকে যদি ইলম সম্পর্কিত কিছু জিজ্ঞেস করা হয় এবং সে (জানা সত্ত্বেও) তা গোপন রাখে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আগুনের লাগাম পরিধান করাবেন। (আবু দাউদ-৩৬৫৮, আত তিরমিযী-২৬৩৯, সহীহ হাসান)