📘 হারাম ও কবীরা গুনাহ > 📄 ব্যভিচারের অপকার ও তার ভয়াবহতা

📄 ব্যভিচারের অপকার ও তার ভয়াবহতা


১. কোন বিবাহিতা মহিলা ব্যভিচার করলে তার স্বামী, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন মারাত্মকভাবে লাঞ্ছিত হয়। জনসমক্ষে তারা আর মাথা উঁচু করে কথা বলতে সাহস পায় না।
২. কোন বিবাহিতা মহিলার ব্যভিচারের কারণে যদি তার পেটে সন্তান জন্ম নেয় তা হলে তাকে হত্যা করা হবে অথবা জীবিত রাখা হবে। যদি তাকে হত্যাই করা হয় তা হলে দু'টি গুনাহ্ একত্রেই করা হলো। আর যদি তাকে জীবিতই রাখা হয় এবং তার স্বামীর সন্তান হিসেবেই তাকে ধরে নেয়া হয় তখন এমন ব্যক্তিকেই পরিবারভুক্ত করা হলো যে মূলতঃ সে পরিবারের সদস্য নয় এবং এমন ব্যক্তিকেই ওয়ারিশ বানানো হলো যে মূলতঃ ওয়ারিশ নয়। তেমনিভাবে সে এমন ব্যক্তির সন্তান হিসেবেই পরিচয় বহন করবে যে মূলতঃ তার পিতা নয়। আরো কত্তো কি?
৩. কোন পুরুষ ব্যভিচার করলে তার বংশ পরিচয়ে গরমিল সৃষ্টি হয় এবং একজন পবিত্র মহিলাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়।
৪. ব্যভিচারের কারণে ব্যভিচারীর উপর দরিদ্রতা নেমে আসে এবং তার বয়স কমে যায়। তাকে লাঞ্ছিত হতে হয় এবং তারই কারণে সমাজে মানুষে মানুষে বিদ্বেষ ছড়ায়।
৫. ব্যভিচার ব্যভিচারীর অন্তরকে বিক্ষিপ্ত করে দেয় এবং ধীরে ধীরে তাকে রোগাক্রান্ত করে তোলে। তেমনিভাবে তার মধ্যে চিন্তা, ভয় ও আশঙ্কার জন্ম দেয়। তাকে ফিরিস্তা থেকে দূরে সরিয়ে নেয় এবং শয়তানের নিকটবর্তী করে দেয়। সুতরাং অঘটনের দিক দিয়ে হত্যার পরেই ব্যভিচারের অবস্থান। যার দরুন বিবাহিতের জন্য এর শাস্তিও জঘন্য হত্যা।
৬. কোন ঈমানদারের জন্য এ সংবাদ শ্রবণ করা সহজ যে, তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এ সংবাদ শ্রবণ করা তার জন্য অবশ্যই কঠিন যে, তার স্ত্রী কারোর সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে। হযরত সা'দ বিন্ ‘উবাদা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
لَوْ رَأَيْتُ رَجُلًا مَعَ امْرَأَتِي لَضَرَبْتُهُ بِالسَّيْفِ غَيْرَ مُصْفَحٍ
অর্থাৎ আমি কাউকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার করতে দেখলে তৎক্ষনাৎই আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। উল্লিখিত উক্তিটি রাসূল এর কানে পৌঁছুতেই তিনি বললেন:
أَتَعْجَبُوْنَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدِ؟ وَ اللَّهِ لأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ ، وَ اللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي ، وَ مِنْ أَجْلِ غَيْرَةِ اللَّهِ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَ مَا بَطَنَ (বুখারী, হাদীস ৬৮৪৬ মুসলিম, হাদীস ১৪৯৯)
অর্থাৎ তোমরা কি আশ্চর্য হয়েছো সা'দের আত্মসম্মানবোধ দেখে? আল্লাহ্'র কসম খেয়ে বলছি: আমার আত্মসম্মানবোধ তার চেয়েও বেশি এবং আল্লাহ্ তা'আলার আরো বেশি। যার দরুন তিনি হারাম করে দিয়েছেন প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল ধরনের অশ্লীলতাকে।
রাসূল আরো বলেন:
يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ وَ اللهُ مَا مِنْ أَحَدٍ أَغْيَرُ مِنَ اللَّهُ أَنْ يَزْنِيَ عَبْدُهُ أَوْ تَزْنِيَ أَمَتُهُ (বুখারী, হাদীস ১০৪৪ মুসলিম, হাদীস ৯০১)
অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ্ এর উম্মতরা! আল্লাহ্'র কসম খেয়ে বলছি: আল্লাহ্ তা'আলার চাইতেও আর কারোর আত্মসম্মানবোধ বেশি হতে পারে না। এ কারণেই তাঁর অসহ্য যে, তাঁর কোন বান্দাহ্ অথবা বান্দি ব্যভিচার করবে।
৭. ব্যভিচারের সময় ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর ঈমান সঙ্গে থাকে না। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِذَا زَلَى الرَّجُلُ خَرَجَ مِنْهُ الإِيْمَانُ ؛ كَانَ عَلَيْهِ كَالظُّلَّةِ ، فَإِذَا انْقَطَعَ رَجَعَ إِلَيْهِ الإِيْمَانُ (আবু দাউد, হাদীس ৪৬৯০)
অর্থাৎ যখন কোন পুরুষ ব্যভিচার করে তখন তার ঈমান তার অন্তর থেকে বের হয়ে মেঘের ন্যায় তার উপরে চলে যায়। অতঃপর যখন সে ব্যভিচারকর্ম সম্পাদন করে ফেলে তখন আবারো তার ঈমান তার নিকট ফিরে আসে। হযরত আবু হুরাইراه্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ زَنَى أَوْ شَرِبَ الْخَمْرَ نَزَعَ اللهُ مِنْهُ الإِيْمَانَ كَمَا يَخْلَعُ الْإِنْسَانُ الْقَمِيْصَ مِنْ رأسه (হা'কিম ১/২২ কানযুল্ ‘উম্মাল্, হাদীস ১২৯৯৩)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি ব্যভিচার অথবা মদ পান করলো আল্লাহ্ তা'আলা তার ঈমান ছিনিয়ে নিবেন যেমনিভাবে কোন মানুষ তার জামা নিজ মাথার উপর থেকে খুলে নেয়।
৮. ব্যভিচারের কারণে ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর ঈমানে ঘাটতি আসে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِيْنَ يَزْنِي وَ هُوَ مُؤْمِنٌ ، وَ لَا يَسْرِقُ حِيْنَ يَسْرِقُ وَ هُوَ مُؤْمِنٌ ، وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِيْنَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ ؛ وَ التَّوْبَةُ مَعْرُوْضَةٌ بَعْدُ (আবু দাউদ, হাদীس ৪৬৮৯ ইন্নু মাজাহ, হাদীস ৪০০৭)
অর্থাৎ ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। চোর যখন চুরি করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। মদ পানকারী যখন মদ পান করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। তবে এরপরও তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দেয়া হয়।
৯. ব্যভিচারের প্রচার-প্রসার কিয়ামতের অন্যতম আলামত। রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ يُرْفَعَ الْعِلْمُ ، وَ يَثْبَتَ الْجَهْلُ ، وَ يُشْرَبَ الْخَمْرُ ، وَيَظْهَرَ الزِّنَا (বুখারী, হাদীস ৮০ মুসলিম, হাদীس ২৬৭১)
অর্থাৎ কিয়ামতের অন্যতম আলামত হচ্ছে: ‘ইল্ল্ম উঠিয়ে নেয়া হবে, মূর্খতা ছেয়ে যাবে, (প্রকাশ্যে) মদ্য পান করা হবে এবং প্রকাশ্যে ব্যভিচার সংঘটিত হবে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসউদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
مَا ظَهَرَ الرِّبَا وَ الزِّنَا فِي قَرْيَةٍ إِلَّا أَذِنَ اللَّهُ بِإِهْلَاكِهَا অর্থাৎ কোন এলাকায় সুদ ও ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়লে আল্লাহ্ তা'আলা তখন সে জনপদের জন্য ধ্বংসের অনুমতি দিয়ে দেন।
১০. ব্যভিচারের শাস্তির মধ্যে এমন তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য কোন দণ্ডবিধিতে নেই। যা নিম্নরূপ:
ক. বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি তথা হত্যা খুব ভয়ানকভাবেই প্রয়োগ করা হয়। এমনকি অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি কমানো হলেও তাতে দু'টি শাস্তি একত্রেই থেকে যায়। বেত্রাঘাতের মাধ্যমে শারীরিক শাস্তি এবং দেশান্তরের মাধ্যমে মানসিক শাস্তি।
খ. আল্লাহ্ তা'আলা এর শাস্তি দিতে গিয়ে ব্যভিচারী অথবা ব্যভিচারিণীর প্রতি দয়া করতে নিষেধ করেছেন।
গ. আল্লাহ্ তা'আলা এর শাস্তি জনসমক্ষে দেয়ার জন্য আদেশ করেছেন। লুক্কায়িতভাবে নয়।
১১. ব্যভিচার থেকে দ্রুত তাওবা করে খাঁটি নেক আমল বেশি বেশি করতে না থাকলে ব্যভিচারী অথবা ব্যভিচারিণীর খারাপ পরিণামের বিপুল আশঙ্কা থাকে। মৃত্যুর সময় তাদের ঈমান নসীব নাও হতে পারে। কারণ, বার বার গুনাহ্ করতে থাকা ভালো পরিণামের বিরাট অন্তরায়। বিশেষ করে কঠিন প্রেম ও ভালোবাসার ব্যাপারগুলো এমনই।
প্রসিদ্ধ একটি ঘটনায় রয়েছে, জনৈক ব্যক্তিকে মৃত্যুর সময় কালিমা পড়তে বলা হলে সে বলে:
أَيْنَ الطَّرِيقُ إِلَى حَمَّامِ مِنْجَابِ অর্থাৎ মিন্ন্জাবের গোসলখানায় কিভাবে যেতে হবে। কোন্ পথে?
এর ঘটনায় বলা হয়, জনৈক ব্যক্তি তার ঘরের দরোজায় দাঁড়ানো ছিলো। এমতাবস্থায় তার পাশ দিয়ে জনৈকা সুন্দরী মহিলা যাচ্ছিলো। মহিলাটি তাকে মিন্ন্জাব গোসলখানার পথ জিজ্ঞাসা করলে সে তার ঘরের দিকে ইশারা করে বললো: এটিই মিন্ন্জাব গোসলখানা। অতঃপর মহিলাটি তার ঘরে ঢুকলে সেও তার পেছনে পেছনে ঘরে ঢুকলো। মহিলাটি যখন দেখলো, সে অন্যের ঘরে এবং লোকটি তাকে ধোকা দিয়েছে তখন সে তার প্রতি খুশি প্রকাশ করে বললো: তোমার সঙ্গে একত্রিত হতে পেরে আমি খুবই ধন্য। সুতরাং কিছু খাবার-দাবার ও আসবাবপত্র জোগাড় করা প্রয়োজন যাতে করে আমরা উভয় একত্রে শান্তিতে বসবাস করতে পারি। দ্রুত লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র খরিদ করে আনলো। ফিরে এসে দেখলো, মহিলাটি ঘরে নেই। কারণ, সে ভুলবশত ঘরে তালা লাগিয়ে যায়নি। অথচ মহিলাটি যাওয়ার সময় ঘরের কোন আসবাবপত্র সঙ্গে নেইনি। তখন লোকটি আধ পাগল হয়ে গেলো এবং গলিতে গলিতে এ বলে ঘুরে বেড়াতে লাগলো:
يَا رُبَّ قَائِلَة يَوْمًا وَ قَدْ تَعِبَتْ كَيْفَ الطَّرِيقُ إِلَى حَمَّامِ مِنْجَابِ অর্থাৎ হে অমুক! যে একদা ক্লান্ত হয়ে বলেছিলে, মিন্ন্জাবের গোসলখানায় কিভাবে যেতে হয়। কোন্ পথে?
একদা সে উক্ত ছন্দটি বলে বেড়াতে লাগলো এমন সময় জনৈকা মহিলা ঘরের জানালা দিয়ে প্রত্যুক্তি করে বললো:
هَلَا جَعَلْتَ سَرِيْعاً إِذْ ظَفِرْتَ بِهَا حرزاً عَلَى الدَّارِ أَوْ قُفْلاً عَلَى الْبَابِ অর্থাৎ কেন তুমি তাকে পাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত দরোজা বন্ধ করে ফেলোনি অথবা ঘরে তালা লাগিয়ে যাওনি? তখন তার চিন্তা আরো বেড়ে যায় এবং প্রথমোক্ত ছন্দ বলতে বলতেই তার মৃত্যু হয়। নাউযুবিল্লাহ্।
১২. কোন জাতির মধ্যে ব্যভিচারের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলার ব্যাপক আযাব নিপতিত হওয়ার এক বিশেষ কারণ। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসঊদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَا ظَهَرَ فِي قَوْمِ الزِّنَا أَوِ الرِّبَا إِلَّا أَحَلَّوْا بِأَنْفُسِهِمْ عَذَابَ اللَّهِ (সা'হীহত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীবি, হাদীস ২৪০২)
অর্থাৎ কোন জাতির মধ্যে ব্যভিচারের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটলে তারা নিজেরাই যেন হাতে ধরে তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আযাব নিপতিত করলো।

📘 হারাম ও কবীরা গুনাহ > 📄 ব্যভিচারের স্তর বিন্যাস

📄 ব্যভিচারের স্তর বিন্যাস


১. অবিবাহিতা মেয়ের সঙ্গে ব্যভিচার। এতে মেয়েটির সম্মানহানি ও চরিত্র বিনষ্ট হয়। কখনো কখনো ব্যাপারটি সন্তান হত্যা পর্যন্ত পৌঁছোয়।
২. বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার। এতে উপরন্তু স্বামীর সম্মানও বিনষ্ট হয়। তার পরিবার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছোয়। তার বংশ পরিচয়ে ব্যাঘাত ঘটে। কারণ, সন্তানটি তারই বলে বিবেচিত হয়; অথচ সন্তানটি মূলতঃ তার নয়।
যেন এমন ঘটনা ঘটতেই না পারে সে জন্য রাসূল স্বামী অনুপস্থিত এমন মহিলার বিছানায় বসা ব্যক্তির এক ভয়ানক রূপ চিত্রায়ন করেছেন। হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَثَلُ الَّذِي يَجْلِسُ عَلَى فِرَاشِ الْمُغِيبَةِ مَثَلُ الَّذِي يَنْهَشُهُ أَسْوَدُ مِنْ أَسَاوِدِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ (সা'হীহত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীবি, হাদীس ২৪০৫)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বামী অনুপস্থিত এমন কোন মহিলার বিছানায় বসে তার দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির ন্যায় যাকে কিয়ামতের দিন কোন বিষাক্ত সাপ দংশন করে।
৩. যে কোন প্রতিবেশী মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার। এতে উপরন্তু প্রতিবেশীর অধিকারও বিনষ্ট হয় এবং তাকে চরম কষ্ট দেয়া হয়। হযরত মিক্বদাদ বিন্ আল্ আসওয়াদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَأَنْ يَزْنِيَ الرَّجُلُ بِعَشْرِ نِسْوَةِ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَزْنِيَ بِامْرَأَةِ جَارِهِ (আহমাদ ৬/৮ সা'হীহ তারগীব ওয়াত্ তারহীব, হাদীস ২৪০৪)
অর্থাৎ সাধারণ দশটি মহিলার সাথে ব্যভিচার করা এতো ভয়ঙ্কর নয় যতো ভয়ঙ্কর নিজ প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা। রাসূল আরো ইরশাদ করেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ (মুসলিম, হাদীس ৪৬)
অর্থাৎ যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
৪. যে প্রতিবেশী নামাযের জন্য অথবা ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের জন্য কিংবা জিহাদের জন্য ঘর থেকে বের হয়েছে তার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার। হযরত বুরাইদাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
حُرْمَةُ نِسَاءِ الْمُجَاهِدِيْنَ عَلَى الْقَاعِدِيْنَ كَحُرْمَةِ أُمَّهَاتِهِمْ ، وَ مَا مِنْ رَجُلٍ مِنَ الْقَاعِدِينَ يَخْلُفُ رَجُلاً مِنَ الْمُجَاهِدِيْنَ فِي أَهْلِهِ فَيَخُونُهُ فِيْهِمْ إِلَّا وُقِفَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، فَيَأْخُذُ مِنْ عَمَلِهِ مَا شَاءَ ، فَمَا ظَنُّكُمْ؟ (মুসলিম, হাদীস ১৮৯৭)
অর্থাৎ মুজাহিদদের স্ত্রীদের সম্মান যুদ্ধে না গিয়ে ঘরে বসে থাকা লোকদের নিকট তাদের মায়েদের সম্মানের মতো। কোন ঘরে বসে থাকা ব্যক্তি যদি কোন মুজাহিদ পুরুষের পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে তাদের তত্ত্বাবধানের ব্যাপারে আমানতের খিয়ানত করে তখন তাকে মুজাহিদ ব্যক্তির প্রাপ্য আদায়ের জন্য কিয়ামতের দিন দাঁড় করিয়ে রাখা হবে। অতঃপর মুজাহিদ ব্যক্তি ঘরে বসা ব্যক্তির আমল থেকে যা মনে চায় নিয়ে নিবে। রাসূল বলেন: তোমাদের কি এমন ধারণা হয় যে, তাকে এতটুকু সুযোগ দেয়ার পরও সে এ প্রয়োজনের দিনে ওর সব আমল না নিয়ে ওর জন্য এতটুকুও রেখে দিবে?
৫. আত্মীয়া মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার। এতে উপরন্তু আত্মীয়তার বন্ধনও বিনষ্ট করা হয়।
৬. মাহরাম বা এগানা (যে মহিলাকে বিবাহ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে চিরতরের জন্য হারাম) মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার। এতে উপরন্তু মাহরামের অধিকারও বিনষ্ট করা হয়।
৭. বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচার। আর তা মারাত্মক এ জন্য যে, তার উত্তেজনা প্রশমনের জন্য তো তার স্ত্রীই রয়েছে। তবুও সে ব্যভিচার করে বসলো।
৮. বুড়ো ব্যক্তির ব্যভিচার। আর তা মারাত্মক এ জন্য যে, তার উত্তেজনা তো তেমন আর উগ্র নয়। তবুও সে ব্যভিচার করে বসলো। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَ لَا يُزَكِّيهِمْ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: شَيْخٌ زَانٍ ، وَ مَلِكٌ كَذَّابٌ ، وَ عَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ (মুসলিম, হাদীس ১০৭)
অর্থাৎ তিন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদেরকে গুনাহ্ থেকে পবিত্র করবেন না, তাদের দিকে দয়ার দৃষ্টিতেও তাকাবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি: বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যুক রাষ্ট্রপতি এবং অহঙ্কারী গরিব।
৯. মর্যাদাপূর্ণ মাস, স্থান ও সময়ের ব্যভিচার। এতে উপরন্তু উক্ত মাস, স্থান ও সময়ের মর্যাদা বিনষ্ট হয়।
কোন ব্যক্তি শয়তানের ধোকায় পড়ে ব্যভিচার করে ফেললে এবং তা কেউ না জানলে অথবা বিচারকের নিকট তা না পৌঁছুলে তার উচিত হবে যে, সে তা লুকিয়ে রাখবে এবং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট কায়মনোবাক্যে খাঁটি তাওবা করে নিবে। অতঃপর বেশি বেশি নেক আমল করবে এবং খারাপ জায়গা ও সাথি থেকে দূরে থাকবে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ هُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَ يَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُوْنَ ) (শূরা: ২৫)
অর্থাৎ তিনিই (আল্লাহ্ তা'আলা) তাঁর বান্দাহদের তাওবা কবুল করেন এবং সমূহ পাপ মোচন করেন। আর তোমরা যা করো তাও তিনি জানেন। হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
اجْتَنِبُوا هَذِهِ الْقَاذُورَاتِ الَّتِي نَهَى اللَّهُ عَنْهَا ، فَمَنْ أَلَمَّ بِهَا فَلْيَسْتَتِرْ بِسِتْرِ اللَّهِ ، وَلْيَتُبْ إِلَى اللَّهُ ، فَإِنَّهُ مَنْ يُبْدِ لَنَا صَفْحَتَهُ نُقِمْ عَلَيْهِ كِتَابَ اللَّهِ تَعَالَى (‘হাকিম ৪/২৭২)
অর্থাৎ তোমরা ব্যভিচার থেকে দূরে থাকো যা আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এরপরও যে ব্যক্তি শয়তানের ধোকায় পড়ে তা করে ফেলে সে যেন তা লুকিয়ে রাখে। যখন আল্লাহ্ তা'আলা তা গোপনই রেখেছেন। তবে সে যেন এ জন্য আল্লাহ্ তা'আলার নিকট তাওবা করে নেয়। কারণ, যে ব্যক্তি তা আমাদের নিকট প্রকাশ করে দিবে তার উপর আমরা অবশ্যই আল্লাহ্ তা'আলার বিধান প্রয়োগ করবো।
উক্ত কারণেই হযরত মা'য়িয বিন্ মা'লিক যখন রাসূল এর নিকট বার বার ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি করছিলেন তখন রাসূল তাঁর প্রতি এতটুকুও ভ্রূক্ষেপ করেননি। চার বারের পর তিনি তাকে এও বলেন: হয়তো বা তুমি তাকে চুমু দিয়েছো, ধরেছো কিংবা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করেছো। কারণ, এতে করে তিনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট খাঁটি তাওবা করার সুযোগ করে দিতে চেয়েছিলেন।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
أَتَى رَسُوْلَ اللهِ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ ، وَ هُوَ فِي الْمَسْجِدِ ، فَنَادَاهُ ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ ، فَأَعْرَضَ عَنْهُ ، فَتَنَحَّى تِلْقَاءَ وَجْهِهِ ، فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللَّهِ! إِنِّي زَنَيْتُ ، فَأَعْرَضَ عَنْهُ ، حَتَّى ثَنَّى ذَلِكَ عَلَيْهِ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ ، فَلَمَّا شَهِدَ عَلَى نَفْسِهِ أَرْبَعَ شَهَادَات دَعَاهُ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ فَقَالَ: أَبكَ جُنُوْنَ؟ قَالَ: لَا ، قَالَ: فَهَلْ أَحْصِنْتَ؟ قَالَ: نَعَمْ ، فَقَالَ النَّبِيُّ : اذْهَبُوا بِهِ فَارْجُمُوهُ (বুখারী, হাদীস ৫২৭১ মুসলিম, হাদীস ১৬৯১)
অর্থাৎ রাসূল এর নিকট জনৈক মুসলমান আসলো। তখনো তিনি মসজিদে। অতঃপর সে রাসূল কে ডেকে বললো: হে আল্লাহ্'র রাসূল! আমি ব্যভিচার করে ফেলেছি। রাসূল তার প্রতি কোন রূপ ভ্রূক্ষেপ না করে অন্য দিকে তাঁর চেহারা মুবারক মুড়িয়ে নিলেন। সে রাসূল এর চেহারা বরাবর এসে আবারো বললো: হে আল্লাহ্'র রাসূল! আমি ব্যভিচার করে ফেলেছি। রাসূল আবারো তার প্রতি কোন রূপ ভ্রূক্ষেপ না করে অন্য দিকে তাঁর চেহারা মুবারক মুড়িয়ে নিলেন। এমন কি সে উক্ত স্বীকারোক্তি চার চার বার করলো। যখন সে নিজের উপর ব্যভিচারের সাক্ষ্য চার চার বার দিয়েছে তখন রাসূল তাকে ডেকে বললেন: তুমি কি পাগল? সে বললো: না। রাসূল বললেন: তুমি কি বিবাহিত? সে বললো: জী হ্যাঁ। অতঃপর রাসূল সাহাবাদেরকে বললেন: তোমরা একে নিয়ে যাও এবং রজম তথা প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করো।
হযরত বুরাইদাহ্ এর বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল হযরত মা'য়িয বিন্ মা'লিক কে বলেছিলেন:
وَيْلَكَ ارْجِعْ فَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ وَ تُبْ إِلَيْهِ (মুসলিম, হাদীস ১৬৯৫)
অর্থাৎ আহা! তুমি ফিরে যাও। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ক্ষমা চাও এবং তাঁর নিকট তাওবা করে নাও।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
لَمَّا أَتَى مَاعِزُ بْنُ مَالِكَ إِلَى النَّبِيِّ قَالَ لَهُ: لَعَلَّكَ قَبَّلْتَ أَوْ غَمَرْتَ أَوْ نَظَرْتَ، قَالَ: لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ ! (বুখারী, হাদীস ৬৮২৪)
অর্থাৎ যখন মা'য়িয বিন্ মা'লিক নবী এর নিকট আসলো তখন তিনি তাকে বললেন: হয়তো বা তুমি তাকে চুমু দিয়েছো, ধরেছো কিংবা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করেছো। সে বললো: না, হে আল্লাহ্'র রাসূল!
তবে বিচারকের নিকট ব্যাপারটি (সাক্ষ্য সবুতের মাধ্যমে) পৌঁছুলে অবশ্যই তাকে বিচার করতে হবে। তখন আর কারোর ক্ষমার ও সুপারিশের সুযোগ থাকে না।
এ কারণেই রাসূল সায়ান বিন্ উমাইয়াহকে চোরের জন্য সুপারিশ করতে চাইলে তাকে বললেন:
هلا كَانَ ذَلِكَ قَبْلَ أَنْ تَأْتِيَنِي بِهِ؟! (আবু দাউদ, হাদীস ৪৩৯৪ ইন্নু মাজাহ, হাদীস ২৬৪৪ নাসায়ী ৮/৬৯ আহমاد ৬/৪৬৬ হা'কিম ৪/৩৮০ ইব্বুল্ জারূদ, হাদীস ৮২৮)
অর্থাৎ আমার নিকট আসার পূর্বেই কেন তা করলে না।
তেমনিভাবে হযরত উসামাহ্ জনৈকা কুরাশী চুন্নি মহিলার জন্য সুপারিশ করতে চাইলে রাসূল তাকে অত্যন্ত রাগতস্বরে বললেন:
يَا أَسَامَةُ! أَتَشْفَعُ فِي حَدٌ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ ؟! (বুখারী, হাদীস ৬৭৮৮ মুসলিম, হাদীس ১৬৮৮ আবু দাউদ, হাদীس ৪৩৭৩ তিরমিযী, হাদীস ১৪৩০ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৫৯৫)
অর্থাৎ তুমি কি আল্লাহ্ তা'আলার দণ্ডবিধির ব্যাপারে সুপারিশ করতে আসলে?!
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর বিন্ ‘আস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
تَعَافَوْا الْحُدُوْدَ فِيْمَا بَيْنَكُمْ ، فَمَا بَلَغَنِي مِنْ حَدٌ فَقَدْ وَجَبَ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৩৭৬)
অর্থাৎ তোমরা দণ্ডবিধি সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো একে অপরকে ক্ষমা করো। কারণ, আমার নিকট এর কোন একটি পৌঁছুলে তা প্রয়োগ করা আমার উপর আবশ্যক হয়ে যাবে।
শুধুমাত্র তিনটি পদ্ধতিতেই কারোর উপর ব্যভিচারের দোষ প্রমাণিত হয়। যা নিম্নরূপ:
১. ব্যভিচারী একবার অথবা চারবার ব্যভিচারের সুস্পষ্ট স্বীকারাক্তি করলে। কারণ, জুহাইনী মহিলা ও উনাইস্ এর রজমকৃতা মহিলা ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি একবারই করেছিলো। অন্য দিকে হযরত মা’য়িয বিন্ মা'লিক রাসূল এর নিকট চার চারবার ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি করেছিলো। কিন্তু সংখ্যার ব্যাপারে হাদীসটির বর্ণনা সমূহ মুস্তারিব তথা এক কথার নয়। কোন কোন বর্ণনায় চার চার বারের কথা। কোন কোন বর্ণনায় তিন তিন বারের কথা। আবার কোন কোন বর্ণনায় দু' দু' বারের কথারও উল্লেখ রয়েছে। তবুও চার চারবার স্বীকারোক্তি নেয়াই সর্বোত্তম। কারণ, হতে পারে স্বীকারোক্তিকারী এমন কাজ করেছে যাতে সে শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত হয় না। যা বার বার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। আর এ কথা সবারই জানা যে, ইসলামী দণ্ডবিধি যে কোন যুক্তি সঙ্গত সন্দেহ কিংবা অজুাতের কারণে রহিত হয়। যা হযরত ‘উমর, আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ এবং অন্যন্য সাহাবা থেকেও বর্ণিত। ‘আল্লামা ইবনুল্ মুন্যির্ (রাহিমাহুল্লাহ) এ ব্যাপারে ‘উলামায়ে কিরামের ঐকমত্যেরও দাবি করেছেন। তেমনিভাবে চার চারবার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে ব্যভিচারীকে ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট খাঁটি তাওবা করারও সুযোগ দেয়া হয়। যা একান্তভাবেই কাম্য।
তবে স্বীকারাক্তির মধ্যে ব্যভিচারের সুস্পষ্ট উল্লেখ এবং দণ্ডবিধি প্রয়োগ পর্যন্ত স্বীকারোক্তির উপর স্বীকারকারী অটল থাকতে হবে। অতএব কেউ যদি এর আগেই তার স্বীকারোক্তি পরিহার করে নেয় তা হলে তার কথাই তখন গ্রহণযোগ্য হবে। তেমনিভাবে স্বীকারকারী জ্ঞানসম্পন্নও হতে হবে।
২. ব্যভিচারের ব্যাপারে চার চার জন সত্যবাদী পুরুষ এ বলে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিলে যে, তারা সত্যিকারার্থে ব্যভিচারী ব্যক্তির সঙ্গমকর্ম স্বচক্ষে দেখেছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ اللَّاتِي يَأْتِيْنَ الْفَاحِشَةَ مِنْ نِّسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنْكُمْ ) (নিসা': ১৫)
অর্থাৎ তোমাদের স্ত্রীদের মধ্য থেকে কেউ ব্যভিচার করলে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চার চার জন সাক্ষী সংগ্রহ করো।
৩. কোন মহিলা গর্ভবতী হলে, অথচ তার স্বামী নেই। হযরত ‘উমর তাঁর যুগে এমন একটি বিচারে রজম করেছেন। তবে এ প্রমাণ হেতু যে কোন মহিলার উপর দণ্ডবিধি প্রয়োগ করতেই হবে ব্যাপারটি এমন নয়। এ জন্য যে, গর্ভটি সন্দেহবশত সঙ্গমের কারণেও হতে পারে অথবা ধর্ষণের কারণেও। এমনকি মেয়েটি গভীর নিদ্রায় থাকাবস্থায়ও তার সঙ্গে উক্ত ব্যভিচার কর্মটি সংঘটিত হতে পারে। তাই হযরত ‘উমর তার যুগেই শেষোক্ত দু'টি অজুহাতে দু'জন মহিলাকে শাস্তি দেননি। তবে কোন মেয়ে যদি গর্ভবতী হয়, অথচ তার স্বামী নেই এবং সে এমন কোন যুক্তিসঙ্গত অজুহাতও দেখাচ্ছে না যার দরুন দণ্ডবিধি রহিত হয় তখন তার উপর ব্যভিচারের উপযুক্ত দণ্ডবিধি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
হযরত ‘উমর তার এক দীর্ঘ খুতবায় বলেন:
وَ إِنَّ الرَّجْمَ حَقٌّ فِي كِتَابِ اللهِ تَعَالَى عَلَى مَنْ زَنَى ، إِذَا أَحْصَنَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ ، إِذَا قَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ الْحَبْلُ أَو الاعْتِرَافُ (বুখারী, হাদীস ৬৮২৯ মুসলিম, হাদীস ১৬৯১ তিরমিযী, হাদীস ১৪৩২ আবু দাউদ, হাদীস ৪৪১৮ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৬০১)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই রজম আল্লাহ্ তা'আলার বিধানে এমন পুরুষ ও মহিলার জন্যই নির্ধারিত যারা ব্যভিচার করেছে, অথচ তারা বিশুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে ইতিপূর্বে নিজ স্ত্রী অথবা স্বামীর সাথে সম্মুখ পথে সঙ্গম করেছে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয় জনই তখন ছিলো প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন যখন ব্যভিচারের উপযুক্ত সাক্ষী-প্রমাণ মিলে যায় অথবা মহিলা গর্ভবতী হয়ে যায় অথবা ব্যভিচারী কিংবা ব্যভিচারিণী ব্যভিচারের ব্যাপারে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দেয়।

📘 হারাম ও কবীরা গুনাহ > 📄 ব্যভিচারের শাস্তি

📄 ব্যভিচারের শাস্তি


কেউ শয়তানের ধোকায় পড়ে ব্যভিচার করে ফেললে সে যদি অবিবাহিত হয় তা হলে তাকে একশ'টি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করা হবে। আর যদি সে বিবাহিত হয় তা হলে তাকে রজম তথা পাথর মেরে হত্যা করা হবে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ، وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي ديْنِ اللَّهِ ، إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ) (নূর: ২)
অর্থাৎ ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী; তাদের প্রত্যেককে তোমরা একশ' করে বেত্রাঘাত করবে। আল্লাহ্'র বিধান কার্যকরী করণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত করতে না পারে যদি তোমরা আল্লাহ্ তা'আলা ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাকো এবং মু'মিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ ও হযরত যায়েদ বিন্ খালিদ জুহানী (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন:
جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! اِقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللَّهِ ، فَقَامَ خَصْمُهُ فَقَالَ: صَدَقَ ، اقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ ، فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: إِنَّ ابْنِي كَانَ عَسِيْفَا عَلَى هَذَا ، فَزَنَى بِامْرَأَتِهِ ، فَقَالُوْا لِي : عَلَى ابْنِكَ الرَّجْمُ ، فَفَدَيْتُ ابْنِي مِنْهُ بِمِئَةٍ مِنَ الْغَنَمِ وَوَلِيْدَةٍ ، ثُمَّ سَأَلْتُ أَهْلَ الْعِلْمِ فَقَالُوْا : إِنَّمَا عَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِئَةٍ وَ تَغْرِيْبُ عَامٍ ، فَقَالَ النَّبِيُّ : الأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بكتاب الله ، أَمَّا الْوَلِيْدَةُ وَ الْغَنَمُ فَرَدُّ عَلَيْكَ ، وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِئَةٍ وَ تَعْرِيبُ عَامٍ ، وَ أَمَّا أَنْتَ يَا أُنَيْسُ! فَاغْدُ عَلَى امْرَأَةِ هَذَا فَارْجُمْهَا ، فَغَدَا عَلَيْهَا أُنَيْسٌ فَرَجَمَهَا (বুখারী, হাদীস ২৬৯৫, ২৬৯৬ মুসলিম, হাদীস ১৬৯৭, ১৬৯৮ তিরমিযী, হাদীস ১৪৩৩ আবু দাউদ, হাদীস ৪৪৪৫ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৫৯৭)
অর্থাৎ জনৈক বেদুঈন ব্যক্তি রাসূল ﷺ এর নিকট এসে বললো: হে আল্লাহ্'র রাসূল! আপনি আমাদের মাঝে কোর'আনের ফায়সালা করুন। তার প্রতিপক্ষও দাঁড়িয়ে বললো: সে সত্য বলেছে। আপনি আমাদের মাঝে কোর'আনের ফায়সালা করুন। তখন বেদুঈন ব্যক্তিটি বললো: আমার ছেলে এ ব্যক্তির নিকট কামলা খাটতো। ইতিমধ্যে সে এর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করে বসে। সবাই আমাকে বললো: তোমার ছেলেটিকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে। তখন আমি আমার ছেলেকে ছাড়িয়ে নেই একে একটি বান্দি ও একশ'টি ছাগল দিয়ে। অতঃপর আলিমদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো: তোমার ছেলেকে একশ'টি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করতে হবে। এরপর নবী বললেন: আমি তোমাদের মাঝে কোর'আনের বিচার করছি, বান্দি ও ছাগলগুলো তোমাকে ফেরত দেয়া হবে এবং তোমার ছেলেকে একশ'টি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর করতে হবে। আর হে উনাইস্! তুমি এর স্ত্রীর নিকট যাও। অতঃপর তাকে রজম করো। অতএব উনাইস্ তার নিকট গেলো। অতঃপর তাকে রজম করলো। হযরত ‘উবাদা বিন্ স্বামিত থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
خُذُوا عَنِّي ، خُذُوا عَنِّي ، فَقَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً ، الْبَكْرُ بِالْبَكْرِ جَلْدُ مَنة وَنَفْيُ سَنَةِ، وَ الطَّيِّبُ بالشَّيِّبِ جَلْدُ مِنَةِ وَ الرَّجْمُ (মুসলিম, হাদীস ১৬৯০ আবু দাউদ, হাদীস ৪৪১৫, ৪৪১৬ তিরমিযী, হাদীস ১৪৩৪ ইন্নু মাজাহ, হাদীস ২৫৯৮)
অর্থাৎ তোমরা আমার নিকট থেকে বিধানটি সংগ্রহ করে নাও। তোমরা আমার নিকট থেকে বিধানটি সংগ্রহ করে নাও। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের জন্য একটি ব্যবস্থা দিয়েছেন তথা বিধান অবতীর্ণ করেছেন। অবিবাহিত যুবক-যুবতীর শাস্তি হচ্ছে, একশ'টি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ ও মহিলার শাস্তি হচ্ছে, একশ'টি বেত্রাঘাত ও রজম তথা পাথর মেরে হত্যা।
উক্ত হাদীসে বিবাহিত পুরুষ ও মহিলাকে একশ'টি বেত্রাঘাত করার কথা থাকলেও তা করতে হবে না। কারণ, রাসূল হযরত মা'য়িয ও গা'মিদী মহিলাকে একশ'টি করে বেত্রাঘাত করেননি। বরং অন্য হাদীসে তাদেরকে শুধু রজম করারই প্রমাণ পাওয়া যায়।
আরেকটি কথা হচ্ছে, শরীয়তের সাধারণ নিয়ম এই যে, কারোর উপর কয়েকটি দণ্ডবিধি একত্রিত হলে এবং তার মধ্যে হত্যার বিধানও থাকলে তাকে শুধু হত্যাই করা হয়। অন্যগুলো করা হয় না। হযরত ‘উমর ও ‘উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এটির উপরই আমল করেছেন এবং হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসউদ থেকেও ইহা বর্ণিত হয়েছে। তবে হযরত ‘আলী তাঁর যুগে কোন এক ব্যক্তিকে রজমও করেছেন এবং বেত্রাঘাতও। হযরত ‘আব্দল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্, উবাই বিন্ কা'ব এবং আবু যরও এ মত পোষণ করেন। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
ضَرَبَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَ غَرَّبَ ، وَ ضَرَبَ أَبُو بَكْرٍ ، وَ غَرَّبَ ، وَ ضَرَبَ عُمَرُ ﷺ وَ غَرَّبَ (তিরমিযী, হাদীس ১৪৩৮)
অর্থাৎ রাসূল ﷺ মেরেছেন (বেত্রাঘাত করেছেন) ও দেশান্তর করেছেন, হযরত আবু বকর মেরেছেন ও দেশান্তর করেছেন এবং হযরত ‘উমর মেরেছেন ও দেশান্তর করেছেন। হযরত ‘ইমরان বিন্ ‘হুস্বাইন্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
أَنْتِ النَّبِيَّ امْرَأَةٌ مِنْ جُهَيْنَةَ ، وَ هِيَ حُبْلَى مِنَ الزِّنَا ، فَقَالَتْ: يَا نَبِيَّ الله ! أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْهُ عَلَيَّ ، فَدَعَا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَلَيْهَا ، فَقَالَ: أَحْسِنْ إِلَيْهَا ، فَإِذَا وَضَعَتْ فَأْتِنِي بِهَا ، فَفَعَلَ ، فَأَمَرَ بِهَا ، فَشَكَتْ عَلَيْهَا ثِيَابُهَا ، ثُمَّ أُمِرَ بِهَا فَرُحِمَتْ ، ثُمَّ صَلَّى عَلَيْهَا ، فَقَالَ عُمَرُ : أَتُصَلِّي عَلَيْهَا يَا نَبِيَّ اللَّهِ! وَ قَدْ زَنَتُ؟! فَقَالَ: لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسْمَتْ بَيْنَ سَبْعِينَ مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ لَوَسِعَتْهُمْ ، وَ هَلْ وَجَدْتَ أَفْضَلَ مِنْ أَنْ جَادَتْ بِنَفْسِهَا لِلَّهِ تَعَالَى (মুসলিম, হাদীس ১৬৯৬ আবু দাউদ, হাদীس ৪৪৪০ তিরমিযী, হাদীس ১৪৩৫ ইব্বু মাজাহ, হাদীس ২৬০৩)
অর্থাৎ একদা জনৈকা জুহানী মহিলা রাসূল ﷺ এর নিকট আসলো। তখন সে ব্যভিচার করে গর্ভবতী। সে বললো: হে আল্লাহ্'র নবী! আমি ব্যভিচারের শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত। অতএব আপনি তা আমার উপর প্রয়োগ করুন।
অতঃপর রাসূল ﷺ তার অভিভাবককে ডেকে বললেন: এর উপর একটু দয়া করো। এ যখন সন্তান প্রসব করবে তখন তুমি তাকে আমার নিকট নিয়ে আসবে। লোকটি তাই করলো। অতঃপর রাসূল ﷺ আদেশ করলে তার কাপড় শরীরের সাথে শক্ত করে বেঁধে দেয়া হলো। এরপর তাকে রজম করা হলে রাসূল ﷺ তার জানাযার নামায পড়ান। হযরত ‘উমর রা. রাসূল ﷺ কে আশ্চর্যান্বিতের স্বরে বললেন: আপনি এর জানাযার নামায পড়াচ্ছেন, অথচ সে ব্যভিচারিণী?! রাসূল ﷺ বললেন: সে এমন তাওবা করেছে যা মদীনার সত্তরজনকে বন্টন করে দেয়া হলেও তা তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। তুমি এর চাইতেও কি উৎকৃষ্ট কিছু পেয়েছো যে তার জীবন আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দিয়েছে।
হযরত ‘উমর রা. তাঁর এক দীর্ঘ খুতবায় বলেন:
إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ مُحَمَّداً بِالْحَقِّ ، وَ أَنْزَلَ عَلَيْهِ الْكِتَابَ ، فَكَانَ فِيْمَا أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْهِ آيَةُ الرَّجْمِ ، قَرَأْنَاهَا ، وَ وَعَيْنَاهَا ، وَ عَقَلْنَاهَا ، فَرَجَمَ رَسُوْلُ اللهُ ﷺ ، وَ رَجَمْنَا بَعْدَهُ، فَأَخْشَى إِنْ طَالَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ أَنْ يَقُوْلَ قَائِلٌ: مَا نَجِدُ الرَّجْمَ فِي كِتَابِ اللَّهِ ، فَيَضِلُّوْا بِتَرْكَ فَرِيْضَةِ أَنْزَلَهَا اللَّهُ (বুখারী, হাদীস ৬৮২৯ মুসলিম, হাদীস ১৬৯১ আবু দাউদ, হাদীস ৪৪১৮)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মাদ ﷺ কে সত্য ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তাঁর উপর কোর'আন অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর উপর যা অবতীর্ণ করেছেন তার মধ্যে রজমের আয়াতও ছিলো। আমরা তা পড়েছি, মুখস্থ করেছি ও বুঝেছি। অতঃপর রাসূল ﷺ রজম করেছেন এবং আমরাও তাঁর ইন্তেকালের পর রজম করেছি। আশঙ্কা হয় বহু কাল পর কেউ বলবে: আমরা কোর'আন মাজীদে রজম পাইনি। অতঃপর তারা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত একটি ফরয কাজ ছেড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। হযরত ‘উমর যে আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তা হচ্ছে:
الشَّيْخُ وَ الشَّيْحَةُ إِذَا زَنَيَا ، فَارْجُمُوْهُمَا أَلْبَتَّةَ ، نَكَالاً مِّنَ اللَّهِ ، وَ اللَّهُ عَزِيزٌ
অর্থাৎ বয়স্ক (বিবাহিত) পুরুষ ও মহিলা যখন ব্যভিচার করে তখন তোমরা তাদেরকে সন্দেহাতীতভাবে পাথর মেরে হত্যা করবে। এটি হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের জন্য শাস্তিস্বরূপ এবং আল্লাহ্ তা'আলা পরাক্রমশালী ও সুকৌশলী।
উক্ত আয়াতটির তিলাওয়াত রহিত হয়েছে। তবে উহার বিধান এখনও চালু। কোন অবিবাহিত ব্যভিচারী কিংবা ব্যভিচারিণী যদি এমন অসুস্থ অথবা দুর্বল হয় যে, তাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একশ'টি বেত্রাঘাত করা হলে তার মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে তা হলে তাকে একশ'টি বেত একত্র করে একবার প্রহার করা হবে।
হযরত সা'ঈদ্ বিন্ সা'দ বিন্ ‘উবা'দাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كَانَ فِي أَبْيَاتِنَا رُوَيْجِلٌ ضَعِيفٌ ، فَخَبُثَ بِأَمَةٍ مِنْ إِمَائِهِمْ ، فَذَكَرَ ذَلِكَ سَعِيدٌ لِرَسُوْلِ اللهِ ، فَقَالَ: اضْرِبُوهُ حَدَّهُ ، فَقَالُوْا : يَا رَسُولَ اللَّهِ! إِنَّهُ أَضْعَفُ مِنْ ذَلِكَ ، فَقَالَ: خُذُوا عِثْكَالاً فِيْهِ مِئَةُ شِمْرَارٍ ، ثُمَّ اضْرِبُوهُ بِهِ ضَرْبَةً وَاحِدَةً ، فَفَعَلُوْا (আহমাদ ৫/২২২ ইন্নু মাজাহ, হাদীس ২৬২২)
অর্থাৎ আমাদের এলাকায় জনৈক দুর্বল ব্যক্তি বসবাস করতো। হঠাৎ সে জনৈকা বান্দির সাথে ব্যভিচার করে বসে। ব্যাপারটি সা'ঈদ্ রাসূল কে জানালে তিনি বললেন: তাকে তার প্রাপ্য শাস্তি দিয়ে দাও তথা একশ'টি বেত্রাঘাত করো। উপস্থিত সকলে বললো: হে আল্লাহ্'র রাসূল! সে তো তা সহ্য করতে পারবে না। তখন রাসূল বললেন: একটি খেজুর বিহীন একশ'টি শাখাগুচ্ছ বিশিষ্ট থোকা নিয়ে তাকে তা দিয়ে এক বার মারবে। অতএব তারা তাই করলো। অমুসলমানকেও ইসলামী বিচারাধীন রজম করা যেতে পারে।
হযরত জা'বির বিন্ ‘আব্দুল্লাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
رَجَمَ النَّبِيُّ رَجُلاً مِنْ أَسْلَمَ ، وَ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ وَ امْرَأَةً (মুসলিম, হাদীস ১৭০১)
অর্থাৎ নবী আল্লাম বংশের একজন পুরুষকে এবং একজন ইহুদি পুরুষ ও একজন মহিলাকে রজম করেন। ব্যভিচারের কারণে কোন সন্তান জন্ম নিলে এবং ভাগ্যক্রমে সে জীবনে বেঁচে থাকলে তার মায়ের সন্তান রূপেই সে পরিচয় লাভ করবে। বাপের নয়। কারণ, তার কোন বৈধ বাপ নেই। অতএব ব্যভিচারীর পক্ষ থেকে সে কোন মিরাস পাবে না।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ ও হযরত ‘আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَ لِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ (বুখারী, হাদীস ২০৫৩, ২২১৮, ৬৮১৮ মুসলিম, হাদীس ১৪৫৭, ১৪৫৮ ইন্নু হিব্বান, হাদীس ৪১০৪ হাকিম, হাদীس ৬৬৫১ তিরমিযী, হাদীস ১১৫৭ বায়হাক্বী, হাদীস ১৫১০৬ আবু দাউদ, হাদীস ২২৭৩ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২০৩৫, ২০৩৭ আহমাদ, হাদীس ৪১৬, ৪১৭)
অর্থাৎ সন্তান মহিলারই এবং ব্যভিচারীর জন্য শুধু পাথর তথা রজম। হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর (রাزियल্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ عَاهَرَ أَمَةً أَوْ حُرَّةً فَوَلَدُهُ وَلَدُ زِنَا ، لَا يَرِثُ وَ لَا يُوْرَثُ (ইবনু মাজাহ, হাদীس ২৭৯৪)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন বান্দি অথবা স্বাধীন মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার করলো তার সন্তান হবে ব্যভিচারের সন্তান। সে মিরাস পাবে না এবং তার মিরাসও কেউ পাবে না।
যে কোন ঈমানদার পবিত্র পুরুষের জন্য কোন ব্যভিচারিণী মেয়েকে বিবাহ করা হারাম। তেমনিভাবে যে কোন ঈমানদার সতী মেয়ের জন্যও কোন ব্যভিচারী পুরুষকে বিবাহ করা হারাম। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
الزَّانِي لَا يَنْكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً ، وَ الزَّانِيَةُ لَا يَنْكِحُهَا إِلَّا زَانِ أَوْ مُشْرِكٌ ، وَ حُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ ) (নূর: ৩)
অর্থাৎ একজন ব্যভিচারী পুরুষ আরেকজন ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক্কা মেয়েকেই বিবাহ করে এবং একজন ব্যভিচারিণী মেয়েকে আরেকজন ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিকই বিবাহ করে। মু'মিনদের জন্য তা করা হারাম।

📘 হারাম ও কবীরা গুনাহ > 📄 দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু কথা

📄 দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু কথা


কাউকে লুক্কায়িতভাবে ব্যভিচার কিংবা যে কোন হারাম কাজ করতে দেখলে তা তড়িঘড়ি বিচারককে না জানিয়ে তাকে ব্যক্তিগতভাবে নসীহত করা ও পরকালে আল্লাহ্ তা'আলার কঠিন শাস্তির ভয় দেখানো উচিত। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَ الْآخِرَةِ (তিরমিযী, হাদীس ১৪২৫ ইবনু মাজাহ, হাদীস ২৫৯২)
অর্থাৎ কোন মুসলমানের দোষ লুকিয়ে রাখলে আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষও লুকিয়ে রাখবেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00