📄 আল্লাহ্'র বিধান লঙ্ঘন করে মানব রচিত বিধানের আলোকে বিচার কার্য পরিচালনা বা তা গ্রহণ করা
আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া কল্যাণময় বিধানকে লঙ্ঘন করে মানব রচিত যে কোন বিধানের আলোকে বিচার কার্য পরিচালনা বা গ্রহণ করাও আরেকটি কবীরা গুনাহ্।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ مَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَائِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ ) (মা'য়িদাহ: ৪৪)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া বিধানানুযায়ী বিচার করে না সে তো কাফির।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَ مَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَائِكَ هُمُ الظَّالِمُوْنَ ) (মা'য়িদাহ: ৪৫)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া বিধানানুযায়ী বিচার করে না সে তো জালিম।
তিনি আরো বলেন:
وَ مَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَائِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ ) (মা'য়িদাহ: ৪৪)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া বিধানানুযায়ী বিচার করে না সে তো ফাসিক তথা ধর্মচ্যুত নাফরমান।
আল্লাহ্ তা'আলা কোর'আন মাজীদের মধ্যে মানব রচিত আইন গ্রহণকারীদেরকেও ঈমানশূন্য তথা কাফির বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِيْنَ يَزْعُمُوْنَ أَنَّهُمْ آمَنُوْا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَ مَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوْا إِلَى الطَّاغُوتِ وَ قَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَ يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالاً بَعِيداً ، ... فَلَا وَ رَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجاً مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ) (নিসা': ৬০-৬৫)
অর্থাৎ আপনি কি ওদের ব্যাপারে অবগত নন? যারা আপনার প্রতি অবতীর্ণ কিতাব ও পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের উপর ঈমান এনেছে বলে ধারণা পোষণ করছে, অথচ তারা তাগূতের (আল্লাহ্ বিরোধী যে কোন শক্তি) ফায়সালা কামনা করে। বস্তুতঃ তাদেরকে ওদের বিরুদ্ধাচরণের আদেশ দেয়া হয়েছে। শয়তান চায় ওদেরকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করতে। ... অতএব আপনার প্রতিপালকের কসম! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারে না যতক্ষণ না তারা আপনাকে নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিরোধের বিচারক বানিয়ে নেয় এবং আপনার সকল ফায়সালা নিঃসঙ্কোচে তথা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়।
তবে মানব রচিত বিধান কর্তৃক বিচার কার্য পরিচালনা করার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। যা নিম্নরূপ:
ক. যে বিচারক বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্ তা'আলার বিধান বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য কোনভাবেই উপযোগী নয় তা হলে সে কাফির। এ ব্যাপারে সকল মুসলমানের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ, সে আল্লাহ্ তা'আলার বিধানকে অস্বীকার করেছে যা নিশ্চিত কুফরি।
খ. যে বিচারক বিশ্বাস করে যে, মানব রচিত বিধানই বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী; আল্লাহ্ তা'আলার বিধান নয়, চাই তা সর্ব বিষয়েই হোক অথবা শুধুমাত্র নব উদ্ভাবিত বিষয়াবলীতে, তা হলে সেও কাফির। এ ব্যাপারেও সকল মুসলমানের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ, সে মানব রচিত বিধানকে আল্লাহ্ তা'লার বিধানের উপর প্রাধান্য দিয়েছে, যা কুফরি।
গ. যে বিচারক বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্ তা'আলার বিধান যেমন বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য উপযোগী তেমনিভাবে মানব রচিত বিধানও, তা হলে সেও কাফির। কারণ, সে সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমপর্যায়ে দাঁড় করিয়েছে যা শির্ক তথা কুফরিও বটে।
ঘ. যে বিচারক বিশ্বাস করে যে, বর্তমান যুগের শরীয়ত বিরোধী আদালত সমূহ্ই মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল; ইসলামী শরীয়ত নয় তা হলে সেও কাফির। কারণ, সেও নিশ্চিত হারাম বস্তুকে হালাল মনে করছে। যা কুফরিরই অন্তর্গত।
৬. যে বিচারক মনে করে যে, আল্লাহ্ তা'আলার বিধানই বিচারের ক্ষেত্রে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিধান; অন্য কোন মানব রচিত বিধান নয়। এর পরও সে মানব রচিত কোন বিধানের আলোকে বিচার কার্য পরিচালনা করে যাচ্ছে এবং সে এও মনে করছে যে, আমার এ কর্ম নীতি কখনোই ঠিক হতে পারে না তা হলে সে সত্যিই বড় পাপী। কারণ, সে নিজ স্বার্থ বা প্রবৃত্তি পূজারী। তবে সে কাফির নয়।
মানব রচিত আইন গ্রহণকারীদেরও কয়েকটি পর্যায় রয়েছে যা নিম্নরূপ:
ক. যে বিচারপ্রার্থী এ কথা জানে যে, তার প্রশাসক বা বিচারক আল্লাহ্ তা'আলার বিধান অনুযায়ী বিচার করছে না। তবুও সে তার প্রশাসক বা বিচারকেরই অনুসরণ করছে এবং এও মনে করছে যে, তার প্রশাসক বা বিচারকের বিচার কার্যই সঠিক। তারা যা হালাল বলে তাই হালাল এবং তারা যা হারাম বলে তাই হারাম তা হলে সে কাফির। কারণ, সে তার প্রশাসক বা বিচারককে তার প্রভু বানিয়ে নিয়েছে যা শির্ক তথা কুফরিও বটে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللَّهِ وَ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَ مَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَّاحِدًا ، لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُوْنَ ) (তাওবাহ: ৩১)
অর্থাৎ তারা আল্লাহ্ তা'আলাকে ছেড়ে নিজেদের আলিম, ধর্ম যাজক ও মারইয়ামের পুত্র মাসীহ্ (ঈসা) কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তাদেরকে শুধু এতটুকুই আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই ইবাদাত করবে। তিনি ব্যতীত সত্যিকার কোন মা'বুদ নেই। তিনি তাদের শির্ক হতে একেবারেই পূতপবিত্র।
হযরত ‘আদি' বিন্ হাতিম থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
أَتَيْتُ النَّبِيَّ وَ فِي عُنُقِي صَلِيْبٌ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ : يَا عَدِيُّ اطْرَحْ عَنْكَ هَذَا الْوَثَنَ ، وَ سَمِعْتُهُ يَقْرَأُ فِي سُوْرَةٍ بَرَاءَةِ: اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللَّهِ ) قَالَ: أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوْا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوْا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوْهُ (তিরমিযী, হাদীস ৩০৯৫)
অর্থাৎ আমি নবী এর দরবারে গলায় স্বর্ণের ক্রুশ ঝুলিয়ে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে ডেকে বলেন: হে ‘আদি’! এ মূর্তিটি (ক্রুশ) গলা থেকে ফেলে দাও। তখন আমি তাঁকে উক্ত আয়াতটি পড়তে শুনেছি। হযরত ‘আদি’ বলেন: মূলতঃ খ্রিষ্টানরা কখনো তাদের আলিমদের উপাসনা করতো না। তবে তারা হালাল ও হারামের ব্যাপারে বিনা প্রমাণে আলিমদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতো। আর এটিই হচ্ছে আলিমদেরকে প্রভু মানার অর্থ তথা আনুগত্যের শির্ক।
উক্ত বিধান আলিম ও ধর্ম যাজকদের ব্যাপারে যেমন প্রযোজ্য তেমনিভাবে বিচারক ও প্রশাসকদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
খ. যে বিচারপ্রার্থী মনে করে যে, আল্লাহ্ তা'আলার বিচারই সঠিক। তার বিচারকের বিচার সঠিক নয়। আল্লাহ্ তা'আলা যাই হালাল বলেন তাই হালাল আর তিনি যাই হারাম বলেন তাই হারাম। তবুও সে তার বিচারকের বিচারই গ্রহণ করছে তার কোন স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে তা হলে সে সত্যিই বড় পাপী। কারণ, সে স্বার্থ পূজারী। তবে সে কাফির নয়।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ السَّمْعُ وَ الطَّاعَةُ فِيْمَا أَحَبَّ وَ كَرِهَ إِلَّا أَنْ يُؤْمَرَ بِمَعْصِيَةِ ، فَإِنْ أَمَرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ (বুখারী, হাদীস ৭১৪৪ মুসলিম, হাদীস ১৮৩৯)
অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তি তার উপরস্থের যে কোন কথা শুনতে ও তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য তা তার পছন্দসই হোক বা নাই হোক যতক্ষণ না তিনি তাকে কোন গুনাহ্'র আদেশ করেন। তবে যদি তিনি তাকে কোন গুনাহ্'র আদেশ করেন তখন তার জন্য উক্ত কথাটি শুনা ও মানা বৈধ নয়।
হযরত ‘আলী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল জনৈক আনসারী সাহাবীকে আমীর বানিয়ে একটি সেনাদল পাঠান এবং তাদেরকে তাদের আমীরের যাবতীয় কথা শুনতে ও তাঁর আনুগত্য করতে আদেশ করেন। পথিমধ্যে তারা উক্ত আমীরকে কোন এক ব্যাপারে রাগিয়ে তুললে তিনি তাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা আমার জন্য কিছু জ্বালানি কাঠ একত্রিত করো। তখন তারা তাই করলো। আমীর সাহেব তাদেরকে সেগুলোতে আগুন ধরাতে বললেও তারা তাই করলো। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেন: রাসূল কি তোমাদেরকে আমার যাবতীয় কথা শুনতে ও আমার আনুগত্য করতে আদেশ করেননি? তারা সকলেই বললো: অবশ্যই। আমীর বললেন: তা হলে তোমরা আগুনে প্রবেশ করো। তখন তারা একে অপরের চেহারা চাওয়া-চাওয়ি শুরু করলো। তারা বললো: আমরা তো রাসূল এর নিকট ছুটেই আসলাম আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে। এভাবেই কিছু সময় কেটে গেলো। ইতোমধ্যে তাঁর রাগ নেমে গেলো এবং আগুন নিভিয়ে দেয়া হলো। তারা রাসূল এর নিকট ফিরে এসে তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন:
لَوْ دَخَلُوْهَا مَا خَرَجُوا مِنْهَا ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوْفِ (বুখারী, হাদীস ৭১৪৫ মুসলিম, হাদীস ১৮৪০)
অর্থাৎ যদি তারা তাতে (আগুনে) প্রবেশ করতো তা হলে তারা আর সেখান থেকে বের হতে পারতো না। নিশ্চয়ই আনুগত্য হচ্ছে (কুর'আন ও হাদীস সম্মত) সৎ কাজেই।
গ. যে বিচারপ্রার্থী বাধ্য হয়েই শরীয়ত বিরোধী বিচার গ্রহণ করেছে; সন্তুষ্ট চিত্তে নয় তা হলে সে কাফিরও নয়। গুনাহগারও নয়। হযরত উম্মে সালামাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
يُسْتَعْمَلُ عَلَيْكُمْ أَمَرَاءُ ، فَتَعْرِفُوْنَ وَ تُنْكِرُوْنَ ، فَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ بَرِئَ ، وَ مَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ سَلِمَ ، وَ لَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَ تَابَعَ (মুসলিম, হাদীস ১৮৫৪)
অর্থাৎ তোমাদের উপর এমন আমীর নিয়োগ করা হবে যাদের কিছু কর্মকাণ্ড হবে মেনে নেয়ার মতো আর কিছু মেনে নেয়ার মতো নয়। সুতরাং যা মেনে নেয়ার মতো নয় তা কেউ অপছন্দ করলে সে দায়মুক্ত হলো। আর যে তা মেনে নিলো না সে নির্ভেজাল থাকলো। আর যে তাতে তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করলো এবং তার অনুসরণ করলো সেই হবে নিশ্চিত দোষী।
📄 ধর্মীয় জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তা কাউকে না বলা
ধর্মীয় জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তা কাউকে না বলা আরেকটি কবীরা গুনাহ্। তাই তো এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা'আলা লা'নত করেন এবং সকল লা'নতকারীরাও তাকে লা'নত করে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّ الَّذِيْنَ يَكْتُمُوْنَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَ الْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ ، أُوْلَائِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَ يَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُوْنَ ، إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَ أَصْلَحُوا وَبَيَّنُوْا فَأَوْلَائِكَ أَتُوْبُ عَلَيْهِمْ ، وَ أَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ ) (বাক্বারাহ: ১৫৯-১৬০)
অর্থাৎ আমি যে সকল উজ্জ্বল নিদর্শন ও হিদায়াত নাযিল করেছি তা মানুষকে কুর'আন মাজীদে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়ার পরও যারা তা লুকিয়ে রাখে তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা লা'নত করেন এবং অন্য সকল লা'নতকারীরাও তাদেরকে লা'নত করে। তবে যারা তাওবা করে নিজ কর্ম সংশোধন করে নেয় এবং লুক্কায়িত সত্য প্রকাশ করে আমি তাদের তাওবা গ্রহণ করবো। বস্তুতঃ আমিই তো তাওবা গ্রহণকারী করুণাময়।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّ الَّذِيْنَ يَكْتُمُوْنَ مَا أَنْزَلَ اللهُ مِنَ الْكِتَابِ وَ يَشْتَرُوْنَ بِهِ ثَمَنًا قَليْلاً أُولَائِكَ مَا يَأْكُلُوْنَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ ، وَ لا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَ لَا يُزَكِّيْهِمْ ، وَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ، أُوْلَائِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَى وَ الْعَذَابَ بِالْمَغْفِرَةِ فَمَا أَصْبَرَهُمْ عَلَى النَّارِ ) (বাক্বারাহ: ১৭৪-১৭৫)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ তা'আলা যে কুর'আন মাজীদ নাযিল করেছেন তা লুকিয়ে রেখেছে এবং এর পরিবর্তে (দুনিয়ার) সামান্য সম্পদ খরিদ করে নিয়েছে তারা তো নিজ পেটে শুধু আগুন ঢুকাচ্ছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা তাদের সাথে কোন কথাই বলবেন না এবং তাদেরকে গুনাহ্ থেকেও পবিত্র করবেন না। উপরন্তু তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। কারণ, এরাই তো হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা এবং ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি খরিদ করে নিয়েছে। সুতরাং আশ্চর্য! তারা জাহান্নামের ব্যাপারে কতই না ধৈর্যশীল! হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
وَ الله لَوْلا آيتان في كتاب الله تَعَالَى مَا حَدَّثْتُ عَنْهُ يَعْنَى عَنِ النَّبِيِّ شَيْئًا أَبَدًا، لَوْلَا قَوْلُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ : ( إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُوْنَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ ... ) إلى آخر الآيتين (ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৬২)
অর্থাৎ আল্লাহ্'র কসম! যদি দু'টি আয়াত কুর'আন মাজীদের মধ্যে না থাকতো তা হলে আমি নবী থেকে কখনো কোন কিছু (হাদীস) বর্ণনা করতাম না। আয়াত দু'টি উপরে উল্লিখিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ وَ فِي رِوَايَةِ ابْنِ مَاجَةَ يَعْلَمُهُ فَكَتَمَهُ ، أَلْحِمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِلِحَامِ مِنْ نَارٍ (আবু দাউদ, হাদীস ৩৬৫৮ তিরমিযী, হাদীস ২৬৪৯ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৬৪, ২৬৬)
অর্থাৎ যাকে এমন কিছু জিজ্ঞাসা করা হলো যা সে জানে অথচ সে তা লুকিয়ে রেখেছে তাকে কিয়ামতের দিন আগুনের লাগাম পরানো হবে। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ رَجُلٍ يَحْفَظُ عِلْمًا فَيَكْتُمُهُ ، إِلَّا أُتِيَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مُلْجَمًا بِلِجَامِ مِنَ النَّارِ (ইবনু মাজাহ, হাদীস ২৬১)
অর্থাৎ কেউ কোন কিছু সত্যিকারভাবে জেনেও তা লুকিয়ে রাখলে তাকে কিয়ামতের দিন আগুনের লাগাম পরিয়ে উঠানো হবে।
📄 কারোর দোষ অনুসন্ধান বা তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করা
কারোর দোষ অনুসন্ধান অথবা তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্। তাই তো আল্লাহ্ তা'আলা মু'মিনদেরকে এমন করতে নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيْرًا مِّنَ الظَّنِّ ، إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إثْمٌ وَ لَا تَجَسَّسُوا ) (‘হুজুরাত: ১২)
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। কারণ, কিছু কিছু অনুমান তো পাপ এবং তোমরা কারোর গোপনীয় দোষ অনুসন্ধান করো না।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল মিম্বারে উঠে উচ্চ স্বরে বলেন:
يَا مَعْشَرَ مَنْ أَسْلَمَ بِلِسَانِهِ، وَ لَمْ يُفْضِ الإِيْمَانُ إِلَى قَلْبِهِ! لَا تُؤْذُوا الْمُسْلِمِينَ وَ لَا تُعَيِّرُوهُمْ وَ لَا تَتَّبِعُوْا عَوْرَاتِهِمْ؛ فَإِنَّهُ مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ، وَ مَنْ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَ لَوْ فِي جَوْفِ رَحْلِهِ (তিরমিযী, হাদীস ২০৩২)
অর্থাৎ হে লোক সকল! তোমরা যারা মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছো; অথচ ঈমান তোমাদের অন্তরে ঢুকেনি তোমরা মুসলমানদেরকে কষ্ট দিও না। তাদেরকে লজ্জা দিও না। তাদের দোষ অনুসন্ধান করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার কোন মুসলমান ভাইয়ের দোষ অনুসন্ধান করলো আল্লাহ্ তা'আলাও তার দোষ অনুসন্ধান করবেন। আর যার দোষ আল্লাহ্ তা'আলা অনুসন্ধান করবেন তাকে অবশ্যই তিনি লাঞ্ছিত করে ছাড়বেন যদিও সে নিজ ঘরের অভ্যন্তরেই অবস্থান করুক না কেন।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
مَنِ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيْثِ قَوْمٍ وَ هُمْ لَهُ كَارِهُوْنَ ، أَوْ يَفِرُّوْنَ مِنْهُ صُبَّ فِي أُذُنِهِ الْأَنكُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ (বুখারী, হাদীস ৭০৪২)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কথা গুপ্তভাবে শুনলো অথচ সে তাদের কথাগুলো শুনুক তারা তা পছন্দ করছে না অথবা তারা তার অবস্থান টের পেয়ে তার থেকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে কিয়ামতের দিন এ জন্য তার কানে সিসা ঢেলে দেয়া হবে।
হযরত মু'আবিয়া থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন:
إِنَّكَ إِنِ اتَّبَعْتَ عَوْرَاتِ النَّاسِ أَفْسَدْتَهُمْ ، أَوْ كِدْتَ أَنْ تُفْسِدَهُمْ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৮৮)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই তুমি মানুষের দোষ অনুসন্ধান করলে তাদেরকে ধ্বংস করে দিবে অথবা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছিয়ে দিবে।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ্ এর নিকট জনৈক ব্যক্তিকে আনা হলো যার দাড়ি থেকে তখনো মদের ফোঁটা ঝরছিলো অতঃপর তিনি বললেন:
إِنَّا قَدْ نُهِينَا عَنِ التَّجَسُّسِ ، وَ لَكِنْ إِنْ يَظْهَرْ لَنَا شَيْءٌ نَأْخُذْ بِهِ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৯০)
অর্থাৎ আমাদেরকে গোয়েন্দাগিরি বা কারোর দোষ অনুসন্ধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে আমাদের নিকট কোন কিছু প্রকাশ পেলেই তখন সে জন্য আমরা তাকে পাকড়াও করতে পারি।
কেউ কারোর ঘরে তার অনুমতি ছাড়াই উঁকি মারলে ঘরের মালিক কোন বস্তু দিয়ে তার চোখ ফুটো করে দিলে এর জন্য তাকে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَوْ أَنَّ امْرَأَ اطَّلَعَ عَلَيْكَ بِغَيْرِ إِذْنِ فَخَذَفْتَهُ بِحَصَاةِ ، فَفَقَأْتَ عَيْنَهُ ، لَمْ يَكُنْ عَلَيْكَ جُنَاحٌ (বুখারী, হাদীস ৬৯০০ মুসলিম, হাদীস ২১৫৮)
অর্থাৎ কোন ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া তোমার ঘরে উঁকি মারলে অতঃপর তুমি কুঁচি পাথর অথবা কঙ্কর মেরে তার চোখ ফুটো করে দিলে এতে তোমার কোন গুনাহ্ হবে না।
📄 কোন মুসলমানকে গালি বা যে কোনভাবে কষ্ট দেয়া
কোন মুসলমানকে গali বা যে কোনভাবে কষ্ট দেয়া আরেকটি কবীরা গুনাহ্। যদিও সে লোকটি মৃত হোক না কেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ الَّذِينَ يُؤْذُوْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَ الْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا ) (আহযাব: ৫৮)
অর্থাৎ যারা মু'মিন পুরুষ ও মহিলাদেরকে কোন অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয় তারা অপবাদ ও সুপষ্ট গুনাহ্'র বোঝা বহন করে। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
سَبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوْقَ وَ قِتَالُهُ كُفْرٌ (বুখারী, হাদীস ৬০৪৪, ৭০৭৬ মুসলিম, হাদীস ৬৪)
অর্থাৎ কোন মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং হত্যা করা কুফরি। হযরত ‘আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ، فَإِنَّهُمْ قَدْ أَفْضَوْا إِلَى مَا قَدَّمُوا (বুখারী, হাদীস ১৩৯৩, ৬৫১৬)
অর্থাৎ তোমরা মৃতদেরকে গালি দিও না। কারণ, তারা দুনিয়াতে যা করেছে তার ফলাফল তো এমনিতেই ভোগ করবে।
কোন কোন মানুষ অন্যের অনিষ্ট করতে বা তাকে কষ্ট দিতে সিদ্ধহস্ত। তাই অন্যরা সাধ্যমতো তার থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে। এমন মানুষ আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সর্ব নিকৃষ্ট।
হযরত ‘আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ شَرَّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتَّقَاءَ شَرِّهِ (বুখারী, হাদীস ৬০৩২ মুসলিম, হাদীস ২৫৯১)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সর্ব নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে যাকে অন্যরা পরিত্যাগ করে তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্যে।
একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সুতরাং সে তার উপর যুলুম করতে পারে না, তার অসহযোগিতা করতে পারে না এবং তাকে নীচও ভাবতে পারে না।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
الْمُسْلِمُ أَخَوَ الْمُسْلِمِ ، لَا يَظْلِمُهُ ، وَ لَا يَخْذُلُهُ ، وَ لَا يَحْقِرُهُ ... بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَ عَرْضُهُ (মুসলিম, হাদীস ২৫৬৪)
অর্থাৎ একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সুতরাং সে তার উপর যুলুম করতে পারে না, তার অসহযোগিতা করতে পারে না এবং তাকে নীচও ভাবতে পারে না। একজন ব্যক্তির নিকৃষ্ট প্রমাণিত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার অন্য মুসলিম ভাইকে নীচ বলে মনে করবে। একজন মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও ইয্যত হারাম। সে তা কোনভাবেই হনন বা ক্ষুণ্ণ করতে পারে না।