📘 হারাম ও কবীরা গুনাহ > 📄 যুলুম, অত্যাচার ও কারোর উপর অন্যায় মূলক আক্রমণ

📄 যুলুম, অত্যাচার ও কারোর উপর অন্যায় মূলক আক্রমণ


কারোর জন্য অন্যের উপর যে কোনভাবে যুলুম, অত্যাচার অথবা অন্যায় মূলক আক্রমণ হারাম ও কবীরা গুনাহ্। কাউকে মারা, হত্যা করা, আহত করা, গালি দেয়া, অভিসম্পাত করা, ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া, দুর্বলের উপর হাত উঠানো চাই সে হোক নিজের কাজের ছেলে কিংবা নিজের কাজের মেয়ে অথবা নিজ স্ত্রী-সন্তান; তেমনিভাবে জোর করে কারোর কোন অধিকার হরণ ইত্যাদি ইত্যাদি যুলুমেরই অন্তর্গত।
যুলুম পারস্পরিক বন্ধুত্ব বিনষ্ট করে। আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করে। মানুষের মাঝে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয় এবং এরই কারণে ধনী ও গরীবের মাঝে ধীরে ধীরে ঘৃণা ও শত্রুতা জেগে উঠে। তখন উভয় পক্ষই দুনিয়ার বুকে অশান্তি নিয়েই জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়।
আল্লাহ্ তা'আলা যালিমদের জন্য জাহান্নামে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। যা তাকে গ্রহণ করতেই হবে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ نَارًا، أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا، وَ إِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ ، بِئْسَ الشَّرَابُ ، وَ سَاءَتْ مُرْتَفَقًا ) (কাহফ : ২৯)
অর্থাৎ আমি যালিমদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি। যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে। তারা পানি চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানি। যা তাদের মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দিবে। এটা কতই না নিকৃষ্ট পানীয় এবং সে জাহান্নাম কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَ سَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ ) (শু'আরা': ২২৭)
অর্থাৎ অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে কোথায় তাদের গন্তব্যস্থল!
হযরত আবু যর গিফারী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন: আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَ جَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا فَلَا تَظَالَمُوا ) (মুসলিম, হাদীস ২৫৭৭)
অর্থাৎ হে আমার বান্দারা! নিশ্চয়ই আমি আমার উপর যুলুম হারাম করে দিয়েছি অতএব তোমাদের উপরও তা হারাম। সুতরাং তোমরা পরস্পর যুলুম করো না।
কেউ কেউ কোন যালিমকে অনায়াসে মানুষের উপর যুলুম করতে দেখলে এ কথা ভাবে যে, হয়তো বা সে ছাড় পেয়ে গেলো। তাকে আর কোন শাস্তিই দেয়া হবে না। না, ব্যাপারটা কখনোই এমন হতে পারে না। বরং আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে কিয়ামতের দিনের কঠিন শাস্তির অপেক্ষায় রেখেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ لَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلاً عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُوْنَ ، إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ ، مُهْطِعِينَ مُقْنِعِي رُؤُوسِهِمْ ، لَا يَرْتَدُّ إِلَيْهِمْ طَرْفُهُمْ ، وَ أَفْئِدَتُهُمْ هَوَاء ) (ইব্রাহীম: ৪২-৪৩)
অর্থাৎ তুমি কখনো মনে করো না যে, যালিমরা যা করে যাচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলা সে ব্যাপারে গাফিল। বরং তিনি তাদেরকে সুযোগ দিচ্ছেন কিয়ামতের দিন পর্যন্ত। যে দিন সবার চক্ষু হবে স্থির বিস্ফারিত। সে দিন তারা ভীত-বিহ্বল হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে ছুটোছুটি করবে। তাদের চক্ষু এতটুকুর জন্যও নিজের দিকে ফিরবে না এবং তাদের অন্তর হবে একেবারেই আশা শূন্য।
কারোর মধ্যে বিনয় ও নম্রতা না থাকলেই সে কারোর উপর উদ্যত ও আক্রমণাত্মক হতে পারে। এ কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা সকলকে বিনয়ী ও নম্র হতে আদেশ করেন।
হযরত ‘ইয়ায বিন্ ‘হিমার মুজাশি'য়ী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল একদা খুৎবা দিতে গিয়ে বলেন:
وَ إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوْا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ ، وَ لَا يَبْغِيَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ (মুসলিম, হাদীস ২৮৬৫)
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা এ মর্মে আমার নিকট ওহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা নম্র ও বিনয়ী হও; যাতে করে একের অন্যের উপর গর্ব করার পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় এবং একের অন্যের উপর অত্যাচার বা আক্রমণাত্মক আচরণ করার সুযোগ না আসে।
হযরত আবু মাস্'উদ্‌ আন্সারী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كُنْتُ أَضْرِبُ غُلَامًا لِي ، فَسَمِعْتُ مِنْ خَلْفِي صَوْتًا : اعْلَمْ ، أَبَا مَسْعُودٍ ! لَلَّهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ ، فَالْتَفَتْ فَإِذَا هُوَ رَسُوْلُ اللهُ ، فَقُلْتُ: يَا رَسُوْلَ الله ! هُوَ حُرٌّ لِوَجْهِ اللهِ ، فَقَالَ: أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ (মুসলিম, হাদীস ১৬৫৯)
অর্থাৎ আমি আমার একটি গোলামকে মারছিলাম এমতাবস্থায় পেছন থেকে শুনতে পেলাম, কে যেন আমাকে বড় আওয়াজে বলছে: শুনো, হে আবু মাস্'উদ্‌! তুমি এর উপর যতটুকু ক্ষমতাশীল তার চাইতেও অনেক বেশি ক্ষমতাশীল আল্লাহ্ তা'আলা তোমার উপর। অতঃপর আমি (পেছনে) তাকিয়ে দেখি, তিনি হচ্ছেন স্বয়ং রাসূল। অতএব আমি বললাম: হে আল্লাহ্'র রাসূল! একে আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য স্বাধীন করে দিলাম। তখন রাসূল বললেন: তুমি যদি এমন না করতে তা হলে তোমাকে জাহান্নামের অগ্নি স্পর্শ করতো অথবা পুড়িয়ে দিতো।
হযরত হিশাম বিন্ ‘হাকীম থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ يُعَذِّبُ الَّذِينَ يُعَذِّبُوْنَ النَّاسَ فِي الدُّنْيَا (মুসলিম, হাদীস ২৬১৩)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা ওদেরকে শাস্তি দিবেন যারা দুনিয়াতে মানুষকে (অন্যায়ভাবে) শাস্তি দেয়।
আল্লাহ্ তা'আলা অত্যাচারী ও কারোর উপর অন্যায় মূলক আক্রমণকারীর শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। উপরন্তু আখিরাতের শাস্তি তো তার জন্য প্রস্তুত আছেই।
হযরত আবু বাক্বাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ ذَنْبٍ أَجْدَرُ أَنْ يُعَجِّلَ اللهُ لِصَاحِبِهِ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا مَعَ مَا يَدَّخِرُ لَهُ فِي الآخرَةِ مِنَ الْبَغْيِ وَ قَطِيعَةِ الرَّحِمِ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০২ তিরমিযী, হাদীস ২৫১১ ইন্নু মাজাহ, হাদীস ৪২৮৬ ইন্নু হিব্বান, হাদীস ৪৫৫, ৪৫৬ বায্যার, হাদীস ৩৬৯৩ আহমাদ, হাদীস ২০৩৯০, ২০৩৯৬, ২০৪১৪)
অর্থাৎ দু'টি গুনাহ্ ছাড়া এমন কোন গুনাহ্ নেই যে গুনাহ্গারের শাস্তি আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াতেই দিবেন এবং তা দেওয়াই উচিৎ; উপরন্তু তার জন্য আখিরাতের শাস্তি তো আছেই। গুনাহ্ দু'টি হচ্ছে, অত্যাচার তথা কারোর উপর অন্যায় মূলক আক্রমণ এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী।

📘 হারাম ও কবীরা গুনাহ > 📄 আত্মহত্যা

📄 আত্মহত্যা


আত্মহত্যা একটি মহাপাপ। যেভাবেই সে আত্মহত্যা করুক না কেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ لَا تَقْتُلُوْا أَنْفُسَكُمْ ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا ) (নিসা': ২৯)
অর্থাৎ এবং তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল। হযরত জুন্দাব থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
كَانَ بِرَجُلٍ جِرَاحٌ فَقَتَلَ نَفْسَهُ ، فَقَالَ اللهُ: بَدَرَنِي عَبْدِي بِنَفْسِهِ ، حَرَّمْتُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ (বুখারী, হাদীস ১৩৬৪)
অর্থাৎ জনৈক ব্যক্তি গুরুতর আহত হলে সে তার ক্ষতগুলোর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করলো। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বললেন: আমার বান্দাহ্ স্বীয় জান কবজের ব্যাপারে তড়িঘড়ি করেছে অতএব আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম। হযরত সাবিত্ বিন্ যাহ্হাক থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَيْءٍ فِي الدُّنْيَا عَذَّبَهُ اللَّهُ بِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ (বুখারী, হাদীস ১৩৬৩, ৬০৪৭, ৬১০৫, ৬৬৫২ মুসলিম, হাদীস ১১০)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন বস্তু দিয়ে আত্মহত্যা করলো আল্লাহ্ তা'আলা তাকে জাহান্নামে সে বস্তু দিয়েই শাস্তি দিবেন।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَتَوَجَّاُ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا ، وَ مَنْ شَرِبَ سُمًّا فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ يَتَحَسَّاهُ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا ، وَ مَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ يَتَرَدَّى فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيْهَا أَبَدًا (বুখারী, হাদীস ৫৭৭৮ মুসলিম, হাদীস ১০৯)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন লোহা বা লোহা জাতীয় বস্তু দিয়ে আত্মহত্যা করলো সে লোহা বা লোহা জাতীয় বস্তুটি তার হাতেই থাকবে। তা দিয়ে সে জাহান্নামের আগুনে নিজ পেটে আঘাত করবে এবং তাতে সে চিরকাল থাকবে। তেমনিভাবে যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করলো সে জাহান্নামের আগুনে বিষ পান করতেই থাকবে এবং তাতে সে চিরকাল থাকবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করলো সে জাহান্নামের আগুনে লাফাতেই থাকবে এবং তাতে সে চিরকাল থাকবে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
الَّذِي يَخْنُقُ نَفْسَهُ يَخْنُقُهَا فِي النَّارِ ، وَ الَّذِي يَطْعَنُهَا يَطْعَنُهَا فِي النَّارِ (বুখারী, হাদীস ১৩৬৫)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করলো সে জাহান্নামে গিয়ে এভাবেই করতে থাকবে এবং যে ব্যক্তি নিজকে বর্শা অথবা অন্য কোন কিছু দিয়ে আঘাত করে আত্মহত্যা করলো সেও জাহান্নামে গিয়ে এভাবেই করতে থাকবে। আত্মহত্যা জাহান্নামে যাওয়ার একটি বিশেষ কারণ। রাসূল এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে আগাম সংবাদ দিয়েছেন।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমরা একদা রাসূল এর সাথে ‘হুনাইন্ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম। পথিমধ্যে রাসূল জনৈক মুসলমান সম্পর্কে বললেন: এ ব্যক্তি জাহান্নামী। যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো তখন লোকটি এক ভয়ানক যুদ্ধে লিপ্ত হলো এবং সে তাতে প্রচুর ক্ষত-বিক্ষত হলো। জনৈক ব্যক্তি বললো: হে আল্লাহ্'র রাসূল! যার সম্পর্কে আপনি ইতিপূর্বে বললেন: সে জাহান্নামী সে তো আজ এক ভয়ানক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে মৃত্যু বরণ করলো। তখন রাসূল আবারো বললেন: সে জাহান্নামী। তখন মুসলমানদের কেউ কেউ এ ব্যাপারে সন্দিহান হলো। এমতাবস্থায় সংবাদ এলো: সে মরেনি; সে এখনো জীবিত। তবে তার দেহে অনেকগুলো মারাত্মক ক্ষত রয়েছে। যখন রাত হলো তখন লোকটি আর ধৈর্য ধরতে না পেরে আত্মহত্যা করলো। এ ব্যাপারে রাসূল কে সংবাদ দেয়া হলে তিনি বলেন: আল্লাহ্ সুমহান। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ্ তা'আলার বান্দাহ্ ও তাঁর প্রেরিত রাসূল। অতঃপর তিনি হযরত বিলাল কে এ মর্মে ঘোষণা দিতে বললেন যে,
إِنَّهُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلَّا نَفْسٌ مُسْلِمَةٌ ، وَ إِنَّ اللَّهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ (মুসলিম, হাদীস ১১১)
অর্থাৎ একমাত্র মু'মিন ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তবে আল্লাহ্ তা'আলা কখনো কখনো কোন কোন গুনাহগার ব্যক্তির মাধ্যমেও ইসলামকে শক্তিশালী করে থাকেন।

📘 হারাম ও কবীরা গুনাহ > 📄 কারোর রূপ মর্যাদায় আঘাত হানা

📄 কারোর রূপ মর্যাদায় আঘাত হানা


কারোর বংশ মর্যাদা হানি করাও কবীরা গুনাহ্ সমূহের অন্যতম। যা রাসূল এর ভাষায় কুফরি বলে আখ্যায়িত।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرٌ ، الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَ النِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ (মুসলিম, হাদীস ৬৭)
অর্থাৎ মানুষের মধ্যে দু'টি চরিত্র কুফরি পর্যায়ের। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে কারোর বংশ মর্যাদায় আঘাত হানা আর অপরটি হচ্ছে মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে বিলাপ করা।

📘 হারাম ও কবীরা গুনাহ > 📄 আল্লাহ্'র বিধান লঙ্ঘন করে মানব রচিত বিধানের আলোকে বিচার কার্য পরিচালনা বা তা গ্রহণ করা

📄 আল্লাহ্'র বিধান লঙ্ঘন করে মানব রচিত বিধানের আলোকে বিচার কার্য পরিচালনা বা তা গ্রহণ করা


আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া কল্যাণময় বিধানকে লঙ্ঘন করে মানব রচিত যে কোন বিধানের আলোকে বিচার কার্য পরিচালনা বা গ্রহণ করাও আরেকটি কবীরা গুনাহ্।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ مَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَائِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ ) (মা'য়িদাহ: ৪৪)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া বিধানানুযায়ী বিচার করে না সে তো কাফির।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَ مَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَائِكَ هُمُ الظَّالِمُوْنَ ) (মা'য়িদাহ: ৪৫)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া বিধানানুযায়ী বিচার করে না সে তো জালিম।
তিনি আরো বলেন:
وَ مَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَائِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ ) (মা'য়িদাহ: ৪৪)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া বিধানানুযায়ী বিচার করে না সে তো ফাসিক তথা ধর্মচ্যুত নাফরমান।
আল্লাহ্ তা'আলা কোর'আন মাজীদের মধ্যে মানব রচিত আইন গ্রহণকারীদেরকেও ঈমানশূন্য তথা কাফির বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِيْنَ يَزْعُمُوْنَ أَنَّهُمْ آمَنُوْا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَ مَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوْا إِلَى الطَّاغُوتِ وَ قَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَ يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالاً بَعِيداً ، ... فَلَا وَ رَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجاً مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ) (নিসা': ৬০-৬৫)
অর্থাৎ আপনি কি ওদের ব্যাপারে অবগত নন? যারা আপনার প্রতি অবতীর্ণ কিতাব ও পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের উপর ঈমান এনেছে বলে ধারণা পোষণ করছে, অথচ তারা তাগূতের (আল্লাহ্ বিরোধী যে কোন শক্তি) ফায়সালা কামনা করে। বস্তুতঃ তাদেরকে ওদের বিরুদ্ধাচরণের আদেশ দেয়া হয়েছে। শয়তান চায় ওদেরকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করতে। ... অতএব আপনার প্রতিপালকের কসম! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারে না যতক্ষণ না তারা আপনাকে নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিরোধের বিচারক বানিয়ে নেয় এবং আপনার সকল ফায়সালা নিঃসঙ্কোচে তথা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়।
তবে মানব রচিত বিধান কর্তৃক বিচার কার্য পরিচালনা করার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। যা নিম্নরূপ:
ক. যে বিচারক বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্ তা'আলার বিধান বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য কোনভাবেই উপযোগী নয় তা হলে সে কাফির। এ ব্যাপারে সকল মুসলমানের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ, সে আল্লাহ্ তা'আলার বিধানকে অস্বীকার করেছে যা নিশ্চিত কুফরি।
খ. যে বিচারক বিশ্বাস করে যে, মানব রচিত বিধানই বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী; আল্লাহ্ তা'আলার বিধান নয়, চাই তা সর্ব বিষয়েই হোক অথবা শুধুমাত্র নব উদ্ভাবিত বিষয়াবলীতে, তা হলে সেও কাফির। এ ব্যাপারেও সকল মুসলমানের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ, সে মানব রচিত বিধানকে আল্লাহ্ তা'লার বিধানের উপর প্রাধান্য দিয়েছে, যা কুফরি।
গ. যে বিচারক বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্ তা'আলার বিধান যেমন বর্তমান যুগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য উপযোগী তেমনিভাবে মানব রচিত বিধানও, তা হলে সেও কাফির। কারণ, সে সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমপর্যায়ে দাঁড় করিয়েছে যা শির্ক তথা কুফরিও বটে।
ঘ. যে বিচারক বিশ্বাস করে যে, বর্তমান যুগের শরীয়ত বিরোধী আদালত সমূহ্ই মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল; ইসলামী শরীয়ত নয় তা হলে সেও কাফির। কারণ, সেও নিশ্চিত হারাম বস্তুকে হালাল মনে করছে। যা কুফরিরই অন্তর্গত।
৬. যে বিচারক মনে করে যে, আল্লাহ্ তা'আলার বিধানই বিচারের ক্ষেত্রে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিধান; অন্য কোন মানব রচিত বিধান নয়। এর পরও সে মানব রচিত কোন বিধানের আলোকে বিচার কার্য পরিচালনা করে যাচ্ছে এবং সে এও মনে করছে যে, আমার এ কর্ম নীতি কখনোই ঠিক হতে পারে না তা হলে সে সত্যিই বড় পাপী। কারণ, সে নিজ স্বার্থ বা প্রবৃত্তি পূজারী। তবে সে কাফির নয়।
মানব রচিত আইন গ্রহণকারীদেরও কয়েকটি পর্যায় রয়েছে যা নিম্নরূপ:
ক. যে বিচারপ্রার্থী এ কথা জানে যে, তার প্রশাসক বা বিচারক আল্লাহ্ তা'আলার বিধান অনুযায়ী বিচার করছে না। তবুও সে তার প্রশাসক বা বিচারকেরই অনুসরণ করছে এবং এও মনে করছে যে, তার প্রশাসক বা বিচারকের বিচার কার্যই সঠিক। তারা যা হালাল বলে তাই হালাল এবং তারা যা হারাম বলে তাই হারাম তা হলে সে কাফির। কারণ, সে তার প্রশাসক বা বিচারককে তার প্রভু বানিয়ে নিয়েছে যা শির্ক তথা কুফরিও বটে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللَّهِ وَ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَ مَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَّاحِدًا ، لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُوْنَ ) (তাওবাহ: ৩১)
অর্থাৎ তারা আল্লাহ্ তা'আলাকে ছেড়ে নিজেদের আলিম, ধর্ম যাজক ও মারইয়ামের পুত্র মাসীহ্ (ঈসা) কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তাদেরকে শুধু এতটুকুই আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই ইবাদাত করবে। তিনি ব্যতীত সত্যিকার কোন মা'বুদ নেই। তিনি তাদের শির্ক হতে একেবারেই পূতপবিত্র।
হযরত ‘আদি' বিন্ হাতিম থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
أَتَيْتُ النَّبِيَّ وَ فِي عُنُقِي صَلِيْبٌ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ : يَا عَدِيُّ اطْرَحْ عَنْكَ هَذَا الْوَثَنَ ، وَ سَمِعْتُهُ يَقْرَأُ فِي سُوْرَةٍ بَرَاءَةِ: اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللَّهِ ) قَالَ: أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوْا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوْا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوْهُ (তিরমিযী, হাদীস ৩০৯৫)
অর্থাৎ আমি নবী এর দরবারে গলায় স্বর্ণের ক্রুশ ঝুলিয়ে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে ডেকে বলেন: হে ‘আদি’! এ মূর্তিটি (ক্রুশ) গলা থেকে ফেলে দাও। তখন আমি তাঁকে উক্ত আয়াতটি পড়তে শুনেছি। হযরত ‘আদি’ বলেন: মূলতঃ খ্রিষ্টানরা কখনো তাদের আলিমদের উপাসনা করতো না। তবে তারা হালাল ও হারামের ব্যাপারে বিনা প্রমাণে আলিমদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতো। আর এটিই হচ্ছে আলিমদেরকে প্রভু মানার অর্থ তথা আনুগত্যের শির্ক।
উক্ত বিধান আলিম ও ধর্ম যাজকদের ব্যাপারে যেমন প্রযোজ্য তেমনিভাবে বিচারক ও প্রশাসকদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
খ. যে বিচারপ্রার্থী মনে করে যে, আল্লাহ্ তা'আলার বিচারই সঠিক। তার বিচারকের বিচার সঠিক নয়। আল্লাহ্ তা'আলা যাই হালাল বলেন তাই হালাল আর তিনি যাই হারাম বলেন তাই হারাম। তবুও সে তার বিচারকের বিচারই গ্রহণ করছে তার কোন স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে তা হলে সে সত্যিই বড় পাপী। কারণ, সে স্বার্থ পূজারী। তবে সে কাফির নয়।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ السَّمْعُ وَ الطَّاعَةُ فِيْمَا أَحَبَّ وَ كَرِهَ إِلَّا أَنْ يُؤْمَرَ بِمَعْصِيَةِ ، فَإِنْ أَمَرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ (বুখারী, হাদীস ৭১৪৪ মুসলিম, হাদীস ১৮৩৯)
অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তি তার উপরস্থের যে কোন কথা শুনতে ও তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য তা তার পছন্দসই হোক বা নাই হোক যতক্ষণ না তিনি তাকে কোন গুনাহ্'র আদেশ করেন। তবে যদি তিনি তাকে কোন গুনাহ্'র আদেশ করেন তখন তার জন্য উক্ত কথাটি শুনা ও মানা বৈধ নয়।
হযরত ‘আলী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল জনৈক আনসারী সাহাবীকে আমীর বানিয়ে একটি সেনাদল পাঠান এবং তাদেরকে তাদের আমীরের যাবতীয় কথা শুনতে ও তাঁর আনুগত্য করতে আদেশ করেন। পথিমধ্যে তারা উক্ত আমীরকে কোন এক ব্যাপারে রাগিয়ে তুললে তিনি তাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা আমার জন্য কিছু জ্বালানি কাঠ একত্রিত করো। তখন তারা তাই করলো। আমীর সাহেব তাদেরকে সেগুলোতে আগুন ধরাতে বললেও তারা তাই করলো। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেন: রাসূল কি তোমাদেরকে আমার যাবতীয় কথা শুনতে ও আমার আনুগত্য করতে আদেশ করেননি? তারা সকলেই বললো: অবশ্যই। আমীর বললেন: তা হলে তোমরা আগুনে প্রবেশ করো। তখন তারা একে অপরের চেহারা চাওয়া-চাওয়ি শুরু করলো। তারা বললো: আমরা তো রাসূল এর নিকট ছুটেই আসলাম আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে। এভাবেই কিছু সময় কেটে গেলো। ইতোমধ্যে তাঁর রাগ নেমে গেলো এবং আগুন নিভিয়ে দেয়া হলো। তারা রাসূল এর নিকট ফিরে এসে তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন:
لَوْ دَخَلُوْهَا مَا خَرَجُوا مِنْهَا ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوْفِ (বুখারী, হাদীস ৭১৪৫ মুসলিম, হাদীস ১৮৪০)
অর্থাৎ যদি তারা তাতে (আগুনে) প্রবেশ করতো তা হলে তারা আর সেখান থেকে বের হতে পারতো না। নিশ্চয়ই আনুগত্য হচ্ছে (কুর'আন ও হাদীস সম্মত) সৎ কাজেই।
গ. যে বিচারপ্রার্থী বাধ্য হয়েই শরীয়ত বিরোধী বিচার গ্রহণ করেছে; সন্তুষ্ট চিত্তে নয় তা হলে সে কাফিরও নয়। গুনাহগারও নয়। হযরত উম্মে সালামাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
يُسْتَعْمَلُ عَلَيْكُمْ أَمَرَاءُ ، فَتَعْرِفُوْنَ وَ تُنْكِرُوْنَ ، فَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ بَرِئَ ، وَ مَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ سَلِمَ ، وَ لَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَ تَابَعَ (মুসলিম, হাদীস ১৮৫৪)
অর্থাৎ তোমাদের উপর এমন আমীর নিয়োগ করা হবে যাদের কিছু কর্মকাণ্ড হবে মেনে নেয়ার মতো আর কিছু মেনে নেয়ার মতো নয়। সুতরাং যা মেনে নেয়ার মতো নয় তা কেউ অপছন্দ করলে সে দায়মুক্ত হলো। আর যে তা মেনে নিলো না সে নির্ভেজাল থাকলো। আর যে তাতে তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করলো এবং তার অনুসরণ করলো সেই হবে নিশ্চিত দোষী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00