📄 হত্যাকারীর শাস্তি
অবৈধভাবে কেউ কাউকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করলে তার শাস্তি হচ্ছে, ক্বিসাস্ তথা হত্যার পরিবর্তে হত্যা অথবা দিয়াত তথা ক্ষতিপূরণ স্বরূপ শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সম্পদ। তবে এ ব্যাপারে হত্যাকৃত ব্যক্তির ওয়ারিশরা রাজি থাকতে হবে অথবা আপোস-মীমাংসার মাধ্যমে নির্ধারিত সম্পদ।
অনুরূপভাবে হত্যাকৃত ব্যক্তির ওয়ারিশরা হত্যাকারীকে একেবারে ক্ষমাও করে দিতে পারে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى ، الْحُرُّ بِالْحُرِّ ، وَالْعَبْدُ بالْعَبْدِ ، وَ الأُنثَى بالأُنثَى ، فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوْفِ وَ أَدَاء إِلَيْهِ بِإِحْسَانِ ، ذَلِكَ تَحْفِيفٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَ رَحْمَةٌ ، فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ ) (বাক্বারাহ: ১৭৮)
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর নিহতদের ব্যাপারে ক্বিসাস্ তথা হত্যার পরিবর্তে হত্যা নির্ধারণ করা হলো। স্বাধীনের পরিবর্তে স্বাধীন, দাসের পরিবর্তে দাস এবং নারীর পরিবর্তে নারী। তবে কাউকে যদি তার ভাই (মৃত ব্যক্তি) এর পক্ষ থেকে কিছুটা ক্ষমা করে দেয়া হয় তথা মৃতের ওয়ারিশরা ক্বিসাসের পরিবর্তে দিয়াত গ্রহণ করতে রাজি হয় তবে ওয়ারিশরা যেন ন্যায় সঙ্গতভাবে তা আদায়ের ব্যাপারে তাগাদা দেয় এবং হত্যাকারী যেন তা সদ্ভাবে আদায় করে। এ হচ্ছে তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে লঘু সংবিধান এবং (তোমাদের উপর) তাঁর একান্ত করুণা। এরপরও কেউ সীমালংঘন করলে তথা হত্যাকারীকে হত্যা করলে তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
ক্বিসাস সত্যিকারার্থে কোন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়। বরং তাতে এমন অনেকগুলো ফায়েদা রয়েছে যা একমাত্র বুদ্ধিমানরাই উদ্ঘাটন করতে পারেন।
আল্লাহ্ তা'আলা ক্বিসাসের ফায়েদা বা উপকার সম্পর্কে বলেন:
وَ لَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ ، لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ ) (বাক্বারাহ: ১৭৯)
অর্থাৎ হে জ্ঞানী লোকেরা! ক্বিসাসের মধ্যেই তোমাদের সকলের বাস্তব জীবন লুক্কায়িত আছে। (কোন হত্যাকারীর উপর ক্বিসাসের বিধান প্রয়োগ করা হলে অন্যরা এ ভয়ে আর কাউকে হত্যা করবে না। তখন অনেকগুলো তাজা জীবন মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে) এতে করে হয়তো বা তোমরা আল্লাহভীরু হবে।
হযরত আ'য়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لاَ يَحِلُّ قَتْلُ مُسْلِمٍ إِلاَّ فِي إِحْدَى ثَلاَثَ خِصَالٍ : زَانٍ مُحْصَنٍ فَيُرْجَمُ ، وَ رَجُلٍ يَقْتُلُ مُسْلِماً مُتَعَمِّداً فَيُقْتَلُ ، وَ رَجُلٍ يَخْرُجُ مِنَ الْإِسْلاَمِ فَيُحَارِبُ اللَّهَ وَ رَسُولَهُ فَيُقْتَلُ أَوْ يُصْلَبُ أَوْ يُنْفَى مِنَ الْأَرْضِ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৩৫৩ নাসায়ী: ৭/৯১ হা'কিম: ৪/৩৬৭)
অর্থাৎ তিনটি কারণের কোন একটি কারণ ছাড়া অন্য যে কোন কারণে কোন মুসলমানকে হত্যা করা জায়িয নয়। উক্ত তিনটি কারণ হচ্ছে: ব্যভিচারী বিবাহিত স্বাধীন পুরুষ। তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। কেউ কোন মুসলমানকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে তাকে তার পরিবর্তে হত্যা করা হবে। কেউ ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করলে এবং আল্লাহ্ তা'আলা ও তদীয় রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তাকে হত্যা করা হবে অথবা ফাঁসি দেয়া হবে অথবা এক দেশ থেকে অন্য দেশে তাড়ানো হবে তথা তাকে কোথাও স্থির হতে দেয়া যাবে না।
হযরত আবু শুরাইহ্ খযা'য়ী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ قُتِلَ لَهُ قَتَيْلٌ بَعْدَ مَقَالَتِي هَذِهِ فَأَهْلُهُ بَيْنَ خَيْرَتَيْنِ : إِمَّا أَنْ يَأْخُذُوا الْعَقْلَ أَوْ يَقْتُلُوا (আবু দাউদ, হাদীস ৪৫০৪ তিরমিযী, হাদীস ১৪০৬)
অর্থাৎ আমার এ কথার পর কোন ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে তার ওয়ারিশরা দু'টি অধিকার পাবে। দিয়াত গ্রহণ করবে অথবা হত্যাকারীকে হত্যা করবে। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
مَنْ قُتِلَ فَهُوَ بِخَيْرِ النَّظْرَيْنِ : إِمَّا أَنْ يُعْقَلُ ، وَ إِمَّا أَنْ يُقَادَ أَهْلُ الْقَتِيلِ (বুখারী, হাদীস ১১২ মুসলিম, হাদীস ১৩৫৫ আবু দাউদ, হাদীস ৪৫০৫ তিরমিযী, হাদীস ১৪০৬)
অর্থাৎ কাউকে হত্যা করা হলে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশরা দু'টি অধিকার পাবে। তার মধ্য থেকে ভেবেচিন্তে তারা উত্তমটিই গ্রহণ করবে। তার দিয়াত নেয়া হবে অথবা তার ওয়ারিশদেরকে তার ক্বিসাস্ নেয়ার সুবিধা দেয়া হবে। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
مَنْ قُتِلَ لَهُ قَتِيْلٌ فَهُوَ بِخَيْرِ النَّظْرَيْنِ: إِمَّا أَنْ يَعْفُوَ وَ إِمَّا أَنْ يَقْتَلَ (তিরমিযী, হাদীস ১৪০৫)
অর্থাৎ কাউকে হত্যা করা হলে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশরা দু'টি অধিকার পাবে। তার মধ্য থেকে ভেবেচিন্তে তারা উত্তমটিই গ্রহণ করবে। হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিবে অথবা তাকে হত্যা করবে। তবে বিচারকের দায়িত্ব হচ্ছে, তিনি সর্বপ্রথম হত্যাকৃতের ওয়ারিশদেরকে ক্ষমার পরামর্শ দিবেন। হযরত আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ رُفِعَ إِلَيْهِ شَيْءٌ فِيْهِ قِصَاصِ إِلَّا أَمَرَ فِيْهِ بِالْعَفْوِ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৪৯৭ ইন্নু মাজাহ, হাদীস ২৭৪২)
অর্থাৎ নবী এর নিকট ক্বিসাস্ সংক্রান্ত কোন ব্যাপার উপস্থাপন করা হলে তিনি সর্বপ্রথম ক্ষমারই আদেশ করতেন।
পিতা-মাতা অথবা দাদা-দাদী তাদের কোন সন্তানকে হত্যা করলে তাদেরকে তার পরিবর্তে হত্যা করা যাবে না।
হযরত ‘উমর বিন্ খাত্তাব থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا يُقَادُ الْوَالِدُ بِالْوَلَد (তিরমিযী, হাদীস ১৪০০ ইন্নু মাজাহ, হাদীস ২৭১২ আহমাদ : ১/২২ ইদুল জারূদ, হাদীস ৭৮৮ বায়হাক্বী: ৮/৩৮)
অর্থাৎ পিতা-মাতা অথবা দাদা-দাদীকে তাদের সন্তান হত্যার পরিবর্তে হত্যা করা যাবে না।
তবে তাদেরকে সন্তান হত্যার দিয়াত অবশ্যই দিতে হবে এবং তারা হত্যাকৃতের ওয়ারিসি সম্পত্তি হিসেবে উক্ত দিয়াতের কোন অংশই পাবে না। এ ছাড়াও হত্যাকারী ব্যক্তি হত্যাকৃত ব্যক্তির যে কোন ধরনের ওয়ারিশ হলেও সে উক্ত ব্যক্তির ওয়ারিসি সম্পত্তির কিছুই পাবে না। এমনকি দিয়াতের কোন অংশও নয়।
হযরত আবু হুরাইراহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
الْقَاتِلُ لَا يَرِثُ (ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৬৯৫)
অর্থাৎ হত্যাকারী ব্যক্তি কোন মিরাসই পাবে না।
হত্যাকারী কোন মুসলমানকে কোন কাফির হত্যার পরিবর্তে ক্বিসাস্ হিসেবে হত্যা করা যাবে না। বরং তাকে উক্ত হত্যার পরিবর্তে দিয়াত দিতে হবে।
হযরত ‘আলী, হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর ও হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ আব্বাস্ থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
لَا يُقْتَلُ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ (বুখারী, হাদীস ১১১ আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৩০ তিরমিযী, হাদীস ১৪১২ নাসায়ী: ৮/১৯ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৭০৮, ২৭০৯, ২৭১০ আহমাদ: ১/১২২ হা'কিম: ২/১৫৩)
অর্থাৎ কোন মুসলমানকে কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা যাবে না। হত্যাকারী যে কোন পুরুষকে যে কোন মহিলা হত্যার পরিবর্তে হত্যা করা যাবে। অনুরূপভাবে হত্যাকারী ব্যক্তি যেভাবে হত্যাকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে ঠিক সেভাবেই হত্যাকারীকে হত্যা করা হবে।
হযরত আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
إِنْ يَهُودِيًّا رَضَ رَأْسَ جَارِيَةٍ بَيْنَ حَجَرَيْنِ ، قِيلَ: مَنْ فَعَلَ هَذَا بِكِ ، أَفُلَانٌ؟ أَفُلانٌ ، حَتَّى سُمِّيَ الْيَهُودِيُّ ، فَأَوْمَاتْ بِرَأْسِهَا ، فَأُخِذَ الْيَهُودِيُّ فَاعْتَرَفَ ، فَأَمَرَ به النبي ﷺ فَرُضٌ رَأْسُهُ بَيْنَ حَجَرَيْنِ (বুখারী, হাদীস ২৪১৩ মুসলিম, হাদীস ১৬৭২ আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৩৫ ইনু মাজাহ, হাদীস ২৭১৫, ২৭১৬)
অর্থাৎ জনৈক ইহুদি ব্যক্তি দু'টি পাথরের মাঝে এক আনসারী মেয়ের মাথা রেখে তা পিষে দিলে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কে সে ব্যক্তি যে তোমার সাথে এমন ব্যবহার করলো? ওমুক না ওমুক। একে একে অনেকের নামই তার সামনে উল্লেখ করা হয়। সর্বশেষে তার সামনে ইহুদিটির নাম উল্লেখ করা হলে সে মাথা দিয়ে ইশারা করে জিজ্ঞাসাকারীর প্রতি সমর্থন জানায় এবং ইহুদিটিকে পাকড়াও করা হলে সে তা স্বীকারও করে। তখন নবী অনুরূপভাবে তার মাথা পিষে দেয়ার আদেশ জারি করেন এবং তাঁর আদেশ যথোচিত কার্যকরী করা হয়।
হত্যাকারী ছাড়া অন্য কাউকে কারোর হত্যার পরিবর্তে হত্যা করা যাবে না। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ لَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا ، وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ) (আন'আম : ১৬৪)
অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীয় কৃতকর্মের জন্য নিজেই দায়ী। কোন পাপীই অন্যের পাপের বোঝা নিজে বহন করবে না। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَ مَنْ قُتِلَ مَظْلُوْماً فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَاناً ، فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ ، إِنَّهُ كَانَ مَنْصُوراً ) (ইস্রা'/বানী ইস্রা'ঈল: ৩৩)
অর্থাৎ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে তার ওয়ারিশকে আমি (আল্লাহ) ক্বিসাস্ গ্রহণের অধিকার দিয়ে থাকি। তবে (হত্যার পরিবর্তে) হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে। (যেমন: হত্যাকারীর পরিবর্তে অন্য নির্দোষকে হত্যা, হত্যাকারীর সঙ্গে অন্য নিরপরাধকেও হত্যা অথবা হত্যাকারীকে অমানবিকভাবে হত্যা করা ইত্যাদি)। কারণ, তার এ কথা জেনে রাখা উচিৎ যে, ক্বিসাস্ নেয়ার ব্যাপারে তাকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আম্র (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
( إِنْ أَعْتَى النَّاسِ عَلَى اللهِ ثَلَاثَةٌ : مَنْ قَتَلَ فِي حَرَمِ اللَّهِ ، أَوْ قَتَلَ غَيْرَ قَاتِلِهِ ، أَوْ قَتَلَ لأُحْلِ الْجَاهِلِيَّة ) (আহমাদ: ২/১৭৯, ১৮৭ ইবনু হিব্বান: ১৩/৩৪০)
অর্থাৎ মানব জাতির মধ্য থেকে তিন ব্যক্তিই আল্লাহ্ তা'আলার সঙ্গে সব চাইতে বেশি গাদ্দারী করে থাকে। তারা হচ্ছে: (মক্কা-মদীনার) হারাম এলাকায় কাউকে হত্যাকারী। যে ব্যক্তি হত্যাকারীর পরিবর্তে অন্যকে হত্যা করে। শত্রুতাবশতঃ অন্যকে হত্যাকারী। যা বরবর যুগের নিয়ম ছিলো।
হযরত ‘আমর বিন্ আ'হ্ওয়াস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল কে বিদায় হজ্জের দিবসে নিম্নোক্ত কথা বলতে শুনেছি। তিনি বলেন:
أَلَا لَا يَجْنِي جَانِ إِلَّا عَلَى نَفْسِهِ ، وَ لَا يَجْنِي وَالِدٌ عَلَى وَلَدِهِ ، وَ لَا مَوْلُودٌ على والده (ইবনু মাজাহ, হাদীস ২৭১৯)
অর্থাৎ যে কোন অপরাধী অপরাধের জন্য সে নিজেই দায়ী। অন্য কেউ নয়। অতএব পিতার অপরাধের জন্য সন্তান দায়ী নয়। অনুরূপভাবে সন্তানের অপরাধের জন্য পিতাও দায়ী নন।
কেউ কাউকে এমন বস্তু দিয়ে হত্যা করলে যা কর্তৃক সাধারণত কেউ কাউকে হত্যা করে না সে জন্য তাকে অবশ্যই দিয়াত দিতে হবে। এ জাতীয় হত্যা "তুলনামূলক ইচ্ছাকৃত হত্যা" নামে পরিচিত। এ হত্যার সাথে ইচ্ছাকৃত হত্যার কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। কারণ, তাতে হত্যার সামান্যটুকু ইচ্ছা অবশ্যই পাওয়া যায়। তবে উক্ত হত্যাকে নিরেট ইচ্ছাকৃত হত্যা এ কারণেই বলা হয় না যে, যেহেতু তাতে এমন বস্তু ব্যবহার করা হয়নি যা কর্তৃক সাধারণত কাউকে হত্যা করা হয়। অনুরূপভাবে এ জাতীয় হত্যাকাণ্ডে ক্বিসাস্ নেই বলে ভুলবশতঃ হত্যার সঙ্গেও এর সামান্যটুকু সাদৃশ্য থেকে যায়।
কারোর হত্যাকারীর পরিচয় পাওয়া সম্ভবপর না হলেও তার দিয়াত দিতে হয়। কারণ, কোন মুসলমানের রক্ত কখনো বৃথা যেতে দেয়া হবে না। তবে সরকারই সে দিয়াত বহন করবে। সে জন্য কাউকে হত্যা করা যাবে না। যেমন: কোন ভিড় শেষ হওয়ার পর সেখানে কাউকে মৃত পাওয়া গেলে।
কোন ব্যক্তি কারোর ক্বিসাস্ অথবা দিয়াত বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করলে তার উপর আল্লাহ্ তা'আলার অভিশাপ নিপতিত হয়।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ قُتِلَ عِمِّيًّا أَوْ رِميًا بِحَجَرٍ أَوْ سَوْطٍ أَوْ عَصًا فَعَقْلُهُ عَقْلُ الْخَطَإِ ، وَ مَنْ قُتِلَ عَمْداً فَهُوَ قَوَدٌ ، وَ مَنْ حَالَ دُونَهُ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَ الْمَلَائِكَةِ وَ النَّاسِ أَجْمَعِيْنَ ، لا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَ لَا عَدْلٌ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৪০, ৪৫৯১ নাসায়ী: ৮/৩৯ ইন্নু মাজাহ, হাদীস ২৬৮৫)
অর্থাৎ যার হত্যাকারীর পরিচয় মিলেনি অথবা যাকে পাথর মেরে কিংবা লাঠি ও বেত্রাঘাতে হত্যা করা হয়েছে তার দিয়াত হচ্ছে ভুলবশত হত্যার দিয়্যাত। তবে যাকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করা হয়েছে তার শাস্তি হবে ক্বিসাস্। যে ব্যক্তি উক্ত ক্বিসাস্ বা দিয়াত বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে তার উপর আল্লাহ্ তা'আলা, ফিরিশতা ও সকল মানুষের লা'নত। তার পক্ষ থেকে কোন প্রকার তাওবা অথবা ফিদয়া (ক্ষতিপূরণ) গ্রহণ করা হবে না। অন্য অর্থে, তার পক্ষ থেকে কোন ফরয ও নফল ইবাদাত গ্রহণ করা হবে না।
সরকারী কোষাগার চার ধরনের দায়ভার গ্রহণ করতে বাধ্য। যা নিম্নরূপ:
১. কোন মুসলমান ঋণগ্রস্তাবস্থায় মারা গেলে এবং ঋণ পরিশোধ করার মতো কোন সম্পদ সে রেখে না গেলে উক্ত ঋণ তার সরকারই পরিশোধ করবে।
২. কেউ কাউকে ভুলবশতঃ অথবা তুলনামূলক ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে এবং সে ব্যক্তি আর্থিকভাবে সচ্ছল না হলে অথবা তার কোন আত্মীয়-স্বজন না থাকলে উক্ত দিয়াত তার সরকারই পরিশোধ করবে। তবে তার কোন আত্মীয়-স্বজন থাকলে তারাই তা পরিশোধ করবে।
৩. কোন হত্যাকৃত ব্যক্তির ওয়ারিশরা নির্দিষ্ট কোন আলামতের ভিত্তিতে কাউকে সে হত্যার জন্য দায়ী করলে অতঃপর বিচারক তাদেরকে সে ব্যাপারে পঞ্চাশটি কসম করতে বলার পরও তারা তা করতে অস্বীকৃতি জানালে এবং বিবাদীর পক্ষ থেকেও তারা সে জাতীয় কসম গ্রহণ না করলে সরকার কোষাগার থেকেই তার দিয়াত আদায় করবে।
৪. কোন হত্যাকৃত ব্যক্তির হত্যাকারীর পরিচয় পাওয়া না গেলেও সরকার তার দিয়াত বায়তুল্মাল্ থেকেই আদায় করবে। ইচ্ছাকৃত হত্যা বলতে স্বভাবতঃ হত্যা করা হয় এমন বস্তু দিয়ে কাউকে হত্যা করাকে বুঝানো হয়।
নিম্নে ইচ্ছাকৃত হত্যার কয়েকটি রূপ উল্লেখ করা হয়েছে:
১. কোন ভারী বস্তু দিয়ে হত্যা। ২. শরীরে ঢুকে যায় এমন বস্তু দিয়ে হত্যা। ৩. হিংস্র পশুর থাবায় নিক্ষেপ করে হত্যা। ৪. আগুনে বা পানিতে নিক্ষেপ করে হত্যা। ৫. গলা টিপে হত্যা। ৬. খানা-পানি না দিয়ে খিদে ও তৃষ্ণায় হত্যা। ৭. বিষ পানে হত্যা। ৮. যাদু করে হত্যা। ৯. হত্যা সংক্রান্ত ব্যাপারে দু'জন মিলে সাক্ষী দিয়ে কাউকে হত্যা করানো। নিরেট ইচ্ছাকৃত অথবা তুলনামূলক ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত হচ্ছে: একশতটি উট। যার মধ্যে চল্লিশটি হবে গর্ভবতী। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর বিন্ ‘আস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
أَلَا إِنَّ دِيَةَ الْخَطَأِ شِبْهِ الْعَمْدِ: مَا كَانَ بِالسَّوْطِ وَ الْعَصَا مِئَةٌ مِنَ الإِبِلِ ، مِنْهَا أَرْبَعُوْنَ فِي بُطُونِهَا أَوْلَادُهَا (আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৪৭, ৪৫৮৮ নাসায়ী: ৮/৪১ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৬৭৬ ইন্নু হিব্বান, হাদীস ১৫২৬)
অর্থাৎ কাউকে লাঠি ও বেত্রাঘাতে হত্যা করা হলে তথা তুলনামূলক ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত হচ্ছে: একশতটি উট। যার মধ্যে চল্লিশটি হবে গর্ভবতী।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর বিন্ ‘আস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
عَقْلُ شِبْهِ الْعَمْدِ مُغَلَّظٌ مِثْلُ عَقْلِ الْعَمْدِ ، وَ لَا يُقْتَلُ صَاحِبُهُ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৬৫)
অর্থাৎ তুলনামূলক ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াতের ন্যায় বেশি। এ জাতীয় হত্যাকারীকে কখনো হত্যা করা হবে না।
ভুলবশতঃ হত্যার দিয়াত হচ্ছে: বিশটি দু'বছরের মাদি উট, চল্লিশটি তিন বছরের নর ও মাদি উট, বিশটি চার বছরের মadi উট ও বিশটি পাঁচ বছরের মাদি উট।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'ঊদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
دِيَةُ الْخَطَا أَحْمَاساً : عِشْرُوْنَ حِقَّةً ، وَ عِشْرُونَ جَدَعَةً ، وَ عِشْرُونَ بَنَاتِ مَخَاضٍ، وَ عِشْرُونَ بَنَاتِ لَبُوْنٍ ، وَ عِشْرُوْنَ بَنِي لَبُوْنٍ (দারাকুত্বনী, হাদীস ৩৩৩২)
অর্থাৎ ভুলবশতঃ হত্যার দিয়াত হচ্ছে: বিশটি চার বছরের মাদি উট, বিশটি পাঁচ বছরের মাদি উট, বিশটি দু' বছরের মাদি উট ও চল্লিশটি তিন বছরের নর ও মadi উট।
বর্তমান সৌদি রিয়ালের হিসাবানুযায়ী নিরেট ইচ্ছাকৃত অথবা তুলনামূলক ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত হচ্ছে: ১,২০,০০০ (এক লক্ষ বিশ হাজার) রিয়াল এবং ভুলবশতঃ হত্যার দিয়াত হচ্ছে: ১০০,০০০ (এক লক্ষ) রিয়াল। তবে সর্ব যুগেই উটের মূল্যের পরিবর্তনের কারণে উক্ত দিয়াতের হার পরিবর্তনশীল।
ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত স্বয়ং হত্যাকারীই পরিশোধ করতে বাধ্য। অন্য কেউ উহার সামান্যটুকুও বহন করবে না। তবে তুলনামূলক ইচ্ছাকৃত হত্যা ও ভুলবশতঃ হত্যার দিয়াত হত্যাকারীর পুরুষ আত্মীয়-স্বজনই পরিশোধ করবে। যদিও হত্যাকারী ধনীই হোক না কেন। তবে বিজ্ঞ বিচারক ব্যক্তি উক্ত দিয়্যাতকে আত্মীয়তার দূরত্ব ও নৈকট্যের কথা বিবেচনা করে সকল আত্মীয়-স্বজনের উপর বন্টন করে দিবে। যা তারা তিন বছরের মধ্যেই সহজ ও সরল কিস্তিতে পরিশোধ করবে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
اقْتَتَلَتِ امْرَأَتَانِ مِنْ هُذَيْلٍ ، فَرَمَتْ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى بِحَجَرٍ فَقَتَلَتْهَا وَ مَا فِي بَطْنِهَا ، فَاخْتَصَمُوْا إِلَى رَسُولِ اللهِ ، فَقَضَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنَّ دِيَةَ جَيْنِهَا غُرَّةٌ: عَبْدٌ أَوْ وَلِيْدَةٌ ، وَ قَضَى بِدِيَةِ الْمَرْأَةِ عَلَى عَاقَلَتِهَا (বুখারী, হাদীস ৫৭৫৮ মুসলিম, হাদীস ১৬৮১)
অর্থাৎ হুযাইল্ গোত্রের দু'জন মহিলা ঝগড়া করে একজন অপরজনকে একটি পাথর নিক্ষেপ করে। তাতে অপর মহিলাটি ও তার পেটের সন্তান মরে যায়। মহিলাটির ওয়ারিশরা রাসূল এর নিকট এ ব্যাপারে বিচার দায়ের করলে তিনি নিম্নোক্ত ফায়সালা করেন:
১. সন্তানের দিয়াত হচ্ছে, একটি গোলাম অথবা একটি বান্দি। যা হত্যাকারিণী মহিলাটি স্বয়ং আদায় করবে। যার পরিমাণ পাঁচটি উট।
২. হত্যাকৃতা মহিলার দিয়াত হত্যাকারিণী মহিলার আত্মীয়-স্বজনরাই আদায় করবে।
হযরত মিক্বদাম শামী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
أَنَا وَارِثُ مَنْ لاَ وَارِثَ لَهُ ، أَعْقِلُ عَنْهُ وَ أَرِثُهُ ، وَ الْخَالُ وَارِثُ مَنْ لَا وَارِثَ لَهُ ، يَعْقِلُ عَنْهُ وَ يَرِثُهُ (ইবনু মাজাহ, হাদীস ২৬৮৪)
অর্থাৎ যার ওয়ারিশ নেই তার ওয়ারিশ হবো আমি। আমি তার পক্ষ থেকে দিয়াত দেবো এবং তার ওয়ারিশ হবো। যার ওয়ারিশ নেই তার ওয়ারিশ হবে তার মামা। সে তার পক্ষ থেকে দিয়াত দেবে এবং তার ওয়ারিশ হবে। ইহুদি-খ্রিস্টান অথবা যে কোন চুক্তিবদ্ধ কিংবা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফিরের দিয়াত মুসলমানের দিয়্যাতের অর্ধেক। অনুরূপভাবে গোলামের দিয়্যাতও স্বাধীন পুরুষের দিয়্যাতের অর্ধেক। তেমনিভাবে মহিলার দিয়্যাতও পুরুষের দিয়্যাতের অর্ধেক। এ ব্যাপারে আলিমদের ঐকমত্য রয়েছে। হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর বিন্ ‘আস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
قَضَى رَسُوْلُ اللَّهِ أَنَّ عَقْلَ أَهْلِ الْكِتَابَيْنِ نِصْفُ عَقْلِ الْمُسْلِمِينَ ، وَ هُمُ الْيَهُودُ وَ النَّصَارَى (ইবনু মাজাহ, হাদীস ২৬৯৪)
অর্থাৎ ইহুদি-খ্রিস্টানদের সম্পর্কে রাসূল এর ফায়সালা এই যে, তাদের দিয়াত মুসলমানদের দিয়্যাতের অর্ধেক। হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর বিন্ ‘আস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
دِيَةُ الْمُعَاهَد نِصْفُ دِيَةِ الْحُرُ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৮৩)
অর্থাৎ চুক্তিবদ্ধ কাফিরের দিয়াত স্বাধীন পুরুষের দিয়্যাতের অর্ধেক। হযরত ‘আমর বিন্ শু'আইব থেকে বর্ণিত তিনি তার পিতা থেকে এবং তার পিতা তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
عَقْلُ الْمَرَأَةِ مِثْلُ عَقْلِ الرَّجُلِ ، حَتَّى يَبْلُغَ الثُلُثَ مِنْ دِيَتِهَا (নাসায়ী: ৮/৪৫)
অর্থাৎ মহিলার দিয়াত পুরুষের দিয়্যাতের মতোই। তবে যখন তা তার মূল দিয়্যাতের এক তৃতীয়াংশে পৌঁছুবে তখন তার দিয়াত হবে পুরুষের দিয়্যাতের অর্ধেক।
যদি কোন হত্যাকৃত ব্যক্তি কোথাও ক্ষতবিক্ষত অথবা রক্তাক্তাবস্থায় পাওয়া যায় এবং তার হত্যাকারী জানা না যায়। এমনকি হত্যাকারীর ব্যাপারে কোন প্রমাণও মিলেনি। তবুও হত্যাকৃতের ওয়ারিশরা উক্ত হত্যার ব্যাপারে নির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করছে এবং তাদের দাবির পক্ষে কিছু আকার-ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। যেমন: হত্যাকৃত ব্যক্তি ও সন্দেহকৃত ব্যক্তির মাঝে পূর্বের কোন শত্রুতা ছিলো অথবা সন্দেহকৃত ব্যক্তির ঘরেই হত্যাকৃত ব্যক্তিকে পাওয়া গেলো অথবা হত্যাকৃতের কোন ব্যবহৃত সম্পদ সন্দেহকৃত ব্যক্তির সাথে পাওয়া গেলো অথবা হত্যার ব্যাপারে বাচ্চাদের সাক্ষী পাওয়া যায় কোন বালিগ পুরুষের নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এমতাবস্থায় বাদী ব্যক্তি সন্দেহকৃত ব্যক্তি যে উক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে তা বলে পঞ্চাশটি কসম খাবে। অতঃপর ইচ্ছাকৃত হত্যা বলে প্রমাণিত হলে তার ক্বিসাস্ নেয়া হবে এবং ভুলবশত হত্যা প্রমাণিত হলে উহার দিয়াত নেয়া হবে। আর যদি বাদী ব্যক্তি পঞ্চাশটি কসম খেতে অস্বীকার করে অথবা বাদী পক্ষ মহিলা কিংবা বাচ্চা হয় তখন বিবাদী ব্যক্তি পঞ্চাশটি কসম খেয়ে উক্ত অপবাদ থেকে নিজকে নিষ্কৃত করবে। আর যদি সেও কসম খেতে অস্বীকার করে তা হলে অবশ্যই তাকে হত্যাকারী বলে দোষী সাব্যস্ত করা হবে। আর যদি বিবাদী ব্যক্তি পঞ্চাশটি কসম খেয়ে বসে অথবা বাদী পক্ষ তার কসমে রাজি না হয় তখন হত্যাকারীর দিয়াত সরকারী খাজাঞ্চিখানা থেকে দেয়া হবে।
তবে ‘উলামা সম্প্রদায় উক্ত দাবির বিশুদ্ধতার জন্য দশটি শর্ত উল্লেখ করে থাকেন। যা নিম্নরূপ:
১. উক্ত হত্যার দাবি বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কিছু আকার-ইঙ্গিত পাওয়া যেতে হবে। যার কিয়দংশ উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
২. যার বিরুদ্ধে হত্যার দাবি করা হচ্ছে সে বালিগ ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে।
৩. যার ব্যাপারে হত্যার সন্দেহ করা হচ্ছে তার পক্ষে কাউকে হত্যা করা সম্ভবপর হতে হবে। যেমন: কারোর হাত-পা অবশ। এমতাবস্থায় তাকে সন্দেহ করা যাবে না।
৪. উক্ত দাবির মধ্যে হত্যার বাস্তব বর্ণনা অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন: এমন বলা যে, তার শরীরের ওমুক জায়গায় তলোয়ারের আঘাত রয়েছে।
৫. সমস্ত ওয়ারিশ উক্ত হত্যার দাবির ব্যাপারে একমত হতে হবে। কেউ চুপ থাকলে চলবে না।
৬. সমস্ত ওয়ারিশ উক্ত হত্যার ব্যাপারে একমত হতে হবে। কেউ উক্ত হত্যাকে অস্বীকার করলে চলবে না।
৭. সমস্ত ওয়ারিশ উক্ত দাবি করতে হবে।
৮. সমস্ত ওয়ারিশ এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে দায়ী করতে হবে। এমন যেন না হয়, কেউ বললো: অমুক ব্যক্তি হত্যা করেছে। আরেক জন বললো: না, এ নয় বরং অন্য আরেক জন হত্যা করেছে।
৯. ওয়ারিশদের মধ্যে পুরুষ থাকতে হবে।
১০. দাবি এক ব্যক্তির ব্যাপারে হতে হবে। অনেক জনের ব্যাপারে নয়। হযরত সাহল বিন্ আবু হাসমা থেকে বর্ণিত তিনি তাঁর বংশের বড়দের মুখ থেকে শ্রবণ করেন যে, আব্দুল্লাহ্ বিন্ সাহল এবং মু'হাইয়েসা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) কোন এক কারণে খাইবার রওয়ানা করেন। কিছুক্ষণ পর উভয় জন ভিন্ন হয়ে যান। অতঃপর মু'হাইয়েসার নিকট এ সংবাদ আসলো যে, ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ সাহলকে হত্যা করে কূপে ফেলে দেয়া হয়েছে। তখন সে ইহুদিদের নিকট এসে বললো: আল্লাহ্'র কসম! তোমরাই ওকে হত্যা করেছো। তারা বললো: আল্লাহ্'র কসম! আমরা ওকে হত্যা করিনি। তখন সে এবং তার ভাই ‘হুওয়াইয়েসা এবং আব্দুর রহমান বিন্ সাহল রাসূল এর নিকট আসলো। মু'হাইয়েসা কথা বলতে চাইলে রাসূল তাকে বললেন:
كُبِّرْ كُبِّرْ অর্থাৎ তোমার বড় ভাইকে কথা বলতে দাও।
তখন ‘হুওয়াইয়েসা ঘটনাটি বিস্তারিত বললে রাসূল বলেন:
إِمَّا أَنْ يَدُوْا وَ إِمَّا أَنْ يَأْذَنُوْا بِحَرْبٍ ، فَكَتَبَ إِلَيْهِمْ فِي ذَلِكَ كِتَاباً ، فَكَتَبُوْا: إِنَّا وَاللَّهُ مَا قَتَلْنَاهُ ، فَقَالَ لِحُوَيْصَةَ وَ مُحَيِّصَةَ وَ عَبْدِ الرَّحْمَنُ مِنْ سَهْل : أَتَحْلِفُوْنَ وَتَسْتَحقُوْنَ دَمَ صَاحِبَكُمْ؟ قَالُوا : لا ، قَالَ: فَتَحْلِفُ لَكُمْ يَهُودُ؟ قَالُوا : لَيْسُوا مُسْلِمِينَ، فَوَدَاهُ رَسُوْلُ اللَّهِ مِنْ عِنْدِهِ ، فَبَعَثَ إِلَيْهِمْ مِئَةَ نَاقَةِ (বুখারী, হাদীস ৭১৯২ মুসলিম, হাদীস ১৬৬৯)
অর্থাৎ তারা দিয়াত দিবে অথবা আমাদের সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণা দিবে। রাসূল এ ব্যপারে তাদের নিকট চিঠি পাঠালে তারা তাঁর কাছে লিখে পাঠায় যে, আল্লাহ্'র কসম! আমরা ওকে হত্যা করিনি। অতঃপর রাসূল ‘হুওয়াইয়েসা, মু'হাইয়েসা ও আব্দুর রহমান বিন্ সাহলকে বলেন: তোমরা কি কসম খেয়ে ওর ক্বিসাস্ নিবে? তারা বললো: না। তিনি বললেন: তাহলে ইহুদিরা তোমাদের নিকট কসম খাবে? তারা বললো: তারা মুসলমান নয়। অতএব তাদের কসমের কোন গুরুত্ব নেই। অতঃপর রাসূল নিজ পক্ষ থেকে একশতটি উট তাদের নিকট দিয়াত হিসেবে পাঠিয়ে দেন।
কেউ কাউকে ধোঁকা কিংবা কৌশলে অথবা অভয় দিয়ে হত্যা করলে (চাই তা সম্পদের জন্য হোক কিংবা ইজ্জতহানির জন্যে অথবা কোন রহস্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়) এমনকি স্বামী স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করলেও বিচারক উক্ত হত্যাকারীকে অবশ্যই হত্যা করবে। কোনভাবেই তাকে ক্ষমা করা হবে না। কারণ, সে আল্লাহ্ তা'আলার যমিনে ফিৎনা সৃষ্টিকারী। অনুরূপভাবে সন্ত্রাসী, দস্যু, তস্কর, ধর্ষক ও শ্লীলতাহানিকারী, ছিনতাইকারী এবং অপহরণকারীর বিধানও একই। চাই তারা কাউকে হত্যা করুক অথবা নাই করুক। তবে তারা কাউকে হত্যা করলে অবশ্যই তাদেরকে হত্যা করতে হবে। আর তারা কাউকে হত্যা না করলে তাদেরকে চারটি শাস্তির যে কোন একটি শাস্তি দেয়া হবে। হত্যা করা হবে অথবা ফাঁসী দেয়া হবে অথবা এক দিকের হাত এবং অপর দিকের পা কেটে ফেলা হবে অথবা অন্য এলাকার জেলে বন্ধী করে রাখা হবে যতক্ষণ না তারা খাঁটি তাওবা করে নেয়। এমনকি একজনকে হত্যা করার ব্যাপারে কয়েকজন অংশ গ্রহণ করলেও তাদের সকলকে হত্যা করা হবে। যদি তারা সরাসরি উক্ত হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে থাকে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِيْنَ يُحَارِبُوْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوْا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَ أَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنْفَوْ مِنَ الْأَرْضِ ، ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ، إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ) (মা'য়িদাহ : ৩৩)
অর্থাৎ যারা আল্লাহ্ তা'আলা ও তদীয় রাসূল এর সাথে যুদ্ধ কিংবা প্রকাশ্য শত্রুতা পোষণ করে অথবা আল্লাহ্ তা'আলা ও তদীয় রাসূল এর বিধি-বিধানের উপর হঠকারিতা দেখায় এবং (হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের মাধ্যমে) ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ফাঁসী দেয়া হবে অথবা এক দিকের হাত এবং অপর দিকের পা কেটে ফেলা হবে অথবা অন্য এলাকার জেলে বন্দী করে রাখা হবে যতক্ষণ না তারা খাঁটি তাওবা করে নেয়। এ হচ্ছে তাদের জন্য ইহলোকের ভীষণ অপমান এবং পরকালেও তাদের জন্য ভীষণ শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে তোমরা তাদেরকে গ্রেফতার করার পূর্বে যদি তারা স্বেচ্ছায় তাওবা করে নেয় তাহলে জেনে রাখো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত দয়ালু।
তবে মানুষের হৃত অধিকার তাদেরকে অবশ্যই পূরণ করতে হবে।
হযরত আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
قَدِمَ أُنَاسٌ مِنْ عُرَيْنَةَ عَلَى رَسُوْلُ اللَّهِ الْمَدِينَةَ ، فَاجْتَوَوْهَا ، فَقَالَ لَهُمْ رَسُوْلُ اللَّهِ : إِنْ شِئْتُمْ أَنْ تَخْرُجُوا إِلَى إِبْلِ الصَّدَقَةِ فَتَشْرَبُوا مِنْ أَلْبَانِهَا وَأَبْوَالِهَا ، فَفَعَلُوْا، فَصَحُوْا ، ثُمَّ مَالُوْا عَلَى الرُّعَاةِ فَقَتَلُوهُمْ وَ ارْتَدُّوا عَنِ الإِسْلَامِ، وَ سَاقُوْا ذَوْدَ رَسُولِ اللَّهِ ، فَبَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيَّ ، فَبَعَثَ فِي أَثَرِهِمْ، فَأُتِيَ بِهِمْ ، فَقَطَعَ أَيْدِيَهُمْ وَ أَرْجُلَهُمْ ، وَ سَمَلَ أَعْيُنَهُمْ وَ تَرَكَهُمْ فِي الْحَرَّةِ حَتَّى مَاتُوا (বুখারী, হাদীস ৫৬৮৫, ৫৬৮৬ মুসলিম, হাদীস ১৬৭১)
অর্থাৎ ‘উরাইনাহ্ গোত্রের কিছু লোক মদিনায় রাসূল এর নিকট আসলো। অসুস্থতার দরুন তারা মদীনায় অবস্থান করতে চাচ্ছিলো না। অতএব রাসূল তাদেরকে বললেন: যদি তোমাদের মনে চায় তা হলে তোমরা সাদাকার উটের দুধ ও প্রস্রাব পান করতে পারো। তারা তাই করলো। তাতে তারা সুস্থ হয়ে গেলো। অতঃপর তারা উট রাখালদেরকে হত্যা করলো, মুর্তাদ্ হয়ে গেলো এবং রাসূল এর কয়েকটি উট নিয়ে গেলো। নবী ব্যাপারটি জানতে পেরে তাদেরকে ধরে আনার জন্য লোক পাঠালেন। তাদেরকে উপস্থিত করা হলে রাসূল তাদের হাত-পা কেটে দিলেন, তাদের চোখ উঠিয়ে ফেললেন এবং তাদেরকে রোদ্রে বেঁধে রাখলেন যতক্ষণ না তারা মৃত্যু বরণ করে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
قُتِلَ غُلَامٌ غِيْلَةً ، فَقَالَ عُمَرُ : لَوِ اشْتَرَكَ فِيْهِ أَهْلُ صَنْعَاءَ لَقَتَلْتُهُمْ بِهِ (বুখারী, হাদীস ৬৮৯৬)
অর্থাৎ জনৈক যুবককে গুপ্তভাবে হত্যা করা হলে হযরত ‘উমর বললেন: পুরো সান্’আবাসীরাও (বর্তমানে ইয়েমেনের রাজধানী) যদি উক্ত যুবককে হত্যা করায় অংশ গ্রহণ করতো তা হলে আমি তাদের সকলকেই ওর পরিবর্তে হত্যা করতাম। তাদেরকে আমি কখনোই এমনিতেই ছেড়ে দিতাম না।
তবে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। আর তা হলো: কেউ কাউকে হত্যা করে তাওবা করে ফেললে সে দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে কি না?
এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, তাওবার কারণে দুনিয়ার শাস্তি কখনো ক্ষমা করা হবে না। তবে হত্যাকৃত ব্যক্তির ওয়ারিশরা যদি হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয় তা হলে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। অন্যথা নয়।
তবে তাওবার কারণে আখিরাতে তাকে আর শাস্তি দেয়া হবে কি না সে ব্যাপারে আলিমদের মতানৈক্য রয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের তিনটি মত উল্লেখযোগ্য। যা নিম্নরূপ:
১. তার জন্য আখিরাতের শাস্তি ক্ষমা করা হবে না। কারণ, যাকে হত্যা করা হয়েছে সে তার অধিকার ফিরে পায়নি। অতএব তাকে তা আখিরাতে দেয়া হবে।
২. তাওবার কারণে আখিরাতে তাকে আর শাস্তি দেয়া হবে না। কারণ, তাওবা সকল গুনাহ্ মুছে দেয়। আর হত্যাকৃত ব্যক্তি যখন নিজ অধিকার আদায় করতে সক্ষম নয় সে জন্য তার ওয়ারিশদেরকে এ ব্যাপারে তার প্রতিনিধি বানানো হয়েছে। সুতরাং তাদের ফায়সালা তার ফায়সালা হিসেবেই ধরা হবে। অতএব আখিরাতে তার পাওনা বলতে কিছুই থাকবে না। যার দরুন হত্যাকারীকে শাস্তি পেতে হবে।
প্রথম মতই গ্রহণযোগ্য। কারণ, তাতে হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাসের সমর্থন রয়েছে। আর একটি কথা হচ্ছে, হত্যার সঙ্গে তিনটি অধিকার সম্পৃক্ত। আল্লাহ্'র অধিকার, হত্যাকৃত ব্যক্তির অধিকার ও তার ওয়ারিশদের অধিকার। সুতরাং তাওবার কারণে আল্লাহ্ তা'আলার অধিকার রক্ষা পেলো। ওয়ারিশদের অধিকার ক্বিসাস্ (হত্যার বিনিময়ে হত্যা), দিয়াত (শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ), চুক্তিবদ্ধ সম্পদ অথবা ক্ষমার মাধ্যমে রক্ষিত হয়। তবে হত্যাকৃত ব্যক্তির অধিকার কিছুতেই রক্ষা পায়নি। যা সে পরকালেই পাবে ইন্শাআল্লাহ্।