📄 কাউকে কোন কিছু দান করে অতঃপর খোঁটা দেয়া
কারোর প্রতি কোন প্রকার অনুগ্রহ করে অথবা তাকে কোন কিছু দান করে অতঃপর তা উল্লেখ পূর্বক খোঁটা দেয়া আরেকটি কবীরা গুনাহ্ এবং হারাম কাজ। এমন কাণ্ড করলে উক্ত দান বা অনুগ্রহের কখনোই কোন সাওয়াব মিলবে না।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوْا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَ الْأَذَى ، كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ
رِنَاءَ النَّاسِ وَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ، فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانِ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا ، لَا يَقْدِرُوْنَ عَلَى شَيْءٍ مِّمَّا كَسَبُوا ، وَ اللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ ) (বাক্বারাহ: ২৬৪)
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের দান-সাদাকা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে বিনষ্ট করো না সে ব্যক্তির ন্যায় যে নিজ ধন-সম্পদ ব্যয় করে মানুষকে দেখানোর জন্য উপরন্তু সে আল্লাহ্ তা'আলা এবং পরকালেও বিশ্বাসী নয়। সুতরাং তার দৃষ্টান্ত এমন এক মসৃণ পাথরের ন্যায় যার উপর কিছু মাটি জমেছে অতঃপর ভারি বর্ষণ হয়ে সে মাটি সরে গিয়ে শুষ্ক মসৃণ হয়ে গেলো। তারা যা অর্জন করেছে তা আর কিছুই পেলো না। মূলতঃ আল্লাহ্ তা'আলা কাফির সম্প্রদায়কে সঠিক পথ দেখান না।
যে ব্যক্তি কিছু দান করে অতঃপর খোঁটা দেয় আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন তার সাথে কোন কথা বলবেন না, তার দিকে তাকাবেনও না এমনকি তাকে গুনাহ্ থেকে পবিত্র করবেন না উপরন্তু তার জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। হযরত আবু যর গিফারী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَ لَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ، قَالَ: فَقَرَأَهَا رَسُولُ اللهِ ثَلَاثَ مِرَارٍ ، قَالَ أَبُوْ ذَرِّ: خَابُوا وَخَسِرُوا ، مَنْ هُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : الْمُسْبِلُ ، وَ الْمَنَّانُ وَ فِي رِوَايَةٍ: الْمَنَّانُ الَّذِي لَا يُعْطِي شَيْئًا إِلَّا مَنَّهُ ، وَ الْمُنْفِقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ (মুসলিম, হাদীস ১০৬)
অর্থাৎ তিন ব্যক্তি এমন যে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেনও না এমনকি তাদেরকে গুনাহ্ থেকে পবিত্রও করবেন না উপরন্তু তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। বর্ণনাকারী বলেন: রাসূল কথাগুলো তিন বার বলেছেন। হযরত আবু যর বলেন: তারা সত্যিই ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত। তবে তারা কারা হে আল্লাহ্'র রাসূল! রাসূল বললেন: টাখনু বা পায়ের গিঁটের নিচে কাপড় পরিধানকারী, কাউকে কোন কিছু দিয়ে খোঁটা দানকারী এবং মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য সাপ্লাইকারী।
📄 গান-বাদ্য কিংবা মিউজিক শুনা
গান-বাদ্য কিংবা মিউজিক শুনাও হারাম কাজ এবং কবীরা গুনাহ্। হযরত আবু মা'লিক আশ্আরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّوْنَ الْحِرَ وَ الْحَرِيْرَ وَ الْخَمْرَ وَ الْمَعَازِفَ (বুখারী, হাদীস ৫৫৯০)
অর্থাৎ আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু সম্প্রদায় অবশ্যই জন্ম নিবে যারা ব্যভিচার, সিল্কের কাপড়, মদ্য পান ও বাদ্যকে হালাল মনে করবে। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ্ থেকে বর্ণিত তিনি আল্লাহ্ তা'আলার কসম খেয়ে বলেন: আল্লাহ্'র বাণী:
وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيْثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا، أَوْلَائِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ ) (লুকুমান : ৬)
অর্থাৎ মানুষের মধ্য থেকে তো কেউ কেউ অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহ্ তা'আলার পথ থেকে অন্যদেরকে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য তথা গান (কিংবা সেগুলোর আসবাবপত্র) খরিদ করে এবং আল্লাহ্ প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা- বিদ্রূপ করে। তাদের জন্য রয়েছে (পরকালে) অবমাননাকর শাস্তি। হযরত ইবনু মাস্'উদ্ কসম খেয়ে বলেন: উপরোক্ত আয়াত থেকে একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে গান-বাদ্য।
রাসূল বাদ্যকে অভিসম্পাতও করেন। তিনি বলেন:
صَوْتَانِ مَلْعُونَانِ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ : مِزْمَارٌ عِنْدَ نِعْمَةٍ ، وَ رَنَّةٌ عِنْدَ مُصِيبَةٍ (সা'হীহল্ জা'মি', হাদীস ৩৮০১)
অর্থাৎ দু' ধরনের আওয়াজ দুনিয়া ও আখিরাতে লা'নতপ্রাপ্ত। তার মধ্যে একটি হচ্ছে সুখের সময়ের বাদ্য। আর অপরটি বিপদের সময়ের চিৎকার। বর্তমান যুগে নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্রের দ্রুত আবিষ্কার, গায়ক-গায়িকা ও অভিনেতা-অভিনেত্রীর সরগরম বাজার, আধুনিক সুরের রকমফের, গানের ভাষা ও ইঙ্গিতের ভয়ানকতা ব্যাপারটিকে আরো বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। সুতরাং তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে আর কারোর সামান্যটুকু সন্দেহের অবকাশও থাকতে পারে না। উপরন্তু গান হচ্ছে ব্যভিচারের প্রথম ধাপ এবং গান মানুষের মধ্যে মুনাফিকীরও জন্ম দেয়।
📄 ধন-সম্পদের অপচয়
ধন-সম্পদ অপচয় করাও আরেকটি হারাম কাজ এবং কবীরা গুনাহ্। যদিও তা নিজেরই হোক না কেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ كُلُوا وَاشْرَبُوا وَ لَا تُسْرِفُوا ، إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ ) (আ'রাফ: ৩১)
অর্থাৎ তোমরা খাও এবং পান করো। কিন্তু অপচয় করো না। কারণ, আল্লাহ্ তা'আলা অপচয়কারীদেরকে ভালোবাসেন না। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلاثًا وَ يَكْرَهُ لَكُمْ ثَلاثًا ، فَيَرْضَى لَكُمْ أَنْ تَعْبُدُوهُ ، وَ لَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ، وَ أَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَ لَا تَفَرَّقُوْا ، وَ يَكْرَهُ لَكُمْ
قِيلَ وَ قَالَ وَ كَثْرَةَ السُّؤَالِ ، وَ إِضَاعَةَ الْمَالِ (মুসলিম, হাদীস ১৭১৫)
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্য তিনটি কাজ পছন্দ করেছেন। তেমনিভাবে আরো তিনটি কাজ অপছন্দ। আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্য যা পছন্দ করেছেন তা হলো, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং তোমরা সবাই একমাত্র আল্লাহ্'র রজ্জুকেকেই আঁকড়ে ধরবে। কখনো বিক্ষিপ্ত হবে না। তিনি তোমাদের জন্য যা অপছন্দ করেছেন তা হলো, এমন কথা বলা হয়েছে; অমুক এমন কথা বলেছে তথা অযথা সংলাপ, অহেতুক অত্যধিক প্রশ্ন এবং ধন-সম্পদের বিনষ্ট সাধন।
প্রতিটি মানুষকে কিয়ামতের দিন অবশ্যই আল্লাহ্ তা'আলার সম্মুখে নিজের সম্পদের হিসেব দিতে হবে। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ : عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَقْنَاهُ؟ وَ عَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ ؟ وَ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ؟ وَ فِيمَ أَنْفَقَهُ؟ وَمَاذَا عَمِلَ فِيْمَا عَلِمَ ؟ (তিরমিযী, হাদীস ২৪১৬)
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের দু'টি পা আল্লাহ্ তা'আলার সম্মুখ থেকে এতটুকুও নড়বে না যতক্ষণ না সে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেয়: তার পুরো জীবন সে কি কাজে ক্ষয় করেছে? তার পূর্ণ যৌবন সে কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার ধন-সম্পদ সে কোথায় থেকে সংগ্রহ করেছে এবং কি কাজে খরচ করেছে? তার জ্ঞানানুযায়ী সে কতটুকু আমল করেছে?
📄 কারোর জন্য অন্যের কাছে কোন ব্যাপারে সুপারিশ করে তার থেকে কোন উপঢৌকন গ্রহণ করা
কারোর জন্য অন্যের কাছে কোন ব্যাপারে সুপারিশ করে তার থেকে কোন উপঢৌকন গ্রহণ করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্ ও হারাম।
হযরত আবু উমামাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ شَفَعَ لأَخِيهِ بِشَفَاعَةِ فَأَهْدَي لَهُ هَدِيَّةً عَلَيْهَا ، فَقَبَلَهَا مِنْهُ ، فَقَدْ أَتَى بَابًا عَظِيمًا مِنْ أَبْوَابِ الرِّبَا (আবু দাউদ, হাদীস ৩৫৪১)
অর্থাৎ কেউ নিজ কোন মুসলমান ভাইয়ের জন্য অন্যের নিকট কোন ব্যাপারে সুপারিশ করলে সে যদি তাকে এ জন্য কোন উপঢৌকন দেয় এবং উক্ত ব্যক্তি তা গ্রহণ করে তা হলে সে যেন সুদের এক বিরাট দরোজায় ঢুকে পড়লো।
বর্তমান যুগে তো এমন অনেক লোকই পাওয়া যায় যার আয়ের অধিকাংশই এ জাতীয়। তার অবশ্যই এ কথা জানা দরকার যে, তার এ সকল সম্পদ একেবারেই হারাম। ব্যাপারটি আরো জটিল হয়ে দাঁড়ায় যখন এ জাতীয় উপঢৌকন অবৈধ কোন সুপারিশের জন্য হয়ে থাকে。
সুপারিশের মাধ্যমে কেউ কারোর বৈধ কোন উপকার করতে পারলে সে যেন তা করে। কারণ, তা সত্যিই পুণ্যের কাজ। কারণ, মানুষের মাঝে কারোর সম্মানজনক অবস্থান তা তো একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই দান। অতএব সে জন্য আল্লাহ্ তা'আলার কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। আর তা হচ্ছে কোন মুসলামান ভাইয়ের জন্য বৈধ সুপারিশের মাধ্যমে। যাতে তার কোন বৈধ অধিকার আদায় হয়ে যায় অথবা কোন হৃত অধিকার উদ্ধার পায়।
হযরত জাবির থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَنْفَعَ أَخَاهُ فَلْيَنْفَعْهُ (মুসলিম, হাদীস ২১৯৯)
অর্থাৎ তোমাদের কেউ নিজ কোন মুসলমান ভাইয়ের উপকার করতে পারলে সে যেন তা করে।
হযরত আবু মূসা আশ্'আরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল এর নিকট কোন ভিক্ষুক আসলে অথবা তাঁর নিকট কোন কিছু চাওয়া হলে তিনি বলতেন:
اشْفَعُوْا تُؤْجَرُوْا، وَيَقْضِي اللَّهُ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِ مَا شَاءَ (বুখারী, হাদীস ১৪৩২ মুসলিম, হাদীস ২৬২৭)
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তো তাঁর নবীর মুখ দিয়ে যাই চান ফায়সালা করবেনই। এতসত্ত্বেও তোমরা এর জন্য সুপারিশ করো; তোমাদেরকে সে জন্য সাওয়াব দেয়া হবে।
তবে কারোর জন্য সুপারিশ করতে গিয়ে অন্যের অধিকার খর্ব করা যাবে না। অন্যথায় এক জনের সুবিধার জন্য অন্যের উপর যুলুম করা হবে। আর তখনই অন্যের সুবিধার জন্য নিজকেই অযথা গুনাহ্'র বোঝা বহন করতে হবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةٌ يَكُنْ لَهُ نَصِيبٌ مِنْهَا ، وَ مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَهُ كَفْلٌ مِّنْهَا، وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيْنَا ) (নিসা': ৮৫)
অর্থাৎ কেউ কারোর জন্য ভালো সুপারিশ করলে সে তার (সাওয়াবের) কিয়দংশ পাবে। আর কেউ কারোর জন্য খারাপ সুপারিশ করলে সেও তার (গুনাহ্'র) কিয়দংশ পাবে। আল্লাহ্ তা'আলা সকল বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।