📄 কোন মু'মিন বা মুসলমান ব্যক্তি অহঙ্কারকারী কৃপণ অথবা কঠিন হৃদয় সম্পন্ন হওয়া
কোন মু'মিন বা মুসলমান ব্যক্তি অহঙ্কারকারী কৃপণ অথবা কঠিন হৃদয় সম্পন্ন হওয়া আরেকটি কবীরা গুনাহ্ ও হারাম। রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَّاظُ وَ الْجَعْظَرِيُّ (স'হীহল্ জামি', হাদীস ৪৫১৯)
অর্থাৎ অহঙ্কারকারী কৃপণ ও কঠিন হৃদয় সম্পন্ন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
📄 কোন ঝগড়া-ফাসাদে যুলুমের সহযোগিতা করা
কোন ঝগড়া-ফাসাদে যুলুমের সহযোগিতা করাও আরেকটি কবীরা গুনাহ্ এবং হারাম।
কেউ অবৈধভাবে অন্যের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়েছে তা জেনেশুনেও অন্য কেউ এ ব্যাপারে তাকে সহযোগিতা করলে আল্লাহ্ তা'আলা তার উপর অসন্তুষ্ট হন যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে। হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ أَعَانَ عَلَى خُصُوْمَةٍ بِظُلْمٍ ؛ لَمْ يَزَلْ فِي سَخَطِ اللَّهِ حَتَّى يَنْزِعَ عَنْهُ (ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৩৪৯ ‘হা'কিম ৪/৯৯)
অর্থাৎ কেউ যদি জেনেশুনে অন্যায় মূলক বিবাদে অন্যকে সহযোগিতা করে আল্লাহ্ তা'আলা তার উপর খুবই রাগান্বিত হন যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে। হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ أَعَانَ ظَالِمًا لِيُدْحض بباطله حَقًّا فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ ذِمَّةُ اللَّهِ وَ ذِمَّةُ رَسُولِهِ (সা'হী'হল্ জা'মি', হাদীস ৬০৪৮)
অর্থাৎ কেউ যদি কোন যালিমকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করলো যে, সে তার বাতিল দিয়ে কোন হক্বকে প্রতিহত করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা ও তাঁর রাসূল এর যিম্মাদারি তার উপর থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়।
📄 অমূলকভাবে কোন নেককার ব্যক্তিকে রাগান্বিত করা
অমূলকভাবে কোন নেককার ব্যক্তিকে রাগান্বিত করা হারাম ও কবীরা গুনাহ্।
হযরত ‘আয়িয বিন্ ‘আমর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা আবু সুফ্যান নিজ দলবল নিয়ে সাল্মান, সুহাইব ও বিলাল এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। তখন তাঁরা আবু সুফ্যানকে উদ্দেশ্য করে বললেন: আল্লাহ্ তা'আলার কসম! আল্লাহ্'র তরবারি এখনো তাঁর এ শত্রুর গর্দান উড়িয়ে দেয়নি। তখন আবু বকর তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা কুরাইশ নেতার ব্যাপারে এমন কথা বলতে পারলে?! অতঃপর রাসূল কে ঘটনাটি জানানো হলে তিনি বললেন:
يَا أَبَا بَكْرٍ ! لَعَلَّكَ أَغْضَبْتَهُمْ ، لَئِنْ كُنْتَ أَغْضَبْتَهُمْ لَقَدْ أَغْضَبْتَ رَبَّكَ (মুসলিম, হাদীস ২৫০৪)
অর্থাৎ হে আবু বকর! সম্ভবত তুমি তাদেরকে রাগিয়ে দিলে! যদি তুমি তাদেরকে রাগান্বিত করে থাকো তা হলে যেন তুমি আল্লাহ্ তা'আলাকে রাগান্বিত করলে।
অতঃপর হযরত আবু বকর তাঁদের নিকট এসে বললেন: হে আমার ভাইয়েরা! আমি তো তোমাদেরকে রাগিয়ে দিয়েছি। তাঁরা বললেন: না, হে আমাদের শ্রদ্ধেয় ভাই! বরং আমরা আপনার জন্য আল্লাহ্ তা'আলার নিকট দো'আ করছি তিনি যেন আপনাকে ক্ষমা করে দেন।
বর্তমান যুগে পরিস্থিতি আরো অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। এখন তো রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, খেলাধুলা, গানবাদ্য ইত্যাকার যে কোন বিষয় এমনকি সাধারণ ছুতানাতা নিয়েও একে অপরের সাথে তর্কবিতর্ক করে পরস্পর গালাগালি, হাতাহাতি এমনকি একে অপরকে হত্যা করতেও সচরাচর দেখা যায়। কখনো কখনো তো পরিস্থিতি এমন পর্যায়েও দাঁড়ায় যে, সমাজে পরিচিত তথাকথিত বহু পাক্কা নামাযীকেও একজন কাফির বা ফাসিককে নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ সৃষ্টি করে তর্কবিতর্ক করতে দেখা যায়।
📄 গীবত বা পরনিন্দা চর্চা
গীবত বা পরদোষ চর্চা আরেকটি কবীরা গুনাহ্ এবং হারাম কাজ। গীবত বলতে অন্যের অনুপস্থিতিতে কারোর নিকট তার কোন দোষ চর্চাকে বুঝানো হয়। যা শুনলে সে রাগান্বিত অথবা অসন্তুষ্ট হবে। অন্ততপক্ষে তার মনে সামান্যটুকু হলেও কষ্ট আসবে।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর পবিত্র কুর'আন মাজীদে মু'মিনদেরকে এমন অপতৎপরতা চালাতে কঠিনভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। এমনকি তিনি এর প্রতি মু'মিনদের কঠিন ঘৃণা জন্মানোর জন্যে এর এক বিশ্রী দৃষ্টান্তও উপস্থাপন করেছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ لَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ، أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ، وَ اتَّقُوا اللَّهَ ، إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ ) (‘হুজুরাত : ১২)
অর্থাৎ তোমরা একে অপরের গীবত চর্চা করো না। তোমাদের কেউ কি চায় সে তার মৃত ভাইয়ের গোস্ত কামড়ে কামড়ে খাবে। বস্তুতঃ তোমরা তা কখনোই করতে চাইবে না। তা হলে তোমরা আল্লাহ্ তা'আলাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা গ্রহণকারী অত্যন্ত দয়ালু।
রাসূল সাহাবাদেরকে এর বিস্তারিত পরিচয় দিয়েছেন। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
أَتَدْرُوْنَ مَا الْغِيْبَةُ ؟ قَالُوْا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ ، قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ ، قِيلَ: أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُوْلُ ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا تَقُوْلُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ ، وَ إِنْ لَمْ يَكُنْ فِيْهِ فَقَدْ بَهَتَهُ (মুসলিম, হাদীস ২৫৮৯ আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৭৪ তিরমিযী, হাদীস ১৯৩৪)
অর্থাৎ তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলা হয়? সাহাবারা বললেন: আল্লাহ্ তা'আলা ও তদীয় রাসূলই এ সম্পর্কে ভালো জানেন। তখন তিনি বলেন: তোমার মুসলিম ভাই অপছন্দ করে এমন কোন কথা তার পেছনে বলা। জনৈক সাহাবী বললেন: আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যেই থাকে তাও কি তা গীবত হবে? রাসূল বললেন: তুমি যা বলছো তা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তা হলেই তো গীবত। আর যদি তার মধ্যে তা না পাওয়া যায় তা হলে তা বুহুতান তথা মিথ্যা অপবাদ।
কারো কারোকে যখন অন্যের গীবত করা থেকে বারণ করা হয় তখন তিনি বলে থাকেন, আমি হুবহু কথাটি তার সামনেও বলতে পারবো। তাকে আমি এতটুকুও ভয় পাই না। মূলতঃ তার এ ধরনের উক্তি কোন কাজের নয়। কারণ, রাসূল গীবত না হওয়ার জন্য এ ধরনের সাহসিকতার শর্ত দেননি। সুতরাং তার সামনে বলার সাহস থাকলেও তা গীবত হবেই।
একদা হযরত ‘আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হযরত স্বাফিয়্যাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এর পেছনে তার শারীরিক খর্বাকৃতির ব্যাপারটি রাসূল এর সামনে তুলে ধরলে তিনি তাঁকে বলেন:
لَقَدْ قُلْتِ كَلِمَةً لَوْ مُزِجَتْ بِمَاءِ الْبَحْرِ لَمَزَجَتْهُ ، قَالَتْ: وَ حَكَيْتُ لَهُ إِنْسَانًا فَقَالَ: مَا أُحِبُّ أَنِّي حَكَيْتُ إِنْسَانًا وَ أَنْ لِيْ كَذَا وَ كَذَا (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৭৫)
অর্থাৎ তুমি এমন কথা বললে যা এক সাগর পানির সাথে মিশালেও তা মিশে যাবে বরং তা বাড়তি বলেও মনে হবে। হযরত ‘আয়িশা বলেন: আমি রাসূল এর সামনে জনৈক ব্যক্তির অভিনয় করলে তিনি আমাকে বলেন: আমি এটা পছন্দ করি না যে, আমি কারোর অভিনয় করবো আর আমি এতো এতো কিছুর মালিক হবো।
রাসূল মি'রাজে গিয়ে গীবতকারীদের শান্তি স্বচক্ষে দেখে আসলেন। হযরত আনাস্ বিন্ মালিক থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَطْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَحْمُشُوْنَ وُجُوْهَهُمْ وَصُدُوْرَهُمْ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِيْنَ يَأْكُلُوْنَ لُحُوْمَ النَّاسِ وَ يَقَعُوْنَ فِي أَعْرَاضِهِمْ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৭৮)
অর্থাৎ যখন আমি মি'রাজে গেলাম তখন এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম যারা তামার নখ দিয়ে নিজেদের বক্ষ ও মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করছে। আমি বললাম: এরা কারা হে জিব্রীল! তিনি বললেন: এরা ওরা যারা মানুষের গোস্ত খায় এবং তাদের ইজ্জত লুটায়।
কারোর গীবত করা মুনাফিকের আলামত। হযরত আবু বারযাহ্ আল্লামী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَ لَمْ يَدْخُلِ الْإِيْمَانُ قَلْبَهُ ! لَا تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ ، وَ لَا تَتَّبِعُوْا عَوْرَاتِهِمْ ، فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ ، وَ مَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي بَيْتِهِ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৮০)
অর্থাৎ হে তোমরা যারা মুখে ঈমান এনেছো; অথচ ঈমান তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলমানদের গীবত এবং তাদের ছিদ্রান্বেষণ করো না। কারণ, যে ব্যক্তি মুসলমানদের ছিদ্রান্বেষণ করবে আল্লাহ্ তা'আলাও তার ছিদ্রান্বেষণ করবে। আর আল্লাহ্ তা'আলা যার ছিদ্রান্বেষণ করবেন তাকে তিনি তার ঘরেই লাঞ্ছিত করবেন।
কাউকে অন্যের গীবত করতে দেখলে তাকে অবশ্যই বাধা দিবেন। তা হলে আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন আপনাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন। হযরত আবুদ্দারদা' থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ رَدَّ عَنْ عَرْضٍ أَخِيهِ رَدَّ اللَّهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ (তিরমিযী, হাদীস ১৯৩১)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি অন্যের অপবাদ খণ্ডন করে নিজ কোন মুসলিম ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করলো আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন। হযরত মু'আয বিন্ আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ حَمَى مُؤْمِنًا مِنْ مُنَافِقِ بَعَثَ اللهُ مَلَكًا يَحْمِي لَحْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ، وَ مَنْ رَمَى مُسْلِمًا بِشَيْءٍ يُرِيدُ شَيْنَهُ بِهِ حَبَسَهُ اللَّهُ عَلَى جِسْرِ جَهَنَّمَ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৮৩)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন মু'মিনকে মুনাফিকের কুৎসার হাত থেকে রক্ষা করলো আল্লাহ্ তা'আলা (এর প্রতিফল স্বরূপ) কিয়ামতের দিন তার নিকট এমন একজন ফিরিস্তা পাঠাবেন যে তার শরীরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে তার ইজ্জত হননের উদ্দেশ্যে কোন ব্যাপারে অপবাদ দিলো আল্লাহ্ তা'আলা তাকে কিয়ামতের দিন (এর প্রতিফল স্বরূপ) জাহান্নামের পুলের উপর আটকে রাখবেন যতক্ষণ না সে উক্ত অপবাদ থেকে নিষ্কৃতি পায়।
একদা রাসূল সাহাবাদেরকে নিয়ে তাবুক এলাকায় বসেছিলেন এমতাবস্থায় তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন: কা'ব বিন্ মা'লিক কোথায়? তখন বনী সালিমাহ্ গোত্রের জনৈক ব্যক্তি বললেন: হে আল্লাহ্'র রাসূল! তার সম্পদ ও আত্মগর্ব তাকে যুদ্ধ থেকে বিরত রেখেছে। তখন হযরত মু'আয বিন জাবাল প্রত্যুত্তরে বললেন: হে ব্যক্তি তুমি অত্যন্ত খারাপ উক্তি করলে। হে আল্লাহ্'র রাসূল! আল্লাহ্'র কসম! আমরা তার ব্যাপারে ভালো ধারণাই রাখি। (মুসলিম, হাদীস ২৭৬৯)
তবে কোন সঠিক ধর্মীয় উদ্দেশ্য যদি গীবত ছাড়া কোনভাবেই অর্জিত না হয় তখন প্রয়োজনের খাতিরে কারো কারোর গীবত করা যায় যা নিম্নরূপ:
১. কেউ কারো কর্তৃক যুলুম তথা অত্যাচারের শিকার হলে তার জন্য জায়িয অত্যাচারীর বিপক্ষে রাষ্ট্রপতি কিংবা বিচারপতির নিকট নালিশ করা। যাতে করে মযলুম তার হৃত অধিকার ফিরে পায়।
২. কাউকে বহুবার ওয়ায নসীহত করার পরও সে যদি শরীয়ত বিরোধী উক্ত অপকর্ম থেকে বিরত না হয় তা হলে তার বিরুদ্ধে এমন ব্যক্তির কাছে নালিশ করা যাবে যে তাকে উক্ত অপকর্ম থেকে বিরত রাখতে সক্ষম।
৩. কোন অঘটনের ব্যাপারে উক্ত ঘটনার পূর্ণ বর্ণনা দিয়ে অভিজ্ঞ কোন মুফতি সাহেবের নিকট ফতোয়া চাওয়া। তবে এ ব্যাপারে কারোর নাম ধরে না বলা অনেক ভালো। বরং সে মুফতি সাহেবকে বলবে: জনৈক ব্যক্তি কিংবা জনৈকা মহিলা এমন এমন কাজ করেছে অতএব এর শরয়ী সিদ্ধান্ত কি?
৪. কারোর ব্যাপারে সাধারণ মুসলমানদেরকে সতর্ক করা। যা নিম্নরূপ:
ক. কোন হাদীসের বর্ণনাকারী কিংবা কোন সাক্ষী অগ্রহণযোগ্য হলে তার ব্যাপারে অন্যকে সতর্ক করা।
খ. কেউ কারোর ব্যাপারে আপনার নিকট পরামর্শ চাইলে তাকে সঠিক তথ্য ভিত্তিক পরামর্শ দেয়া। চাই তা কারোর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারেই হোক অথবা তার নিকট কোন আমানত রাখার ব্যাপারে কিংবা তার সাথে কোন ধরনের লেনদেন করার ব্যাপারে।
গ. কোন ধর্মীয় জ্ঞান অনুসন্ধানকারীকে কোন বিদ'আতী কিংবা কোন ফাসিকের নিকট জ্ঞান আহরণ করতে দেখলে তাকে সে ব্যাপারে সতর্ক করা। তবে এ ব্যাপারে হিংসা যেন কোনভাবেই স্থান নিতে না পারে সে ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
ঘ. কোন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি উক্ত পদের অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলে কিংবা ফাসিক অথবা গাফিল হলে তার ব্যাপারে তার উপরস্থ ব্যক্তিকে জানানো যাতে করে তাকে উক্ত পদ থেকে বহিষ্কার করা যায় অথবা অন্ততপক্ষে সামান্যটুকু হলেও তাকে পরিশুদ্ধ করা যায়।
ঙ. কেউ সপ্রকাশ্যে কোন গুনাহ্ কিংবা বিদ'আত করলে সে গুনাহটি অন্যের কাছে বলা যায়। যাতে করে তার বিরুদ্ধে বিপুল জনমত সৃষ্টি করে উহার প্রতিকার করা যায়।
চ. কারোর কোন দোষ কোন সমাজে এমনভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করলে যা না বললে কেউ তাকে চিনবে না তখন সে দোষ উল্লেখ পূর্বক তার পরিচয় দেয়া যায়। তবে অন্যভাবে তার পরিচয় দেয়া সম্ভব হলে সেভাবেই পরিচয় দেয়া উচিৎ।
হযরত ‘আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: জনৈক ব্যক্তি রাসূল এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন:
ائْذَنُوا لَهُ ، بِئْسَ أَخَوْ الْعَشِيْرَةِ وَ بِئْسَ ابْنُ الْعَشِيْرَةِ (বুখারী, হাদীস ৬০৩২, ৬০৫৪, ৬১৩১ মুসলিম, হাদীস ২৫৯১)
অর্থাৎ তাকে ঢুকার অনুমতি দাও। সে তো নিকৃষ্ট হীন বংশ।
হযরত ‘আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল দু'জন মুনাফিক সম্পর্কে বলেন:
مَا أَظُنُّ فُلَانَا وَ فُلَانَا يَعْرِفَانِ مِنْ دِيْنِنَا شَيْئًا (বুখারী, হাদীস ৬০৬৭)
অর্থাৎ আমার ধারণা মতে অমুক আর অমুক ধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানে না। হযরত ফাতিমা বিন্ত ক্বাইস্ (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: যখন আমি তালাকের ইদ্দত শেষ করে হালাল হয়ে গেলাম তখন হযরত মু'আবিয়া ও হযরত আবু জাহ্ম (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আমাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়। ব্যাপারটি রাসূল কে জানালে তিনি আমাকে বলেন:
أَمَّا أَبُو جَهْمٍ فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ عَنْ عَائِقِهِ، وَ أَمَّا مُعَاوِيَةُ فَصَعْلُوْكَ ، لَا مَالَ لَهُ، الْكِحِيْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ (মুসলিম, হাদীস ১৪৮০)
অর্থাৎ আবু জাহ্ম তো লাঠি কাঁধ থেকেই নামায় না আর মু'আবিয়া তো খুবই গরীব; তার কোন সম্পদই নেই। তবে তুমি উসামাহ্ বিন যায়েদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারো।
হযরত ‘আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা আবু সুফ্যানের স্ত্রী হিন্দ বিন্ত ‘উদ্বাহ্ রাসূল এর নিকট এসে বললো:
يَا رَسُولَ اللَّهِ! إِنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ شَحِيْحٌ ، لاَ يُعْطَيْنِي مِنَ النَّفَقَةِ مَا يَكْفَيْنِي وَيَكْفِي بَنِيَّ إِلَّا مَا أَخَذْتُ مِنْ مَالِهِ بِغَيْرِ عِلْمِهِ، فَهَلْ عَلَيَّ فِي ذَلِكَ مِنْ جُنَاحٍ ؟ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ : خُذِي مِنْ مَالِهِ بِالْمَعْرُوْفِ مَا يَكْفِيْكِ وَ يَكْفِي بَنِيكِ (বুখারী, হাদীস ২২১১ মুসলিম, হাদীস ১৭১৪)
অর্থাৎ হে আল্লাহ্'র রাসূল! আবু সুফ্যান তো খুবই কৃপণ। সে তো আমার ও আমার সন্তানের জন্য যথেষ্ট এতটুকু খরচা আমাদেরকে দেয় না। তবে আমি তাকে না জানিয়ে তার সম্পদ থেকে কিছু নিয়ে নিতে পারি। এতে কি আমার কোন গুনাহ্ হবে? তখন রাসূল বললেন: তুমি তোমার ও তোমার সন্তানের জন্য যথেষ্ট এতটুকু খরচা তো তার সম্পদ থেকে ন্যায়ভাবে নিতে পারো।
হযরত যায়েদ বিন্ আরক্বাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা আমি এক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম তখন আব্দুল্লাহ্ বিন্ উবাইকে বলতে শুনলাম সে বলছে: তোমরা রাসূল এর আশপাশের লোকদের উপর কোন টাকা-পয়সা খরচ করো না যাতে তারা রাসূল এর সঙ্গ ছেড়ে দেয়। সে আরো বললো: আমরা এখান থেকে মদীনায় ফিরে গেলে আমাদের মধ্যে যারা পরাক্রমশালী তারা অধমদেরকে মদীনা থেকে বের করে দিবে। হযরত যায়েদ বলেন: আমি ব্যাপারটি আমার চাচা অথবা হযরত ‘উমর কে জানালে তাঁরা তা রাসূল কে জানায়। তখন রাসূল আমাকে ডাকেন। আমি ব্যাপারটি তাঁকে বিস্তারিত জানালে তিনি আব্দুল্লাহ্ ও তার সাথীদেরকে ডেকে পাঠান। তারা উপস্থিত হয়ে রাসূল এর নিকট কসম খেয়ে বললো: তারা এমন কথা বলেনি। তখন রাসূল তাদের কথা বিশ্বাস করলেন এবং আমাকে মিথ্যুক ভাবলেন। তখন আমি খুব চিন্তিত হই যা ইতিপূর্বে হইনি। আর তখনই আল্লাহ্ তা'আলা আমার সাপোর্টে সূরা মুনাফিকুনের প্রথম তিনটি আয়াত নাযিল করেন। (বুখারী, হাদীস ৪৯০০ মুসলিম, হাদীস ২৭৭২)
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল একদা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টন করে শেষ করলে জনৈক আন্সারী বললো: আল্লাহ্'র কসম! মুহাম্মাদ এ বন্টনে আল্লাহ্'র সন্তুষ্টি কামনা করেনি। তখন আমি রাসূলকে এ ব্যাপারে সংবাদ দিলে তিনি রাগে লাল হয়ে বললেন: আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মূসা কে দয়া করুন। তাঁকে এর চাইতেও বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছিলো; অথচ তিনি তা অকাতরে সহ্য করেছেন। (বুখারী, হাদীস ৬০৫৯ মুসলিম, হাদীস ১০৬২)
উক্ত ঘটনা সমূহে রাসূল নিজেই অথবা অন্য কোন ব্যক্তি তাঁর সামনেই অন্যের গীবত করে। যা প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কোন উদ্দেশ্যে গীবত জায়িয হওয়াই প্রমাণ করে।
কেউ কারোর গীবত করে তার নিকট ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করাই উচিৎ। তেমনিভাবে কেউ স্বেচ্ছায় তার সকল গীবতকারীকে ব্যাপকভাবে ক্ষমা করে দিলে তা আরো অনেক ভালো।
হযরত ক্বাতাদাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
أَيَعْجِزُ أَحَدُكُمْ أَنْ يَكُونَ مِثْلَ أَبِي ضَيْعَمٍ أَوْ ضَمْضَمٍ ؛ كَانَ إِذَا أَصْبَحَ قَالَ: اللَّهُمَّ إِنِّي قَدْ تَصَدَّقْتُ بِعِرْضِيْ عَلَى عِبَادِكَ ! (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৮৬)
অর্থাৎ তোমরা কি আবু যায়গাম অথবা আবু যামযামের মতো হতে পারো না? সে প্রতিদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে বলতো: হে আল্লাহ্! আমি আমার ইয্যত তোমার সকল বান্দাহ্'র জন্য সাদাকা করে দিলাম।