📄 গর্ব, দাম্ভিকতা ও আত্মঅহঙ্কার
গর্ব, দাম্ভিকতা, অহঙ্কার ও অহংবোধ একটি মারাত্মক অপরাধ। যা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট খুবই অপছন্দনীয় এবং যা আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ অসন্তুষ্টি ও জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণও বটে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْتَكْبِرِينَ ) (না'হল: ২৩)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ্ তা'আলা) অহংকারীদেরকে ভালোবাসেন না। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ رَجُلٍ يَخْتَالُ فِي مِشْيَتِهِ وَ يَتَعَاظَمُ فِي نَفْسِهِ إِلَّا لَقِيَ اللَّهُ وَ هُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ (আহমাদ, হাদীস ৫৯৯৫ বুখারী/আল্-আদাবুল্ মুফ্রাদ, হাদীস ৫৪৯ হা'কিম ১/৬০)
অর্থাৎ কোন ব্যক্তি গর্বভরে চলাফেরা করলে এবং যে সত্যিই আত্মম্ভরী সে (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ্ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করবে অথচ আল্লাহ্ তা'আলা তখন তার উপর খুবই অসন্তুষ্ট থাকবেন।
হযরত আবু সা'ঈদ খুদ্রী ও হযরত আবু হুরাইরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
الْعِزُّ إِزَارُهُ ، وَ الْكِبْرِيَاءُ رِدَاؤُهُ ، فَمَنْ يُنَازِعُنِي عَذَّبْتُهُ (মুসলিম, হাদীস ২৬২০)
অর্থাৎ ইয্যত তাঁর (আল্লাহ্ তা'আলার) নিম্ন বসন এবং গর্ব তাঁর চাদর। যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে আমার সাথে দ্বন্দ্ব করবে তাকে আমি শাস্তি দেবো।
হযরত মূসা সকল গর্বকারীদের থেকে আল্লাহ্ তা'আলার আশ্রয় কামনা করেছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ قَالَ مُوسَى إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَ رَبِّكُمْ مِّنْ كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ ) (গাফির/মু'মিন : ২৭)
অর্থাৎ মূসা বললো: যারা হিসাব দিবসে বিশ্বাসী নয় সে সকল অহঙ্কারী ব্যক্তি থেকে আমি আমার ও তোমাদের প্রভুর আশ্রয় কামনা করছি।
সর্ব প্রথম গুনাহ্ যা আল্লাহ্ তা'আলার সাথে করা হয়েছে তা হচ্ছে অহঙ্কার।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ إِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلَيْسَ ، أَبَى وَ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ (বাক্বারাহ : ৩৪) مِنَ الْكَافِرِينَ )
অর্থাৎ যখন আমি ফিরিস্তাদেরকে বললাম: তোমরা আদমকে সিজদাহ্ করো। তখন ইবলিস ব্যতীত সকলেই সিজদাহ্ করলো। শুধুমাত্র সেই অহঙ্কার বশতঃ সিজদাহ করতে অস্বীকার করলো। আর তখনই সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো।
দলীল বিহীন যারা কোর'আন ও হাদীস নিয়ে অন্যের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় তারা অহঙ্কারীই বটে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُجَادِلُوْنَ فِي آيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمْ ، إِنْ فِي صُدُورِهِمْ إِلَّا كِبْرٌ، مَا هُمْ بِبَالِغِيْهِ ، فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ) (গাফির/মু'মিন : ৫৬)
অর্থাৎ যারা দলীল বিহীন আল্লাহ্ তা'আলার আয়াত সমূহ নিয়ে ঝগড়া করে তাদের অন্তরে রয়েছে শুধু অহঙ্কারই অহঙ্কার। তারা তাদের উদ্দেশ্যে কখনো সফলকাম হবে না। অতএব তুমি আল্লাহ্ তা'আলার শরণাপন্ন হও। তিনিই তো সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।
গর্বকারীরা সত্যিই জাহান্নামী এবং যাদেরকে নিয়ে জাহান্নাম জান্নাতের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়েছে। হযরত ‘হারিসা বিন্ ওয়াহ্ব থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ قَالُوْا : بَلَى ، قَالَ: كُلُّ عُتُلٌ جَوَاطٍ مُسْتَكْبِرِ (বুখারী, হাদীস ৪৮১৮, ৬০৭১, ৬৬৫৭ মুসলিম, হাদীস ২৮৫৩)
অর্থাৎ আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে সংবাদ দেবো না? সাহাবারা বললেন: অবশ্যই দিবেন। তখন তিনি বলেন: জাহান্নামী হচ্ছে প্রত্যেক কঠিন প্রকৃতির ধনী কৃপণ অহঙ্কারী। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
تَحَاجَّتِ النَّارُ وَ الْجَنَّةُ ، فَقَالَتِ النَّارُ: أُوْثَرْتُ بِالْمُتَكَبِّرِيْنَ وَ الْمُتَجَبِّرِينَ ، وَقَالَتِ الْجَنَّةُ: فَمَا لِي لَا يَدْخُلُنِي إِلَّا ضُعَفَاءُ النَّاسِ وَ سَقَطُهُمْ وَ عَجَرُهُمْ (মুসলিম, হাদীস ২৮৪৬)
অর্থাৎ জাহান্নাম ও জান্নাত পরস্পর তর্ক করছিলো। জাহান্নাম বললো: আমাকে দাম্ভিক ও অহঙ্কারী মানুষগুলো দেয়া হয়েছে যা তোমাকে দেয়া হয়নি। জান্নাত বললো: আমার কি দোষ যে, দুর্বল, অক্ষম ও গুরুত্বহীন মানুষগুলোই আমার ভেতর প্রবেশ করছে।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ ، قَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَ نَعْلَهُ حَسَنَةً ، قَالَ: إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَ غَمْطُ النَّاسِ (মুসলিম, হাদীস ৯১)
অর্থাৎ যার অন্তরে অণু পরিমাণ গর্ব থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জনৈক সাহাবী বললো: মানুষ তো চায় যে, তার কাপড় সুন্দর হোক এবং তার জুতো সুন্দর হোক (তাও কি গর্ব বলে গণ্য হবে?) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা সুন্দর। অতএব তিনি সুন্দরকেই পছন্দ করেন। তবে গর্ব হচ্ছে সত্য প্রত্যাখ্যান এবং মানব অবমূল্যায়ন। গর্বকারীদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন মানুষের আকৃতিতেই ছোট পিপীলিকার ন্যায় উঠাবেন। তখন তাদের লাঞ্ছনার আর কোন সীমা থাকবে না।
হযরত ‘আমর বিন্ শু'আইব্ তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:
يُحْشَرُ الْمُتَكَبِّرُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَمْثَالَ الدَّرِّ فِي صُوَرِ الرِّجَالِ ، يَغْشَاهُمُ الذُّلُّ مِنْ
كُلِّ مَكَانٍ ، فَيُسَاقُوْنَ إِلَى سِجْنِ فِي جَهَنَّمَ - يُسَمَّى بُوْلَسَ - تَعْلُوْهُمْ نَارُ الْأَدْيَارِ، يُسْقَوْنَ مِنْ عُصَارَةِ أَهْلِ النَّارِ ؛ طَيِّنَةِ الْخَبَالِ (তিরমিযী, হাদীস ২৪৯২ আহমাদ, হাদীস ৬৬৭৭ দায়লামী, হাদীস ৮৮২১ বায্যার, হাদীস ৩৪২৯)
অর্থাৎ গর্বকারীদেরকে কিয়ামতের দিন মানুষের আকৃতিতেই ছোট পিপীলিকার ন্যায় উঠানো হবে। সর্ব দিক থেকে লাঞ্ছনা তাদেরকে ছেয়ে যাবে। "বুলাস" নামক জাহান্নামের একটি জেলখানার দিকে তাদেরকে হাঁকিয়ে নেয়া হবে। তাদের উপরে থাকবে শুধু আগুন আর আগুন এবং তাদেরকে জাহান্নামীদের পুঁজরক্ত পান করানো হবে।
একদা বানী ইস্রা'ঈলের জনৈক ব্যক্তি গর্ব করলে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে কঠিন শাস্তি দেন। রাসূল এর যুগেও এমন একটি ঘটনা ঘটে যায়। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي فِي حُلَّةٍ ، تُعْجِبُهُ نَفْسُهُ ، مُرَجِّلٌ جُمَّتَهُ ، إِذْ خَسَفَ اللَّهُ بِهِ ، فَهُوَ يَتَجَلْجَلُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ (বুখারী, হাদীস ৫৭৮৯, ৫৭৯০ মুসলিম, হাদীস ২০৮৮)
অর্থাৎ একদা জনৈক ব্যক্তি এক জোড়া জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে (রাস্তা দিয়ে) চলছিলো। তাকে নিয়েই তার খুব গর্ববোধ হচ্ছিলো। তার জমকালো লম্বা চুলগুলো সে খুব যত্নসহকারে আঁচড়িয়ে রেখেছিলো। হঠাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ভূমিতে ধ্বসিয়ে দেন এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই নিচের দিকে নামতে থাকবে।
হযরত সালামাহ্ বিন্ আকওয়া' থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
أَكَلَ رَجُلٌ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ بِشمَالِهِ ، فَقَالَ: كُلَّ بِيَمِينِكَ ، قَالَ: لَا أَسْتَطِيعُ،
قَالَ: لَا اسْتَطَعْتَ ، مَا مَنَعَهُ إِلَّا الْكِبْرُ ، قَالَ: فَمَا رَفَعَهَا إِلَى فِيْهِ (মুসলিম, হাদীস ২০২১ ইন্নু হিব্বান খণ্ড ১৪ হাদীস ৬৫১২, ৬৫১৩ বাইহাক্বী, হাদীস ১৪৩৮৮ ইব্বু আবী শাইবাহ, হাদীস ২৪৪৪৫ দা'রামী, হাদীস ২০৩২ আবু ‘আগুয়ানাহ, ৮২৪৯, ৮২৫১, ৮২৫২ আহমাদ, হাদীস ১৬৫৪০, ১৬৫৪৬, ১৬৫৭৮ ত্বাবারানী/কাবীর খণ্ড ৭ হাদীস ৬২৩৫, ৬২৩৬ ইবনু ‘হমাইদ, হাদীস ৩৮৮)
অর্থাৎ জনৈক ব্যক্তি রাসূল এর নিকট বাম হাতে খাচ্ছিলো। তখন রাসূল তাকে বললেন: ডান হাতে খাও। সে বললো: আমি ডান হাতে খেতে পারবো না। রাসূল বললেন: ঠিক আছে; তুমি আর পারবেও না। দম্ভের কারণেই সে তা করতে রাজি হয়নি। অতএব সে আর কখনো ডান হাত মুখ পর্যন্ত উঠাতে পারেনি।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা দাম্ভিকের সাথে কথা বলবেন না, তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাকে গুনাহ্ থেকে পবিত্র করবেন না এবং তার জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَ لا يُزَكِّيهِمْ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: شَيْخٌ زَانٍ ، وَ مَلِكٌ كَذَّابٌ ، وَ عَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ (মুসলিম, হাদীস ১০৭)
অর্থাৎ তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা কথা বলবেন না, তাদেরকে গুনাহ্ থেকেও পবিত্র করবেন না, তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতেও তাকাবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তারা হচ্ছে বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যুক রাষ্ট্রপতি ও দাম্ভিক ফকির।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلَاءَ (বুখারী, হাদীস ৩৬৬৫, ৫৭৮৩, ৫৭৮৪ মুসলিম, হাদীস ২০৮৫)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি গর্ব করে নিজ নিম্ন বসন মাটিতে টেনে চলবে (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ্ তা'আলা তার প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।
📄 চুগলি করা
চুগলি করা তথা মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব লাগানোর জন্য একের কথা অন্যের কাছে লাগানো কবীরা গুনাহ্। মানুষে মানুষে বৈরিতা-বিদ্বেষ, আত্মীয়তার বন্ধন বিচ্ছেদ এবং মুসলমানদের মাঝে পরস্পর শত্রুতা জন্ম নেয়ার এ এক বড় কারণ। তাই তো আল্লাহ্ তা'আলা এ জাতীয় ব্যক্তির আনুগত্য করতে নিষেধ করেন। চাই সে যতই সম্পদশালী হোক না কেন।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ لَا تُطِعْ كُلَّ حَلافٍ مَّهِينٍ ، هَمَّازٍ مَّشَاء بِنَمِيمٍ ، مَّنَّاعٍ لِلْخَيْرِ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ ، عُتُلٌ بَعْدَ ذَلِكَ زَنِيْمٍ أَنْ كَانَ ذَا مَالٍ وَّ بَنِيْنَ ) (ক্বালাম: ১০-১৪)
অর্থাৎ তুমি অনুসরণ করো না এমন প্রত্যেক ব্যক্তির যে কথায় কথায় কসম খায়, লাঞ্ছিত, পরনিন্দুক, চুগলখোর, কল্যাণকর কাজে বাধা প্রদানকারী, সীমালংঘনকারী, পাপিষ্ঠ, রূঢ় স্বভাবের অধিকারী এবং সর্বোপরি সে কুখ্যাত। এ জন্য অনুসরণ করো না যে, সে ব্যক্তি ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধশালী।
চুগলি করা কবরের আযাবের বিশেষ একটি কারণ।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
مَرَّ النَّبِيُّ بِقَبْرَيْنِ ، فَقَالَ: إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ ، وَ مَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ ، وَ فِي رِوَايَة: بَلَى إِنَّهُ كَبِيرٌ ، أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنَ الْبَوْلِ ، وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ ، ثُمَّ أَخَذَ جَرِيدَةً رَطْبَةً فَشَقَّهَا نِصْفَيْنِ ، فَغَرَزَ فِي كُلِّ قَبْرٍ وَاحِدَةً، قَالُوا: يَا رَسُوْلَ اللهِ! لِمَ فَعَلْتَ هَذَا ؟ قَالَ: لَعَلَّهُ يُخَفِّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا (বুখারী, হাদীস ২১৮ মুসলিম, হাদীস ২৯২)
অর্থাৎ একদা নবী দু'টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন: এ দু' জন কবরবাসীকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তবে তা আপাত দৃষ্টিতে কোন বড় অপরাধের জন্য নয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, বাস্তবে তা সত্যিই বড় অপরাধ অথবা বস্তুতঃ উক্ত দু'টি গুনাহ্ থেকে রক্ষা পাওয়া তাদের জন্য কোন কষ্টকরই ছিলো না। তাদের এক জন নিজ প্রস্রাব থেকে ভালোভাবে পবিত্রতার্জন করতো না আর অপর জন মানুষের মাঝে চুগলি করে বেড়াতো। অতঃপর রাসূল খেজুর গাছের একটি তাজা ডালকে দু' ভাগ করে প্রত্যেক কবরে একটি করে গেড়ে দিলেন। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহ্'র রাসূল ! আপনি কেন এমন করলেন? রাসূল বললেন: হয়তো বা তাদের শাস্তি হালকা করে দেয়া হবে যতক্ষণ না ডাল দু'টি শুকাবে।
চুগলখোর জান্নাতে যাবে না।
হযরত ‘হুযাইফাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি নবী কে এ কথা বলতে শুনেছি তিনি বলেন:
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ فَتَاتٌ وَ فِي رِوَايَةِ: نَمَّامٌ (বুখারী, হাদীস ৬০৫৬ মুসলিম, হাদীস ১০৫)
অর্থাৎ চুগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না。
কেউ কারোর সাথে কথা বলার সময় এদিক ওদিক তাকালে তা আর অন্যের কাছে বলা যাবে না। বরং উক্ত কথাগুলোকে আমানত হিসেবেই ধরে নিতে হবে। হযরত জাবির বিন্ আব্দুল্লাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ بِالْحَدِيْثِ ثُمَّ الْتَفَتَ ، فَهِيَ أَمَانَةٌ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৬৮)
অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কথা বলার সময় এদিক ওদিক তাকালে তা আমানত হিসেবেই ধরে নিতে হবে।
তবে কারোর কাছে অন্যের ব্যাপারে মীমাংসার নিয়তে ভালো কথা লাগানো মিথ্যা অথবা চুগলি নয়। হযরত উম্মে কুলসুম (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
لَمْ يَكْذِبْ مَنْ نَمَى بَيْنَ اثْنَيْنِ لِيُصْلِحَ وَ فِي لَفْظ: لَيْسَ بِالْكَاذِبِ مَنْ أَصْلَحَ بَيْنَ النَّاسِ ، فَقَالَ خَيْرًا أَوْ نَمَى خَيْرًا (আবু দাউদ, হাদীস ৪৯২০)
অর্থাৎ সে ব্যক্তি মিথ্যা বলেনি যে দু' জনের মাঝে মীমাংসার জন্য চুগলি করলো। অন্য শব্দে এসেছে, সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয় যে মানুষের মাঝে মীমাংসা করলো এবং তা করতে গিয়ে ভালো কথা বললো অথবা ভালো কথার চুগলি করলো।
কেউ কারোর নিকট অন্যের ব্যাপারে চugli করলে তার করণীয় হবে ছয়টি কাজ। যা নিম্নরূপ:
ক. তার কথা একেবারেই বিশ্বাস করবে না। কারণ, সে ফাসিক। আর ফাসিকের সংবাদ শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
খ. তাকে এ মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে এবং তাকে সদুপদেশ দিবে।
গ. তাকে আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য ঘৃণা করবে। কারণ, সে আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও সত্যিই ঘৃণিত।
ঘ. যার সম্পর্কে সে চুগলি করেছে তার সম্পর্কে আপনি খারাপ ভাববেন না।
৬. এরই কথার কারণে আপনি ওর পেছনে পড়বেন না।
চ. উক্ত চুগলি সে অন্যের নিকট বর্ণনা করতে যাবে না।
📄 কাউকে লা'নত বা অভিসম্পাত করা
কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে লা'নত বা অভিসম্পাত করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্। তাই তো রাসূল কাউকে লা'নত করা তাকে হত্যা করার সমতুল্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।
হযরত সাবিত বিন যাহ্হাক থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
وَ مَنْ لَعَنَ مُؤْمِنًا فَهُوَ كَقَتْله (বুখারী, হাদীস ৬০৪৭)
অর্থাৎ কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে লা'নত করা তাকে হত্যা করার সমতুল্য।
লা'নত করা তো কোনভাবেই মু'মিনের চরিত্র হতে পারে না।
কাউকে লা'নত করা কোন সিদ্দীক তথা বিনা দ্বিধায় নবী আদর্শের সত্যিকার অনুসারী এমনকি সাধারণ কোন মু'মিনেরও বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا يَنْبَغِي لِصِدِّيقِ أَنْ يَكُوْنَ لَعَانًا (মুসলিম, হাদীস ২৫৯৭)
অর্থাৎ কোন সিদ্দীকের জন্য উচিৎ নয় যে, সে লা'নতকারী হবে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
لَا يَكُوْنُ الْمُؤْمِنُ لَعَّانًا (তিরমিযী, হাদীস ২০১৯)
অর্থাৎ মু'মিন তো কখনো লা'নতকারী হতে পারে না।
কাউকে লা'নত করলে সে ব্যক্তি লা'নতের উপযুক্ত না হলে উক্ত লা'نত লা'নতকারীর উপরই প্রত্যাবর্তন করবে। হযরত উম্মুদ্দারদা' (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি আবুদ্দারদা' কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا لَعَنَ شَيْئًا صَعِدَتِ اللَّعْنَةُ إِلَى السَّمَاءِ ، فَتَعْلَقُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ دُونَهَا ، ثُمَّ تَهْبِطُ إِلَى الْأَرْضِ ، فَتُعْلَقُ أَبْوَابُهَا دُونَهَا ، ثُمَّ تَأْخُذُ يَمِينَا وَ شِمَالاً ، فَإِذَا لَمْ تَجِدْ مَسَانًا رَجَعَتْ إِلَى الَّذِي لُعنَ ، فَإِنْ كَانَ لذَلكَ أَهْلاً ، وَ إِلَّا رَجَعَتْ إِلَى قَائِلُهَا (আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০৫)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই কোন বান্দাহ্ কোন বস্তুকে লা'নত করলে উক্ত লা'নত আকাশের দিকে উঠে যায়। ইতিমধ্যেই আকাশের দরোজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন তা আকাশে উঠতে না পেরে জমিনের দিকে নেমে আসে। ইতিমধ্যেই জমিনের দরোজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন তা ডানে-বাঁয়ে পথ খোঁজাখুঁজি করে। পরিশেষে কোন ক্ষেত্র না পেয়ে তা লা'নতকৃত ব্যক্তির নিকটই ফিরে আসে। যদি সে উক্ত লা'নতের উপযুক্তই হয়ে থাকে তা হলে তো ভালোই নতুবা তা লা'নতকারীর দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে। লা'নতকারী শহীদ ও সুপারিশকারী হতে পারবে না। হযরত আবুদ্দারদা' থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا يَكُوْنُ اللَّعَّانُوْنَ شُفَعَاءَ وَ لَا شُهَدَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ (মুসলিম, হাদীস ২৫৯৮ আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০৭)
অর্থাৎ লা'নতকারীরা কিয়ামতের দিন কখনো শহীদ ও সুপারিশকারী হতে পারবে না।
কেউ কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে লা'نত করলে তিনি অন্যের কাছে তাঁর নিজ সম্মান হারিয়ে ফেলেন।
হযরত ‘ইমরان বিন্ ‘হুস্বাইন থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
بَيْنَمَا رَسُوْلُ اللَّهِ فِي بَعْضِ أَسْفَارِهِ ، وَ امْرَأَةٌ مِنَ الْأَنْصَارِ عَلَى نَاقَةٍ ، فَضَجِرَتْ فَلَعَنَتْهَا ، فَسَمِعَ ذَلِكَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ : خُذُوا مَا عَلَيْهَا وَ دَعُوْهَا ، فَإِنَّهَا مَلْعُونَةٌ (মুসলিম, হাদীস ২৫৯৫)
অর্থাৎ একদা রাসূল সফর করছিলেন এমতাবস্থায় জনৈকা আন্সারী মহিলা নিজ উটের উপর বিরক্ত হয়ে তাকে লা'نত করলো। রাসূল তা শুনে সাহাবাদেরকে বললেন: তোমরা তার সকল আসবাবপত্র নামিয়ে লও এবং তাকে এমনিতেই ছেড়ে দাও। কারণ, সে লা'نতপ্রাপ্তা।
📄 কারোর সাথে কোন ব্যাপারে চুক্তি বা ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করা
কারোর সাথে কোন ব্যাপারে চুক্তি বা ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্। তাই তো এ জাতীয় ব্যক্তিকে মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا ، وَ مَنْ كَانَتْ فِيْهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ، وَ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَ إِذَا خَاصَمَ فَجَرَ (বুখারী, হাদীস ৩৪)
অর্থাৎ চারটি চরিত্র কারোর মধ্যে পাওয়া গেলে সে খাঁটি মুনাফিক হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর যার মধ্যে সেগুলোর একটি পাওয়া গেলো তার মধ্যে তো শুধু মুনাফিকীর একটি চরিত্রই পাওয়া গেলো যতক্ষণ না সে তা ছেড়ে দেয়। উক্ত চরিত্রগুলো হলো: যখন তার কাছে কোন কিছু আমানত রাখা হয় তখন সে তা খেয়ানত করে, যখন সে কোন কথা বলে তখন সে মিথ্যা বলে, যখন সে কারোর সাথে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন সে তা ভঙ্গ করে এবং যখন সে কারোর সাথে ঝগড়া দেয় তখন সে অশ্লীল কথা বলে।
কিয়ামতের দিন প্রত্যেক চুক্তি ভঙ্গকারী বা ওয়াদা খেলাফীর পাছার নিকট একটি করে ঝাণ্ডা প্রোথিত থাকবে এবং যা দিয়ে সে কিয়ামতের দিন বিশ্ব জন সমাবেশে পরিচিতি লাভ করবে।
হযরত আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُعْرَفُ بِهِ (মুসলিম, হাদীস ১৭৩৭)
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক চুক্তি ভঙ্গকারীর একটি করে ঝাণ্ডা হবে যা দিয়ে সে পরিচিতি লাভ করবে।
হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ عِنْدَ اسْتِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ (মুসলিম, হাদীস ১৭৩৮)
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক চুক্তি ভঙ্গকারীর একটি করে ঝাণ্ডা হবে যা তার পাছার নিকট প্রোথিত থাকবে।
হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرْفَعُ لَهُ بِقَدْرِ غَدْرِهِ ، أَلَا وَ لَا غَادِرَ أَعْظَمُ غَدْرًا مِنْ أَمِيرِ عَامَّةٍ (মুসলিম, হাদীস ১৭৩৮)
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক চুক্তি ভঙ্গকারীর একটি করে ঝাণ্ডা হবে যা তার চুক্তি ভঙ্গের পরিমাণ অনুযায়ী উত্তোলন করা হবে। জেনে রাখো, সে ব্যক্তি অপেক্ষা বড় চুক্তি ভঙ্গকারী আর কেউ হতে পারে না যে সাধারণ জনগণের দায়িত্বভার হাতে নিয়ে তাদের সঙ্গেই চুক্তি ভঙ্গ করে।