📄 আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা একটি মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহ্ তা'আলা কোর'আন মাজীদে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের নিন্দা করেন এবং তাদেরকে লা'নত ও অভিসম্পাত দেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَ تُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ ، أُوْلَائِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَ أَعْمَى أَبْصَارَهُمْ ) (মুহাম্মাদ: ২২-২৩)
অর্থাৎ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। আল্লাহ্ তা'আলা এদেরকেই করেন অভিশপ্ত, বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَ الَّذِينَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُوْنَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوْصَلَ، وَ يُفْسِدُوْنَ فِي الْأَرْضِ ، أَوْلَائِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَ لَهُمْ سُوءُ الدَّارِ ) (রা'দ্: ২৫)
অর্থাৎ যারা আল্লাহ্ তা'আলাকে দেয়া দৃঢ় অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ্ তা'আলা আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে তাদের জন্য রয়েছে লা'নত ও অভিসম্পাত এবং তাদের জন্যই রয়েছে মন্দ আবাস।
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না।
হযরত জুবায়ের বিন্ মুতু'ইম থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ (বুখারী, হাদীস ৫৯৮৪ মুসলিম, হাদীস ২৫৫৬ তিরমিযী, হাদীস ১৯০৯ আবু দাউদ, হাদীস ১৬৯৬ আব্দুর রায্যাক, হাদীস ২০২৩৮ বায়হাক্বী, হাদীস ১২৯৯৭)
অর্থাৎ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না।
হযরত আবু মূসা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ : مُدْمِنُ الْخَمْرِ وَ قَاطِعُ الرَّحِمِ وَ مُصَدِّقَ بِالسِّحْرِ (আহমাদ, হাদীস ১৯৫৮৭ হা'কিম, হাদীস ৭২৩৪ ইন্নু হিব্বান, হাদীস ৫৩৪৬)
অর্থাৎ তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না: অভ্যস্ত মদ্যপায়ী, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী ও যাদুতে বিশ্বাসী।
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীর নেক আমল আল্লাহ্ তা'আলা গ্রহণ করেন না।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنْ أَعْمَالَ بَنِي آدَمَ تُعْرَضُ كُلِّ خَمِيْسٍ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ ، فَلَا يُقْبَلُ عَمَلُ قَاطِعِ رَحِمٍ (আহমাদ, হাদীস ১০২৭৭)
অর্থাৎ আদম সন্তানের আমল সমূহ প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রিতে (আল্লাহ্ তা'আলার নিকট) উপস্থাপন করা হয়। তখন আত্মীয়তার বন্ধন বিচ্ছিন্নকারীর আমল গ্রহণ করা হয় না।
আল্লাহ্ তা'আলা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীর শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। উপরন্তু আখিরাতের শাস্তি তো তার জন্য প্রস্তুত আছেই।
হযরত আবু বাক্বাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ ذَنْبٍ أَجْدَرُ أَنْ يُعَجِّلَ اللهُ لِصَاحِبِهِ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا مَعَ مَا يَدَّخِرُ لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْبَغْيِ وَ قَطِيْعَةِ الرَّحِمِ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০২ তিরমিযী, হাদীস ২৫১১ ইন্নু মাজাহ, হাদীস ৪২৮৬ ইব্বু হিব্বান, হাদীস ৪৫৫, ৪৫৬ বায্যার, হাদীস ৩৬৯৩ আহমাদ, হাদীস ২০৩৯০, ২০৩৯৬, ২০৪১৪)
অর্থাৎ দু'টি গুনাহ্ ছাড়া এমন কোন গুনাহ্ নেই যে গুনাহ্গারের শাস্তি আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াতেই দিবেন এবং তা দেওয়াই উচিৎ; উপরন্তু তার জন্য আখিরাতের শাস্তি তো আছেই। গুনাহ্ দু'টি হচ্ছে, অত্যাচার ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী।
কেউ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করলে আল্লাহ্ তা'আলাও তার সাথে নিজ সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى خَلَقَ الْخَلْقَ ، حَتَّى إِذَا فَرَغَ مِنْ خَلْقِهِ قَالَتِ الرَّحِمُ: هَذَا مَقَامُ الْعَائِذ بكَ مِنَ الْقَطِيعَة ، قَالَ: نَعَمْ ، أَمَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَصْلَ مَنْ وَصَلَكَ ، وَ أَقْطَعَ مَنْ قَطَعَكَ؟ قَالَتْ: بَلَى يَا رَبِّ قَالَ: فَهُوَ لَكَ (বুখারী, হাদীস ৪৮৩০, ৫৯৮৭ মুসলিম, হাদীস ২৫৫৪)
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্টিকুল সৃজন শেষে আত্মীয়তার বন্ধন (দাঁড়িয়ে) বললো: এটিই হচ্ছে সম্পর্ক বিচ্ছিন্নতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনাকারীর স্থান। আল্লাহ্ তা'আলা বললেন: হ্যাঁ, ঠিকই। তুমি কি এ কথায় সন্তুষ্ট নও যে, আমি ওর সঙ্গেই সম্পর্ক স্থাপন করবো যে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে এবং আমি ওর সাথেই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করবো যে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করবে। তখন সে বললো: আমি এ কথায় অবশ্যই রাজি আছি হে আমার প্রভু! তখন আল্লাহ্ তা'আলা বললেন: তা হলে তোমার জন্য তাই হোক।
কেউ কেউ মনে করেন, আত্মীয়-স্বজনরা তার সাথে দুর্ব্যবহার করলে তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা জায়িয। মূলতঃ ব্যাপারটি তেমন নয়। বরং আত্মীয়রা আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করার পরও আপনি যদি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার দেখান তখনই আপনি তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেছেন বলে প্রমাণিত হবে।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর বিন্ ‘আস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِي وَلَكِنَّ الْوَاصِلَ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا (বুখারী, হাদীস ৫৯৯১ আবু দাউদ, হাদীس ১৬৯৭ তিরমিযী, হাদীস ১৯০৮ বায়হাক্বী, হাদীস ১২৯৯৮)
অর্থাৎ সে ব্যক্তি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী হিসেবে গণ্য হবে না যে কেউ তার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করলেই সে তার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে। বরং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী সে ব্যক্তি যে কেউ তার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করলেও সে তার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন: হে আল্লাহ্'র রাসূল! আমার এমন কিছু আত্মীয়-স্বজন রয়েছে যাদের সাথে আমি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করি অথচ তারা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করি অথচ তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। আমি তাদের সাথে ধৈর্যের পরিচয় দেই অথচ তারা আমার সাথে কঠোরতা দেখায়। অতএব তাদের সাথে এখন আমার করণীয় কি? তখন রাসূল বললেন:
لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ فَكَأَنَّمَا تُسِفُهُمُ الْمَل ، وَ لَا يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللَّهِ ظَهِيرٌ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَى ذَلِكَ (মুসলিম, হাদীস ২৫৫৮)
অর্থাৎ তুমি যদি সত্যি কথাই বলে থাকো তা হলে তুমি যেন তাদেরকে উত্তপ্ত ছাই খাইয়ে দিচ্ছো। আর তুমি যতদিন পর্যন্ত তাদের সাথে এমন ব্যবহার করতে থাকবে ততদিন আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের উপর তোমার জন্য একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত থাকবে।
হযরত উম্মে কুলসূম বিন্তে ‘উক্বাহ্, ‘হাকীম বিন্ ‘হিযাম ও আবু আইয়ুব থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ الصَّدَقَةُ عَلَى ذِي الرَّحِمِ الْكَاشِحِ (ইব্বু খুযাইমাহ, হাদীস ২৩৮৬ বায়হাক্বী, হাদীস ১৩০০২ দা'রামী, হাদীস ১৬৭৯ ত্বাবারানী/কাবীর, হাদীস ৩১২৬, ৩৯২৩, ৪০৫১ আওসাত্ব, হাদীস ৩২৭৯ আহমাদ, হাদীস ১৫৩৫৫, ২৩৫৭৭)
অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ সাদাকা হচ্ছে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যে আপনার শত্রু তার উপর সাদাকা করা।
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীর সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা সর্বশ্রেষ্ঠ আমল।
হযরত ‘উবাহ্ বিন্ ‘আমির ও হযরত ‘আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল কে সর্বশ্রেষ্ঠ আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:
صِلْ مَنْ قَطَعَكَ ، وَ أَعْطِ مَنْ حَرَمَكَ ، وَ أَعْرِضْ عَمَّنْ ظَلَمَكَ (আহমাদ, হাদীস ১৭৩৭২, ১৭৪৮৮ ‘হাকিম, হাদীস ৭২৮৫ বায়হাক্বী, হাদীস ২০৮৮০ ত্বাবারানী/কাবীর, হাদীস ৭৩৯, ৭৪০ আওসাত্ব, হাদীস ৫৫৬৭)
অর্থাৎ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো ওর সঙ্গে যে তোমার সঙ্গে সে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, দাও ওকে যে তোমাকে বঞ্চিত করেছে এবং যালিমের পাশ কেটে যাও তথা তাকে ক্ষমা করো।
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করলে রিযিক ও বয়সে বরকত আসে।
হযরত আনাস্ ও আবু হুরাইরাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ (বুখারী, হাদীস ২০৬৭, ৫৯৮৫, ৫৯৮৬ মুসলিম, হাদীস ২৫৫৭ আবু দাউদ, হাদীস ১৬৯৩)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, তার রিযিক ও বয়স বেড়ে যাক সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
تَعَلَّمُوا مِنْ أَنْسَابِكُمْ مَا تَصِلُوْنَ بِهِ أَرْحَامَكُمْ ، فَإِنَّ صِلَةَ الرَّحِمِ مَحَبَّةٌ فِي الأَهْلِ، مَثْرَاةٌ فِي الْمَالِ ، مَنْسَأَةٌ فِي الْأَثَرِ (তিরমিযী, হাদীস ১৯৭৯)
অর্থাৎ তোমরা নিজ বংশ সম্পর্কে ততটুকুই জানবে যাতে তোমরা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতে পারো। কারণ, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করলে আত্মীয়-স্বজনদের ভালোবাসা পাওয়া যায় এবং ধন-সম্পদ ও বয়স বেড়ে যায়।
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা ঈমানের একটি বাহ্যিক পরিচয়।
হ হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَ الْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ (বুখারী, হাদীস ৬১৩৮)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলা ও পরকালে বিশ্বাসী সে যেন নিজ আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে।
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করলে জান্নাত অতি নিকটবর্তী এবং জাহান্নাম অতি দূরবর্তী হয়ে যায়।
হযরত আবু আইয়ূব আনসারী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ فَقَالَ: دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ أَعْمَلُهُ يُدْنِيْنِي مِنَ الْجَنَّةِ وَ يُبَاعِدُنِي مِنَ النَّارِ، قَالَ: تَعْبُدُ اللهُ ، لَا تُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمُ الصَّلَاةَ وَ تُؤْتِي الزَّكَاةَ ، وَتَصِلُ ذَا رَحِمِكَ ، فَلَمَّا أَدْبَرَ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ : إِنْ تَمَسَّكَ بِمَا أُمِرَ بِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ (বুখারী, হাদীস ১৩৯৬, ৫৯৮২, ৫৯৮৩ মুসলিম, হাদীস ১৩)
অর্থাৎ জনৈক ব্যক্তি নবী এর নিকট এসে বললেন: (হে নবী!) আপনি আমাকে এমন একটি আমল বাতলিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে দিবে। নবী বললেন: একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদাত করবে; তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না। নামাজ কা'য়িম করবে, যাকাত দিবে ও নিজ আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করবে।
লোকটি রওয়ানা করলে রাসূল তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: সে যদি আদিষ্ট বিষয়গুলো আঁকড়ে ধরে রাখে তা হলে সে জান্নাতে যাবে।
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করলে গুনাহ্ মাফ হয়। যদিও তা বড় হোক না কেন।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
أَتَى رَجُلُ النَّبِيَّ ﷺ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَصَبْتُ ذَنْبًا عَظِيمًا ، فَهَلْ لِي مِنْ تَوْبَةِ؟ قَالَ: هَلْ لَكَ مِنْ أَمْ؟ قَالَ: لَا ، قَالَ : هَلْ لَكَ مِنْ خَالَةِ؟ قَالَ: نَعَمْ ، قَالَ: فَبِرَّهَا (তিরমিযী, হাদীস ১৯০৪)
অর্থাৎ জনৈক ব্যক্তি নবী এর নিকট এসে বললো: হে আল্লাহ্'র রাসূল! আমি একটি বড় গুনাহ্ করে ফেলেছি। সুতরাং আমার জন্য কি তাওবাহ্ আছে? রাসূল তাকে জিজ্ঞাসা করেন: তোমার কি মা আছে? সে বললো: নেই। রাসূল তাকে আবারো জিজ্ঞাসা করলেন: তোমার কি খালা আছে? সে বললো: জি হ্যাঁ। তখন রাসূল বললেন: সুতরাং তার সাথেই ভালো ব্যবহার করবে।
আত্মীয়-স্বজনদেরকে সাদাকা করলে দু'টি সাওয়াব পাওয়া যায়: একটি সাদাকার সাওয়াব এবং অপরটি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার।
একদা রাসূল মহিলাদেরকে সাদাকা করার উপদেশ দিলে নিজ স্বামীদেরকেও সাদাকা করা যাবে কি না সে ব্যাপারে দু' জন মহিলা সাহাবী হযরত বিলাল এর মাধ্যমে রাসূল কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন:
لَهُمَا أَجْرَانِ : أَجْرُ الْقَرَابَةِ وَ أَجْرُ الصَّدَقَة (বুখারী, হাদীস ১৪৬৬ মুসলিম, হাদীস ১০০০)
অর্থাৎ (স্বামীদেরকে দিলেও চলবে) বরং তাতে দু'টি সাওয়াব রয়েছে: একটি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার সাওয়াব এবং আরেকটি সাদাকার সাওয়াব।
একদা হযরত মাইমূনা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) রাসূল কে না জানিয়ে একটি বান্দি স্বাধীন করে দিলেন। অতঃপর রাসূল কে সে সম্পর্কে জানালে তিনি বলেন:
أَمَا إِنَّكَ لَوْ أَعْطَيْتِهَا أَحْوَالَكَ كَانَ أَعْظَمَ لأَجْرِكَ (বুখারী, ২৫৯২, ২৫৯৪ মুসলিম, হাদীস ৯৯৯ আবু দাউদ, হাদীস ১৬৯০)
অর্থাৎ জেনে রাখো, তুমি যদি বান্দিটিকে তোমার মামাদেরকে দিয়ে দিতে তা হলে তুমি আরো বেশি সাওয়াব পেতে।
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার বিশেষ গুরুত্বের কারণেই রাসূল নিজ সাহাবাদেরকে মিসরে অবস্থানরত তাঁরই আত্মীয়-স্বজনের প্রতি ভালো ব্যবহারের ওয়াসিয়ত করেন।
হযরত আবুযর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّكُمْ سَتَفْتَحُوْنَ مِصْرَ ، وَ هِيَ أَرْضٌ يُسَمَّى فِيهَا الْقِيْرَاطُ ، فَإِذَا فَتَحْتُمُوْهَا فَأَحْسِنُوْا إِلَى أَهْلِهَا ، فَإِنَّ لَهُمْ ذِمَّةً وَ رَحِمًا أَوْ قَالَ: ذِمَّةً وَ صِهْرًا (মুসলিম, হাদীস ২৫৪৩)
অর্থাৎ তোমরা অচিরেই মিশর বিজয় করবে। যেখানে ক্বীরাতের (দিরহাম ও দীনারের অংশ বিশেষ) প্রচলন রয়েছে। যখন তোমরা তা বিজয় করবে তখন সে এলাকার অধিবাসীদের প্রতি দয়া করবে। কারণ, তাদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি ও আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। (হযরত ইসমা'ঈল এর মা হযরত হা'জার ‘আলাইহাস্ সালা'ম) সেখানকার) অথবা হয়তো বা রাসূল বলেছেন: কারণ, তাদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি ও আমার শ্বশুর পক্ষীয় আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। (রাসূলের স্ত্রী হযরত মা'রিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহ্যা সেখানকার)।
অন্ততপক্ষে সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে হলেও আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতে হবে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
بُلُّوْا أَرْحَامَكُمْ وَ لَوْ بِالسَّلَامِ (বায্যার, হাদীস ১৮৭৭)
অর্থাৎ অন্ততপক্ষে সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে হলেও তোমরা তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করো।
📄 নিজ অধীনস্থ মহিলাদের অশ্লীলতায় খুশি হওয়া অথবা তা অকাতরে চোখ বুজে মেনে নেয়া
নিজ অধীনস্থ মহিলাদের অশ্লীলতায় খুশি হওয়া অথবা তা চোখ বুজে মেনে নেয়াও আরেকটি কবীরা গুনাহ্ এবং হারাম কাজ। যাকে আরবী ভাষায় দিয়াসাহ্ এবং উক্ত ব্যক্তিকে দাইয়ূস বলা হয়।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
ثَلَاثَةٌ قَدْ حَرَّمَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَلَيْهِمُ الْجَنَّةَ : مُدْمِنُ الْخَمْرِ ، وَ الْعَاقُ ، وَالدَّيُّوْتُ الَّذِي يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخَبَثَ (আহমাদ ২/৬৯, ১২৮ সা'হীহুল্ জা'মি', হাদীস ৩০৫২ সা'হীহত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব, হাদীস ২৩৬৬)
অর্থাৎ তিন ব্যক্তির উপর আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। তারা হলো মধ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান এবং এমন আত্মমর্যাদাহীন বা ঈর্ষাহীন ব্যক্তি যে নিজ পরিবারবর্গের ব্যাপারে ব্যভিচার তথা অশ্লীলতা মেনে নেয়।
হযরত ‘আম্মার বিন্ ইয়াসির (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ أَبَدًا : الدَّيُّوتُ ، وَ الرَّجُلَةُ مِنَ النِّسَاءِ ، وَ مُدْمِنُ الْخَمْرِ ، قَالُوا : يَا رَسُوْلَ اللهِ! أَمَّا مُدْمِنُ الْخَمْرِ فَقَدْ عَرَفْنَاهُ فَمَا الدَّيُّوْتُ؟ قَالَ: الَّذِي لَا يُبَالِي مَنْ دَخَلَ عَلَى أَهْلِه ، قُلْنَا: فَمَا الرَّجُلَةُ مِنَ النِّسَاءِ؟ قَالَ: الَّتِي تَشَبَّهُ بِالرِّجَالِ (সা'হীহত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব, হাদীস ২০৭১, ২৩৬৭)
অর্থাৎ তিন ব্যক্তি কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তারা হলো আত্মমর্যাদাহীন বা ঈর্ষাহীন ব্যক্তি, পুরুষ মার্কা মেয়ে এবং মধ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহ্'র রাসূল ! মধ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তিকে তো আমরা চিনি তবে আত্মমর্যাদাহীন বা ঈর্ষাহীন ব্যক্তি বলতে আপনি কাকে বুঝাচ্ছেন? রাসূল বললেন: যে নিজ পরিবারবর্গের নিকট কে বা কারা আসা-যাওয়া করছে এর কোন খবরই রাখে না বা এর কোন পরোয়াই করে না। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন: তা হলে পুরুষ মার্কা মেয়ে বলতে আপনি কাদেরকে বুঝাতে চাচ্ছেন? রাসূল বললেন: যে মহিলা পুরুষের সাথে কোনভাবে সাদৃশ্য বজায় রাখে।
আত্মমর্যাদাহীনতা বা ঈর্ষাহীনতার আরেকটি পর্যায় এই যে, কেউ নিজ মেয়ে বা স্ত্রীকে গায়রে মাহরাম তথা যার সাথে দেখা দেয়া হারাম এমন কারোর সাথে সরাসরি, টেলিফোন অথবা মোবাইলে কথা বলতে বা হাসাহাসি করতে কিংবা নির্জনে বসে গল্প-গুজব করতে দেখলো অথচ সে কিছুই বললো না।
আত্মমর্যাদাহীনতা বা ঈর্ষাহীনতার আরেকটি পর্যায় এও যে, কারোর কাজের ছেলে বা গাড়ি চালক তার অন্দরমহলে যখন-তখন ঢুকে পড়ছে এবং তার স্ত্রী-কন্যার সাথে কথাবার্তা বলছে। তার স্ত্রী-কন্যারা যখন-তখন গাড়ি চালকের সাথে একাকী মার্কেট, পার্ক, বিয়ে বাড়ি ইত্যাদির দিকে ছুটে বেড়াচ্ছে অথচ সে তা জানা সত্ত্বেও তাদেরকে এ ব্যাপারে কিছুই বলছে না।
আত্মমর্যাদাহীনতা বা ঈর্ষাহীনতার আরেকটি পর্যায় এও যে, কারোর স্ত্রী- কন্যা বেপর্দাভাবে রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর পিপাসার্ত যুবকরা ওদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে বার বার তাকিয়ে আত্মতৃপ্ত হচ্ছে অথচ সে তা জানা সত্ত্বেও তাদেরকে এ ব্যাপারে কিছুই বলছে না।
আত্মমর্যাদাহীনতা বা ঈর্ষাহীনতার আরেকটি পর্যায় এও যে, কারোর স্ত্রী- কন্যা টিভির পর্দায় অর্ধ উলঙ্গ নায়ক-নায়িকার গলা ধরাধরি, চুমোচুমি ইত্যাদি দেখে উক্ত নায়কের প্রতি নিজের অজান্তেই আসক্ত হয়ে পড়ছে অথচ সে নিজেই জেনে-শুনে তাদের জন্য এ কুব্যবস্থা চালু করে রেখেছে। আরো কত্তো কী?
📄 কোন মহিলা নিজ স্বামীর অবাধ্য হওয়া
কোন মহিলা নিজ স্বামীর অবাধ্য হওয়াও কবীরা গুনাহ্'র অন্যতম। তাই তো আল্লাহ্ তা'আলা এ জাতীয় মহিলাদের জন্য পর্যায়ক্রমে কয়েকটি শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ اللَّاتِي تَخَافُوْنَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوْهُنَّ وَ اهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ، فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوْا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) (নিসা': ৩৪)
অর্থাৎ আর যে নারীদের তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাদেরকে সদুপদেশ দাও তথা আল্লাহ্ তা'আলার আযাবের ভয়-ভীতি দেখাও, তাদেরকে শয্যায় পরিত্যাগ করো এবং প্রয়োজনে তাদেরকে প্রহার করো। এতে করে তারা তোমাদের অনুগত হয়ে গেলে তাদের ব্যাপারে আর অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা সমুন্নত মহীয়ান।
কোন মহিলা তার স্বামীর প্রয়োজনের ডাকে সাড়া না দিলে যদি সে তার উপর রাগান্বিত হয়ে রাত্রি যাপন করে তা হলে ফিরিস্তারা তার উপর লা'নত করতে থাকেন যতক্ষণ না সে সকালে উপনীত হয়।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ ، فَبَات غَضْبَانَ عَلَيْهَا ، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ (বুখারী, হাদীস ৩২৩৭ মুসলিম, হাদীস ১৪৩৬)
অর্থাৎ কোন পুরুষ নিজ স্ত্রীকে তার শয্যার দিকে ডাকলে সে যদি তাতে সাড়া না দেয় অতঃপর সে তার উপর রাগান্বিত হয়ে রাত্রি যাপন করে তা হলে ফিরiস্তারা তার উপর লা'নত করতে থাকে যতক্ষণ না সে সকালে উপনীত হয়।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
وَ الَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُوْ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهَا ، فَتَأْبَى عَلَيْهِ إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا (বুখারী, হাদীস ৩২৩৭, ৫১৫৩ মুসলিম, হাদীস ১৪৩৬)
অর্থাৎ সে সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! কোন ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে তার শয্যার দিকে ডাকলে সে যদি তাতে সাড়া দিতে অস্বীকার করে তা হলে সে সত্তা যিনি আকাশে রয়েছেন (আল্লাহ্ তা'আলা) তার উপর অসন্তুষ্ট হবেন যতক্ষণ না তার উপর তার স্বামী সন্তুষ্ট হয়।
কোন মহিলা নিজ স্বামীর সমূহ অধিকার আদায় না করলে সে আল্লাহ্ তা'আলার সমূহ অধিকার আদায় করেছে বলে ধর্তব্য হবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ আবু আওফা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَوْ كُنْتُ أَمْرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِغَيْرِ الله لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا ، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ! لَا تُؤَدِّيَ الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤَدِّيَ حَقَّ زَوْجِهَا كُلِّهِ ، حَتَّى لَوْ سَأَلَهَا نَفْسَهَا وَهِيَ عَلَى قَتَبٍ لَّمْ تَمْنَعْهُ (ইবনু মাজাহ, হাদীস ১৮৮০ আহমাদ ৪/৩৮১ ইবনু হিব্বান/ইহসান, হাদীস ৪১৫৯ বায়হাক্বী ৭/২৯২)
অর্থাৎ আমি যদি কাউকে আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য সিজদাহ্ করতে আদেশ করতাম তা হলে মহিলাকে তাঁর স্বামীর জন্য সিজদাহ্ করতে আদেশ করতাম। কারণ, সে সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! কোন মহিলা নিজ প্রভুর সমূহ অধিকার আদায় করেছে বলে ধর্তব্য হবে না যতক্ষণ না সে তার স্বামীর সমূহ অধিকার আদায় করে। এমনকি কোন মহিলাকে তার স্বামী সহবাসের জন্য ডাকলে তাতে তার অস্বীকার করার কোন অধিকার নেই। যদিও সে তখন উটের পিঠে আরোহণ অবস্থায় থাকুক না কেন। স্বামীর সন্তুষ্টিতেই স্ত্রীর জান্নাত এবং তার অসন্তুষ্টিতেই স্ত্রীর জাহান্নাম। একদা জনৈকা সাহাবী মহিলা রাসূল এর নিকট তার স্বামীর কথা উল্লেখ করলে তিনি তাকে বলেন:
اُنْظُرِي أَيْنَ أَنْتِ مِنْهُ ، فَإِنَّهُ جَنَّتَكَ وَ نَارُكَ (আহমাদ ৪/৩৪১ নাসায়ী/'ইশ্রাতুন্ নিসা', হাদীস ৭৬, ৭৭, ৭৮, ৭৯, ৮০, ৮১, ৮২, ৮৩ ইবনু আবী শাইবাহ ৪/৩০৪ হা'কিম ২/১৮৯ বায়হাক্বী ৭/২৯১)
অর্থাৎ ভেবে দেখো তার সাথে তুমি কি ধরনের আচরণ করছো! কারণ, সেই তো তোমার জান্নাত এবং সেই তো তোমার জাহান্নাম।
কোন মহিলা তার স্বামীর অবদান সমূহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে আল্লাহ্ তা'আলা তার প্রতি কখনো সন্তুষ্টির দৃষ্টিতে তাকাবেন না। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى امْرَأَةٍ لَا تَشْكُرُ لِزَوْجِهَا ، وَ هِيَ لَا تَسْتَغْنِي عَنْهُ (নাসায়ী/'ইশ্রাতুন নিসা', হাদীস ২৪৯, ২৫০ হা'কিম ২/১৯০ বায়হাক্বী ৭/২৯৪ খতীব ৯/৪৪৮)
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা এমন মহিলার দিকে (সন্তুষ্টির দৃষ্টিতে) তাকান না যে নিজ স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না; অথচ সে তার স্বামীর প্রতি সর্বদাই মুখাপেক্ষিণী।
কোন মহিলা তার স্বামীকে দুনিয়াতে কষ্ট দিলে তার জান্নাতী অপরূপা সুন্দরী স্ত্রী তথা ‘হুররা সে মহিলাকে তিরস্কার করতে থাকে। হযরত মু'আয বিন জাবাল থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا تُؤْذِي امْرَأَةٌ زَوْجَهَا إِلَّا قَالَتْ زَوْجَتُهُ مِنَ الْحُوْرِ الْعِيْنِ : لَا تُؤْذِيهِ ، قَاتَلَكِ اللَّهُ ! فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكَ دَخِيْلٌ ، أَوْشَكَ أَنْ يُفَارِقَكَ إِلَيْنَا (ইন্নু মাজাহ, হাদীস ২০৪৪)
অর্থাৎ কোন মহিলা তার স্বামীকে দুনিয়াতে কষ্ট দিলে তার জান্নাতী অপরূপা সুন্দরী স্ত্রীরা বলে: তাকে কষ্ট দিও না। আল্লাহ্ তোমাকে ধ্বংস করুক! কারণ, সে তো তোমার কাছে কিছু দিনের জন্য। বেশি দেরি নয় যে, সে তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে চলে আসবে।
আল্লাহ্ তা'আলা, তদীয় রাসূল এবং স্বামীর আনুগত্যহীনতার কারণেই অধিকাংশ মহিলারা জাহান্নামে যাবে। হযরত ‘ইমরান বিন্ ‘হুস্বাইন থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী ইরশাদ করেন:
اطَّلَعْتُ فِي الْجَنَّةِ فَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا الْفُقَرَاءَ ، وَ اطْلَعْتُ فِي النَّارِ فَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ (বুখারী, হাদীস ৩২৪১ মুসলিম, হাদীস ২৭৩৮)
অর্থাৎ আমি জান্নাতে উঁকি মেরে দেখতে পেলাম, জান্নাতীদের অধিকাংশই গরীব শ্রেণীর এবং জাহান্নামে উঁকি মেরে দেখতে পেলাম, জাহান্নামীদের অধিকাংশই মহিলা।
হযরত আবু সা'ঈদ খুদ্রী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল মহিলাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ ، فَإِنِّي أُرِيتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ ، فَقُلْنَ: وَ بِمَ يَا رَسُوْلَ الله !؟ قَالَ: تُكْثَرْنَ اللَّعْنَ وَ تَكْفُرْنَ الْعَشِيْرَ (বুখারী, হাদীস ৩০৪ মুসলিম, হাদীস ৮০)
অর্থাৎ হে মহিলারা! তোমরা (বেশি বেশি) সাদাকা করো। কারণ, আমি তোমাদেরকেই জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী রূপে দেখেছি। মহিলারা বললো: কেন হে আল্লাহ্'র রাসূল! তখন রাসূল বললেন: তোমরা বেশি লা'নত করে থাকো এবং স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করো না।
📄 ওসিয়ত বা দানের ক্ষেত্রে সন্তানদের কাউকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যের ক্ষতি করা
অসিয়ত বা দানের ক্ষেত্রে সন্তানদের কাউকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যের ক্ষতি করা হারাম ও কবীরা গুনাহ্।
মূলতঃ কারোর নিজ কোন সন্তানের জন্য কোন কিছুর অসিয়ত করাই না জায়িয। কারণ, সে তো ওয়ারিশ। আর ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত করা তো কোন প্রকারেই জায়িয নয়। সুতরাং কোন সন্তানের জন্য কোন কিছুর অসিয়ত করা মানেই অন্য সন্তানের ক্ষতি করা।
হযরত আবু উমামাহ্ বাহিলী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلِّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثِ (আবু দাউদ, হাদীস ২৮৭০ ইবনু মাজাহ, হাদীস ২৭৬৩)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা প্রত্যেক পাওনাদারকে তার পাওনা দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং ওয়ারিশের জন্য আর কোন অসিয়ত চলবে না।
তেমনিভাবে কোন ধর্মীয় ক্ষেত্র অথবা কোন ব্যক্তির জন্য সম্পদের এক তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করাও নিজ সন্তানদের ক্ষতি সাধন করার শামিল।
হযরত সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস্ব থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি মক্কা বিজয়ের বছর রোগাক্রান্ত হই। এমনকি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তেই পৌঁছে গিয়েছিলাম।
তখন রাসূল আমাকে দেখতে আসলেন। আমি রাসূল কে বললাম: হে আল্লাহ্'র রাসূল! আমার তো অনেকগুলো সম্পদ। তবে একটি মেয়ে ছাড়া আমার আর কোন ওয়ারিশ নেই। আমি কি আমার সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ সাদাকা করে দেবো? রাসূল বললেন: না। আমি বললাম: তা হলে অর্ধেক সম্পদ? রাসূল বললেন: না। আমি বললাম: তা হলে এক তৃতীয়াংশ। রাসূল বললেন: ঠিক আছে এক তৃতীয়াংশ। তবে তাও অনেক বেশি। তিনি আরো বললেন:
أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُوْنَ النَّاسَ (আবু দাউদ, হাদীস ২৮৬৪ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৭৫৮)
অর্থাৎ তুমি তোমার সন্তানদেরকে ধনী রেখে যাওয়া তোমার জন্য অনেক উত্তম তাদের গরীব রেখে যাওয়ার চাইতে যাতে তারা মানুষের কাছে হাত পাতে।
যারা জীবিত থাকতেই সময় মতো আল্লাহ্'র রাস্তায় সাদাকা করে না তারা মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে এলোমেলোভাবে সাদাকা করে নিজ ওয়ারিশদের ক্ষতি সাধন করে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূল কে জিজ্ঞাসা করলো: হে আল্লাহ্'র রাসূল! কোন ধরনের সাদাকা উত্তম? রাসূল বললেন:
أَنْ تَصَدَّقَ وَ أَنْتَ صَحِيحٌ حَرِيصٌ ، تَأْمُلُ الْبَقَاءَ ، وَ تَخْشَى الْفَقْرَ ، وَ لَا تُمْهِلْ، حَتَّى إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُوْمَ قُلْتَ: لِفُلَانِ كَذَا ، لِفُلَانِ كَذَا ، وَ قَدْ كَانَ لِفُلَانِ (আবু দাউদ, হাদীস ২৮৬৫)
অর্থাৎ তুমি সাদাকা করবে যখন তুমি সুস্থ থাকো এবং সম্পদের প্রতি তোমার লোভ থাকে। দুনিয়ায় থাকার ইচ্ছা এবং দরিদ্রতার ভয় পাও। সাদাকা করতে দেরি করো না কিন্তু। এমন যেন না হয়, রূহ গলায় পৌঁছে গেলো। আর তুমি বললে: অমুকের জন্য এতো। অমুকের জন্য এতো; মূলতঃ তা অন্যের জন্যই। কোন সন্তানকে এককভাবে কোন কিছু দান করা যাবে না। বরং দিতে চাইলে সবাইকে সমানভাবেই দিতে হবে। নতুবা স্বেচ্ছায় অন্য সন্তানের ক্ষতি সাধন করা হবে।
হযরত নু'মান বিন্ বাশীর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা আমার মা আমার পিতার নিকট আমার জন্য কিছু বিশেষ দান চাইলে তিনি আমাকে একটি গোলাম দান করেন। তখন আমার মা বললেন: আমি এতে সন্তুষ্ট হবো না যতক্ষণ না রাসূল কে এ ব্যাপারে সাক্ষী বানাবেন। তখন আমার পিতা রাসূল এর নিকট এসে বললেন: হে আল্লাহ্'র রাসূল! আমি ‘আমরাহ্ বিন্তে রাওয়াহার গর্ভজাত ছেলে তথা আমারই সন্তান নু'মানকে একটি গোলাম দিয়েছি। সে এ ব্যাপারে আপনাকে সাক্ষী বানাতে চায়। তখন রাসূল বললেন:
أَكُلَّ وَلَدِكَ نَحَلْتَ مِثْلَهُ ؟ قَالَ : لا ، قَالَ: فَارْجِعْهُ ، وَ فِي رِوَايَةٍ : فَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوْا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ ، وَ فِي رِوَايَةٍ : لَا تُشْهِدْنِي عَلَى جَوْرٍ ، وَ فِي رِوَايَةٍ : أَلَيْسَ يَسُرُّكَ أَنْ يَكُونُوا لَكَ فِي الْبَرِّ سَوَاءٌ ؟ قَالَ: بَلَى ، قَالَ: فَلَا إِذًا (বুখারী, হাদীস ২৫৮৬, ২৫৮৭, ২৬৫০ মুসলিম, হাদীস ১৬২৩ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৪০৪, ২৪০৫)
অর্থাৎ তোমার সকল সন্তানকেই এমন করে একটি একটি গোলাম দিয়েছো? তিনি বললেন: না। তখন রাসূল ﷺ বললেন: সুতরাং তা ফেরৎ নিয়ে নাও।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করো। অন্য বর্ণনায় আরো রয়েছে, আমাকে যুলুমের সাক্ষী বানিও না। আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, তোমার কি মনে চায় না যে, তোমার সকল সন্তান তোমার সাথে সমানভাবেই ভালো ব্যবহার দেখাক? তিনি বললেন: অবশ্যই। তখন রাসূল ﷺ বললেন: তা হলে তুমি নু'মানকে এককভাবে একটি গোলাম দিতে পারো না।
এ যুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই যদি কেউ তার সন্তানকে কোন কিছু এককভাবে দিয়ে দেয় তা ফেরত নেয়ার বিধান রাখা হয়েছে; যদিও তা অন্যের ক্ষেত্রে জায়িয নয়।
হ হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর ও হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ Š থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: নবী ﷺ ইরশাদ করেন:
لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يُعْطِيَ عَطِيَّةً ، أَوْ يَهَبَ هِبَةً فَيَرْجِعَ فِيْهَا ، إِلَّا الْوَالِدَ فِيمَا يُعْطِي وَلَدَهُ ، وَ مَثَلُ الَّذِي يُعْطِي الْعَطِيَّةَ ثُمَّ يَرْجِعُ فِيْهَا ، كَمَثَلِ الْكَلْبِ يَأْكُلُ ، فَإِذَا شَبِعَ قَاءَ ، ثُمَّ عَادَ فِي قَيْتِهِ (আবু দাউদ, হাদীস ৩৫৩৯ ইব্বু মাজাহ, হাদীস ২৪০৬)
অর্থাৎ কোন ব্যক্তির জন্য জায়িয নয় যে, সে কাউকে কোন কিছু দিয়ে তা আবার ফেরৎ নিবে। তবে পিতা তার সন্তানকে কোন কিছু দিয়ে তা আবার ফেরৎ নিতে পারে। যে ব্যক্তি কাউকে কোন কিছু দিয়ে তা আবার ফেরৎ নেয় সে যেন কুকুরের ন্যায়। পেট ভরে খাদ্য খেয়ে বমি করলো এবং আবারো সেই বমি খোলো।
তবে কোন সন্তানকে প্রয়োজনের খাতিরে কোন কিছু দিলে তা অন্যকেও সমভাবে দিতে হবে এমন নয় যতক্ষণ না তারো প্রয়োজন দেখা দেয়। যেমন: কেউ স্কুল, কলেজ অথবা মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে তখন তার খরচ কিংবা কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসা খরচ ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে তাকে দেয়ার সময় অন্য জনেরও এমন প্রয়োজন দেখা দিলে তাকেও দিবে এ মানসিকতা থাকতে হবে।