📄 হারাম অবাধ্যতার দৃষ্টান্ত
ক. হারাম অবাধ্যতার দৃষ্টান্ত। যেমন: মাতা-পিতা সন্তানের উপর কোন ব্যাপারে কসম খেয়েছেন। অথচ সে তাদের উক্ত কসমটি রক্ষা করেনি।
মাতা-পিতা সন্তানের নিকট প্রয়োজনীয় কিছু চেয়েছেন। অথচ সে তাদের উক্ত চাহিদা পূরণ করেনি।
মাতা-পিতা সন্তানের নিকট কোন কিছু আশা করেছেন। অথচ সে তাদের উক্ত আশা ভঙ্গ করেছে।
মাতা-পিতা সন্তানকে কোন কাজের আদেশ করেছেন। অথচ সে তাদের উক্ত আদেশটি মান্য করেনি।
মাতা-পিতাকে মেরে, গালি দিয়ে বা কারোর নিকট তাদের গীবত বা দোষ চর্চা করে তাদেরকে কষ্ট দেয়া সর্বোচ্চ নাফরমানি। তবে গুনাহ্'র কাজে তাদের কোন আনুগত্য করা যাবেনা। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ إِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ، وَصَاحِبُهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا، وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ، ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُوْنَ ) (লুক্বমান: ১৫)
অর্থাৎ তোমার মাতা-পিতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বস্তু বা ব্যক্তিকে শরীক করতে পীড়াপীড়ি করে যে ব্যাপারে তোমার কোন জ্ঞান নেই তথা কোর'আন ও হাদীসের কোন সাপোর্ট নেই তাহলে তুমি এ ব্যাপারে তাদের কোন আনুগত্য করবেনা। তবে তুমি এতসত্ত্বেও দুনিয়াতে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে এবং সর্বদা তুমি আমি (আল্লাহ) অভিমুখী মানুষের পথ অনুসরণ করবে। কারণ, পরিশেষে তোমাদের সকলকে আমার নিকটই প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন আমি তোমাদের কর্ম সম্পর্কে তোমাদেরকে অবশ্যই অবগত করবো।
📄 মাকরুহ্ অবাধ্যতার দৃষ্টান্ত
খ. মাকরূহ্ অবাধ্যতার দৃষ্টান্ত। যেমন: আপনার পিতা খাবার শেষ করেছেন। এখন তিনি হাত ধুতে চাচ্ছেন এবং তিনি স্বয়ং উঠে গিয়ে হাতও ধুয়েছেন। আপনি শুধু তা দেখেই আছেন। কিছুই করেননি। এতে আপনি পিতার অবাধ্য হননি।
তবে কাজটি আরো ভালো হতো যদি আপনি আপনার কাজের ছেলেকে হাত ধোয়ার পানিটুকু আপনার পিতাকে এগিয়ে দিতে বলতেন। কাজটি আরো ভালো হতো যদি আপনি স্বয়ং উঠে গিয়ে হাত ধোয়ার পানিটুকু আপনার পিতাকে এগিয়ে দিতেন।
তবে আপনার পিতা যদি দাঁড়াতে না পারেন অথবা দাঁড়াতে কষ্ট হয় অথবা আপনার পিতা স্বয়ং আপনাকেই পানি উপস্থিত করতে আদেশ করলেন এবং আপনি আদেশটি পালন করলেন না তখন কিন্তু আপনি আপনার পিতার অবাধ্য বলে বিবেচিত হবেন।
📄 অবাধ্যতার আরো কিছু দৃষ্টান্ত
১. মাতা-পিতার নিকট আপনি কখনো বসছেন না। তাদের ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন না। পারিবারিক সমস্যা নিয়ে তাদের সঙ্গে কোন আলোচনাই করছেন না এবং তাদের প্রয়োজন সম্পর্কে কিছু জানতেও চাচ্ছেন না।
২. তারা আপনার যে যে ব্যাপারে পরামর্শ দিতে পারেন সে ব্যাপারে আপনি তাদের নিকট কোন পরামর্শও চাচ্ছেন না। কারণ, কিছু কিছু ব্যাপার তো এমনো থাকতে পারে যে তারা সে ব্যাপারে আপনাকে কোন পরামর্শ দেয়ারই যোগ্যতা রাখেন না। তখনো কিন্তু আপনি সে ব্যাপারে বিজ্ঞ লোকের পরামর্শ তাদের সম্মুখে উপস্থাপন করে তাদের মতামত চাইতে পারেন। তখন অবশ্যই তারা এ পরামর্শ সমর্থন করবেন এবং আপনার উপর সন্তুষ্ট হবেন।
৩. কোথাও যাওয়ার সময় আপনি তাদের অনুমতি চাচ্ছেন না অথবা ঘর থেকে বেরনোর সময় আপনি তাদেরকে জানিয়ে বেরুচ্ছেন না।
৪. সহজভাবে তাদের যে কোন খিদমুত আঞ্জাম দেয়ার আপনার কোন সদিচ্ছাই নেই। অথচ এ ব্যাপারে তাদের নিকট অপারগতা প্রকাশ করতে আপনি খুবই তৎপর। আপনি কখনো এ কথা জানতে চাচ্ছেন না যে, তারা আমার এ অপারগতার কথা বিশ্বাস করছেন কি? নাকি আপনার অপারগতার কথা তারা প্রত্যাখ্যানই করছেন। নাকি তারা শুধু আপনার কথা শুনেই চুপ থাকলেন। আপনার উপর অসন্তুষ্টির কারণে পরিষ্কার কিছু বলছেননা। কারণ, আপনি মনে করছেন, তারা আমার অপারগতার কথা শুনেই আমার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। অথচ ব্যাপারটি অন্য রকমও হতে পারে।
৫. আপনার প্রয়োজনকেই আপনার মাতা-পিতার প্রয়োজনের উপর অগ্রাধিকার দিলেন। যেমন: আপনাকে তারা কোন কাজের আদেশ করলেন। উত্তরে আপনি বললেন: এখন আমার একটুও সময় নেই। সময় পেলেই তা করে ফেলবো।
৬. নিজকে আপনার মাতা-পিতার চাইতেও বড় মনে করলেন। তা সাধারণত হয়ে থাকে যখন আপনি সামাজিক কোন সম্মানের অধিকারী হয়ে থাকেন অথবা মাতা-পিতা অপেক্ষা আপনি বেশি নেককার। যেমন: আপনি নামায পড়ছেন অথচ আপনার মাতা-পিতা নামায পড়ছেন না। তখনই আপনার পক্ষ থেকে তাদের প্রতি অবাধ্যতা পাওয়া যাওয়া খুবই সহজ।
৭. মাতা-পিতার মধ্যে কোন অপরাধ অবলোকন করে আপনি তাদের অবাধ্য হলেন। যেমন: আপনার মাতা-পিতা খুব কঠিন মেজাজের, অত্যন্ত কৃপণ, গোঁয়ার বা একগুঁয়ে। কিন্তু আপনাকে মনে রাখতে হবে যে, শির্ক চাইতে আর বড় অপরাধ দুনিয়াতে নেই। যখন আপনার মাতা-পিতা আল্লাহ্ তা'আলার সাথে আপনাকে কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে শরীক করতে বললেও আল্লাহ্ তা'আলা আপনার মাতা-পিতার সাথে দুনিয়াতে ভালো ব্যবহার করতে আদেশ করেছেন তখন এ ছাড়া অন্য কোন অপরাধের কারণে তাদের অবাধ্য হওয়া মারাত্মক অপরাধই বটে।
৮. দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করে আপনি তাদের সঙ্গে কোন ব্যাপারে তর্ক ধরলেন। যেমনিভাবে আপনি তর্ক ধরে থাকেন আপনার সাথী-সঙ্গীদের সাথে। কারণ, আপনি তাদের সঙ্গে কোন দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে আদিষ্ট নন। বরং আপনি সর্বদা তাদের সঙ্গে নম্রতা দেখাতে একান্তভাবে বাধ্য। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا ﴾ (ইসরা/বানী ইসরাঈল : ২৩-২৪)
অর্থাৎ আপনার প্রভু এ বলে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারোর ইবাদাত করবেনা এবং মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়জন তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তুমি তাদেরকে বিরক্তি সূচক কোন শব্দ বলবেনা এবং তাদেরকে ভর্ৎসনাও করবেনা। বরং তাদের সাথে সম্মান সূচক নম্র কথা বলবে। দয়াপরবশ হয়ে তাদের প্রতি সর্বদা বিনয়ী থাকবে এবং সর্বদা তাদের জন্য এ দো'আ করবে যে, হে আমার প্রভু! আপনি তাদের প্রতি দয়া করুন যেমনিভাবে শৈশবে তারা আমার প্রতি অশেষ দয়া করে আমাকে লালন-পালন করেছেন।
তবে তারা আপনাকে কোন গুনাহ্'র আদেশ করলে আপনি তাদেরকে কোর'আন ও হাদীসের বাণী শুনিয়ে সে আদেশ থেকে বিরত রাখবেন।
৯. মাতা-পিতার পারস্পরিক ঝগড়া দেখে আপনি তাদের যে কারোর পক্ষ নিয়ে অন্যজনকে কোন অপবাদ, কটু কথা বা বিরক্তি সূচক শব্দ বললেন। এমনকি তার অবাধ্য হলেন। যেমন: আপনি আপনার মাতা-পিতার মধ্যে কোন ঝগড়া হতে দেখলেন এবং আপনি বুঝতেও পারলেন যে, আপনার পিতা এ ব্যাপারে সত্যিকারই দোষী। সুতরাং আপনি এ পরিবেশে আপনার পিতাকে কোন গাল-মন্দ করতে পারেননা এবং তার সাথে কোন কঠোরতাও দেখাতে পারেননা। যাতে আপনি তার অবাধ্য বলে বিবেচিত হবেন। বরং আপনার কাজ হবে, সূক্ষ্মভাবে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়া। তবে খেয়াল রাখবেন, মীমাংসা করতে গিয়ে আপনার পিতাকে আপনি কোন বিশ্রী শব্দ বলবেননা। যাতে তিনি আপনাকে আপনার মায়ের পক্ষপাতী বলে মনে না করেন। বরং আপনি আপনার পিতার প্রতি ভালোবাসা দেখাবেন এবং তাদের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। এরপরও আপনার পিতা হঠকারিতা দেখালে আপনি তাকে কটু বাক্য শুনাতে পারেননা এবং তার প্রতি কঠোরও হতে পারেননা।
১০. আপনি বিবাহ করার পর আপনার মাতা-পিতা থেকে ভিন্ন হয়ে গেলেন। আপনি মনে করছেন, আপনার মাতা-পিতার সঙ্গে আপনার মানসিকতার কোন মিল নেই। সুতরাং দূরে থাকাই ভালো অথবা আপনার স্ত্রী আপনাকে ভিন্ন হতে বাধ্য করেছে অথবা আপনি আপনার পরিবারের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চান অথবা আপনি মনে করছেন, ঘরে এমন লোক রয়েছে যারা তাদের খিদমতের জন্য যথেষ্ট অথবা আপনি একাকী ভালো খেতে ও ভালো পরতে চান। কারণ, আপনার এমন সঙ্গতি নেই যে, আপনি আপনার মাতা-পিতাকে নিয়ে ভালো খাবেন ও ভালো পরবেন।
আপনার ধারণাগুলো সঠিক কিনা সে বিষয়ে আলোচনা না করে আমি উক্ত ব্যাপারে আপনাকে একটি মৌলিক ধারণা দিতে চাই। তা হচ্ছে এই যে, এ ব্যাপারে আপনাকে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে:
ক. তাদের থেকে ভিন্ন হওয়ার জন্য সর্বপ্রথম আপনাকে তাদের অনুমতি চাইতে হবে। তারা আপনাকে ভিন্ন হওয়ার মৌখিক অনুমতি দিলেও আপনাকে এ ব্যাপারে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে, তারা অনুমতিটুকু সুস্পষ্ট ভাষায় ও সন্তুষ্ট চিত্তে দিচ্ছেন কিনা? নাকি এমনিতেই দিচ্ছেন।
খ. তাদের খিদমতের জন্য পছন্দসই যথেষ্ট লোক থাকতে হবে। সুতরাং ঘরের মধ্যে যদি তাদের খিদমতের জন্য কোন লোক না থাকে অথবা তারা আপনার ও আপনার স্ত্রীর খিদমতের মুখাপেক্ষী হন তাহলে এমতাবস্থায় আপনার জন্য ভিন্ন হওয়া জায়িয হবে না। যদিও তারা আপনাকে এ ব্যাপারে মৌখিক অনুমতি দিয়ে থাকে। কারণ, সে অনুমতি কখনো সন্তুষ্ট চিত্তে হবে না।
গ. তাদেরকে সর্বদা প্রয়োজনীয় খরচাদি দিতে হবে। আপনি যেখানেই থাকুননা কেন।
১১. তারা আপনাকে কোন সংবাদ জিজ্ঞাসা করছেন। অথচ আপনি এ ব্যাপারে তাদেরকে কোন উত্তরই দিচ্ছেন না। যেমন: আপনি কোন ব্যাপারে খুশি হয়েছেন অথবা নাখোশ। তখন এ ব্যাপারে আপনার মাতা-পিতা জানতে চাইলেন। অথচ আপনি কিছুই বলছেননা।
১২. আপনি কারোর মাতা-পিতাকে গালি দিলেন। অতঃপর সেও আপনার মাতা-পিতাকে গালি দিয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! وَ كَيْفَ يَلْعَنُ الرَّجُلُ وَالدَيْهِ؟ قَالَ: يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُل فَيَسُبُّ أَبَاهُ ، وَ يَسُبُّ أُمَّهُ فَيَسُبُّ أُمَّهُ (বুখারী, হাদীস ৫৯৭৩ মুসলিম, হাদীস ৯০)
অর্থাৎ সর্ববৃহৎ অপরাধ হচ্ছে নিজ মাতা-পিতাকে লা'নত করা। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহ্'র রাসূল! মানুষ কিভাবে নিজ মাতা-পিতাকে লা'নত করতে পারে? তিনি বললেন: তা এভাবেই সম্ভব যে, সে কারোর মাতা- পিতাকে গালি দিলো। অতঃপর সে ব্যক্তি এর মাতা-পিতাকে গালি দিলো।
📄 মাতা-পিতার অবাধ্যতার কারণ সমূহ
১. সন্তান কখনো এমন মনে করে যে, আমার মাতা-পিতার এ আদেশটি মানার চাইতে অন্য কোন নেক আমল করা অনেক ভালো। যেমন: তার পিতা তাকে বলেছেন: অমুক বস্তুটি বাজার থেকে নিয়ে আসো। তখন দেখা যাচ্ছে, তার মন তা করতে চাচ্ছেনা। কারণ, সে মনে করছে, কোর'আন হিফজ অথবা ধর্মীয় বিষয়ের কোন ক্লাসে বসা তার জন্য এর চাইতেও অনেক বেশি সাওয়াবের।
তার এ কথা জানা উচিৎ যে, তার নেক আমলটি তো আর জিহাদ চাইতে উত্তম নয়। অথচ রাসূল মাতা-পিতার খিদমতকে হিজরত ও জিহাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন:
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর বিন্ ‘আস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
أَقْبَلَ رَجُلٌ إِلَى نَبِيِّ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ: أَبَايِعُكَ عَلَى الْهِجْرَةِ وَ الْجِهَادِ ، أَبْتَغِيُّ الْأَجْرَ مِنَ اللَّهِ، قَالَ: فَهَلْ مِنْ وَالِدَيْكَ أَحَدٌ حَيٌّ؟ قَالَ: نَعَمْ، بَلْ كِلَاهُمَا، قَالَ: فَتَبْتَغِي الْأَجْرَ مِنَ اللَّهِ؟ قَالَ: نَعَمْ ، قَالَ : فَارْجِعْ إِلَى وَالِدَيْكَ فَأَحْسِنْ صُحْبَتَهُمَا (মুসলিম, হাদীস ২৫৪৯)
অর্থাৎ আল্লাহ্'র নবীর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বললো: আমি সাওয়াবের আশায় আপনার নিকট হিজরত ও জিহাদের বায়'আত করতে চাই। নবী ﷺ বললেন: তোমার মাতা-পিতার কোন একজন বেঁচে আছে কি? সে বললো: জি, উভয় জনই বেঁচে আছেন। নবী ﷺ বললেন: তুমি কি সত্যিই সাওয়াব চাও? সে বললো: জি। তিনি বললেন: অতএব তুমি তোমার মাতা-পিতার নিকট চলে যাও। তাদের সঙ্গে সদাচরণ করো।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
سَأَلْتُ النَّبِيَّ ﷺ : أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ؟ قَالَ: الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا ، قَالَ : ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: بِرُّ الْوَالِدَيْنِ ، قَالَ : ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ (বুখারী, হাদীস ৫৯৭০)
অর্থাৎ আমি নবী ﷺ কে জিজ্ঞাসা করেছি, কোন আমল আল্লাহ্ তা'আলার নিকট অধিক প্রিয়? তিনি বললেন: সময় মতো নামায পড়া। বর্ণনাকারী বলেন: আমি বললাম: অতঃপর। তিনি বললেন: মাতা-পিতার সঙ্গে সদাচরণ। আমি বললাম: অতঃপর। তিনি বললেন: আল্লাহ্'র পথে জিহাদ করা।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর বিন্ ‘আস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন:
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ ، فَقَالَ: جِنْتُ أَبَايِعُكَ عَلَى الْهِجْرَةِ ، وَتَرَكْتُ أَبَوَيْ يَبْكِيَانِ ، فَقَالَ: ارْجِعْ عَلَيْهِمَا ، فَأَضْحِكْهُمَا كَمَا أَبْكَيْتَهُمَا (আবু দাউদ, হাদীস ২৫২৮)
অর্থাৎ জনৈক ব্যক্তি রাসূলের নিকট এসে বললো: আমার মাতা-পিতাকে কাঁদিয়ে আমি আপনার নিকট হিজ্জতের বায়'আত করতে এসেছি। তখন রাসূল বললেন: তাদের নিকট ফিরে যাও। তাদেরকে হাসাও যেমনিভাবে তাদেরকে কাঁদিয়েছো।
হযরত মু'আবিয়া বিন্ জা'হিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমার পিতা জা'হিমা নবী এর নিকট এসে বললেন:
أَرَدْتُ أَنْ أَغْرُوَ، وَ قَدْ جِئْتُ أَسْتَشِيْرُكَ ، فَقَالَ النَّبِيُّ : هَلْ لَكَ مِنْ أُمِّ؟ قَالَ: نَعَمْ ، قَالَ : فَالْزَمْهَا ، فَإِنَّ الْجَنَّةَ عِنْدَ رِجْلَيْهَا (সাহীহল্ জা'মি': ১/৩৯৫)
অর্থাৎ আমি আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাচ্ছি। এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি? নবী বললেন: তোমার মা জীবিত আছেন? সে বললো: হাঁ। নবী বললেন: তাঁর খিদমতে লেগে যাও। কারণ, নিশ্চয়ই জান্নাত তাঁর পায়ের কাছে। অর্থাৎ তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই জান্নাত পাবে।
২. সন্তান কোন একটি নফল নেক আমল করতে যাচ্ছে এবং তা করতে গেলে তার মাতা-পিতার খিদমতে সমস্যা দেখা দিবে সত্যিই কিংবা সে আমল করতে তাকে বহু দূর যেতে হবে। তবুও সে তা করতে গিয়ে মাতা-পিতার অনুমতি নিচ্ছে না অথবা তাদেরকে এ ব্যাপারটি জানিয়েও যাচ্ছে না। কারণ, সে মনে করছে, যে কোন নেক আমল করতে মাতা-পিতার অনুমতি নিতে হয় না। অথচ এ মানসিকতা একেবারেই ভুল। কারণ, রাসূল জনৈক সাহাবীকে জিহাদ করার জন্য মাতা-পিতার অনুমতি নিতে আদেশ করেন। তা হলে অন্য যে কোন নফল নেক আমলের জন্য তাদের অনুমতি চাওয়া তো আবশ্যকই বটে। বিশেষ করে যখন তার অনুপস্থিতিতে তাদের খিদমতে সমস্যা দেখা দেওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা থাকে।
সুতরাং যে আমল করতে বহু দূর যেতে হয় না অথবা তা করতে গেলে মাতা-পিতার খিদমতে কোন ত্রুটি হয় না এমন আমল করার জন্য মাতা-পিতার অনুমতি আবশ্যক নয়। বরং এ সকল ক্ষেত্রে তাদের সন্তষ্টি অর্জনের জন্য তাদেরকে জানিয়ে যাবে মাত্র। অতএব সৌদী আরবে অবস্থানরত কোন প্রবাসীকে হজ্জ বা ‘উমরাহ্ করার জন্য মাতা-পিতার অনুমতি নিতে হবে না। হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
هَاجَرَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ مِنَ الْيَمَنِ، فَقَالَ : هَلْ لَكَ أَحَدٌ بِالْيَمَنِ؟ قَالَ: أَبَوَايَ، قَالَ: أَذِنَا لَكَ؟ قَالَ : لا ، قَالَ: ارْجِعْ إِلَيْهِمَا فَاسْتَأْذِنْهُمَا، فَإِنْ أَذِنَا لَكَ فَجَاهِدْ ، وَ إِلَّا فَبَرَّهُمَا (আবু দাউদ, হাদীস ২৫৩০)
অর্থাৎ জনৈক ব্যক্তি ইয়েমেন থেকে হিজরত করে রাসূল এর নিকট আসলো। রাসূল তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: ইয়েমেনে তোমার কেউ আছে? সে বললো: সেখানে আমার মাতা-পিতা রয়েছেন। রাসূল বললেন: তারা তোমাকে হিজরত করার অনুমতি দিয়েছে কি? সে বললো: না। তিনি বললেন: তুমি তাদের নিকট গিয়ে অনুমতি চাও। তারা অনুমতি দিলে যুদ্ধ করবে। নতুবা তাদের নিকট থেকেই তাদের সঙ্গে সদাচরণ করবে।
৩. সাধারণত ক্লাসের শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে এ ব্যাপারে কমই নসীহত করে থাকেন। তারা এ ব্যাপারে কম গুরুত্ব দেয়ার কারণেই মাতা-পিতার অবাধ্যতা বেড়েই চলছে।
৪. অন্যন্য ব্যাপারে যেমন প্রচুর বাস্তব নমুনা পাওয়া যায় তেমনিভাবে মাতা-পিতার বাধ্যতার ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ছোটরা বড়দের কাছ থেকে এ ব্যাপারে অনুকরণীয় জ্বলন্ত আদর্শ খুঁজে না পাওয়ার দরুন হাতে-কলমে কার্যকরী শিক্ষা পাচ্ছে না।
৫. আদতেই মাতা-পিতারা নেককার সন্তানকে যে কোন কাজের জন্য বেশি বেশি আদেশ করেন। যা বদকার ছেলেকে করেন না। কিন্তু এতে করে অনেক নেককার ছেলের মধ্যে এ ভুল মনোভাব জন্ম নেয় যে, আমার মাতা-পিতা ওকে খুব ভালোবাসে। অথচ ব্যাপারটা এমন নয়। বরং তাঁরা আপনাকে বেশি ভালোবাসার দরুনই বার বার কাজের ফরমায়েশ করছেন। কারণ, তারা জানেন, আপনি ভালো হওয়ার দরুন ওদের সকল ফরমায়েশ আপনি ঠিক ঠিক মানবেন। এর বিপরীতে অন্য জন এমন নয়। তাই আপনি ওদের একমাত্র নেক সন্তান হিসেবে অন্যদের পক্ষের ঘাটতিটুকু আপনারই পূরণ করা উচিৎ।
৬. সন্তানের মধ্যে আল্লাহ্'র ভয় না থাকা অথবা মাতা-পিতার অনুগ্রহের কথা অস্বীকার করা।
৭. পিতা-মাতা সন্তানকে ছোট থেকেই এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ না দেয়া অথবা সন্তান নেককার হওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে দো'আ না করা।
৮. পিতা-মাতা তাদের পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। তবে তা তাদের সন্তান তাদের সঙ্গে দূরাচার করা জায়িয করে দেয়না। কারণ, তারা পাপ করলে আপনিও পাপ করবেন কি? আপনি তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করলে আপনার সন্তানরাও আপনার সঙ্গে তেমন আচরণ করবে।
৯. অনেক মাতা-পিতা সন্তানদেরকে কিছু দেয়ার ব্যাপারে সমতা বজায় রাখে না। যদ্দরুন যে কম পাচ্ছে সে নিজকে মাযলুম তথা অত্যাচারিত মনে করে। তখন সে মাতা-পিতার অবাধ্য হতে উদ্ধত হয়।
১০. অনেক মাতা-পিতা কোন সন্তান তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার পরও তাকে ভুল বুঝে থাকে অথবা তার উপর যুলুম করে অথবা তারা তার কাছ থেকে এমন কিছু চায় যা তার পক্ষে দেয়া সম্ভবপর নয়। এমতাবস্থায় সন্তানটি তাদের সাথে আর ভালো ব্যবহার করতে চায় না। এমন করা ঠিক নয়। বরং আপনি ধৈর্যের সঙ্গে সাওয়াবের নিয়্যাতে তাদের খিদমত করে যাবেন।