📄 নামাযের মধ্যে ধীরস্থীরভাবে রুকু', সিজদাহ্ বা অন্যান্য রুকন আদায় না করা
নামাযের মধ্যে ধীরস্থিরভাবে রুকূ', সিজদাহ্ বা অন্যান্য রুকন আদায় না করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্ ও হারাম।
হযরত আবু আব্দুল্লাহ্ আশ্আরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল নামায শেষে কিছু সংখ্যক সাহাবাদেরকে নিয়ে মসজিদেই বসেছিলেন এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি মসজিদে ঢুকে নামায পড়তে শুরু করলো। সে রুকু ও সিজদাহ্ ঠিকভাবে করছিলো না। তখন তিনি সাহাবাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
أَتَرَوْنَ هَذَا ؟ مَنْ مَاتَ عَلَى هَذَا مَاتَ عَلَى غَيْرِ مِلَّةِ مُحَمَّدٍ ، يَنْقُرُ صَلَاتَهُ كَمَا يَنْقُرُ الْغُرَابُ الدَّمَ (ইব্বু খুযাইমাহ ১/৩৩২)
অর্থাৎ তোমরা একে দেখতে পাচ্ছো। কোন ব্যক্তি এভাবে নামায পড়তে পড়তে মৃত্যু বরণ করলে ইসলামের উপর তার মৃত্যু হবে না। সে নামায পড়ছে যেন কোন কাক রক্তের উপর ঠোকর মারছে। রাসূল আরো বলেন:
لَا تُجْزِئُ صَلَاةٌ لَا يُقِيمُ الرَّجُلُ فِيْهَا صُلْبَهُ فِي الرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ (ইব্বু খুযাইমাহ ১/৩৩২)
অর্থাৎ ওই ব্যক্তির নামায হবে না যে রুকু' ও সিজদায় নিজ পিঠকে সোজা রাখে না। রাসূল আরো বলেন:
أَسْوَأُ النَّاسِ سَرِقَةُ الَّذِي يَسْرِقُ مِنْ صَلَاتِهِ ، قَالُوا : يَا رَسُوْلَ اللهِ وَكَيْفَ يَسْرِقُ مِنْ صَلَاتِهِ ؟ قَالَ: لَا يُتِمُّ رُكُوْعَهَا وَ لَا سُجُوْدَهَا (স'হীহল জা'মি', হাদীস ৯৯৭)
অর্থাৎ সর্ব নিকৃষ্ট চোর সে ব্যক্তি যে নামায চুরি করে। সাহাবারা বললেন: হে আল্লাহ্'র রাসূল! সে আবার নামায চুরি করে কিভাবে? রাসূল বললেন: সে রুকু' ও সিজদাহ্ সঠিকভাবে আদায় করে না।
📄 নামাযের কোন রুকন ইমামের আগে আদায় করা
নামাযের কোন রুকন ইমামের আগে আদায় করা আরেকটি হারাম কাজ ও কবীরা গুনাহ্। রাসূল বলেন:
أَمَا يَخْشَى الَّذِي يَرْفَعُ رَأْسَهُ قَبْلَ الإِمَامِ أَنْ يُحَوِّلَ اللَّهُ رَأْسَهُ رَأْسَ حِمَارٍ أَوْ يُحَوِّلَ صُوْرَتَهُ صُوْرَةَ حِمَارٍ (বুখারী, হাদীস ৬৯১ মুসলিম, হাদীস ৪২৭ আবু দাউদ, হাদীস ৬২৩)
অর্থাৎ ওই ব্যক্তি কি ভয় পাচ্ছে না যে ইমাম সাহেবের পূর্বেই রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে নেয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার মাথাকে গাধার মাথায় রূপান্তরিত করবেন অথবা তার গঠনকে গাধার গঠনে পরিণত করবেন। তিনি আরো বলেন:
لَا تَسْبِقُونِي بِالرُّكُوعِ وَ لَا بِالسُّجُودِ وَ لَا بِالْقِيَامِ وَ لَا بِالْقُعُوْدِ وَ لَا بِالْإِنْصِرَافِ (মুসলিম, হাদীস ৪২৬)
অর্থাৎ তোমরা আমার আগে রুকু, সিজদাহ, উঠা, বসা ও সালাম আদায় করবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ও হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) কোন রুকন আদায়ে ইমামের অগ্রবর্তীকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
لَا وَحْدَكَ صَلَّيْتَ وَ لَا بِإِمَامَكَ اقْتَدَيْتَ (রিসালাতুল ইমাম আহমাদ)
অর্থাৎ (তোমার নামাযই হয়নি) না তুমি একা পড়লে না ইমাম সাহেবের সাথে পড়লে।
যে কোন কাজ ইমাম সাহেবের একটু পরেই করতে হবে। অর্থাৎ ইমাম সাহেব যখন তাকবীর দিয়ে পুরোপুরি রুকুতে চলে যাবেন তখন মুক্তাদিগণ রুকু করতে অগ্রসর হবেন। তেমনিভাবে ইমাম সাহেব যখন তাকবীর দিয়ে সিজদার জন্য জমিনে কপাল ঠেকাবেন তখনই মুক্তাদিগণ তাকবীর দিয়ে সিজদায় যাবেন। ইমাম সাহেবের আগে, বহু পরে ও সমানতালে কোন রুকন আদায় করা যাবে না। রাসূল বলেন:
الإِمَامُ يَرْكَعُ قَبْلَكُمْ وَ يَرْفَعُ قَبْلَكُمْ (মুসলিম, হাদীস ৪০৪ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১৫৯৩)
অর্থাৎ ইমাম সাহেব তোমাদের আগেই রুকু করবেন এবং তোমাদের আগেই রুকু থেকে মাথা উঠাবেন। রাসূল আরো বলেন:
إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ ، فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا وَ لَا تُكَبِّرُوا حَتَّى يُكَبِّرَ ، وَ إِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوْا وَ لَا تَرْكَعُوْا حَتَّى يَرْكَعَ (বুখারী, হাদীস ৩৭৮, ৮০৫, ১১১৪ মুসলিম, হাদীস ৪১৪, ৪১৭ আবু দাউদ, হাদীস ৬০৩)
অর্থাৎ ইমাম সাহেব হচ্ছেন অনুসরণীয়। তাই তিনি তাকবীর সমাপ্ত করলে তোমরা তাকবীর বলবে। তোমরা কখনো তাকবীর বলবে না যতক্ষণ না তিনি তাকবীর বলেন। তিনি রুকুতে চলে গেলেই তোমরা রুকু শুরু করবে। তোমরা রুকু করবে না যতক্ষণ না তিনি রুকু করেন।
তিনি আরো বলেন:
إِذَا كَبَّرَ الإِمَامُ فَكَبِّرُوا وَ إِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوْا وَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ وَ قَالَ: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ فَارْفَعُوْا وَ قُوْلُوْا رَبَّنَا وَ لَكَ الْحَمْدُ وَ إِذَا سَجَدَ فَاسْجُدُوا (বুখারী, হাদীস ৭২২, ৭৩৪, ৮০৫ মুসলিম, হাদীস ৪১৪)
অর্থাৎ যখন ইমাম সাহেব তাকবীর সমাপ্ত করবেন তখন তোমরা তাকবীর বলবে। আর যখন তিনি রুকুতে চলে যাবেন তখন তোমরা রুকু শুরু করবে। আর যখন তিনি রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে "সামি'আল্লাহু লিমান্ হামিদাহ্" বলবেন তখন তোমরা রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে “রাব্বানা ওয়া লাকাল্ হাম্দ” বলবে। আর যখন তিনি সিজদায় যাবেন তখন তোমরা সিজদাহ শুরু করবে। হযরত বারা বিন ‘আযিব থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ إِذَا الْحَطَّ لِلسُّجُودِ لَا يَحْنِي أَحَدٌ ظَهْرَهُ حَتَّى يَضَعَ النَّبِيُّ ﷺ جَبْهَتَهُ عَلَى الْأَرْضِ (বুখারী, হাদীস ৬৯০, ৮১১ মুসলিম, হাদীস ৪৭৪ আবু দাউদ, হাদীস ৬২১)
অর্থাৎ নবী যখন সিজদাহর জন্যে ঝুঁকে পড়তেন আমাদের কেউ নিজ পৃষ্ঠদেশ বাঁকা করতো না যতক্ষণ না নবী নিজ কপাল জমিনে রাখতেন।
📄 আযানের পর কোন ওযর ছাড়া একা নামায পড়ার উদ্দেশ্যে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়া
আযানের পর কোন ওযর ছাড়া জামাতে নামায না পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়া আরেকটি হারাম কাজ। হযরত আবুশা'সা' (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كُنَّا قُعُودًا فِي الْمَسْجِدِ مَعَ أَبِي هُرَيْرَةَ له ، فَأَذَّنَ الْمُؤَذِّنُ ، فَقَامَ رَجُلٌ مِنَ الْمَسْجِدِ يَمْشِي ، فَأَتْبَعَهُ أَبُو هُرَيْرَةَ بَصَرَهُ حَتَّى خَرَجَ مِنَ الْمَسْجِدِ ، فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ : أَمَّا هَذَا فَقَدْ عَصَى أَبَا الْقَاسِمِ (মুসলিম ৫/১৬২)
অর্থাৎ আমরা একদা হযরত আবু হুরাইরাহ্ এর সাথে মসজিদে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় মুআযযিন আযান দিলো। তখন জনৈক ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো। হযরত আবু হুরাইরাহ্ তার দিকে অপলক তাকিয়েই থাকলেন যতক্ষণ না সে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলো। তখন হযরত আবু হুরাইরাহ্ বললেন: এ তো রাসূল এর বিরুদ্ধাচরণ করলো। রাসূল ইরশাদ করেন:
إِذَا أَذَّنَ الْمُؤَذِّنُ فَلَا يَخْرُجْ أَحَدٌ حَتَّى يُصَلِّيَ (স'হীহল্ জা'মি', হাদীস ২৯৭)
অর্থাৎ যখন মুআযযিন আযান দিবে তখন তোমাদের কেউ (মসজিদ থেকে) বের হবে না যতক্ষণ না সে (উক্ত মসজিদে) নামায পড়ে নেয়।
📄 সন্দেহের দিনে রামায়ানের রোযা রাখা
সন্দেহের দিনে রামাযানের রোযা রাখা আরেকটি হারাম কাজ। হযরত ‘আম্মার বিন্ ইয়াসির থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ صَامَ الْيَوْمَ الَّذِي يَسُكُ فِيهِ النَّاسُ فَقَدْ عَصَى أَبَا الْقَاسِمِ (তিরমিযী, হাদীস ৬৮৬ আবু দাউদ, হাদীস ২৩৩৪ ইবনু মাজাহ, হাদীস ১৬৬৮)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি এমন দিনে রামাযানের রোযা রাখলো যে দিন রামাযানের প্রথম দিন হওয়া সম্পর্কে মানুষের সন্দেহ রয়েছে তা হলে সে সত্যিই রাসূল এর বিরুদ্ধাচরণ করলো।
শা'বানের ত্রিশতম দিন রামাযানের প্রথম দিন হওয়া সম্পর্কে সন্দেহ দেখা দিলে শা'বান মাস পুরা করাই রাসূল এর আদর্শ।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
الشَّهْرُ تِسْع وَ عِشْرُوْنَ لَيْلَةً ، فَلَا تَصُوْمُوا حَتَّى تَرََوْهُ ، فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِيْنَ (বুখারী, হাদীস ১৯০৭)
অর্থাৎ আরবী মাস উনত্রিশ দিনেরও হতে পারে। তাই তোমরা রোযা রাখবে না যতক্ষণ না নতুন মাসের চাঁদ দেখবে। তবে আকাশে মেঘ থাকলে শা'বান মাস ত্রিশ দিন পুরা করবে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
صُوْمُوا لِرُؤْيَتِهِ وَ أَفْطِرُوْا لِرُؤْيَتِهِ ، فَإِنْ غُبِّيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوْا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلَاثِينَ (বুখারী, হাদীস ১৯০৯)
অর্থাৎ তোমরা রামাযানের চাঁদ দেখলেই রোযা রাখবে এবং ঈদের চাঁদ দেখলেই রোযা ছাড়বে। তবে আকাশে মেঘ থাকলে শা'বান মাস ত্রিশ দিন পুরা করবে।