📄 আল্লাহ্ তা'আলার দয়া কিংবা অনুগ্রহ অস্বীকার তথা নিজ সম্পদ থেকে গরীবদের অধিকার আদায়ে অনীহা প্রকাশ করা
আল্লাহ্ তা'আলার দয়া কিংবা অনুগ্রহ অস্বীকার তথা নিজ সম্পদ থেকে গরীবের অধিকার আদায়ে অনীহা প্রকাশ করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্ ও হারাম।
আল্লাহ্ তা'আলা বনী ইস্রাঈলের কয়েকজন ব্যক্তিকে অঢেল সম্পদ দিয়ে পুনরায় তাদেরকে ফিরিস্তার মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। তাদের অধিকাংশই তা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার একান্ত অনুগ্রহ নয় বলে তাঁর নিয়ামত অস্বীকার করতঃ তা তাদের বাপ-দাদার সম্পদ বলে দাবি করলে আল্লাহ্ তা'আলা তাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেন। আর যারা তা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহ বলে স্বীকার করলো তাদের উপর তিনি সন্তুষ্ট হন এবং তাদের সম্পদ আরো বাড়িয়ে দেন।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন:
إِنَّ ثَلَاثَةٌ فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ : أَبْرَصَ وَ أَقْرَعَ وَ أَعْمَى ، أَرَادَ اللَّهُ أَنْ يَبْتَلِيَهُمْ ، فَبَعَثَ إِلَيْهِمْ مَلَكاً ، فَأَتَى الأَبْرَصَ فَقَالَ: أَيُّ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: لَوْنٌ حَسَنٌ وَ جِلْدٌ حَسَنٌ وَ يَذْهَبَ عَنِّي الَّذِي قَدْ قَدَرَنِي النَّاسُ ، قَالَ: فَمَسَحَهُ فَذَهَبَ عَنْهُ قَذَرُهُ وَ أُعْطِيَ لَوْناً حَسَناً وَ جِلْداً حَسَناً ، قَالَ: فَأَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: الإِبلُ ، أَوْ قَالَ: الْبَقَرُ - شَكٍّ إِسْحَاقَ - إِلَّا أَنَّ الْأَبْرَصَ أَوِ الْأَقْرَعَ قَالَ أَحَدُهُمَا: الإِبلُ وَ قَالَ الآخَرُ : الْبَقَرُ ، قَالَ : فَأُعْطِيَ نَاقَةً عُشَرَاءَ ، فَقَالَ: بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِيْهَا، قَالَ: فَأَتَى الْأَقْرَعَ فَقَالَ: أَيُّ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: شَعْرٌ حَسَنٌ وَ يَذْهَبَ عَنِّي هَذَا الَّذِي قَدْ قَذِرَنِي النَّاسُ، قَالَ: فَمَسَحَهُ فَذَهَبَ عَنْهُ وَ أُعْطِيَ شَعْراً
حَسَناً، قَالَ: فَأَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: الْبَقَرُ ، فَأُعْطِيَ بَقَرَةً حَامِلاً ، فَقَالَ: بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِيْهَا ، قَالَ : فَأَتَى الأَعْمَى فَقَالَ : أَيُّ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: أَنْ يَرُدَّ اللَّهُ إِلَيَّ بَصَرِي فَأَبْصِرَ بِهِ النَّاسَ ، قَالَ: فَمَسَحَهُ فَرَدَّ اللَّهُ إِلَيْهِ بَصَرَهُ ، قَالَ: فَأَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ : الْغَنَمُ ، فَأُعْطِيَ شَاةً وَالداً ، فَأَنْتَجَ هَذَانِ وَ وَلَدَ هَذَا ، قَالَ: فَكَانَ لِهَذَا وَادٍ مِنَ الإِبْلِ وَ لِهَذَا وَادٍ مِنَ الْبَقَرِ وَ لِهَذَا وَادٍ مِنَ الْغَنَمِ. قَالَ: ثُمَّ إِنَّهُ أَتَى الأَبْرَصَ فِي صُورَتِهِ وَ هَيْئَتِهِ ، فَقَالَ: رَجُلٌ مِسْكِينَ ، قَدِ القَطَعَتْ بِيْ الْجِبَالُ فِي سَفَرِي ، فَلَا بَلاغَ لِي الْيَوْمَ إِلَّا بِاللهِ ثُمَّ بِكَ ، أَسْأَلُكَ بِالَّذِي أَعْطَاكَ اللَّوْنَ الْحَسَنَ وَ الْجِلْدَ الْحَسَنَ وَ الْمَالَ بَعِيْراً أَتَبَلِّغُ عَلَيْهِ فِي سَفَرِي ، فَقَالَ: الْحُقُوقُ كَثِيرَةٌ ، فَقَالَ لَهُ: كَأَنِّي أَعْرِفُكَ ، أَلَمْ تَكُنْ أَبْرَصَ يَقْذَرُكَ النَّاسُ؟ فَقِيْراً فَأَعْطَاكَ اللَّهُ؟ فَقَالَ: إِنَّمَا وَرِثْتُ هَذَا الْمَالَ كَابِراً عَنْ كَابِرٍ ، فَقَالَ: إِنْ كُنْتَ كَاذِبًا فَصَيَّرَكَ اللَّهُ إِلَى مَا كُنْتُ، قَالَ: وَ أَتَى الْأَقْرَعَ فِي صُوْرَتِهِ ، فَقَالَ لَهُ مِثْلَ مَا قَالَ لِهَذَا، وَ رَدَّ عَلَيْهِ مِثْلَ مَا رَدَّ عَلَى هَذَا ، فَقَالَ: إِنْ كُنْتَ كَاذِبًا فَصَيَّرَكَ اللَّهُ إِلَى مَا كُنْتَ. قَالَ: وَ أَتَى الأَعْمَى فِي صُورَتِهِ وَ هَيْئَتِهِ ، فَقَالَ: رَجُلٌ مِسْكِينٌ وَابْنُ سَبِيْلِ القَطَعَتْ بِي الْجِبَالُ فِي سَفَرِي ، فَلَا بَلاغَ لِي الْيَوْمَ إِلَّا بِاللَّهِ ثُمَّ بِكَ، أَسْأَلُكَ بِالَّذِي رَدَّ عَلَيْكَ بَصَرَكَ ، شَاةً أَتَبَلِّغُ بِهَا فِي سَفَرِي ، فَقَالَ: قَدْ كُنْتُ أَعْمَى فَرَدَّ اللَّهُ إِلَيَّ بَصَرِي ، فَخُذْ مَا شِئْتَ وَ دَعْ مَا شِئْتَ ، فَوَاللَّهِ لَا أَجْهَدُكَ الْيَوْمَ شَيْئًا أَخَذْتُهُ لِلَّهِ ، فَقَالَ: أَمْسِكْ مَالَكَ ، فَإِنَّمَا ابْتُلِيْتُمْ ، فَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْكَ وَ سَخِطَ عَلَى صَاحِبَيْكَ (বুখারী, হাদীস ৩৪৬৪, ৬৬৫৩ মুসলিম, হাদীস ২৯৬৪)
অর্থাৎ বনী ইস্রাঈলের তিন ব্যক্তি শ্বেতী রোগী, টাক মাথা ও অন্ধের নিকট আল্লাহ্ তা'আলা জনৈক ফিরিস্তা পাঠিয়েছেন তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে। ফিরিস্তাটি শ্বেতী রোগীর নিকট এসে বললেন: তোমার নিকট কোন্ বস্তুটি অধিক পছন্দনীয়? সে বললো: আমার নিকট পছন্দনীয় বস্তু হচ্ছে সুন্দর রং ও মনোরম চামড়া এবং আমার এ রোগটি যেন ভালো হয়ে যায়, যার কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। তৎক্ষণাৎ ফিরিস্তাটি তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে তার কদর্যতা দূর হয়ে যায় এবং তাকে সুন্দর রং ও মনোরম চামড়া দেয়া হয়। আবারো ফিরিস্তাটি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: কোন্ ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক পছন্দনীয়? উত্তরে সে বললো: উট অথবা গরু। শ্বেতি রোগী অথবা টাক মাথার যে কোন এক জন উট চেয়েছে আর অন্য জন গাভী। বর্ণনাকারী ইস্হাক এ ব্যাপারে সন্দেহ করেছেন। যা হোক তাকে দশ মাসের গর্ভবতী একটি উষ্ট্রী দেয়া হলো এবং ফিরিস্তাটি তার জন্য দো'আ করলেন: আল্লাহ্ তা'আলা তোমার এ উষ্ট্রীর মধ্যে বরকত দিক!
এরপর ফিরিস্তাটি টাক মাথা লোকটির নিকট এসে বললেন: তোমার নিকট কোন্ বস্তুটি অধিক পছন্দনীয়? সে বললো: আমার নিকট পছন্দনীয় বস্তু হচ্ছে সুন্দর চুল এবং আমার এ রোগটি যেন ভালো হয়ে যায়, যার কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। তৎক্ষণাৎ ফিরিস্তাটি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে তার কদর্যতা দূর হয়ে যায় এবং তাকে সুন্দর চুল দেয়া হয়। আবারো ফিরিস্তাটি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: কোন্ ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক পছন্দনীয়? উত্তরে সে বললো: গাভী। অতএব তাকে গর্ভবতী একটি গাভী দেয়া হলো এবং ফিরিস্তাটি তার জন্য দো'আ করলেন: আল্লাহ্ তা'আলা তোমার এ গাভীর মধ্যে বরকত দিক!
এরপর ফিরিস্তাটি অন্ধ লোকটির নিকট এসে বললেন: তোমার নিকট কোন্ বস্তুটি অধিক পছন্দনীয়? সে বললো: আমার নিকট পছন্দনীয় বস্তু হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলা যেন আমার চক্ষুটি ফিরিয়ে দেয়। যাতে আমি মানুষ জন দেখতে পাই। তৎক্ষণাৎ ফিরিস্তাটি তার চোখে হাত বুলিয়ে দিলে আল্লাহ্ তা'আলা তার চক্ষুটি ফিরিয়ে দেন। আবারো ফিরিস্তাটি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: কোন্ ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক পছন্দনীয়? উত্তরে সে বললো: ছাগল। অতএব তাকে গর্ভবতী একটি ছাগী দেয়া হলো। অতঃপর প্রত্যেকের উষ্ট্রী, গাভী ও ছাগী বাচ্চা দিতে থাকে। এতে করে কিছু দিনের মধ্যেই প্রত্যেকের উট, গরু ও ছাগলে এক এক উপত্যকা ভরে যায়।
আরো কিছু দিন পর ফিরিস্তাটি শ্বেতী রোগীর নিকট পূর্ব বেশে উপস্থিত হয়ে বললেন: আমি এক জন গরিব মানুষ। আমার পথ খরচা একেবারেই শেষ। এখন এক আল্লাহ্ অতঃপর তুমি ছাড়া আমার কোন উপায় নেই। তাই আমি আল্লাহ্ তা'আলার দোহাই দিয়ে তোমার নিকট একটি উট চাচ্ছি যিনি তোমাকে সুন্দর রং, মনোরম চামড়া ও সম্পদ দিয়েছেন যাতে আমার পথ চলা সহজ হয়ে যায়। উত্তরে সে বললো: দায়িত্ব অনেক বেশি। তোমাকে কিছু দেয়া এখন আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়। ফিরিস্তাটি তাকে বললেন: তোমাকে চেনা চেনা মনে হয়। তুমি কি শ্বেতী রোগী ছিলে না? মানুষ তোমাকে ঘৃণা করতো। তুমি কি দরিদ্র ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন। সে বললো: না, আমি কখনো গরিব ছিলাম না। এ সম্পদগুলো আমি বংশ পরম্পরায় উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। অতঃপর ফিরিস্তাটি বললেন: তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তবে আল্লাহ্ তা'আলা যেন তোমাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেন।
অনুরূপভাবে ফিরিস্তাটি টাক মাথার নিকট পূর্ব বেশে উপস্থিত হয়ে তার সঙ্গে সে জাতীয় কথাই বললেন যা বলেছেন শ্বেতী রোগীর সঙ্গে এবং সেও সে উত্তর দিলো যা দিয়েছে শ্বেতী রোগী। অতঃপর ফিরিস্তাটি বললেন: তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তবে আল্লাহ্ তা'আলা যেন তোমাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেন।
তেমনিভাবে ফিরিস্তাটি অন্ধের নিকট পূর্ব বেশে উপস্থিত হয়ে বললেন: আমি দরিদ্র মুসাফির মানুষ। আমার পথ খরচা একেবারেই শেষ। এখন এক আল্লাহ্ অতঃপর তুমি ছাড়া আমার কোন উপায় নেই। তাই আমি আল্লাহ্ তা'আলার দোহাই দিয়ে তোমার নিকট একটি ছাগল চাচ্ছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন যাতে আমার পথ চলা সহজ হয়ে যায়। উত্তরে সে বললো: আমি নিশ্চয়ই অন্ধ ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা আমার চক্ষু ফিরিয়ে দিয়েছেন। অতএব তোমার যা ইচ্ছা নিয়ে যাও এবং যা ইচ্ছা রেখে যাও। আল্লাহ্'র কসম খেয়ে বলছি: আজ আমি তোমাকে বারণ করবো না যাই তুমি আল্লাহ্'র জন্য নিবে। ফিরিস্তাটি বললেন: তোমার সম্পদ তুমিই রেখে দাও। তোমাদেরকে শুধু পরীক্ষাই করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্য কিছু নয়। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমার সাথীদ্বয়ের উপর হয়েছেন অসন্তুষ্ট।
উক্ত হাদীসে প্রথমোক্ত ব্যক্তিদ্বয় আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহ অস্বীকার ও তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের কারণে তিনি তাদের উপর অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁর দেয়া নিয়ামত তিনি তাদের থেকে ছিনিয়ে নেন। অন্য দিকে অপর জন তাঁর নিয়ামত স্বীকার করেন এবং তাতে তাঁর অধিকার আদায় করেন বিধায় আল্লাহ্ তা'আলা তার উপর সন্তুষ্ট হন এবং তার সম্পদ আরো বাড়িয়ে দেন। অতএব নিয়ামতের শুকর আদায় করা অপরিহার্য। নিয়ামতের শুকর বলতে বিনয় ও ভালোবাসার সঙ্গে অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহ স্বীকার করাকেই বুঝানো হয়।
📄 বিদ‘আতী কিংবা ভ্রান্তিপূজ্যার্থীদের সাথে উঠা-বসা
বিদ'আতী কিংবা প্রবৃত্তিপূজারীদের সাথে উঠ-বসা করা হারাম। কারণ, তারা ইসলামের ব্যাপারে একজন খাঁটি মুসলমানের সামনে হরেক রকমের সংশয়-সন্দেহ উপস্থাপন করে তাঁর মূল পুঁজি তথা বিশুদ্ধ আক্বীদা-বিশ্বাসকেই নষ্ট করে দেয়।
হযরত আবু সা'ঈদ খুদ্রী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا ، وَ لَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيٌّ (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৩২)
অর্থাৎ খাঁটি মু'মিনই যেন তোমার একমাত্র সঙ্গী হয় এবং একমাত্র পরহেযগার ব্যক্তিই যেন তোমার খাবার খায়।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
لَا تُجَالِسٌ أَهْلَ الْأَهْوَاءِ ، فَإِنْ مُجَالَسَتَهُمْ مُمْرِضَةٌ لِلْقَلْبِ (ইবানাহ: ২/৪৮০)
অর্থাৎ তোমরা প্রবৃত্তিপূজারীদের পার্শ্বে বসো না। কারণ, তাদের সাথে উঠা- বসা করলে অন্তর রোগাক্রান্ত হয়ে যায়।
হযরত ফুযাইল্ বিন্ ‘ইয়ায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
صَاحِبُ بِدْعَةٍ لَا تَأْمَنْهُ عَلَى دِيْنِكَ ، وَ لَا تُشَاوِرْهُ فِي أَمْرِكَ ، وَ لَا تَجْلِسَ إِلَيْهِ، وَ مَنْ جَلَسَ إِلَى صَاحِبِ بِدْعَةِ أَوْرَثَهُ اللَّهُ الْعَمَى (ইবানাহ: ২/৪৪২)
অর্থাৎ তোমার ধর্মকর্ম একজন বিদ'আতীর হাতে কখনোই নিরাপদ নয়। সুতরাং তোমার কোন ব্যাপারে তার সামান্যটুকু পরামর্শও নিবে না। এমনকি তার নিকটেও কখনো বসবে না। কারণ, যে ব্যক্তি কোন বিদ'আতীর নিকট বসলো সে অচিরেই তার অন্তর্দৃষ্টি হারিয়ে ফেললো।
হযরত মুসলিম বিন্ ইয়াসা'র (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
لَا تُمَكِّنْ صَاحِبَ بِدْعَةِ مِنْ سَمْعِكَ فَيَصُبُّ فِيهِ مَا لَا تَقْدِرُ أَنْ تُخْرِجَهُ مِنْ قَلْبِكَ (ইবানাহ: ২/৪৫৯)
অর্থাৎ কোন বিদ'আতীকে কখনো তোমার কানের কাছে ঘেঁষতে দিবে না। কারণ, সে তখন তোমার কানে এমন কিছু ঢুকিয়ে দিবে যা আর কখনো তোমার অন্তর থেকে বের করতে পারবে না।
হযরত মুফায্যাল্ বিন্ মুহাল্ল্ল্হাল্ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
لَوْ كَانَ صَاحِبُ الْبِدْعَةِ إِذَا جَلَسْتَ إِلَيْهِ يُحَدِّثُكَ بِبِدْعَته حَذَرْتَهُ وَ فَرَرْتَ مِنْهُ ، وَ لَكِنَّهُ يُحَدِّثُكَ بِأَحَادِيثِ السُّنَّةِ فِي بُدُو مَجْلِسِهِ ثُمَّ يُدْخِلُ عَلَيْكَ بِدْعَتَهُ فَلَعَلَّهَا تَلْزَمُ قَلْبَكَ ، فَمَتَى تُخْرِجُ مِنْ قَلْبِكَ ؟! (ইবানাহ: ২/৪৪৪)
অর্থাৎ যদি কোন বিদ'আতীর নিকট বসলেই সে তোমার সাথে বিদ'আতের কথা আলোচনা করে তা হলে তুমি তার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে এবং তার থেকে দূরে সরে যেতে পারতে। কিন্তু সে তো তা করছে না বরং সে সর্বপ্রথম তোমাকে সুন্নাতের কিছু হাদীস শুনাবে অতঃপর তার বিদ'আত তোমার নিকট সাপ্লাই দিবে। তখন তা তোমার অন্তরের সাথে গেঁথে যাবে যা অন্তর থেকে বের করার সুযোগ আর কখনো তোমার হবে না।
বর্তমান বিশ্বের অনেকেই অন্যের সাথে তার পারস্পরিক সম্পর্ক রাখার ব্যাপারটিকে সংখ্যাধিক্যের সাথে জুড়ে দেয়। তখন সে নিজ সুবিধার জন্য যাদের সংখ্যা বেশি তাদের সাথেই উঠাবসা করে এবং তাদের সাথেই বন্ধুত্ব পাতায়। কে সত্যের উপর আর কে মিথ্যার উপর তা সে কখনোই ভেবে দেখে না। অথচ ধর্মের খাতিরে তাকে একমাত্র সত্যের সাথীই হতে হবে। মিথ্যার নয়।
হযরত ফুযাইল্ বিন্ ‘ইয়ায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
اتَّبِعْ طُرُقَ الْهُدَى، وَ لَا يَضُرُّكَ قِلَّةُ السَّالِكِينَ ، وَ إِيَّاكَ وَ طُرُقَ الضَّلَالَةِ ، وَ لَا تَغْتَرْ بِكَثْرَةِ الْهَالِكَيْنَ (আল্ ই'তিস্বাম: ১/১১২)
অর্থাৎ একমাত্র হিদায়াতের পথই অনুসরণ করো; এ পথের লোক সংখ্যা কম হলে তাতে তোমার কোন অসুবিধে নেই এবং ভ্রষ্টতার পথ থেকে বহু দূরে অবস্থান করো; সে পথের লোক সংখ্যা বেশি বলে তুমি তাতে ধোঁকা খেয়ো না।
📄 কারোর কবরের উপর মসজিদ বানানো
কারোর কবরের উপর মসজিদ বানানো হারাম ও কবীরা গুনাহ্।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসউদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
إِنَّ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكُهُمُ السَّاعَةُ وَ هُمْ أَحْيَاءُ ، وَ الَّذِيْنَ يَتَّخِذُوْنَ الْقُبُوْرَ مساجد (ইবনু খুযাইমাহ, হাদীস ৭৮৯ ইবনু হিব্বান/ইহসান, হাদীস ৬৮০৮ ত্বাবারানী/কাবীর, হাদীস ১০৪১৩ বায্যার/কাফুল আস্তার, হাদীস ৩৪২০)
অর্থাৎ সর্ব নিকৃষ্ট মানুষ ওরা যারা জীবিত থাকতেই কিয়ামত এসে গেলো এবং ওরা যারা কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করলো।
হযরত ‘আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: হযরত উম্মে হাবীবাহ্ ও হযরত উম্মে সালামাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ইথিওপিয়ায় একটি গির্জা দেখেছিলেন যাতে অনেকগুলো ছবি টাঙ্গানো রয়েছে। তাঁরা তা রাসূল কে জানালে তিনি বলেন:
إِنْ أُوْلَائِكَ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ ، بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِداً ، وَصَوَّرُوا فِيه تِلْكَ الصُّوَرَ ، فَأُوْلَاتَكَ شَرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ (বুখারী, হাদীস ৪২৭, ৪৩৪, ১৩৪১, ৩৮৭৩ মুসলিম, হাদীস ৫২৮ ইবনু খুযাইমাহ, হাদীস ৭৯০)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই ওরা তাদের মধ্যে কোন ওলী-বুযুর্গ ইন্তিকাল করলে তারা ওর কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং এ জাতীয় ছবি সমূহ টাঙ্গিয়ে রাখে। ওরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
নবী কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারী ইহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে লা'নত (অভিশাপ) দিয়েছেন।
হযরত ‘আয়েশা ও ইবনে ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন:
لَمَّا نُزِلَ بِرَسُوْلِ اللهِ ، طَفِقَ يَطْرَحُ خَمِيْصَةً عَلَى وَجْهِهِ ، فَإِذَا اغْتَمَّ كَشَفَهَا عَنْ وَجْهِهِ ، فَقَالَ وَ هُوَ كَذَلِكَ : لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُودِ وَ النَّصَارَى ، اتَّخَذُوا قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ، يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوا (বুখারী, হাদীস ৪৩৫, ৪৩৬, ৩৪৫৩, ৩৪৫৪, ৪৪৪৩, ৪৪৪৪ মুসলিম, হাদীস ৫৩১)
অর্থাৎ যখন রাসূল মৃত্যু শয্যায় তখন তিনি চাদর দিয়ে নিজ মুখমণ্ডল ঢেকে ফেললেন। অতঃপর যখন তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো তখন তিনি চেহারা খুলে বললেন: ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের উপর আল্লাহ্ তা'আলার লা'নত; তারা নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিলো। এ কথা বলে নবী নিজ উম্মতকে সে কাজ না করতে সতর্ক করে দিলেন।
নবী কবরের উপর মসজিদ বানানোর ব্যাপারে শুধু লা'নত ও নিন্দা করেই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি তা করতে সুস্পষ্টভাবে নিষেধও করেছেন।
হযরত জুন্দা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি নবী কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন:
أَلَا وَ إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُوْنَ قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ وَ صَالِحِيْهِمْ مَسَاجِدَ ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ ، إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ (মুসলিম, হাদীস ৫৩২)
অর্থাৎ তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা নিজ নবী ও ওলী-বুযুর্গদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিতো। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানিওনা। আমি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করছি।
📄 ইহুদি ও খ্রিষ্টানকে সর্বপ্রথম নিজ থেকেই সালাম দেয়া
ইহুদি ও খ্রিস্টানকে সর্ব প্রথম নিজ থেকেই সালাম দেয়া আরেকটি হারাম কাজ।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরshদ করেন:
لَا تَبْدَؤُوْا الْيَهُودَ وَ لَا النَّصَارَى بِالسَّلَامِ ، فَإِذَا لَقِيْتُمْ أَحَدَهُمْ فِي طَرِيقِ فَاضْطَرُّوهُ إِلَى أَضْيَقِهِ (মুসলিম, হাদীস ২১৬৭)
অর্থাৎ তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানকে সর্ব প্রথম নিজ থেকেই সালাম দিও না। বরং যখনই তাদের কাউকে রাস্তায় পাবে তখনই তাকে একেবারে সংকীর্ণ পথেই চলতে বাধ্য করবে।
এ ছাড়াও সালাম তো ভালোবাসারই একান্ত প্রতীক। তাই ওদেরকে সালাম দেয়া যাবে না। কারণ, তাদের সাথে ভালোবাসা ঈমান বিধ্বংসীই বটে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ ، بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ، وَ مَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ، إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴾ (মা'য়িদাহ : ৫১)
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। তারা তো একে অপরের বন্ধু। তোমাদের কেউ তাদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা যালিমদেরকে সুপথ দেখান না।
ওদের আল্লাহ্ তা'আলাকে নিশ্চয়ই ভয় করা উচিৎ যারা খেলার পাগল হয়ে কাফির খেলোয়াড়কেও ভালোবাসে এবং গানের পাগল হয়ে কাফির গায়ক-গায়িকাকেও ভালোবাসে; অথচ তাদের করণীয় হচ্ছে শুধু ঈমানদারদেরকেই ভালোবাসা যদিও তারা তার উপর যুলুম ও অত্যাচার করুক না কেন এবং কাফিরদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা যদিও তারা তার উপর দয়া বা অনুগ্রহ করুক না কেন। কারণ, আল্লাহ্ তা'আলা এ দুনিয়াতে কিতাব ও রাসূল পাঠিয়েছেন এ জন্যই যে, যেন সকল আনুগত্য হয় একমাত্র তাঁরই জন্য।
সুতরাং ভালোবাসা হবে একমাত্র তাঁরই আনুগত্যকারীদের জন্য এবং শত্রুতা হবে একমাত্র তাঁরই বিরুদ্ধাচারীদের জন্য। সম্মান পাবে একমাত্র তাঁরই বন্ধুরা এবং লাঞ্ছনা পোহাবে একমাত্র তাঁরই শত্রুরা। ভালো প্রতিদান পাবে একমাত্র তাঁরই বন্ধুরা এবং শাস্তি পাবে একমাত্র তাঁরই শত্রুরা।