📄 বড় শিরক
উক্ত শির্ক এতে লিপ্ত যে কোন ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডী থেকেই বের করে দেয়। আল্লাহ্ তা'আলা তাওবা ছাড়া এ ধরনের শির্ক কখনো ক্ষমা করবেন না।
তিনি বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ) (নিসা: ৪৮)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আলাহ্ তা'আলা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা কখনো ক্ষমা করবেন না। তবে তিনি এ ছাড়া অন্যান্য সকল গুনাহ্ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করে দিবেন।
এ ধরনের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য জান্নাত হারাম। জাহান্নামই হবে তার চিরস্থায়ী ঠিকানা।
আলাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ ، وَ مَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أنصار ) (মায়িদাহ: ৭২)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আলাহ্ তা'আলার সাথে কাউকে শরীক করে আলাহ্ তা'আলা তার উপর জান্নাতকে হারাম করে দেন এবং জাহান্নামকে করেন তার চিরস্থায়ী ঠিকানা। আর এরূপ অত্যাচারীদের তখন আর কোন সাহায্যকারী থাকবে না।
বড় শিকগুলো সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নরূপ:
১. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কাউকে আহ্বান করার শিক।
২. বিপদের সময় একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর নিকট ফরিয়াদ করার শিক্।
৩. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর নিকট আশ্রয় প্রার্থনার শির্ক।
৪. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর নিকট আশা ও বাসনার শির্ক।
৫. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর নিকট সাহায্য প্রার্থনার শির্ক।
৬. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য রুকু, সিজদাহ্, তার সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো, নামায ইত্যাদির শির্ক।
৭. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ঘর কা'বাহ্ শরীফ ছাড়া অন্য কোন ঘর বা মাযারের তাওয়াফ করার শিক্ক।
৮. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর নিকট তাওবাহ্ করার শিক্।
৯. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য কোন পশু জবাইয়ের শির্ক।
১০. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য কোন কিছু মানত করার শিক্।
১১. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর একচ্ছত্র আনুগত্য করার শির্ক।
১২. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কাউকে এককভাবে ভালোবাসার শির্ক।
১৩. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কাউকে এককভাবে ভয় করার শির্ক।
১৪. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরতা বা তাওয়াক্কুলের শির্ক।
১৫. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ কারোর জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশ করতে পারে এমন মনে করার শির্ক।
১৬. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ কাউকে হিদায়াত দিতে পারে এমন মনে করার শির্ক।
১৭. কবর পূজার শির্ক।
১৮. আল্লাহ্ তা'আলা নিজ সত্তা সহ সর্বস্থানে রয়েছেন এমন মনে করার শির্ক।
১৯. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও বিশ্ব পরিচালনায় অন্য কারোর হাত রয়েছে এমন মনে করার শির্ক।
২০. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও অন্য কোন ব্যক্তি বা দল শরীয়তের বিশুদ্ধ কোন প্রমাণ ছাড়া নিজ মেধা ও বুদ্ধির আলোকে কোন জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য জীবন বিধান রচনা করতে পারে এমন মনে করার শির্ক।
২১. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা গরিব বানাতে পারে এমন মনে করার শির্ক।
২২. কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার কাছ থেকে কেউ কারোর গুনাহ্ সমূহ ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবে এমন মনে করার শির্ক।
২৩. কিয়ামতের দিন কেউ কাউকে আল্লাহ্ তা'আলার কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবে এমন মনে করার শির্ক।
২৪. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও অন্য কোন গাউস-কুতুব দুনিয়া, আখিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম, লাওহ্, ক্বলম, 'আরশ, কুন্সী তথা সর্বস্থানের সবকিছু দেখে বা শুনে এমন মনে করার শিরক।
২৫. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও অন্য কেউ গায়েব জানে বা কখনো কখনো তার কাশফ হয় এমন মনে করার শিরক।
২৬. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের লুক্কায়িত কথা বলে দিতে পারে এমন মনে করার শিরক।
২৭. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও অন্য কেউ কাউকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিতে পারে এমন মনে করার শিরক।
২৮. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের সামান্যটুকু পরিবর্তন ঘটাতে পারে এমন মনে করার শির্ক।
২৯. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ঘর মসজিদ ছাড়াও অন্য কোন মাজারের খাদিম হওয়া যায় এমন মনে করার শিক।
৩০. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা ছাড়াও অন্য কারোর ইচ্ছা স্বকীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এমন মনে করার শিক।
৩১. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে এমন মনে করার শিক।
৩২. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও কেউ কাউকে সুস্থতা দিতে পারে এমন মনে করার শিক।
৩৩. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার তাওফীক ছাড়াও কেউ ইচ্ছে করলেই কোন নেক আমল করতে পারে এমন মনে করার শিক।
৩৪. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা ছাড়াও কেউ কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে এমন মনে করার শিক।
৩৫. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও কেউ কাউকে জীবন বা মৃত্যু দিতে পারে এমন মনে করার শিক।
৩৬. একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়াও অন্য কোন ব্যক্তি সর্বদা জীবিত রয়েছে বা থাকবে এমন মনে করার শিক্ক।
📄 ছোট শিরক
ছোট শির্ক বলতে এমন কাজ ও কথাকে বুঝানো হয় যা তাতে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডী থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দিবে না বটে। তবে তা কবীরা গুনাহ্ তথা মহা পাপ অপেক্ষা আরো জঘন্যতম। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
فَلَا تَجْعَلُوْا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَّ أَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ) (বাক্বারাহ: ২২)
অর্থাৎ সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার সাথে কাউকে শরীক করো না। অথচ তোমরা এ সম্পর্কে সম্যক অবগত রয়েছো।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
الْأَنْدَادُ هُوَ الشَّرْكُ أَخْفَى مِنْ دَبَيْبِ النَّمْلِ عَلَى صَفَاةِ سَوْدَاءَ فِي ظُلْمَةِ اللَّيْلِ ، ا فُلانَةَ وَ حَيَاتِي ، وَ تَقُوْلُ: لَوْلَا كَلْبَةً هَذِهِ و الله وَ حَيَاتِكَ يَا فَلانَة وَ وَهُوَ أَنْ تَقُوْلَ: وَ الله وَ - لأَتَانَا اللَّصُوصُ ، وَ لَوْلاَ الْبَطُ فِي الدَّارِ لأَتَى اللَّصُوصُ ، وَ قَوْلُ الرَّجُل لصاحبه: مَا شَاءَ اللهُ وَ شِئْتَ ، وَ قَوْلُ الرَّجُلِ : لَوْلاَ اللهُ وَ فُلَانٌ ، لَا تَجْعَلْ فِيْهَا فُلاناً ، هَذَا كُلُّهُ بِهِ شَرْكٌ
অর্থাৎ "আন্ন্দাদ্” বলতে এমন শিককে বুঝানো হচ্ছে যা অন্ধকার রাতে কালো পাথরে পিঁপড়ার চলন চাইতেও সূক্ষ্ম। যা টের পাওয়া খুবই দুরূহ। যেমন: তোমার এ কথা বলা যে, হে অমুক! আল্লাহ্ তা'আলা এবং তোমার ও আমার জীবনের কসম! অথবা এ কথা বলা যে, যদি এ কুকুরটা না হতো তা হলে (আজ রাত) চোর অবশ্যই আসতো। যদি ঘরে হাঁসগুলো না থাকতো তা হলে (আজ রাত) চোর অবশ্যই ঢুকতো অথবা কারোর নিজ সাথীকে এ কথা বলা যে, আল্লাহ্ তা'আলা এবং তুমি না চাইলে কাজটা হতো না অথবা কারোর এ কথা বলা যে, আল্লাহ্ তা'আলা এবং অমুক না থাকলে কাজটা হতো না। অমুক শব্দটি সাথে লাগাবে না। (বরং বলবে: আল্লাহ্ তা'আলা যদি না চাইতেন কাজটা হতো না)। কারণ, এ সব কথা শিকের অন্তর্গত। ছোট শিকগুলো সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নরূপ:
১. কোন বিপদাপদ থেকে বাঁচার জন্য সুতা বা রিং পরার শির্ক।
২. শিক মিশ্রিত মন্ত্র দ্বারা ঝাড়-ফুঁকের শিক।
৩. তাবিজ-কবচের শিক।
৪. শরীয়ত অসম্মত বস্তু বা ব্যক্তি কর্তৃক বরকত গ্রহণের শির্ক।
৫. যাদুর শিক্।
৬. ভাগ্য গণনার শিক্।
৭. জ্যোতিষীর শিক্।
৮. চন্দ্র বা অন্য কোন গ্রহের অবস্থানক্ষেত্রের পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি হয় এমন মনে করার শিক।
৯. আল্লাহ্ তা'আলার যে কোন নিয়ামত অস্বীকার করার শির্ক।
১০. কোন প্রাণীর বিশেষ কোন আচরণে অমঙ্গলের আশংকা রয়েছে এমন মনে করার শিক।
১১. শরীয়ত অসম্মত কোন বস্তু বা ব্যক্তির ওয়াসীলা ধরার শিক্।
১২. নামায ত্যাগের শিক।
১৩. আল্লাহ্ তা'আলা এবং তুমি না চাইলে কাজটা হতো না এমন বলার শির্ক।
১৪. আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুর নামে কসম খাওয়ার শির্ক।
১৫. যুগ বা বাতাসকে গালি দেয়ার শির্ক।
১৬. কোন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর "যদি এমন করতাম তা হলে এমন হতো না" বলার শিক।
১৭. কোন নেক আমল দুনিয়া কামানোর নিয়্যাতে করার শিক।
১৮. কোন নেক আমল আল্লাহ্ ভিন্ন অন্য কারোর সন্তুষ্টির জন্য করার শিক।
১৯. কোন নেক আমল কাউকে দেখানো বা শুনানোর জন্য করার শিক।
📄 ছোট শিরক ও বড় শিরকের মধ্যে পার্থক্য
ছোট শির্ক ও বড় শিরকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি পার্থক্য রয়েছে যা নিম্নরূপ:
১. বড় শির্ক তাতে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডী থেকেই সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয়। ঠিক এরই বিপরীতে ছোট শিক এমন নয় বটে। তবে তা কবীরা গুনাহ্ তথা মহা পাপ অপেক্ষা আরো জঘন্যতম।
২. বড় শির্ক তাতে লিপ্ত ব্যক্তির সকল নেক আমলকে বিনষ্ট করে দেয়। ঠিক এরই বিপরীতে ছোট শির্ক শুধু সে আমলকেই বিনষ্ট করে যে আমলে এ জাতীয় শিকের সংমিশ্রণ রয়েছে। অন্য আমলকে নয়।
৩. বড় শিক তাতে লিপ্ত ব্যক্তির জান ও মাল তথা সার্বিক নিরাপত্তা বিনষ্ট করে দেয়। ঠিক এরই বিপরীতে ছোট শির্ক এমন নয়।
৪. বড় শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি চিরকালের জন্য জাহান্নামী হয়ে যায়। জান্নাত তার জন্য হারাম। তবে ছোট শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি এমন নয়। বরং সে কিছু দিনের জন্য জাহান্নামে গেলেও পরবর্তীতে তাকে জাহান্নাম থেকে চিরতরে মুক্তি দেয়া হবে।
৫. বড় শিকে লিপ্ত ব্যক্তির সাথে কোন ধরনের সম্পর্ক রাখা যাবে না। বরং তার সাথে সকল ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। যদিও সে নিকট আত্মীয় হোক না কেন। তবে ছোট শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি এমন নয়। বরং তার সাথে সম্পর্ক ততটুকুই রাখা যাবে যতটুকু তার ঈমান রয়েছে। তেমনিভাবে তার সাথে ততটুকুই সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে যতটুকু তার মধ্যে শির্ক রয়েছে।