📄 ইসলামে জিহাদ কিভাবে বৈধ হলো
ইসলামে জিহাদ একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কুরআন ও রসূলের সুন্নাহে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে। জিহাদ বলতে সাধারণত ইসলামী শরিয়তে বিধিবদ্ধ যুদ্ধকে বুঝানো হয়। এর মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর বাণী: "তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করো তাদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তবে সীমালঙ্ঘন করো না।" (আল বাকারা: ১৯০)।
ইসলামে জিহাদ প্রাথমিক পর্বে নিষিদ্ধ ছিল। মুসলমানরা শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হলেও প্রতিরোধের অনুমতি ছিল না। তারা শুধুমাত্র ধৈর্যধারণ করতে ও ক্ষমা করতে আদিষ্ট ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, মুসলমানদের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণাবলী সৃষ্টি করা এবং ইসলামের দাওয়াতী কাজ শান্তিপুর্ণভাবে প্রচার করা। মক্কায় এ অবস্থা প্রায় তের বছর ছিল।
পরবর্তীকালে মুসলমানদেরকে শুধু আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হলো, আক্রমণাত্মক যুদ্ধের জন্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন: "যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদেরকে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হলো। কারণ তারা নির্যাতিত হয়েছে এবং আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।" (সূরা হজ্জ: ৩৯)।
এর কিছুদিন পর শত্রুরা আক্রমণ না করলেও আত্মরক্ষার প্রয়োজনে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হলো। আল্লাহ বলেন: "তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো এবং তাদেরকে বন্দী করো, অবরোধ করো ও তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে ওৎ পেতে থাকো। যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (সূরা তওবা: ৫)।
সর্বশেষ, মুশরিকরা আক্রমণ না করলেও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হলো, যাতে করে পৃথিবীতে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সকল ফিতনা দূর হয়। আল্লাহ বলেন: "তোমরা যুদ্ধ করো তাদের বিরুদ্ধে, যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয় এবং আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত হয়।" (সূরা বাকারা: ১৯৩)।
📄 কিভাবে ও কখন জিহাদ ফরয হলো
ইসলামের ইতিহাসে জিহাদ পর্যায়ক্রমে ফরয হয়েছে। প্রথমে মক্কায় এটি নিষিদ্ধ ছিল, মুসলমানরা আক্রান্ত হলেও যুদ্ধ করতে পারত না। হিজরতের পর আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, তারপর আত্মরক্ষার প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো। অবশেষে সকল ফিতনা দূর করে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ ফরয করা হলো।
এই ফরযকরণ পর্যায়ক্রমে হয়েছে যাতে মানুষ ধীরে ধীরে এর সাথে মানিয়ে নিতে পারে। কারণ প্রথমে ইসলামের দাওয়াত প্রচার ছিল মূল লক্ষ্য, যুদ্ধের মাধ্যমে মানুষকে ভীত করা নয়।
📄 জিহাদ কখন ফরযে আইন হয়
জিহাদ সাধারণত ফরযে কিফায়া, অর্থাৎ সমাজের একটি অংশ এ দায়িত্ব পালন করলে অন্যদের উপর থেকে দায় উঠে যায়। কিন্তু কিছু পরিস্থিতিতে জিহাদ ফরযে আইন হয়ে যায়, অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলমানের উপর তা পালন করা বাধ্যতামূলক হয়। এ পরিস্থিতিগুলো হলো:
১. যখন শত্রুরা মুসলিম ভূখণ্ডে আক্রমণ করে: এক্ষেত্রে মুসলিম দেশের প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তির উপর জিহাদ ফরযে আইন হয়, এমনকি স্ত্রী ও দাসদের উপরও।
২. যখন শত্রুরা মুসলিমদেরকে সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধের জন্য আহ্বান করে: এক্ষেত্রে মুসলিমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে পারবে না, বরং শত্রুদের মোকাবেলা করা তাদের উপর ফরযে আইন।
৩. যখন শত্রুরা মুসলিমদের কোনো দল বা ব্যক্তিকে বন্দী করে: এক্ষেত্রে মুসলিমদের উপর ফরযে আইন হয় বন্দীদের মুক্ত করা, যদি তারা সক্ষম হয়।
📄 যার উপর জিহাদ ফরয
জিহাদ সাধারণত প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক, স্বাধীন এবং সামরিক সামর্থ্যবান মুসলমান পুরুষের উপর ফরয। তবে কিছু পরিস্থিতিতে নারী, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং দুর্বলদের উপর জিহাদ ফরয হয় না।
কিছু শর্তপূরণ হলে জিহাদ ফরয হয়:
১. মুসলিম হতে হবে।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।
৩. সুস্থ মস্তিষ্ক হতে হবে।
৪. পুরুষ হতে হবে (সাধারণত)।
৫. সামরিক সামর্থ্য থাকতে হবে (শারীরিক ও অর্থনৈতিক)।
৬. মুক্ত বা স্বাধীন হতে হবে।
৭. পিতা-মাতার অনুমতি (যদি ফরযে আইন না হয়)।
৮. ঋণদাতার অনুমতি (যদি ফরযে আইন না হয়)।