📄 বিরোধীদের বিরুদ্ধে অগ্রধারণ
ইসলামে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক অগ্রধারণ করা হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
إِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا ۚ
“নিশ্চয় অগ্রধারণ সত্যের মোকাবেলায় কিছুই কাজে আসে না।” (সূরা ইউনুস : আয়াত ৩৬)
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “তোমরা অগ্রধারণ থেকে বিরত থাকো। কেননা অগ্রধারণই সবচেয়ে বড় মিথ্যা।” – বুখারি ও মুসলিম।
ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেনো অপরের বিরুদ্ধে অগ্রধারণ না করে।”
ইমাম নববী বলেছেন: “অগ্রধারণ” অর্থ অপরের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা। এটার দ্বারা অন্যের নিন্দা করা বা দোষ খুঁজে বের করা বৈধ নয়। পক্ষান্তরে কেউ যদি নিজের খারাপ ধারণাকে কাজে লাগিয়ে সেই মন্দ ধারণা অনুযায়ী কাজ করে, তবে তা হারাম হবে। এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। তবে তা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে তার উপর ভিত্তি করে কাজ করা বৈধ।
আর যদি মন্দ ধারণা পোষণ করা নিশ্চিত হয়, তাহলে তা থেকে দূরে থাকা উচিত। এটার উপর কাজ করা হারাম। বরং সেটার উপর ভিত্তি করে ভালো ধারণা করা উচিত। এটা সকল মুসলিমের জন্য।
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যখন তোমরা কোনো অগ্রধারণ করো, তা দ্বারা সত্যের অনুসন্ধান করোনা।” – বুখারি।
এর অর্থ হলো, যখন তোমার মনে কোনো মন্দ ধারণা উদয় হয়, তখন তার উপর ভিত্তি করে কোনো কাজ করোনা। এটা মুসলিমদের জন্য।
📄 মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যকার আত্ম-সম্পর্ক
ইসলামের সাথে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের সাথে কোনো বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করা বৈধ নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ ۗ
“তোমরা তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) গালি দিওনা, যাদেরকে তারা আল্লাহ ছাড়া ডাকে। তাহলে তারা সীমা লংঘন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে।” (সূরা আনয়াম : আয়াত ১০৮)
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য যে সকল জিনিস হারাম করেছেন, সেগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা জঘন্য হলো, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার মা বাবাকে গালি দেয়া।” জিজ্ঞাসা করা হলো: হে রসূলুল্লাহ, কিভাবে কেউ নিজের মা বাবাকে গালি দেবে? তিনি বললেন: সে অন্যের মা বাবাকে গালি দেবে। অমনি অন্যরাও তার মা বাবাকে গালি দেবে।” – বুখারি ও মুসলিম।
সুতরাং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তাদের ধর্মকে গালি দেয়া বা তাদের দেবদেবীকে নিয়ে কটু কথা বলা হারাম। বরং তাদের প্রতি সম্মান ও সহনশীলতা দেখানোই ইসলামের শিক্ষা।
📄 অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সংরক্ষণ
ইসলাম অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
“তোমাদের জন্য তোমাদের দীন, আর আমার জন্য আমার দীন।” (সূরা কাফিরুন : আয়াত ৬)
ইসলাম অমুসলিমদের উপাসনালয়, তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি, এবং তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে সম্মান করে। তাদের উপাসনালয়ে হামলা করা বা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিকের উপর যুলুম করবে, তার অধিকার ক্ষুন্ন করবে, তার ক্ষমতা বহির্ভূত কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেবে, অথবা তার অনুমতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু নিয়ে নেবে, কেয়ামতের দিন আমি তার পক্ষ থেকে তার বিপক্ষে লড়াই করবো।” - আবু দাউদ।
রাসূলুল্লাহ সা. নাজরাণবাসীকে চুক্তিপত্র লিখে দিয়েছিলেন, যাতে বলা হয়েছিল: “তাদের জীবন, মাল, ধর্ম, গির্জা, পাদ্রী, যাজক ও তাদের সবকিছু আল্লাহর নিরাপত্তা ও রসূলুল্লাহর নিরাপত্তা ও রসূলুল্লাহর যিম্মায় থাকবে। তাদের কোনো ধর্মযাজককে তার পদ থেকে বিতাড়িত করা যাবে না, তাদের কোনো ধর্মযাজককে তার স্থান থেকে সরানো যাবে না, তাদের কোনো মূর্তি বা দেবদেবীকে পরিবর্তন করা যাবে না, তাদের কোনো অধিকার ও ক্ষমতা পরিবর্তন করা যাবে না, তাদের কোনো ছবি বা প্রতিকৃতিকে পরিবর্তন করা যাবে না। তারা যে সকল জিনিস নিয়ে আছে তা থাকবে, তারা কোনো প্রকার নির্যাতন ও বাড়াবাড়ির শিকার হবে না।”
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. জেরুজালেমবাসীকে চুক্তিপত্র লিখে দিয়েছিলেন, তাতে বলা হয়েছিল: “এটি সেই নিরাপত্তা, যা আল্লাহর বান্দা উমর ইবনুল খাত্তাব জেরুজালেমবাসীকে দান করেছেন। তিনি তাদেরকে তাদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয়, ক্রুশ এবং তাদের অসুস্থদেরকে, সুস্থদেরকে এবং তাদের সকল জাতি ধর্মাবলম্বীকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তাদের উপাসনালয়গুলোকে দখল করা হবে না, ধ্বংস করা হবে না, তাদের থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে নেয়া হবে না। তাদের কোনো ক্রুশ বা তাদের কোনো ছবিকে পরিবর্তন করা হবে না। তাদের ধর্মকে তাদের উপর চাপানো হবে না, তাদের কাউকে অত্যাচার করা হবে না। ইহুদীদেরকে জেরুজালেমে তাদের সাথে বসবাস করতে দেয়া হবে না।”
এ থেকে প্রমাণিত হয়, অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।
📄 নির্দিষ্ট বন্ধুত্ব
ইসলামে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ব্যবসায়িক লেনদেন, বৈবাহিক সম্পর্ক (কিতাবী নারীর সাথে), এবং অন্যান্য সামাজিক সম্পর্ক অনুমোদিত। তবে, মুসলিমদেরকে অমুসলিমদের প্রতি এমন বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি করতে পারে, বা মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ ۖ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً ۗ
“মুমিনগণ যেনো মুমিনদেরকে বাদ দিয়ে কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। যে এরূপ করবে, তার সাথে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে যদি তোমরা তাদের থেকে কোনো ভয় কর, তবে ভিন্ন কথা।” (সূরা আল ইমরান : আয়াত ২৮)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: “আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে কাফেরদের প্রতি তাদের বাহ্যিক আনুগত্যের প্রকাশ ঘটাতে নিষেধ করেছেন। তবে তারা যদি কোনো কাফের শাসকের অধীন থাকে এবং তার থেকে কোনো ক্ষতির আশংকা করে, তাহলে তারা তাদের প্রতি বাহ্যিকভাবে আনুগত্যের প্রকাশ ঘটাতে পারে, কিন্তু মনে মনে তাদের প্রতি আনুগত্য পোষণ করবে না।”
সুতরাং, ইসলামে মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট ও শর্তযুক্ত বন্ধুত্ব বৈধ, যা মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে সুরক্ষিত রাখে।