📄 শান্তির দীন ইসলাম
ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার দীন। মুসলিম শব্দের অর্থ আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণকারী এবং নিরাপত্তা দানকারী। মুসলিমগণ ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও হাদিস থেকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছে যে, ইসলামের সকল বিধি বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা, যার অন্যতম হলো শান্তি ও নিরাপত্তা। এতে যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি, গোলযোগ, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ বলেছেন: سَلَامٌ قَوْلًا مِن رَّبِّ رَّحِيمٍ “পরম দয়ালু প্রভুর পক্ষ থেকে বলা হবে: সালাম।” (সূরা ইয়াসিন : আয়াত ৫৮)
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, বদান্যতা এবং আত্মীয় স্বজনকে দান করার আদেশ দেন। আর অশ্লীলতা, গর্হিত কাজ ও বিদ্রোহ করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।” (সূরা নাহল : আয়াত ৯০)
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেনো ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেনো তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেনো তার মেহমানের সম্মান করে।” – বুখারি ও মুসলিম।
আবদুল্লাহ বিন উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “একজন মুসলমানের জন্য আরেকজন মুসলমানের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম (অন্যের জান, মাল ও ইজ্জতের উপর হস্তক্ষেপ করা অবৈধ)।” - মুসলিম।
সুতরাং ইসলামী বিধানে কোনো প্রকার উৎপীড়ন, অশান্তি ও বিদ্রোহের অবকাশ নেই। ইসলামের সকল বিধি বিধানের মর্মকথা হলো, জীবনের সকল ক্ষেত্রে মানবজাতির জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রসূলুল্লাহ সা.-এর বিদায় হজ্জের ভাষণ ছিল এই মহান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সর্বোত্তম ও সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
📄 ইসলাম শান্তির আদর্শ, শক্তির নয়
যারা মনে করে ইসলাম শক্তি ও যুদ্ধের উপর প্রতিষ্ঠিত, তারা ভুল ধারণায় নিমজ্জিত। ইসলাম শান্তি, ইনসাফ ও সততার ধর্ম। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَإِن جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
অর্থ: “যদি তারা সন্ধি করতে প্রস্তুত হয়, তবে তুমিও সন্ধির জন্য প্রস্তুত হও এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করো। নিশ্চয় তিনি সকল কিছু শোনেন এবং সকল কিছু জানেন।” (সূরা আনফাল : আয়াত ৬১)
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
“তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু সীমালংঘন করোনা। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারীকে পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা : আয়াত ১৯০)
ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মানুষ স্বাধীন। কারো উপর কোনো জোর জবরদস্তি করা জায়েয নেই। আল্লাহ বলেছেন:
لا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ
“দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য মিথ্যা থেকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক হয়ে গেছে।” (সূরা বাকারা : আয়াত ২৫৬)
সুতরাং মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসকে জোর জবরদস্তি করে পরিবর্তন করা যায় না। এর কারণ হলো, মানুষের বিবেক বুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাশক্তি। মানুষ যদি বিবেক বুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সঠিক পথ অবলম্বন করতে পারে, তবে তা তার জন্য উত্তম। সে যদি তা না পারে, তাহলে তা তার জন্য ধ্বংসাত্মক।
ইসলামে শুধু সেই সকল ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য এবং মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য অপরিহার্য। তবে এটা সেই সব ক্ষেত্রে নয়, যেখানে অন্য উপায় আছে।
📄 মানুষে মানুষে সম্পর্ক
ইসলামে মানুষে মানুষে সম্পর্ক চারটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত: ১. মানবীয় ভ্রাতৃত্ব, ২. একে অপরকে জানা, ৩. পরস্পরে সহযোগিতা, ৪. সুবিচার।
১. মানবীয় ভ্রাতৃত্ব: মানুষে মানুষে সম্পর্কের ভিত্তি হলো, সব মানুষ একই পরিবারের সদস্য। আদম ও হাওয়া তাদের আদি পিতা মাতা। সুতরাং সব মানুষ সমান এবং কোনো মানুষের উপর অন্য কোনো মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কেবল খোদাভীতি ও সৎ কাজের কারণে ছাড়া। আল্লাহ বলেছেন: يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَٰكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَٰكُمْ شُعُوبًا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓا۟ ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ ٱللَّهِ أَتْقَىٰكُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
“হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একটি পুরুষ ও একটি নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে জানতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু। নিশ্চয় আল্লাহ সব জানেন এবং সব খবর রাখেন।” (সূরা হুজরাত : আয়াত ১৩)
২. একে অপরকে জানা: সকল মানুষে মানুষে সম্পর্ক এই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যে, তারা একে অপরের সাথে পরিচিত হবে। একজন আরেকজনের নিকট থেকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জন করবে, অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে, এবং একজন আরেকজনের সভ্যতা সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: لِتَعَارَفُوا “যাতে তোমরা পরস্পরকে জানতে পারো।” এটা সকল মানুষে মানুষে সম্পর্ক ও সেতুবন্ধন সৃষ্টির অন্যতম ভিত্তি।
৩. পরস্পরে সহযোগিতা: সব মানুষ এক ও অভিন্ন সত্তা। তাদের প্রত্যেকের জন্য অপরের সাথে সহযোগিতা করা অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ
“তোমরা সৎ কাজ ও খোদাভীতিতে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করো। আর গুনাহ ও সীমালংঘনে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করোনা।” (সূরা মায়েদা : আয়াত ২)
৪. সুবিচার: সব মানুষ ইনসাফ ও সুবিচারের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর প্রতি অবিচার করা ইসলামে অনুমোদনযোগ্য নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর জন্য ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকো, ইনসাফের সাক্ষী হও এবং কোনো জাতির প্রতি বিদ্বেষ যেনো তোমাদেরকে ইনসাফ করতে বাধা না দেয়। ইনসাফ করো, এটিই খোদাভীতির অধিকতর নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কর্ম সম্পর্কে অবগত।” (সূরা মায়েদা : আয়াত ৮)
📄 মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক
ইসলামী সমাজ গঠনের ভিত্তি হলো, মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক চারটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত: ১. একাত্মতা, ২. পরস্পর সহানুভূতি ও সহযোগিতা, ৩. পরস্পর পরামর্শ, ৪. আনুগত্য।
১. একাত্মতা: মুসলিমরা এক পরিবার, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক একাত্মতা ও সংহতির ভিত্তিতে স্থাপিত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
“মুমিনরা তো একে অপরের ভাই।” (সূরা হুজরাত : আয়াত ১০)
২. পরস্পর সহানুভূতি ও সহযোগিতা: মুসলিমরা একে অপরের সহযোগী ও সহমর্মী। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ
“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণ একে অপরের বন্ধু ও অভিভাবক।” (সূরা তাওবা : আয়াত ৭১)
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটা প্রাচীরের মতো, তার একাংশ অপর অংশের সহায়ক।” (একথা বলার পর তিনি নিজের এক হাতের আঙ্গুল অপর হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে ঢুকালেন।) – বুখারি ও মুসলিম।
৩. পরস্পর পরামর্শ: মুসলিম সমাজ পরিচালিত হবে পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ
“তাদের সকল কাজ পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।” (সূরা আশ শূরা : আয়াত ৩৮)
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যার সাথে পরামর্শ করা হলো, সে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি।” - আবু দাউদ।
৪. আনুগত্য: মুসলিম সমাজের প্রতিটি সদস্য আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করবে এবং ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে শাসকের আনুগত্য করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য করো।” (সূরা নিসা : আয়াত ৫৯)
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “মুসলমান ব্যক্তির জন্য বাধ্যতামূলক হলো, শাসককে সে পছন্দ করুক বা না করুক, উভয় অবস্থায় শাসক যা আদেশ করে তা শোনা ও মানা। তবে সে যদি কোনো গুনাহর কাজের আদেশ করে, তাহলে তার আনুগত্য করা জায়েয নয়।” – বুখারি ও মুসলিম।