📄 শরিয়তে তাযীর প্রচলনের যৌক্তিকতা এবং তাযীর ও হদের পার্থক্য
ইমাম আবু হানিফা, মালেক ও আহমদের মতে, শরিয়তে যেসব অপরাধ তাযীর যোগ্য তাতে তাযীর ওয়াজিব। ইমাম শাফেয়ির মতে ওয়াজিব নয়।
৩. শরিয়তে তাযীর প্রচলনের যৌক্তিকতা এবং তাযীর ও হদের পার্থক্য ইসলাম তাযীরের প্রচলন করেছে পাপীদেরকে ও শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদেরকে শিষ্টাচার শেখানোর উদ্দেশ্যে। কাজেই এর যৌক্তিকতা ও উদ্দেশ্য হুবহু হদের উদ্দেশ্য ও যৌক্তিকতা। তবে হদের সাথে এর তিনটে পার্থক্য।
১. হদ সকল মানুষের উপর সমভাবে প্রযোজ্য। তাযীর মানুষের শ্রেণী ও মর্যাদা ভেদে বিভিন্ন মাত্রিক। কোনো সম্মানিত ব্যক্তির পদস্খলন ঘটলে তাকে ক্ষমা করা জায়েয। আর যদি শাস্তি দেয়া হয়, তবে তার চেয়ে নিম্নতর শ্রেণী ও মর্যাদাধারীদের অনুরূপ পদস্খলনে যে শাস্তি দেয়া হয়, তার চেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে। আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী ও বায়হাকি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “হদ ব্যতীত অন্যান্য পদস্খলনে সম্মানিত ব্যক্তিদেরকে ক্ষমা করে দাও।" অর্থাৎ যখন এমন কারো কোনো পদস্খলন ঘটে যে অসৎ লোক হিসেবে পরিচিত নয়, অথবা ছোটখাটো কোনো পাপ করে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবেই করে কিন্তু সেটি তার প্রথম পাপ, তবে সেজন্য তাকে শাস্তি দিওনা। আর যদি শাস্তি দেয়া অনিবার্য হয়, তবে হালকা শাস্তি দেয়া বাঞ্ছনীয়।
২. হদের ক্ষেত্রে মামলা আদালতে যাওয়ার পর কোনো সুপারিশ করা জায়েয নয়। তবে তাযীরে সুপারিশ বৈধ।
৩. তাযীরের কারণে অপরাধী মারা গেলে তার ক্ষতিপূরণ দেয়া বাধ্যতামূলক। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. জনৈকা মহিলাকে প্রচণ্ডভাবে ভীতি প্রদর্শনের ফলে আতঙ্কে তার পেট চুপসে যায় এবং সে মৃত সন্তান প্রসব করে। এ কারণে তিনি তার দিয়াত বহন করেন। (এরূপ ক্ষেত্রে কারো মতে, বাইতুলমাল কর্তৃক, কারো মতে, দায়ী ব্যক্তির পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয় কর্তৃক দিয়াত দিতে হবে।) আবু হানিফা ও মালেকের মতে, কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া লাগবেনা। কেননা এ ক্ষেত্রে তাযীর ও হদ সমান।
📄 তাযীরের পদ্ধতি
৪. তাযীরের পদ্ধতি তাযীর শুধু কথা দিয়েও কার্যকর করা যায়। যেমন, ধমক, তিরস্কার ও উপদেশ। আবার কাজ দ্বারাও করা যায় পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী। যেমন প্রহার, বন্দী করা, আটক করা, দেশান্তর করা, পদচ্যুত করা।
আবু দাউদ বর্ণনা করেন, জনৈক হিজড়াকে রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট আনা হলো। তার দুই হাত ও দুই পা মেহেদী রঞ্জিত। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: এর ব্যাপার কী? লোকেরা বললো : সে মহিলাদের মতো বেশ ধারণ করেছে। রসূলুল্লাহ সা. তৎক্ষণাৎ তাকে বাকি এলাকায় নির্বাসিত করলেন। লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ! ওকে হত্যা করে ফেলি? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: যারা নামায পড়ে তাদের হত্যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। তবে দাড়ি কামিয়ে দিয়ে, ঘরবাড়ি ভেঙে, বাগানের গাছপালা, ক্ষেতের ফসল ইত্যাদি নষ্ট করে তাযীর করা জায়য নেই। অনুরূপ নাক, কান, ঠোঁট, আঙ্গুল ইত্যাদি কেটেও নয়। কেননা কোনো সাহাবি থেকে এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়নি।
📄 দশটার বেশি বেত্রাঘাত করা
৫. দশটার বেশি বেত্রাঘাত করা
ইতিপূর্বে এই মর্মে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে যে, দশটার বেশি বেত্রাঘাত করা যাবেনা। আহমদ লায়েস, ইসহাক ও একদল শাফেয়ি ফকিহ এই হাদিস অনুসরণ করেন। কিন্তু মালেক, শাফেয়ি, যায়দ বিন আলী প্রমুখ দশটার বেশি বেত্রাঘাত জায়েয বলেছেন, তবে তা যেন কোনোক্রমেই হদের সর্বনিম্ন পরিমাপের পর্যায়ে না পৌঁছে। অন্য একদলের মত হলো, পাপ কাজে তাযীর করতে গিয়ে তার জন্য নির্ধারিত হদের সমান, অরক্ষিত স্থান থেকে চুরির ক্ষেত্রে হাতকাটার সমান, ব্যভিচারের অপবাদের সমার্থক নয় এমন গালির জন্য অপবাদের হদের সমান শাস্তি দেয়া যাবেনা। কেউ কেউ বলেন: তাযীরের পরিমাণ নির্ধারণে শাসক ইজতিহাদ করবেন এবং বৃহত্তর কল্যাণ ও অপবাদের পরিমাণ অনুপাতে শাস্তি নির্ধারণ করবেন।
📄 হত্যার মাধ্যমে তাযীর
৬. হত্যার মাধ্যমে তাযীর
কোনো কোনো আলেমের মতে, হত্যার মাধ্যমে তাযীর করা বৈধ, কারো মতে অবৈধ। ইবনে তাইমিয়ার বরাত দিয়ে ইবনে আবেদীন বলেন: "হানাফিদের মূলনীতি অনুযায়ী যেসব অপরাধের শাস্তি হত্যা নয়, যেমন ভোতা ও ভারী অস্ত্র দ্বারা হত্যা ও পুরুষে পুরুষে সমকাম ইত্যাদি যখন বারবার করা হয়, তখন শাসক অপরাধীকে হত্যা করতে অথবা কল্যাণকর মনে করলে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি শাস্তি দিতে পারবে।