📄 তাযীরের সংজ্ঞা
শরিয়তের পরিভাষায় কারো দ্বারা সংঘটিত অপরাধের কারণে তাকে সংশোধন ও সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তাকে শাস্তি দেয়া ও অপমান করাকে তাযীর বলা হয়।
শরিয়তে তাযীরের উদ্দেশ্য হলো, যে পাপের কাফফারাও নেই, হদও নির্ধারিত নেই, তার জন্য তাকে শাস্তি দেয়া। অর্থাৎ এটা এমন একটা সংশোধনমূলক শাস্তি, যা একজন শাসক (যিনি ইসলামী নীতিমালা অনুসরণ করেন, তার আইন ও বিধিমালা বাস্তবায়ন করেন ও তার নির্ধারিত শাস্তিসমূহ কার্যকর করেন) কোনো ফৌজদারী অপরাধ (যার শাস্তি সাধারণত মৃত্যুদণ্ড, কারাদণ্ড বা সশ্রম কারাদণ্ড) বা এমন কোনো পাপাচারের জন্য দিয়ে থাকেন, যার জন্য শরিয়ত কোনো শাস্তি নির্ধারণ করেনি, অথবা শাস্তি নির্ধারণ করেছে, কিন্তু ঐ শাস্তি কার্যকর করার শর্তাবলি পূরণ হয়নি, যেমন যৌনাংগ ব্যতীত অন্য কোথাও সহবাস করা, হাত কাটা লাগেনা এমন দ্রব্য চুরি করা, কিসাস নেই এমন ফৌজদারী অপরাধ করা, মহিলার সাথে মহিলার সংগম, ও ব্যভিচার ব্যতীত অন্য কোনো অপরাধের অপবাদ দেয়া। উল্লেখ্য, অপরাধ তিন রকমের :
১. যে অপরাধে নির্দিষ্ট দণ্ড থাকে, কাফফারা নেই, যেমন ইতিপূর্বে আলোচিত দণ্ডসমূহ।
২. যে অপরাধে কাফফারা থাকে, দণ্ড নেই; যেমন রমযানের দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস এবং এহরাম অবস্থায় স্ত্রী সহবাস।
৩. যে অপরাধে কাফফারাও নেই, দণ্ডও নেই, যেমন উপরোল্লিখিত পাপাচারসমূহ। এগুলোতে তাযীর ওয়াজিব।
📄 তাযীরের শরয়ী ভিত্তি
২. তাযীরের শরয়ী ভিত্তি এর শরয়ী ভিত্তি হচ্ছে আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও বায়হাকি কর্তৃক বর্ণিত হাদিস: রসূলুল্লাহ সা. অপবাদের ঘটনায় (অপবাদদাতাকে) বন্দী করেছিলেন।” এই বন্দী করাটা ছিলো সতর্কতামূলক বা নিরাপত্তামূলক এবং সত্য উদঘাটনই ছিলো এর উদ্দেশ্য। আর বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আল্লাহর নির্ধারিত হদ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যাপারে দশটির বেশি বেত্রাঘাত করোনা।"
উমর রা. চুল কামিয়ে, দেশান্তরী করে ও প্রহার করে তাযীর করতেন বলে প্রমাণ রয়েছে। তাছাড়া তিনি মদখোরদের দোকান ও আড্ডা এবং মদ বিক্রির বসতি জ্বালিয়ে দিতেন। কুফায় সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস জনগণের কাছ থেকে দূরে থাকতেন বলে তার প্রাসাদ তিনি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি একখানা বেত হাতে নিয়ে চলতেন এবং যাকে প্রহারযোগ্য মনে করতেন তাকে প্রহার করতেন। একটা বাড়িকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। জনৈকা পেশাদার ক্রন্দনকারিণীকে তিনি এত প্রহার করেন যে, তার চুল বের হয়ে গিয়েছিল। -ইগাছাতুল লাহফান-ইবনুল জাওযী।
📄 শরিয়তে তাযীর প্রচলনের যৌক্তিকতা এবং তাযীর ও হদের পার্থক্য
ইমাম আবু হানিফা, মালেক ও আহমদের মতে, শরিয়তে যেসব অপরাধ তাযীর যোগ্য তাতে তাযীর ওয়াজিব। ইমাম শাফেয়ির মতে ওয়াজিব নয়।
৩. শরিয়তে তাযীর প্রচলনের যৌক্তিকতা এবং তাযীর ও হদের পার্থক্য ইসলাম তাযীরের প্রচলন করেছে পাপীদেরকে ও শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদেরকে শিষ্টাচার শেখানোর উদ্দেশ্যে। কাজেই এর যৌক্তিকতা ও উদ্দেশ্য হুবহু হদের উদ্দেশ্য ও যৌক্তিকতা। তবে হদের সাথে এর তিনটে পার্থক্য।
১. হদ সকল মানুষের উপর সমভাবে প্রযোজ্য। তাযীর মানুষের শ্রেণী ও মর্যাদা ভেদে বিভিন্ন মাত্রিক। কোনো সম্মানিত ব্যক্তির পদস্খলন ঘটলে তাকে ক্ষমা করা জায়েয। আর যদি শাস্তি দেয়া হয়, তবে তার চেয়ে নিম্নতর শ্রেণী ও মর্যাদাধারীদের অনুরূপ পদস্খলনে যে শাস্তি দেয়া হয়, তার চেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে। আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী ও বায়হাকি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “হদ ব্যতীত অন্যান্য পদস্খলনে সম্মানিত ব্যক্তিদেরকে ক্ষমা করে দাও।" অর্থাৎ যখন এমন কারো কোনো পদস্খলন ঘটে যে অসৎ লোক হিসেবে পরিচিত নয়, অথবা ছোটখাটো কোনো পাপ করে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবেই করে কিন্তু সেটি তার প্রথম পাপ, তবে সেজন্য তাকে শাস্তি দিওনা। আর যদি শাস্তি দেয়া অনিবার্য হয়, তবে হালকা শাস্তি দেয়া বাঞ্ছনীয়।
২. হদের ক্ষেত্রে মামলা আদালতে যাওয়ার পর কোনো সুপারিশ করা জায়েয নয়। তবে তাযীরে সুপারিশ বৈধ।
৩. তাযীরের কারণে অপরাধী মারা গেলে তার ক্ষতিপূরণ দেয়া বাধ্যতামূলক। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. জনৈকা মহিলাকে প্রচণ্ডভাবে ভীতি প্রদর্শনের ফলে আতঙ্কে তার পেট চুপসে যায় এবং সে মৃত সন্তান প্রসব করে। এ কারণে তিনি তার দিয়াত বহন করেন। (এরূপ ক্ষেত্রে কারো মতে, বাইতুলমাল কর্তৃক, কারো মতে, দায়ী ব্যক্তির পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয় কর্তৃক দিয়াত দিতে হবে।) আবু হানিফা ও মালেকের মতে, কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া লাগবেনা। কেননা এ ক্ষেত্রে তাযীর ও হদ সমান।
📄 তাযীরের পদ্ধতি
৪. তাযীরের পদ্ধতি তাযীর শুধু কথা দিয়েও কার্যকর করা যায়। যেমন, ধমক, তিরস্কার ও উপদেশ। আবার কাজ দ্বারাও করা যায় পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী। যেমন প্রহার, বন্দী করা, আটক করা, দেশান্তর করা, পদচ্যুত করা।
আবু দাউদ বর্ণনা করেন, জনৈক হিজড়াকে রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট আনা হলো। তার দুই হাত ও দুই পা মেহেদী রঞ্জিত। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: এর ব্যাপার কী? লোকেরা বললো : সে মহিলাদের মতো বেশ ধারণ করেছে। রসূলুল্লাহ সা. তৎক্ষণাৎ তাকে বাকি এলাকায় নির্বাসিত করলেন। লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ! ওকে হত্যা করে ফেলি? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: যারা নামায পড়ে তাদের হত্যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। তবে দাড়ি কামিয়ে দিয়ে, ঘরবাড়ি ভেঙে, বাগানের গাছপালা, ক্ষেতের ফসল ইত্যাদি নষ্ট করে তাযীর করা জায়য নেই। অনুরূপ নাক, কান, ঠোঁট, আঙ্গুল ইত্যাদি কেটেও নয়। কেননা কোনো সাহাবি থেকে এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়নি।