📄 প্রাণ, সম্পদ ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে হত্যা করা
চোখ নষ্ট করা বা তার অন্য কোনো বিপদ ঘটানো বৈধ নয়। কেননা এ ধরনের দুষ্কর্মের এ ধরনের শাস্তি দেয়া বিধেয় নয়। ইতিপূর্বে যে সকল সহীহ হাদিস উদ্ধৃত করা হয়েছে, এটা তার পরিপন্থি। ইবনে কাইয়েম প্রথমোক্ত মতটিকে অগ্রগণ্য আখ্যায়িত করে বলেছেন: এই সুন্নতগুলোকে ফিকহী মূলনীতির পরিপন্থি বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ শুধু চোখের বিনিময়ে চোখ উৎপাটন বৈধ করেছেন, তাকানোর বিনিময়ে নয়। এজন্য কেউ যদি তার জিহ্বা দিয়ে কারো ক্ষতি করে বা কষ্ট দেয় তবে সে জন্য তার জিহ্বা কাটা যাবেনা। আর যদি আড়ি পেতে অন্যের গোপন কথা শোনে, তবে সে জন্য কান কেটে দেয়া বৈধ হবেনা। কাজেই বলা যায় যে, এই সুন্নতগুলোই সর্বোচ্চ মূলনীতি। এগুলোর পরিপন্থি যা হবে, সেটাই হবে মূলনীতির বিরোধী। "আল্লাহ চোখের বদলে চোখ উৎপাটনের বিধান দিয়েছেন" এ বক্তব্য কিসাসের ক্ষেত্রে সঠিক বটে, তবে যে অংগ অপরাধপ্রবণ সীমালঙ্ঘনকারী এবং যাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া তার ক্ষতি ও আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব নয়, তার বিষয়টি আয়াতে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনোভাবেই আসেনি। কুরআন যখন এ বিষয়ে পরিপূর্ণ নিরবতা অবলম্বন করেছে, তখন হাদীস এ বিষয়ে বিধি বর্ণনা করেছে। এটা কুরআনের বিরোধী কোনো বিধান নয়। এটা কিসাস হিসেবে চোখ নষ্ট বা উৎপাটন করা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ব্যাপার। অনুরূপ, এটা আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা থেকেও ভিন্ন ব্যাপার, যা সহজ থেকে সহজতর পন্থায় করা যায়। কেননা উদ্দেশ্য হলো, তার কূটকৌশলের ক্ষতি প্রতিহত করা। এ কাজটা যদি লাঠি দিয়ে সম্পন্ন করা যায়, তবে তরবারি দিয়ে প্রতিহত করা হবেনা। তবে যে ব্যক্তি অবৈধ জিনিসের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে, অথচ তা থেকে সংযত থাকা সম্ভব নয়, সে ঐ কাজটি গোপনে ও আড়ি পাতার মাধ্যমেই করেছে। সুতরাং ওটা ঐ আক্রমণকারী ও অপরাধীর কাজের চেয়ে ভিন্নতর, যার আক্রমণ বাস্তবায়িত হয়নি। সম্ভবত: এটা গোপনে ছাড়া সংঘটিত হয়না। এমতাবস্থায় যার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছে, তার উপর যদি দৃষ্টিদাতার অপরাধের প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়, তবে সেটা অবশ্যই তার পক্ষে সম্ভব হবেনা। আর যদি সহজ থেকে সহজতর উপায়ে তা প্রতিরোধ করার আদেশ দেয়া হয়, তাহলে তার দিকে ও তার অন্দর মহলের দিকে দৃষ্টি দিয়ে সে যে অপরাধ করেছে, তার আর কোনো শাস্তি হবেনা।
ইসলামী শরিয়ত একটা পূর্ণাঙ্গ বিধান, যা উল্লিখিত দুটো পন্থাই প্রত্যাখ্যান করে। তার দৃষ্টিতে আমাদের ও অপরাধীর জন্য সর্বোত্তম, সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বাপেক্ষা ব্যবস্থা সেটাই, যা হাদিসে এসেছে, যার বিরোধিতা কোথাও করা হয়নি এবং যার বিশুদ্ধতার বিপক্ষেও কোনো প্রমাণ নেই। বস্তুত: সেই ব্যবস্থা হলো, তার দিকে পাথর বা যা সেখানে পাওয়া যায় তা ছুঁড়ে মারা। যদি কেউ সীমালঙ্ঘনপূর্বক তাকিয়ে না থাকে, তবে পাথরের টুকরো ইত্যাদি নিক্ষেপে তার কোনো ক্ষতি হবেনা। আর যদি তাকিয়ে থাকে, তাহলে যে ক্ষতি হবে সে জন্য সে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করবে। কেননা সে নিজেই এই ক্ষতি ডেকে এনেছে। নিক্ষেপকারী তার উপর কোনো যুলুম করেনি। বরং যে ব্যক্তি লুকিয়ে অন্যের অন্দর মহলের দিকে তাকায় সে-ই যুলুম ও খেয়ানতকারী। যে ব্যক্তির সম্ভ্রম এভাবে নষ্ট করা হলো, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ও প্রতাপান্বিত শরিয়ত তার প্রতি পরিচালিত এই
📄 আত্মরক্ষার্থে হত্যার দায়ি
৪৬১ যুলুমের প্রমাণ পাওয়ার পরও তাকে প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেনা। বস্তুত: আল্লাহ তার রসূলের উপর যে শরিয়ত নাযিল করেছেন, সেই অনুসারেই শাসনের ফায়সালা দিয়েছেন। আর মুমিনদের জন্য আল্লাহর শাসনের চেয়ে উত্তম কোনো শাসন নেই।
৩. প্রাণ, সম্পদ ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে হত্যা করা: যে ব্যক্তি কোনো মানুষকে বা পশুকে নিজের বা অন্যের প্রাণ, সম্পদ বা সম্ভ্রম রক্ষার্থে হত্যা করে, তার উপর কোনো শাস্তি বা ক্ষতিপূরণের দায় থাকবেনা। কেননা প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি প্রতিরোধ করা ওয়াজিব। হত্যা না করে যদি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে হত্যা করা তার পক্ষে বৈধ। হত্যা করলে হত্যাকারীর কোনো অপরাধ হবেনা।
মুসলিম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট এসে বললো: হে রসূলুল্লাহ! কেউ যদি আমার সম্পদ কেড়ে নিতে আসে তাহলে আমি কী করবো? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাকে তোমার সম্পদ দেবেনা। সে বললো: যদি সে আমাকে হত্যা করতে তেড়ে আসে? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তুমিও তাকে হত্যা করতে তার উপর আক্রমণ করো। সে বললো: সে যদি আমাকে মেরে ফেলে? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে তুমি শহীদ। সে বললো: আর যদি আমি তাকে হত্যা করি? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: সে দোযখবাসী।"
ইবনে হাযম বলেছেন: যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ কেড়ে নিতে চায়, চাই সে ডাকাত হোক বা অন্য কেউ হোক, তাকে যদি ঠেকানো সম্ভব হয় ও প্রতিহত করা যায় তাহলে তাকে হত্যা করা বৈধ হবেনা। তখন তাকে হত্যা করলে তার উপর কিসাস কার্যকর হবে। আর যদি ন্যূনতম আশংকাও থাকে যে, ডাকাত তাকে কোনো অবকাশ না দিয়ে হত্যা করবে। তাহলে তাকে হত্যা করা উচিত। এতে তার উপর কোনো দায় বর্তাবেনা। কেননা সে তো কেবল আত্মরক্ষা করেছে।
৪. আত্মরক্ষার্থে হত্যার দাবি: হত্যাকারী যখন দাবি করে যে, সে নিহতকে নিজের প্রাণ সম্পদ বা সম্ভ্রম রক্ষার্থে হত্যা করেছে, সে যদি তার দাবির স্বপক্ষে প্রমাণ বা সাক্ষী উপস্থাপন করতে পারে, তবে তার দাবি গ্রহণ করা হবে এবং তার উপর কিসাস ও দিয়াত রহিত হবে। আর যদি দাবির স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রমাণ দিতে না পারে, তাহলে তার দাবি গৃহীত হবেনা এবং তার ভাগ্য নিহতের উত্তরাধিকারীদের হাতে ন্যস্ত হবে। তারা মাফ করতে চাইলে করবে, নচেত কিসাস আদায় করবে। কেননা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারলে সে দোষী সাব্যস্ত হবেই।
📄 আততয়ের ক্ষতির দায়
নিজের স্ত্রীর সাথে জনৈক বেগানা পুরুষকে পেয়ে উভয়কে হত্যা করেছিল এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আলী রা. কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: সে যদি চারজন সাক্ষী হাজির করতে না পারে (মতান্তরে দু'জন সাক্ষী) তাহলে তাকে নিহতের উত্তরাধিকারীদের নিকট হস্তান্তর করা হবে, যাতে তারা তাকে হত্যা করতে পারে। হত্যাকারী যদি সাক্ষী হাজির
📄 অপরের ক্ষেত্রে শস্য নষ্ট করা
না করে এবং উত্তরাধিকারী স্বীকার করে যে, সে আত্মরক্ষার্থে হত্যা করেছে, তাহলে সে দায়মুক্ত হয়ে যাবে এবং কিসাস ও দিয়াত কোনোটাই তাকে দিতে হবেনা।
সাঈদ বিন মানসূর বর্ণনা করেন: একদিন উমর রা. দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। সহসা এক ব্যক্তি দৌড়ে তার কাছে এলো। তার হাতে তখনো একখানা রক্তাক্ত তরবারী। আর একদল লোক তার পিছু পিছু ছুটে আসছিল। লোকটি এসে উমর রা. এর নিকট বসলো। সেই সাথে অন্যেরাও এলো। তারা বললো: হে আমীরুল মুমিনীন, এই লোকটা আমাদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। উমর রা. তাকে বললেন এরা কী বলছে? সে বললো: হে আমীরুল মুমিনীন, আমি তো আমার স্ত্রীর দুই উরুর উপর তরবারী মেরেছি। দুই উরুর মাঝে যদি কেউ থেকে থাকে, তবে আমি তাকে হত্যা করেছি। উমর রা. তাদেরকে বললেন: সে কী বলছে? তারা বললো: হে আমীরুল মুমিনীন, সে তরবারী দিয়ে আঘাত করেছে। সে আঘাত লোকটির দেহের মাঝখানে ও মহিলার উরুদ্বয়ের উপর পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে উমর রা. লোকটির কাছ থেকে তরবারী নিজ হাতে নিলেন, তরবারীটি দোলালেন এবং তার কাছে দিয়ে বললেন ওরা যদি পুনরায় এরূপ কাজ করে, তবে তুমিও পুনরায় হত্যা করবে।"
বর্ণিত আছে, একদিন ইবনুয যুবাইর রা. সেনাবাহিনী থেকে পেছনে পড়ে রইলেন এবং তার কাছে তার একটা বাদী ছিলো। তখন দুই ব্যক্তি তার কাছে এসে বললো: আমাদেরকে কিছু দাও। তিনি তাদেরকে কিছু খাবার জিনিস দিলেন। তারা উভয়ে বললো : বাঁদীটা আমাদেরকে দিয়ে দাও। তিনি তৎক্ষণাৎ উভয়কে তরবারীর এক কোপে হত্যা করে ফেললেন।
ইবনে তাইমিয়া বলেন: হত্যাকারী যদি দাবি করে যে, নিহত ব্যক্তি তার উপর আক্রমণ চালিয়েছিল এবং নিহতের উত্তরাধিকারীরা তা অস্বীকার করে, তাহলে নিহত ব্যক্তি যদি সৎ লোক হিসেবে পরিচিত থেকে থাকে এবং তাকে সে সন্দেহাতীতভাবে হত্যা করে থাকে, তাহলে হত্যাকারীর কথা গৃহীত হবেনা। আর যদি নিহত ব্যক্তি পাপী হিসেবে এবং হত্যাকারী সৎ লোক হিসেবে খ্যাত থেকে থাকে, তাহলে হত্যাকারী কসম খেয়ে যা বলবে, সেটাই গ্রহণ করা হবে। বিশেষতঃ সে যদি এই ঘটনার আগেই পরিচিত থেকে থাকে।
৫. আগুনের ক্ষতির দায়: যদি কেউ অভ্যাস মোতাবেক বাড়িতে আগুন জ্বালায়। কিন্তু বাতাসে আগুন স্থান থেকে স্থানান্তরে চলে যাওয়ায় জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে সে জন্য সে দায়ী হবেনা।
বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনে আগুন জ্বালালো। অতঃপর আগুনের একটা অংশ উড়ে এক প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে তার কিছু সম্পদের ক্ষতি সাধন করলো। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আব্দুল আযীয বিন হুসাইনকে ঘটনাটা জানিয়ে চিঠি লিখলো। আব্দুল আযীয জবাবে লিখলেন রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: বাকশক্তিহীন প্রাণী দায়মুক্ত। আমি মনে করি আগুনও দায়মুক্ত।
৬. অপরের ক্ষেতের শস্য নষ্ট করা কেউ যদি নিজের যমীতে সেচ দিতে গিয়ে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করে এবং তাতে পার্শ্ববর্তী যমীর ফসল নষ্ট