📄 গবাদি পশু কর্তৃক নষ্ট করা ফলাদির ক্ষতি পূরণ
বাজারে বেঁধে রাখে এবং সে পা বা হাত দিয়ে দলিত মথিত করে, তবে সে ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। -দার কুতনি।
ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: জন্তুকে যেভাবে রাখা উচিত, সেভাবে রাখলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবেনা। কিন্তু যেভাবে রাখা উচিত, সেভাবে না রাখলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
গবাদি পশু কর্তৃক নষ্ট করা ফসলাদির ক্ষতিপূরণ
মালেকি, শাফেয়ি ও অধিকাংশ হেজাযী ফকিহসহ অধিকাংশ আলেমের মতে গবাদি পশু দিনের বেলায় মালিক ব্যতীত অন্য কারো জান ও মালের ক্ষতি করলে মালিককে তার কোনো ক্ষতিপূরণের দায় বহন করতে হবেনা। কেননা জনগণের সুবিদিত প্রথা হলো, দিনের বেলায় প্রাচীর ও বাগানের মালিকরা বাগানের রক্ষণাবেক্ষণ করে আর গবাদি পশুর মালিকগণ তাদের পশুদেরকে দিনের বেলা অবাধে বিচরণ করার সুযোগ দেয় এবং রাতের বেলায় গোয়ালে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি এই প্রথা লঙ্ঘন করে, সে রক্ষণাবেক্ষণের নিয়মবহির্ভূত কাজ করে এবং ক্ষতিকর তৎপরতায় লিপ্ত হয়।
উপরোক্ত বিধি শুধু সেই গবাদি পশুর উপর প্রযোজ্য, যার মালিক তাদের সাথে থাকেনা। পক্ষান্তরে যেসব পশুর সাথে তাদের মালিক, চালক বা আরোহী থাকে, তাদের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের দায় মালিক, চালক বা আরোহীকে বা যার কাছে পশুগুলো অবস্থান করে তাকে বহন করতে হবে, চাই জন্তু তার পা দিয়ে, হাত দিয়ে বা মুখ দিয়ে ক্ষতি সাধন করুক। এই মতের স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে মালেক বর্ণিত এই হাদীস পেশ করা হয় যে বারা ইবনে আযেবের রা. উটনি এক ব্যক্তির বাগানে ঢুকে ক্ষতি সাধন করলে রসূলুল্লাহ সা. ফায়সালা করলেন যে, বাগানের মালিকদের দায়িত্ব দিনের বেলা বাগানের রক্ষণাবেক্ষণ করা, আর রাতের বেলা পশুদের দ্বারা ফসলের যে ক্ষতি সাধিত হয়, পশুর মালিকরা তার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। মালেকি ফকিহ সাহনুনের মতে, এ হাদিস মদিনার ন্যায় প্রাচীর বেষ্টিত বাগানের এলাকায় প্রযোজ্য। আর যেসব দেশে উন্মুক্ত বাগান ও ফসলের ক্ষেত বিদ্যমান, সেখানে পশুর মালিকরা পশুর সাধিত ক্ষতিপূরণ করতে বাধ্য থাকবে, চাই তা রাতেই হোক বা দিনেই হোক। আর হানাফি ফকিহদের মত হলো, পশুর সাথে তার মালিক না থাকলে পশুর সাধিত ক্ষয়ক্ষতির দায় কারো উপর থাকবেনা, চাই তা দিনে হোক বা রাতে হোক। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "অবলা পশুর আঘাত দায়মুক্ত।" হানাফিগণ পশুর আঘাতের উপর তার যাবতীয় কর্মকান্ডকে কেয়াস করেন এবং সকল কর্মকাণ্ডকেই দায়মুক্ত গণ্য করেন।
পক্ষান্তরে পশুর মালিক যদি পশুর সাথে থাকে, তাহলে দেখতে হবে, সে পশুকে পেছন থেকে হাঁকায়, না সামনে থেকে টেনে নেয় বা আরোহী হয়ে চালায়। যদি পেছন থেকে হাঁকিয়ে নিয়ে যায়, তবে সে সর্বাবস্থায় ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। আর যদি টেনে নেয় বা আরোহী হয়ে চালায়, তবে মুখ ও সামনের পা দিয়ে সাধিত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেনা।
অধিকাংশ ফকিহ তাদের মতের স্বপক্ষে বলেন: হানাফি ফকিহগণ যে হাদীস দ্বারা প্রমাণ দেন, তা একটা সাধারণ হাদীস, যার প্রয়োগক্ষেত্র অনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, এ বিধিটি কৃষিক্ষেত্রের ফসল ও শস্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যান্য জিনিস সম্পর্কে ইবনে কুদামা বলেন:
📄 পাখি কর্তৃক বিনষ্ট জিনিসের ক্ষতি পূরণ
পশু যদি ক্ষেতের ফসল ছাড়া অন্য কিছু নষ্ট করে। তবে তার মালিক তার দায় বহন করতে বাধ্য থাকবেনা, চাই তা রাতে হোক বা দিনে হোক, যতক্ষণ না ঐ ক্ষতিতে তার কোনো হাত থাকে। তবে তার হাত থাকলে ভিন্ন কথা।
শুরাইহ সম্পর্কে জানা যায়, একটি ছাগল রাত্রিকালে এক ব্যক্তির বাগানের ভেতরে ঢুকে ক্ষতি সাধন করলে তিনি তার ক্ষতিপূরণের পক্ষে রায় দেন। এর প্রমাণস্বরূপ শুরাইহ সূরা আম্বিয়ার ৮৭ নং আয়াত উদ্ধৃত করেন, যাতে একটি গোত্রের মেষপাল রাত্রিকালে এক কৃষকের ক্ষেতে ঢুকে তার ক্ষতি সাধন করলে হযরত দাউদ ও সুলায়মান আ. মেষপালের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
সাওরি বলেন: দিনে হলেও ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। কেননা সে পশুকে ছেড়ে দিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে।
কিন্তু আমাদের মত হলো, অবলা পশুর ক্ষতি দায়মুক্ত- একথা স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা. ঘোষণা করেছেন। তাই এ ক্ষেত্রে কেউ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য নয়। আয়াতে যে কথা বলা হয়েছে, তা রাতের বেলায় পশুর বিচরণের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর ঐ ঘটনাটা ছিলো ক্ষেতের ফসল সংক্রান্ত, যা স্বভাবসুলভভাবেই পশু নষ্ট করে থাকে এবং তা খেতে আগ্রহী হয়। ফসল ব্যতীত অন্যান্য জিনিস সে খেতে আগ্রহী হয়না। কাজেই ফসল ও অ-ফসলকে একই বিধির আওতায় আনা ঠিক নয়।
পাখি কর্তৃক বিনষ্ট জিনিসের ক্ষতিপূরণ কোনো কোনো ফকিহর মতে, মৌমাছি, কবুতর, মোরগ-মুরগী, পাখি ও হাস চতুষ্পদ জন্তুর মতোই। এগুলোকে যদি কেউ পোষ মানায় ও দিনের বেলা ছেড়ে দেয়, আর তখন তারা যদি কোনো শস্য দানা খুটে খায়, তবে তার জন্য কেউ দায়ী হবেনা। কেননা এগুলোকে ছেড়ে রাখাই প্রচলিত রীতি। কোনো কোনো ফকিহর মতে, যে ব্যক্তি ছেড়ে দেয়, সে ক্ষতির জন্য দায়ী ও ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। অনুরূপ, যখন কেউ কোনো পাখিকে শিকার ধরার প্রশিক্ষণ দেয় যে বাজপাখি এবং মানুষের পশুপাখি মারে, তবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ মতটি বিশুদ্ধ।
📄 বিড়াল ও কুকুরের ক্ষতির প্রতিকার
বিড়াল ও কুকুরের ক্ষতির প্রতিকার 'আলমুগনি' গ্রন্থে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি একটি দংশনকারী কুকুর লালন করলো ও পোষ মানালো, অতঃপর তাকে ছেড়ে দিলো, আর সেই সুযোগে কুকুরটি কোনো মানুষকে বা জীবজন্তুকে কামড়ালো অথবা কোনো মানুষের কাপড় কামড়ে ছিঁড়ে দিলো, সে কুকুর যে ক্ষতি সাধন করে, তার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। কেননা সে কুকুর পালনে সীমা অতিক্রম করেছে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি তার বাড়িতে তার অনুমতি ব্যতিরেকে ঢুকে পড়ে এবং কুকুর তাকে কামড়ায়, তাহলে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেনা। কেননা সে অন্যের বাড়িতে প্রবেশের নিয়ম লঙ্ঘন করে কুকুরের হামলা ও কামড়ের কারণ ঘটিয়েছে। আর যদি কুকুরের মালিকের অনুমতি নিয়ে ঢুকে থাকে, তাহলে সে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। কেননা মালিক এই ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছে। তবে কুকুর যদি কামড়ানো ছাড়া অন্য কোনো ক্ষতি সাধন করে, যেমন কারো পানাহারের পাত্র জিভ দিয়ে ফিক্স সুন্নাহ ২য় খণ্ড ফর্মা নং-৫৮
📄 কোন্ কোন্ জন্তু হত্যা করা যাবে এবং কোন্ জন্তু হত্যা করা যাবে না
চাটে কিংবা পেশাব পায়খানা করে। তবে কুকুরের পালক সে জন্য দায়ী হবেনা। কেননা এটা শুধু দংশনকারী কুকুরের একক বৈশিষ্ট নয়। কাযী বলেন: কেউ যদি এমন বিড়াল পোষে, যা মানুষের পালিত মুরগী ইত্যাদির ছানা খেয়ে ফেলে, তাহলে ঐ ব্যক্তি বিড়ালের ক্ষতির জন্য দায়ী হবে ঠিক যেমন দংশনকারী কুকুরের ক্ষতির জন্য তার মালিক দায়ী হয়ে থাকে। এই ক্ষতি দিনে করুক বা রাতে করুক, তাতে কিছু এসে যায়না। তবে এ ধরনের ক্ষতি সাধন যদি বিড়ালটির অভ্যাস না হয়ে থাকে, তবে তার মালিক তার ক্ষতির জন্য দায়ী হবেনা যেমন কুকুর যদি স্বভাবগতভাবে দংশনকারী না হয়েও ঘটনাক্রমে কাউকে দংশন করে বসে তবে মালিক তার জন্য দায়ী হয়না। আর যদি কামড়ানো স্বভাবধারী কুকুর ও ক্ষতিকর স্বভাবধারী বিড়াল কারো কাছে তার ইচ্ছা ও পোষ মানানোর চেষ্টা ছাড়াই অবস্থান করতে থাকে এবং সেই সুবাদে সে কারো ক্ষতি সাধন করে, তবে ঐ ব্যক্তি তার জন্য দায়ী হবেনা। কেননা এখানে কুকুরটি বা বিড়ালটি নিজেই ক্ষতির কারণ হয়েছে, তার মালিক নয়।
কোন্ কোন্ জন্তু হত্যা করা যাবে এবং কোন্ কোন্ জন্তুকে হত্যা করা যাবেনা
রসূলুল্লাহ সা. যে কটি প্রাণীকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন, সে কয়টি ব্যতীত আর কোনো প্রাণীকে হত্যা করা যাবেনা। হত্যার আদেশ দেয়া প্রাণী কয়টি হলো: কাক, চিল, গিরগিটি, ইঁদুর, সাপ, বিচ্ছু, দংশনকারী কুকুর। এছাড়া ক্ষতিকর হওয়ার দিক দিয়ে এই কটা প্রাণীর সাথে যাদের সাহায্য সাদৃশ্য আছে, সেগুলো যদি আক্রমণ নাও করে, তথাপি সেগুলোকেও হত্যা করা যাবে। সেগুলো হচ্ছে: বাঘ, সিংহ, ভিমরুল ও বোলতা। আয়শা রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. পাঁচটি পাপিষ্ঠ প্রাণীকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন, চাই তারা হারাম শরীকের ভেতরে থাকুক বা বাহিরে থাকুক কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর, দংশনকারী কুকুর।” (বুখারি, মুসলিম) বুখারি ও মুসলিমে উম্মে শুরাইক থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. গিরগিটি হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন এবং একে 'পাপিষ্ঠ ক্ষুদ্র প্রাণী' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এসব প্রাণীকে হত্যা করা হলে সেজন্য কেউ দায়ী হবেনা। অনুরূপ, অন্যান্য হিংস্র প্রাণী এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ হত্যা করাও সর্বসম্মতভাবে দূষণীয় নয়, তা যতোই গৃহপালিত হোক না কেন। কিন্তু বিড়াল যদি আগ্রাসী বা হিংস্র আচরণ না করে, তবে তাকে হত্যা করলে তার মূল্য দিতে হবে। কাঠঠোকরা পাখি, পিপড়ে, মৌমাছি ও ব্যাঙ হত্যা করা যাবেনা। কেননা এদের দ্বারা সচরাচর কোনো ক্ষতি সাধিত হয়না। নাসায়ি ইবনে আমর থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি চড়ুই পাখি বা তার চেয়ে বড় কোনো পাখিকে সংগত পদ্ধতি ব্যতীত হত্যা করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। জিজ্ঞাসা করা হলো: হে রসূলুল্লাহ, সংগত পদ্ধতি কি? তিনি বললেন: তাকে যবাই করা ও খাওয়া, মাথা কেটে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া নয়।" আর যদি কেউ অন্যায়ভাবে এগুলোকে হত্যা করে, তবে সে যেন আল্লাহর নিকট তওবা করে। তবে তাকে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবেনা। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. চারটা প্রাণী: পিপড়ে, মৌমাছি, কাঠঠোকরা ও সারাদ (পাখি বিশেষ) হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।