📄 দিয়াত পরিশোধের পর হত্যা
জায়গার হাড় ভুলক্রমে ভেঙ্গে দেয়, অত:পর আহত ব্যক্তি সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে দিয়াত দিতে হবেনা। আর যদি সুস্থ হতে কিছু বাকি থাকে, অথবা এমন দিয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়, যাতে দিয়াত হ্রাস পায়, তাহলে যে পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে, সেই অনুপাতে তার দিয়াত ওয়াজিব হবে। ঐ হাড়টি যদি এমন হয়, যার সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. নির্দিষ্ট দিয়াত ধার্য করেছেন, তাহলে রসূলুল্লাহ সা. যে পরিমাণ দিয়াত ধার্য করেছেন, সেই হিসাবে দিয়াত দিতে হবে। আর যদি রসূলুল্লাহ সা. এর ধার্যকৃত দিয়াতের অন্তর্ভুক্ত না হয় এবং সে ব্যাপারে কোনো সুন্নতও প্রচলিত না থাকে এবং কোনো নির্দিষ্ট দিয়াতও প্রচলিত না থাকে, তাহলে তা নিয়ে ইজতিহাদ বা গবেষণা করতে হবে। (আহত ব্যক্তি সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে গেলে দিয়াত দিতে হবেনা এটা আবু হানিফার মাযহাব। কেননা আহত ব্যক্তির ব্যথা পাওয়া ছাড়া কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয়নি। শুধু ব্যথা পাওয়ার কোনো মূল্য দেয়া যায়না। এটা কাউকে মনে কষ্ট দেয়ার মতো তিরস্কার করা বা গালি দেয়ার সাথে তুলনীয়। কেননা গালি ও তিরস্কারের কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান নেই। অবশ্য গালিদাতা বা তিরস্কারকারী শাস্তি থেকে রেহাই পাবেনা। তাকে তাযীর বা কিসাস নিতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফের মতে, অপরাধীর উপর মনে কষ্ট দেয়ার একটা কিছু দিয়াত বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যা কোনো ন্যায়পরায়ণ শালিস নির্ধারণ করবে। ইমাম মুহাম্মদের মতে, অপরাধীকে চিকিৎসকের ফি ও ওষুধের মূল্য দিতে হবে।)
বিবাদরত জনগোষ্ঠীর মধ্যে যখন লাশ পাওয়া যায় একটি জনগোষ্ঠী যখন পরস্পর বিবাদ বিসম্বাদে লিপ্ত হয়, অতঃপর তাদের মাঝে কোনো লাশ পাওয়া যায় এবং হত্যাকারী সনাক্ত করা না যায়, তখন তাতে দিয়াত দিতে হবে। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যখন পাথর মারামারি, বেত চালাচালি বা লাঠি দিয়ে মারামারি হয় এবং তাতে কেউ মারা যায়, তবে সেটি ভুলক্রমে সংঘটিত হত্যার আওতাভুক্ত। এই হত্যার দিয়াত ভুলবশতঃ হত্যার দিয়াতের মতোই। আর যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়, সে কিসাসযোগ্য। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত হত্যার কিসাসে বাধা দেবে, তার উপর আল্লাহর অভিশাপ ও গযব। সে যত নফল বা ফরয ইবাদত করুক, কিছুই গৃহীত হবেনা।
এখন কার উপর দিয়াত ধার্য হবে, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে।
আবু হানিফা বলেন: যে গোত্রে লাশ পাওয়া গেছে, নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা যদি সেই গোত্র ছাড়া আর কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ না তোলে, তাহলে সেই গোত্রের উপরই দিয়াত ধার্য হবে। ইমাম মালেক বলেন: ঐ গোত্রের সাথে যারা বিরোধে লিপ্ত তাদের উপর দিয়াত ধার্য হবে।
ইমাম শাফেয়ির মতে, উত্তরাধিকারীরা যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, তাহলে তাদের সকলের উপর 'কাসামা' পদ্ধতিতে দিয়াত বণ্টিত হবে। নচেত কোনো কিসাসও হবেনা, দিয়াতও নয়।
ইমাম আহমদ বলেন: নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে, তবে কাসামা হবে। নচেত অন্যদের পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর দিয়াত আরোপিত হবে।
📄 পারস্পারিক সংঘর্থে দুই লড়াকু নিহত হলে
৪৪৪ ফিস্সুন্নাহ
ইবনে আবি লায়লা ও আবু ইউসুফ বলেছেন: বিবাদমান উভয় গোষ্ঠীর উপর একই সাথে দিয়াত আরোপিত হবে। আওযায়ি বলেন: বিবাদমান গোষ্ঠীদ্বয় ব্যতীত অন্য কারো বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে তার উপর কিসাস ও দিয়াত ধার্য হবে। নচেত উভয় গোষ্ঠীর উপর দিয়াত ধার্য হবে।
দিয়াত পরিশোধের পর হত্যা নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী দিয়াত গ্রহণের পর তার আর হত্যাকারীকে হত্যা করা বৈধ নয়। আবু দাউদ জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি দিয়াত গ্রহণের পর হত্যা করে, তার যেন সম্পদ বৃদ্ধি না হয় এবং সে যেন স্বয়ম্ভর না হয়।” দার কুতনি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি নিহত বা আহত হয়, তার তিন উপায়ে প্রতিকারের স্বাধীনতা রয়েছে। সে যদি এ ছাড়া চতুর্থ কোনো উপায় অবলম্বন করতে চায়, তবে তোমরা তাকে প্রতিহত করো। তিনটে উপায় হচ্ছে: হয় সে কিসাস নেবে, নয়তো ক্ষমা করবে, নচেত দিয়াত গ্রহণ করবে। এ তিনটার যে কোনো একটা গ্রহণ করার পর যদি সে সীমা লঙ্ঘন করে, তবে তার জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম।
এরপর যে ব্যক্তি হত্যাকারীকে হত্যা করবে, আলেমদের মধ্যে কতক বলেন: সে প্রথম হত্যাকারীর মতো। উত্তরাধিকারী ইচ্ছা করলে তাকে হত্যা করতে পারবে, অথবা ক্ষমা করতে পারবে এবং তা সত্ত্বেও আখেরাতে তার জন্য আযাব রয়েছে। আবার কেউ বলেন: তাকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে। শাসক উত্তরাধিকারীকে ক্ষমা করার অধিকার দিতে পারবে না। আবার কেউ বলেন: তার ব্যাপার শাসকের হাতে ন্যস্ত করা হবে। তিনি যা ভালো বুঝবেন করবেন।
পারস্পারিক সংঘর্ষে দুই লড়াকু নিহত হলে ইমাম আবু হানিফা ও মালেক বলেন: দুই লড়াকু সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে উভয়ে মারা গেলে উভয়ের জন্য দিয়াত দিতে হবে এবং একজনের পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর অপরজনের দিয়াত ওয়াজিব হবে। ইমাম শাফেয়ি বলেন: উভয়ের উপর অপরজনের দিয়াতের অর্ধেক ওয়াজিব হবে। কেননা উভয়ে নিজের কৃতকর্ম ও প্রতিদ্বন্দ্বির কৃতকর্মের কারণে মৃত্যু বরণ করেছে।
📄 পালিত পশুর ক্ষতির প্রতিভাষ্য
পালিত পশুর ক্ষতির প্রতিকার কোনো পশু যদি তার হাত, পা বা মুখ দ্বারা কারো কোনো ক্ষতি সাধন করে, তাহলে ইমাম শাফেয়ি, ইবনে আবি লায়লা ও ইবনে শাবরামার মতে পশুর মালিক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু ইমাম মালেক, লায়েস ও আওযায়ির মতে পশুর আরোহী বা চালকের পক্ষ থেকে যদি প্রহার বা প্ররোচনামূলক কোনো কারণ না ঘটানো হয়, তবে সে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেনা। কিন্তু যদি তার দিক থেকে কোনো কারণ ঘটানো হয়ে থাকে, যেমন তাদের কেউ পশুটিকে কোনো ধরনের উস্কানি দিয়েছে এবং তার ফলে সে কোনো জিনিস নষ্ট করেছে। তাহলে নষ্টকৃত জিনিসের ক্ষতিপূরণ দিতে সে বাধ্য থাকবে। আর এটা যদি এমন কোনো অপরাধ হয়, যার জন্য কিসাস ওয়াজিব হয় এবং
📄 চালক ও আরোহী কর্তৃক জন্তুর ক্ষতির প্রতিকার
উস্কানিটাও ইচ্ছাকৃত হয়, তাহলে এতে কিসাস দিতে হবে। কেননা এ ক্ষেত্রে পশুটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর যদি উস্কানিটা অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে থাকে, তাহলে এতে পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর দিয়াত ওয়াজিব হবে। আর নষ্ট হওয়া জিনিস যদি কোনো সম্পদ হয় তাহলে অপরাধীর সম্পত্তি থেকেই জরিমানা দেয়া হবে। ইমাম আবু হানিফা বলেন : কোনো মানুষ তার পশুর পিঠে আরোহী থাকা অবস্থায় যদি পশুটি অন্য কোনো মানুষকে পেছনের পা দিয়ে লাথি মারে, তাহলে কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া লাগবেনা। আর যদি সামনের পা দিয়ে আঘাত করে, তাহলে আরোহী তার জন্য দায়ী হবে। কেননা সে সামনের দিক থেকে তাকে ফেরাতে পারে। পেছনের দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। আর যখন কোনো পশুকে চালাতে গিয়ে তার পিঠের উপর থেকে জিন বা লাগাম বা যার উপর মালপত্র বহন করা হয় তা পড়ে যাওয়ায় কোনো মানুষের ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে চালক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। আর যদি কোনো ব্যক্তি কোনো পশুর উপর আরোহণ করে, অতঃপর অন্য কেউ পশুটাকে প্রহার করে বা গুতো দিয়ে উত্তেজিত করে, ফলে সে কোনো মানুষকে লাথি মারে অথবা ছুটে যাওয়ার সময় কাউকে আঘাত করে ও আঘাত করে হত্যা করে, তাহলে যে ব্যক্তি পশুটাকে গুতো দিয়ে উত্তেজিত করেছিল সে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে, আরোহী নয়। আর যদি পশুটি উস্কানিদাতাকে লাথি মেরে হত্যা করে, তবে এই হত্যার জন্য কেউ দায়ী হবেনা। কেননা এর কারণ সে নিজেই। আর যদি আরোহীকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে, তাহলে যে ব্যক্তি পশুকে উত্তেজিত করেছিল সে দিয়াত দিতে বাধ্য থাকবে। আর পশু যখন রাস্তার উপর চলার সময় পেশাব বা পায়খানা করে এবং তার উপর কোনো মানুষ পা পিছলে আছাড় খেয়ে মারা যায়, তবে এই ক্ষতির দায় কারো উপর বর্তাবেনা। অনুরূপ, পেশাব বা পায়খানার জন্য পশুকে বেঁধে রাখার পর এরূপ ঘটনা ঘটলেও একই বিধি কার্যকর হবে।
চালক ও আরোহী কর্তৃক জন্তুর ক্ষতির প্রতিকার যখন জন্তুর আরোহী বা চালক থাকে এবং সেই অবস্থায় পশু কারো ক্ষতি সাধন করে, তখন উক্ত আরোহী বা চালককে উক্ত ক্ষতিপূরণের দায় বহন করতে হবে। জনৈক ব্যক্তি নিজের ঘোড়া দাবড়ানোর কারণে এক ব্যক্তি পদদলিত হয়ে মারা গেলে উমর রা. তার উপর দিয়াত আরোপ করেন। যাহেরি মাযহাবের ফকিহগণের মতে, এ ক্ষেত্রে চালক বা আরোহীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবেনা। কারণ রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: অবলা প্রাণীর আঘাত দায়মুক্ত, কুয়া দায়মুক্ত ও খনি দায়মুক্ত।" তবে যাহেরি মাযহাবের ফকিহদের এই হাদিস থেকে প্রমাণ দর্শানোর সুযোগ থাকে তখন, যখন জন্তুর কোনো চালক বা আরোহী থাকেনা। সে ক্ষেত্রে জন্তু যত ক্ষতিই করুক, সর্বসম্মতভাবে তার জন্য কেউ দায়ী নয়।