📄 নিষিদ্ধ মাসে নিষিদ্ধ শহরে ও আপনজনের বিরুদ্ধে আক্রমণে ভারি দিয়াত
দ্বারা হত্যা করলে তাতে ভারী দিয়াত দিতে হবে : অর্থাৎ একশোটি উটনি, তন্মধ্যে চল্লিশটি ৬ষ্ঠ বছরে পদার্পণকারী থেকে নবম বছরে পদার্পণকারী, যার সবই গর্ভবতী। ভারী দিয়াত উটনি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয়না। কেননা শরিয়তের বিধান এভাবেই রচিত হয়েছে। এখানে কোনো চিন্তাগবেষণার অবকাশ নেই। যেভাবে শ্রুত হয়েছে সেভাবে পালন করতে হবে। এটা সে সব বিধির অন্তর্ভুক্ত, যা অটল ও অকাট্য।
নিষিদ্ধ মাসে নিষিদ্ধ শহরে ও আপন জনের বিরুদ্ধে আক্রমণে ভারী দিয়াত ইমাম শাফেয়ি প্রমুখের মতে হত্যা ও জখম উভয় ক্ষেত্রে ভারী দিয়াত ধার্য হবে, যদি অপরাধটি নিষিদ্ধ শহরে, নিষিদ্ধ মাসে ও রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের উপর সংঘটিত হয়। কেননা শরিয়ত এই নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে কঠোরতর নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছে। তাই অপরাধ গুরুতর হওয়ায় দিয়াতও গুরুতর হবে।
উমর, কাসেম বিন মুহাম্মদ ও ইবনে শিহাব থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এসব ক্ষেত্রে দিয়াতে এক তৃতীয়াংশ পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে। কিন্তু আবু হানিফা ও মালেকের মতে, এসব কারণে দিয়াত ভারী দিয়াতে পরিণত হবেনা। কেননা ভারী দিয়াতে পরিণত করার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। দিয়াত হচ্ছে শরিয়ত প্রণেতার সিদ্ধান্তনির্ভর। যে অপরাধ ভুলক্রমে ঘটে, তাতে দিয়াতকে ভারী দিয়াতে পরিণত করা শরিয়তের মূলনীতির পরিপন্থি।
📄 দিয়াত কার উপর ওয়াজিব
দিয়াত কার কার উপর ওয়াজিব হত্যাকারীর উপর বাধ্যতামূলকভাবে আরোপিত দিয়াত দু'প্রকার: ১. অপরাধীর সম্পদের উপর আরোপিত দিয়াত। ইবনে আব্বাস বলেন: “হত্যাকারীর পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা ইচ্ছাকৃত হত্যায় আত্মস্বীকৃত হত্যার ও ইচ্ছাকৃত হত্যার আপোষ মীমাংসায় কোনো দায় বহন করবেনা।" ইবনে আব্বাসের এই মতের বিরোধিতা কোনো সাহাবি করেননি।
ইবনে শিহাব থেকে মালেক বর্ণনা করেন: "ইচ্ছাকৃত হত্যায় যখন নিহতের উত্তরাধিকারীরা কিসাস মাফ করে দেয় তখন শুধুমাত্র হত্যাকারীর সম্পদের উপরই দিয়াত আরোপিত হয়ে থাকে। এটা চিরাচরিত রীতি। তবে পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা যদি স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে তাকে সাহায্য করে, তবে সেটা ভিন্ন কথা।"
পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দেরকে নিম্নলিখিত তিন ধরনের অবস্থার কোনোটিতেই দিয়াত দিতে হবেনা: ইচ্ছাকৃত হত্যায়, আত্মস্বীকৃত হত্যায় এবং হত্যার পর সন্ধি হলে দিয়াত দিতে হবেনা। কেননা ইচ্ছাকৃত হত্যায় শাস্তি অবধারিত। তাই পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা হত্যাকারীর পক্ষ থেকে দিয়াতের কোনো অংশ বহন করার মাধ্যমে তাকে ছাড় দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। অনুরূপ আত্মস্বীকৃত হত্যায়ও পিতৃসম্পর্কীয় কারণে ওয়াজিব হয়, খোদ হত্যার কারণে নয়। স্বীকারোক্তি এমন একটা প্রমাণ, যা শুধু স্বীকারোক্তিকারীর উপরই দিয়াত আরোপ করে, অন্য কারো উপর নয়। পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা সন্ধির মাধ্যমে স্বীকারোক্তির ক্ষেত্রেও দিয়াত দিতে বাধ্য নয়। কারণ সন্ধিতে যে বিনিময় দিতে হয়, তা হত্যার কারণে ওয়াজিব হয়না। বরং ওয়াজিব হয় সন্ধি চুক্তির কারণে। তাছাড়া স্বীকারোক্তির মাধ্যমে অপরাধী নিজেই তার অপরাধের দায় স্বীকার করে। তাই নিহত প্রাণের ক্ষতিপূরণ হন্তার উপরই বর্তায়।
📄 অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিয়াত
২. আরেক ধরনের দিয়াত হচ্ছে যা হত্যাকারীর উপর ওয়াজিব হয় এবং তার পক্ষে তা বহন করে পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা সহযোগিতা হিসেবে। এটা হচ্ছে আধা ইচ্ছাকৃত হত্যা ও অনিচ্ছাকৃত বা ভুলবশত: হত্যা (অপ্রাপ্তবয়স্ক ও পাগলের ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াতও তাদের পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর ওয়াজিব হয়। কিন্তু কাতাদা, আবু সাওর, ইবনে আবি লায়লা ও ইবনে শাবরুমা বলেছেন: আধা ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত অপরাধীর সম্পদ থেকেই দেয়া হবে। তবে এই শেষোক্ত মতটি দুর্বল।) এ ক্ষেত্রে হত্যাকারী পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দেরই অন্তর্ভুক্ত। কেননা সে হত্যাকারী। কাজেই তাকে এ দলের বহির্ভূত করার কোনো অর্থ হয়না। ইমাম শাফেয়ি বলেন: ভুলবশত হত্যাকারীর উপর দিয়াতের কোনো অংশ ওয়াজিব হয়না। কেননা সে ক্ষমার যোগ্য।
পিতৃসম্পর্কীয় যে আত্মীয়দের উপর আধা ইচ্ছাকৃত হত্যা ও ভুলবশত: হত্যার দিয়াত ওয়াজিব হয়। তাদের মধ্যে কেবল প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক ও সচ্ছল পুরুষ আত্মীয়রাই অন্তর্ভুক্ত। বিত্তশালী অন্ধ বিকলাঙ্গ ও বৃদ্ধ ব্যক্তিত্ত এর আওতাভুক্ত। মহিলা, দরিদ্র, অপ্রাপ্তবয়স্ক, অসুস্থ মস্তিষ্ক ও অপরাধীর ধর্মের বিরোধিরা এদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা এর ভিত্তিই হলো সাহায্য। অথচ এই সকল লোক সাহায্য করার যোগ্য নয়।
পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর দিয়াত আরোপের সূত্রপাত কিভাবে হলো, সে সম্পর্কে বুখারি ও মুসলিম আবু হুরায়রা থেকে নিম্নোক্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। রসূল সা. এর আমলে হুযাইল গ্রোত্রের দু'জন মহিলা মারামারি করলো। মারামারিতে একজন আরেকজনকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করে ফেললো। মহিলা তার গর্ভস্থ সন্তানসহই মারা গেলো। তখন রসূলুল্লাহ সা. মহিলার দিয়াত তার পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর অর্পণ করলেন। রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয় বলতে হত্যাকারীর গোটা গোত্রকেই বুঝানো হতো। উমর রা. এর আমল পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। অবশেষে যখন সেনাবাহিনী ও বেসরকারি প্রশাসন পুরোমাত্রায় গঠিত হলো। তখন বেসরকারী প্রশাসনের উপরই দিয়াতের দায় অর্পিত হলো। অথচ রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে এর বিপরীত ব্যবস্থা চালু ছিলো। উমর রা. যে ব্যবস্থা চালু করলেন, তার সমর্থনে সারাখসি বলেন: যদি প্রশ্ন করা হয়, কিভাবে রসূলূল্লাহ সা. এর ফায়সালার পরিপন্থি ব্যবস্থায় সাহাবীগণ একমত হয়ে গেলেন? তবে এর জবাবে বলবো এটা রসূলুল্লাহ সা. এর সিদ্ধান্তের সমন্বয়ের উপর সাহাবীদের মতৈক্য। কেননা তারা জানতেন, রসূলুল্লাহ সা. গোত্রের নিকট দিয়াতের ভার অর্পণ করেছেন কেবল এ জন্য যে, এতে কিছু সাহায্য পাওয়া যাবে। আর সেকালে মানুষ তার গোত্রের মাধ্যমেই শক্তি ও সাহায্য লাভ করতো। পরে যখন উমর রা. রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থাকে সংগঠিত করলেন, তখন যাবতীয় শক্তির উৎস হয়ে উঠলো রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এই পর্যায়ে গড়ালো যে, লোকেরা নিজ প্রশাসনের পক্ষ হয়ে নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতো। এটা হানাফিদের অভিমত। কিন্তু মালেকি ও শাফেয়িগণ এই মত প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ রসূলুল্লাহ সা. এর পরে শরিয়তের প্রতিষ্ঠিত কোনো বিধি রহিত করার সুযোগ নেই। রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে যে সকল বিধিব্যবস্থা কার্যকর ছিলো, তা পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই।
পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর যে দিয়াত ওয়াজিব হয়, আলেমদের সর্বসম্মত মতানুসারে তা তিন বছরে পরিশোধ করা যায়। কিন্তু যে দিয়াত হত্যাকারীর সম্পদ থেকে দেয়া ওয়াজিব, তা ইমাম শাফেয়ির মতে তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। হানাফিদের মতে, এটাও
📄 অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপকারিতা বা বাবদ দিয়াত
ভুলবশত: সংঘটিত হত্যার দিয়াতের মতো তিন বছরে পরিশোধযোগ্য। আধা-ইচ্ছাকৃত ও ভুলবশত: হত্যার দিয়াত পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর ওয়াজিব করাটা ইসলামের সাধারণ মূলনীতির ব্যতিক্রম। মূলনীতিটি হলো: মানুষ শুধু তার নিজের কাজের জন্য দায়ী এবং নিজের কার্যকলাপের জন্যই তাকে হিসেব দিতে ও জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ বলেন:
. وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى “কেউ অন্য কারো ভার বহন করবেনা।" আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : "কাউকে তার পিতার বা ভাই এর পাপের জন্য দায়ী করা হবেনা।" -নাসায়ী।
পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দেরকে এ ক্ষেত্রে দিয়াতে অংশ গ্রহণের বিধান ইসলাম শুধু অপরাধীর প্রতি সহানুভূতি ও তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই জারি করেছে। কেননা সে এমন একটি অপরাধে জড়িত, যা সে ইচ্ছাকৃতভাবে করেনি। এটা ঐতিহ্যবাহী আরবীয় সমাজব্যবস্থা বহাল রাখার জন্যই করা হয়েছে। সেখানে প্রতিটি গোত্রের অভ্যন্তরে যে পারস্পরিক সাহায্য, সহযোগিতা ও অংশিদারিত্ব বিরাজ করতো, তার পরিপ্রেক্ষিতে এটা ছিলো উক্ত সমাজব্যবস্থার বাস্তব দাবি। এর যৌক্তিকতা সুস্পষ্ট। গোত্র যখন উপলব্ধি করবে যে, গোত্রের কোনো সদস্য দ্বারা এ অপরাধ সংঘটিত হলে সমগ্র গোত্রকে তার দিয়াতের ভার বহনে শরিক হতে হবে, তখন গোত্র সর্বদা সচেষ্ট থাকবে তার আওতাধীন প্রতিটি লোককে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত রাখতে এবং তাদেরকে এমন নির্মল জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করবে যা তাদেরকে ভুলভ্রান্তি থেকে মুক্ত রাখবে।
ফকিহদের অধিকাংশের মত হলো, পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা ভুলবশত: সংঘটিত অপরাধের দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশের অতিরিক্ত দায়িত্ব নেবে, আর এক-তৃতীয়াংশের কম হলে তা অপরাধীর সম্পত্তি থেকে দেয়া হবে। (ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: অপরাধ ছোট হোক বা বড় হোক, ভুলবশত:কৃত অপরাধের দিয়াত পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দেরকেই পুরো বহন করতে হবে। অনুরূপ ইচ্ছাকৃত অপরাধের দিয়াত পুরোপুরি অপরাধীর সম্পত্তি থেকেই দেয়া হবে, তা কম হোক বা বেশি হোক।)
মালেক ও আহমদ রা. এর মতে, পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের কারো উপর দিয়াতের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ ওয়াজিব হয়না। শাসক চেষ্টা করবেন তাদের প্রত্যেকের উপর ততখানি আরোপ করতে, যতখানি তার পক্ষে দেয়া সহজ হয়। আর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দিয়ে শুরু করবেন এবং তারপর অবশিষ্টদের মধ্যে যেজন ঘনিষ্ঠতর, তারপর যেজন ঘনিষ্ঠতর, এভাবে পর্যায়ক্রমে বণ্টন করবেন।
ইমাম শাফেয়ি বলেন: পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে ধনীর উপর এক দিনার, দরিদ্রের উপর আধা দিনার। তার মতে, দিয়াত আত্মীয়দের উপর তাদের ঘনিষ্ঠতা অনুযায়ী ধার্য হবে। সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ হলো বাবার সন্তানেরা, তারপর দাদার সন্তানেরা, তারপর বাবার সন্তানদের সন্তানেরা। আর হত্যাকারীর যদি কোনো পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয় বংশের ভেতর বা মিত্রদের ভেতর না থেকে থাকে তাহলে দিয়াতের ভার পড়বে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উপর। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যার কোনো অভিভাবক নেই, তার অভিভাবক আমি।" অনুরূপ অপরাধী যদি দরিদ্র হয় এবং তার পরিবারও যদি দরিদ্র হয় এবং দিয়াত বহনে অক্ষম হয়, তাহলে বাইতুলমাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারই দিয়াতের দায়িত্ব বহন করবে।
যুদ্ধের সময় যদি মুসলমানরা কাউকে কাফের ভেবে হত্যা করে, অত:পর জানা যায় যে,