📄 হালকা ও ভারি দিয়াত
তোমাদের বিরোধের চূড়ান্ত ফায়সালা করবেন। যে ব্যক্তি সেই ফায়সালা মানবেনা সে কিছুই পাবেনা। এখন আমি যে ফায়সালা করছি তা হলো: তোমরা যে সকল গোত্র এই কূপ খনন করেছে তাদের কাছ থেকে একটা দিয়াতের এক চতুর্থাংশ, দিয়াতের এক তৃতীয়াংশ, দিয়াতের অর্ধেক ও একটা পূর্ণ দিয়াত একত্রিত করো। এরপর প্রথম জনের বাবদে এক চতুর্থাংশ দিয়াত দেয়া হবে। কেননা সে তিন জনের উপর থেকে মারা গেছে। আর দ্বিতীয় জনের বাবদে দিয়াতের এক তৃতীয়াংশ। তৃতীয়জনের বাবদে দিয়াতের অর্ধেক এবং চতুর্থ জনের বাবদে পূর্ণ দিয়াত দেয়া হবে।
আলী রা.-এর ফায়সালা শোনার পর তারা রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে যেতে কৃতসংকল্প হলো। রসূলুল্লাহ সা. যখন মাকামে ইবরাহিমে, তখন তারা তাঁর নিকট উপস্থিত হলো। পুরো ঘটনা শোনার পর রসূলুল্লাহ সা. আলীর ফায়সালা সঠিক বলে ঘোষণা করেন।" (আহমদ, আহমদের আরেক বর্ণনার ভাষা হলো, রসূলুল্লাহ সা. যে সকল গোত্র কূপের পাশে ভিড় করেছিল তাদের উপর দিয়াত ধার্য করলেন?)
আলী বিন রাবাহ লাখমির বর্ণনা থেকে জানা যায়, উমর রা. এর খেলাফতকালে জনৈক চক্ষুষ্মান ব্যক্তি জনৈক অন্ধকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলতো। একদিন তারা উভয়ে একটা কুয়ায় পড়ে গেলো। অন্ধ লোকটি চক্ষুষ্মানের উপর পড়লো এবং চক্ষুষ্মান লোকটি মারা গেলো। উমর রা. অন্ধ লোকটির উপর চক্ষুষ্মান লোকটির দিয়াত ধার্য করলেন (যেহেতু তার কারণেই চক্ষুম্মানের মৃত্যু হয়েছে) এ কারণে অন্ধ লোকটি হজ্জের মৌসুমে জনতার সামনে নিজের দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করে কবিতা আবৃত্তি করতো। তাতে সে বলতো: হে জনতা, আমি একটা অন্যায়ের শিকার হয়েছি। একজন অন্ধ কি একজন সুস্থ চক্ষুষ্মান ব্যক্তির হত্যার জন্য দায়ী ও দিয়াত দিতে বাধ্য হতে পারে। তারা দু'জনেই এক সাথে চলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল।" (দার কুতনি) একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: এক ব্যক্তি কিছু সংখ্যক গৃহবাসীর নিকট এসে পিপাসা নিভৃত করতে পানি চাইল। কিন্তু তারা পানি না দেয়ায় লোকটি মারা গেলো। উমর রা. উক্ত গৃহবাসীদের উপর দিয়াত আরোপ করলেন। কেউ যদি আকস্মিকভাবে কারো কাছে গিয়ে বিকট চিৎকার করে এবং তাতে সে মারা যায়, তবে তার উপর দিয়াত ওয়াজিব হবে। আর যদি কণ্ঠস্বর পাল্টে চিৎকার করে কোনো শিশু বা বালককে ভয় দেখিয়ে পাগল বা বেহুঁশ করে, তাহলে চিৎকারকারী ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।
হালকা ও ভারী দিয়াত
দিয়াত দু'রকমের হয়ে থাকে: হালাক ও ভারী। হালকা দিয়াত ভুলবশত সংঘটিত হত্যায় দিতে হয়। আর ভারী দিয়াত দিতে হয় আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডে। আর ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডে নিহতের উত্তরাধিকারীরা কিসাস মাফ করে দিলে শাফেয়ি ও হাম্বলিদের মতে ভারী দিয়াত দিতে হবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত হত্যায় ইমাম আবু হানিফার মতে কোনো দিয়াত দিতে হয়না। তাঁর মতে, দুই পক্ষ আপোষ রফার মাধ্যমে যা স্থির করে সেটা দিতে হয় এবং তা তাৎক্ষণিকভাবেই দিতে হয়, বাকি রাখার অনুমতি নেই। ভারী দিয়াত হচ্ছে একশোটা উট, যার মধ্যে চল্লিশটি গর্ভবতী। আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: জেনে রাখো, ইচ্ছাকৃতভাবে বেত, লাঠি ও পাথর
📄 নিষিদ্ধ মাসে নিষিদ্ধ শহরে ও আপনজনের বিরুদ্ধে আক্রমণে ভারি দিয়াত
দ্বারা হত্যা করলে তাতে ভারী দিয়াত দিতে হবে : অর্থাৎ একশোটি উটনি, তন্মধ্যে চল্লিশটি ৬ষ্ঠ বছরে পদার্পণকারী থেকে নবম বছরে পদার্পণকারী, যার সবই গর্ভবতী। ভারী দিয়াত উটনি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয়না। কেননা শরিয়তের বিধান এভাবেই রচিত হয়েছে। এখানে কোনো চিন্তাগবেষণার অবকাশ নেই। যেভাবে শ্রুত হয়েছে সেভাবে পালন করতে হবে। এটা সে সব বিধির অন্তর্ভুক্ত, যা অটল ও অকাট্য।
নিষিদ্ধ মাসে নিষিদ্ধ শহরে ও আপন জনের বিরুদ্ধে আক্রমণে ভারী দিয়াত ইমাম শাফেয়ি প্রমুখের মতে হত্যা ও জখম উভয় ক্ষেত্রে ভারী দিয়াত ধার্য হবে, যদি অপরাধটি নিষিদ্ধ শহরে, নিষিদ্ধ মাসে ও রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের উপর সংঘটিত হয়। কেননা শরিয়ত এই নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে কঠোরতর নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছে। তাই অপরাধ গুরুতর হওয়ায় দিয়াতও গুরুতর হবে।
উমর, কাসেম বিন মুহাম্মদ ও ইবনে শিহাব থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এসব ক্ষেত্রে দিয়াতে এক তৃতীয়াংশ পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে। কিন্তু আবু হানিফা ও মালেকের মতে, এসব কারণে দিয়াত ভারী দিয়াতে পরিণত হবেনা। কেননা ভারী দিয়াতে পরিণত করার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। দিয়াত হচ্ছে শরিয়ত প্রণেতার সিদ্ধান্তনির্ভর। যে অপরাধ ভুলক্রমে ঘটে, তাতে দিয়াতকে ভারী দিয়াতে পরিণত করা শরিয়তের মূলনীতির পরিপন্থি।
📄 দিয়াত কার উপর ওয়াজিব
দিয়াত কার কার উপর ওয়াজিব হত্যাকারীর উপর বাধ্যতামূলকভাবে আরোপিত দিয়াত দু'প্রকার: ১. অপরাধীর সম্পদের উপর আরোপিত দিয়াত। ইবনে আব্বাস বলেন: “হত্যাকারীর পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা ইচ্ছাকৃত হত্যায় আত্মস্বীকৃত হত্যার ও ইচ্ছাকৃত হত্যার আপোষ মীমাংসায় কোনো দায় বহন করবেনা।" ইবনে আব্বাসের এই মতের বিরোধিতা কোনো সাহাবি করেননি।
ইবনে শিহাব থেকে মালেক বর্ণনা করেন: "ইচ্ছাকৃত হত্যায় যখন নিহতের উত্তরাধিকারীরা কিসাস মাফ করে দেয় তখন শুধুমাত্র হত্যাকারীর সম্পদের উপরই দিয়াত আরোপিত হয়ে থাকে। এটা চিরাচরিত রীতি। তবে পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা যদি স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে তাকে সাহায্য করে, তবে সেটা ভিন্ন কথা।"
পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দেরকে নিম্নলিখিত তিন ধরনের অবস্থার কোনোটিতেই দিয়াত দিতে হবেনা: ইচ্ছাকৃত হত্যায়, আত্মস্বীকৃত হত্যায় এবং হত্যার পর সন্ধি হলে দিয়াত দিতে হবেনা। কেননা ইচ্ছাকৃত হত্যায় শাস্তি অবধারিত। তাই পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা হত্যাকারীর পক্ষ থেকে দিয়াতের কোনো অংশ বহন করার মাধ্যমে তাকে ছাড় দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। অনুরূপ আত্মস্বীকৃত হত্যায়ও পিতৃসম্পর্কীয় কারণে ওয়াজিব হয়, খোদ হত্যার কারণে নয়। স্বীকারোক্তি এমন একটা প্রমাণ, যা শুধু স্বীকারোক্তিকারীর উপরই দিয়াত আরোপ করে, অন্য কারো উপর নয়। পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা সন্ধির মাধ্যমে স্বীকারোক্তির ক্ষেত্রেও দিয়াত দিতে বাধ্য নয়। কারণ সন্ধিতে যে বিনিময় দিতে হয়, তা হত্যার কারণে ওয়াজিব হয়না। বরং ওয়াজিব হয় সন্ধি চুক্তির কারণে। তাছাড়া স্বীকারোক্তির মাধ্যমে অপরাধী নিজেই তার অপরাধের দায় স্বীকার করে। তাই নিহত প্রাণের ক্ষতিপূরণ হন্তার উপরই বর্তায়।
📄 অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিয়াত
২. আরেক ধরনের দিয়াত হচ্ছে যা হত্যাকারীর উপর ওয়াজিব হয় এবং তার পক্ষে তা বহন করে পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা সহযোগিতা হিসেবে। এটা হচ্ছে আধা ইচ্ছাকৃত হত্যা ও অনিচ্ছাকৃত বা ভুলবশত: হত্যা (অপ্রাপ্তবয়স্ক ও পাগলের ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াতও তাদের পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর ওয়াজিব হয়। কিন্তু কাতাদা, আবু সাওর, ইবনে আবি লায়লা ও ইবনে শাবরুমা বলেছেন: আধা ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত অপরাধীর সম্পদ থেকেই দেয়া হবে। তবে এই শেষোক্ত মতটি দুর্বল।) এ ক্ষেত্রে হত্যাকারী পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দেরই অন্তর্ভুক্ত। কেননা সে হত্যাকারী। কাজেই তাকে এ দলের বহির্ভূত করার কোনো অর্থ হয়না। ইমাম শাফেয়ি বলেন: ভুলবশত হত্যাকারীর উপর দিয়াতের কোনো অংশ ওয়াজিব হয়না। কেননা সে ক্ষমার যোগ্য।
পিতৃসম্পর্কীয় যে আত্মীয়দের উপর আধা ইচ্ছাকৃত হত্যা ও ভুলবশত: হত্যার দিয়াত ওয়াজিব হয়। তাদের মধ্যে কেবল প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক ও সচ্ছল পুরুষ আত্মীয়রাই অন্তর্ভুক্ত। বিত্তশালী অন্ধ বিকলাঙ্গ ও বৃদ্ধ ব্যক্তিত্ত এর আওতাভুক্ত। মহিলা, দরিদ্র, অপ্রাপ্তবয়স্ক, অসুস্থ মস্তিষ্ক ও অপরাধীর ধর্মের বিরোধিরা এদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা এর ভিত্তিই হলো সাহায্য। অথচ এই সকল লোক সাহায্য করার যোগ্য নয়।
পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর দিয়াত আরোপের সূত্রপাত কিভাবে হলো, সে সম্পর্কে বুখারি ও মুসলিম আবু হুরায়রা থেকে নিম্নোক্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। রসূল সা. এর আমলে হুযাইল গ্রোত্রের দু'জন মহিলা মারামারি করলো। মারামারিতে একজন আরেকজনকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করে ফেললো। মহিলা তার গর্ভস্থ সন্তানসহই মারা গেলো। তখন রসূলুল্লাহ সা. মহিলার দিয়াত তার পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর অর্পণ করলেন। রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয় বলতে হত্যাকারীর গোটা গোত্রকেই বুঝানো হতো। উমর রা. এর আমল পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। অবশেষে যখন সেনাবাহিনী ও বেসরকারি প্রশাসন পুরোমাত্রায় গঠিত হলো। তখন বেসরকারী প্রশাসনের উপরই দিয়াতের দায় অর্পিত হলো। অথচ রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে এর বিপরীত ব্যবস্থা চালু ছিলো। উমর রা. যে ব্যবস্থা চালু করলেন, তার সমর্থনে সারাখসি বলেন: যদি প্রশ্ন করা হয়, কিভাবে রসূলূল্লাহ সা. এর ফায়সালার পরিপন্থি ব্যবস্থায় সাহাবীগণ একমত হয়ে গেলেন? তবে এর জবাবে বলবো এটা রসূলুল্লাহ সা. এর সিদ্ধান্তের সমন্বয়ের উপর সাহাবীদের মতৈক্য। কেননা তারা জানতেন, রসূলুল্লাহ সা. গোত্রের নিকট দিয়াতের ভার অর্পণ করেছেন কেবল এ জন্য যে, এতে কিছু সাহায্য পাওয়া যাবে। আর সেকালে মানুষ তার গোত্রের মাধ্যমেই শক্তি ও সাহায্য লাভ করতো। পরে যখন উমর রা. রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থাকে সংগঠিত করলেন, তখন যাবতীয় শক্তির উৎস হয়ে উঠলো রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এই পর্যায়ে গড়ালো যে, লোকেরা নিজ প্রশাসনের পক্ষ হয়ে নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতো। এটা হানাফিদের অভিমত। কিন্তু মালেকি ও শাফেয়িগণ এই মত প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ রসূলুল্লাহ সা. এর পরে শরিয়তের প্রতিষ্ঠিত কোনো বিধি রহিত করার সুযোগ নেই। রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে যে সকল বিধিব্যবস্থা কার্যকর ছিলো, তা পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই।
পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দের উপর যে দিয়াত ওয়াজিব হয়, আলেমদের সর্বসম্মত মতানুসারে তা তিন বছরে পরিশোধ করা যায়। কিন্তু যে দিয়াত হত্যাকারীর সম্পদ থেকে দেয়া ওয়াজিব, তা ইমাম শাফেয়ির মতে তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। হানাফিদের মতে, এটাও