📄 যে হত্যাতে দিয়াত ওয়াজিব হয়
দেয়া সুবিধাজনক তাদের জন্য দু'শো জোড়া লুংগী-চাদর অথবা পাজামা পাঞ্জাবী। যার উপর দিয়াত দেয়া ওয়াজিব হয়েছে, সে উল্লিখিত শ্রেণীসমূহের মধ্য থেকে যে শ্রেণীর দিয়াত উপস্থিত করবে, নিহতের উত্তরাধিকারীকে তা গ্রহণ করতে হবে, চাই উত্তরাধিকারী উক্ত শ্রেণীর সাথে সংশ্লিষ্ট হোক বা না হোক। কারণ তার নিকট সেই মূল দিয়াতই উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ধার্য করা হয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদ বলেছেন: ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত হলো পঁচিশটি এক বছর বয়স্ক উটনী। পঁচিশটি ২ বছর বয়স্কা উটনী, পঁচিশটি ৪ বছর বয়স্কা উটনী এবং পঁচিশটি পাঁচ বছর বয়স্কা উটনী। আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াতই তাদের উভয়ের মতে অনুরূপ। ভিন্ন বর্ণনা অনুসারে ইমাম শাফেয়ির মতে, ত্রিশটি ৪ বছর বয়স্কা উটনী, ত্রিশটি পাঁচ বছর বয়স্কা উটনী, এবং চল্লিশটি গর্ভবতী উটনী। আর ভুলবশত হত্যার দিয়াত বিশটি পাঁচ বছর বয়স্কা উটনী, বিশটি চার বছর বয়স্কা উটনী, বিশটি দুই বছর বয়স্কা উটনী, বিশটি এক বছর বয়স্ক উট ও বিশটি এক বছর বয়স্কা উটনী। ইমাম মালেক ও শাফেয়ি এক বছর বয়স্ক উটের স্থলে দুই বছর বয়স্ক উট ধার্য করেছেন।
যে হত্যাকাণ্ডে দিয়াত ওয়াজিব হয় আলেমগণ একমত যে, ভুলবশত হত্যা, আধা ইচ্ছাকৃত হত্যা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক অথবা পাগলের হাতে সংঘটিত ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি হচ্ছে দিয়াত। (ইমাম আবু হানিফা ও মালেকের মতে পাগল বা অপ্রাপ্তবয়স্ক কর্তৃক সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে হত্যাকারীর পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়দের উপর দিয়াত ওয়াজিব হবে। আর ইমাম শাফেয়ির মতে দিয়াত ওয়াজিব হবে অপ্রাপ্তবয়স্কের সম্পত্তিতে।) অনুরূপ, নিহত যখন হত্যাকরীর চেয়ে কম সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোক হবে তখনও ইচ্ছাকৃত হত্যায় দিয়াত ওয়াজিব হবে, যেমন স্বাধীন ব্যক্তি যখন দাসকে হত্যা করে। যে ঘুমন্ত ব্যক্তি পাশ ফিরে শুতে গিয়ে আরেক জনের উপর পড়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে, যে জাগ্রত ব্যক্তি উপর থেকে আরেক জনের উপর পড়ে যাওয়ায় সে চাপা পড়ে নিহত হয় এবং যে ব্যক্তি কোনো গর্ত খনন করে ও তাতে পড়ে কেউ মারা যায়, এসব ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি মৃত্যুর কারণ হয়েছে তার উপর দিয়াত ওয়াজিব হবে।
আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসূলুল্লাহ সা. আমাকে ইয়ামানে পাঠালেন, আমরা এমন একটা গোত্রের কাছে পৌছলাম যারা সিংহকে আটকে রাখার একটা গভীর কূপ খনন করেছিল। লোকেরা ঐ কূপের পাশে পরস্পরে ধাক্কাধাক্কি করছিল। হঠাৎ একজন কূপে পড়ে যাওয়ার সময় অন্য একজনকে ধরে ঝুলে রইল। অত:পর সেও পড়ে যেতে গিয়ে অন্য একজনকে ধরে ঝুলে রইল। শেষ পর্যন্ত চারজন গর্তের ভেতরে পড়ে গেলো। সিংহটি তাদেরকে ক্ষতবিক্ষত করলো। তখন এক ব্যক্তি একটি বর্শা দিয়ে সিংহটাকে মেরে ফেললো এবং আহত চারজনও সবাই মারা গেলো। তখন মৃত ব্যক্তিদের উত্তরাধিকরীরা পরস্পরে সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। তারা অস্ত্র বের করে পরস্পরে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে গেলো। তাদের উত্তেজনা প্রশমিত করতে আলী রা. এসে বললেন: রসূলুল্লাহ সা. জীবিত থাকতে তোমরা যুদ্ধে লিপ্ত হতে যাচ্ছো? আমি তোমাদের বিরোধের একটা নিষ্পত্তি করে দিচ্ছি। তোমরা যদি এটা মেনে নাও তাহলে তো এটাই হবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। নচেত তোমরা পরস্পরকে সংযত রাখবে এবং রসূলুল্লাহর সা. কাছে চলে যাবে। তখন তিনিই
📄 হালকা ও ভারি দিয়াত
তোমাদের বিরোধের চূড়ান্ত ফায়সালা করবেন। যে ব্যক্তি সেই ফায়সালা মানবেনা সে কিছুই পাবেনা। এখন আমি যে ফায়সালা করছি তা হলো: তোমরা যে সকল গোত্র এই কূপ খনন করেছে তাদের কাছ থেকে একটা দিয়াতের এক চতুর্থাংশ, দিয়াতের এক তৃতীয়াংশ, দিয়াতের অর্ধেক ও একটা পূর্ণ দিয়াত একত্রিত করো। এরপর প্রথম জনের বাবদে এক চতুর্থাংশ দিয়াত দেয়া হবে। কেননা সে তিন জনের উপর থেকে মারা গেছে। আর দ্বিতীয় জনের বাবদে দিয়াতের এক তৃতীয়াংশ। তৃতীয়জনের বাবদে দিয়াতের অর্ধেক এবং চতুর্থ জনের বাবদে পূর্ণ দিয়াত দেয়া হবে।
আলী রা.-এর ফায়সালা শোনার পর তারা রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে যেতে কৃতসংকল্প হলো। রসূলুল্লাহ সা. যখন মাকামে ইবরাহিমে, তখন তারা তাঁর নিকট উপস্থিত হলো। পুরো ঘটনা শোনার পর রসূলুল্লাহ সা. আলীর ফায়সালা সঠিক বলে ঘোষণা করেন।" (আহমদ, আহমদের আরেক বর্ণনার ভাষা হলো, রসূলুল্লাহ সা. যে সকল গোত্র কূপের পাশে ভিড় করেছিল তাদের উপর দিয়াত ধার্য করলেন?)
আলী বিন রাবাহ লাখমির বর্ণনা থেকে জানা যায়, উমর রা. এর খেলাফতকালে জনৈক চক্ষুষ্মান ব্যক্তি জনৈক অন্ধকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলতো। একদিন তারা উভয়ে একটা কুয়ায় পড়ে গেলো। অন্ধ লোকটি চক্ষুষ্মানের উপর পড়লো এবং চক্ষুষ্মান লোকটি মারা গেলো। উমর রা. অন্ধ লোকটির উপর চক্ষুষ্মান লোকটির দিয়াত ধার্য করলেন (যেহেতু তার কারণেই চক্ষুম্মানের মৃত্যু হয়েছে) এ কারণে অন্ধ লোকটি হজ্জের মৌসুমে জনতার সামনে নিজের দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করে কবিতা আবৃত্তি করতো। তাতে সে বলতো: হে জনতা, আমি একটা অন্যায়ের শিকার হয়েছি। একজন অন্ধ কি একজন সুস্থ চক্ষুষ্মান ব্যক্তির হত্যার জন্য দায়ী ও দিয়াত দিতে বাধ্য হতে পারে। তারা দু'জনেই এক সাথে চলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল।" (দার কুতনি) একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: এক ব্যক্তি কিছু সংখ্যক গৃহবাসীর নিকট এসে পিপাসা নিভৃত করতে পানি চাইল। কিন্তু তারা পানি না দেয়ায় লোকটি মারা গেলো। উমর রা. উক্ত গৃহবাসীদের উপর দিয়াত আরোপ করলেন। কেউ যদি আকস্মিকভাবে কারো কাছে গিয়ে বিকট চিৎকার করে এবং তাতে সে মারা যায়, তবে তার উপর দিয়াত ওয়াজিব হবে। আর যদি কণ্ঠস্বর পাল্টে চিৎকার করে কোনো শিশু বা বালককে ভয় দেখিয়ে পাগল বা বেহুঁশ করে, তাহলে চিৎকারকারী ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।
হালকা ও ভারী দিয়াত
দিয়াত দু'রকমের হয়ে থাকে: হালাক ও ভারী। হালকা দিয়াত ভুলবশত সংঘটিত হত্যায় দিতে হয়। আর ভারী দিয়াত দিতে হয় আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডে। আর ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডে নিহতের উত্তরাধিকারীরা কিসাস মাফ করে দিলে শাফেয়ি ও হাম্বলিদের মতে ভারী দিয়াত দিতে হবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত হত্যায় ইমাম আবু হানিফার মতে কোনো দিয়াত দিতে হয়না। তাঁর মতে, দুই পক্ষ আপোষ রফার মাধ্যমে যা স্থির করে সেটা দিতে হয় এবং তা তাৎক্ষণিকভাবেই দিতে হয়, বাকি রাখার অনুমতি নেই। ভারী দিয়াত হচ্ছে একশোটা উট, যার মধ্যে চল্লিশটি গর্ভবতী। আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: জেনে রাখো, ইচ্ছাকৃতভাবে বেত, লাঠি ও পাথর
📄 নিষিদ্ধ মাসে নিষিদ্ধ শহরে ও আপনজনের বিরুদ্ধে আক্রমণে ভারি দিয়াত
দ্বারা হত্যা করলে তাতে ভারী দিয়াত দিতে হবে : অর্থাৎ একশোটি উটনি, তন্মধ্যে চল্লিশটি ৬ষ্ঠ বছরে পদার্পণকারী থেকে নবম বছরে পদার্পণকারী, যার সবই গর্ভবতী। ভারী দিয়াত উটনি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয়না। কেননা শরিয়তের বিধান এভাবেই রচিত হয়েছে। এখানে কোনো চিন্তাগবেষণার অবকাশ নেই। যেভাবে শ্রুত হয়েছে সেভাবে পালন করতে হবে। এটা সে সব বিধির অন্তর্ভুক্ত, যা অটল ও অকাট্য।
নিষিদ্ধ মাসে নিষিদ্ধ শহরে ও আপন জনের বিরুদ্ধে আক্রমণে ভারী দিয়াত ইমাম শাফেয়ি প্রমুখের মতে হত্যা ও জখম উভয় ক্ষেত্রে ভারী দিয়াত ধার্য হবে, যদি অপরাধটি নিষিদ্ধ শহরে, নিষিদ্ধ মাসে ও রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের উপর সংঘটিত হয়। কেননা শরিয়ত এই নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে কঠোরতর নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছে। তাই অপরাধ গুরুতর হওয়ায় দিয়াতও গুরুতর হবে।
উমর, কাসেম বিন মুহাম্মদ ও ইবনে শিহাব থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এসব ক্ষেত্রে দিয়াতে এক তৃতীয়াংশ পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে। কিন্তু আবু হানিফা ও মালেকের মতে, এসব কারণে দিয়াত ভারী দিয়াতে পরিণত হবেনা। কেননা ভারী দিয়াতে পরিণত করার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। দিয়াত হচ্ছে শরিয়ত প্রণেতার সিদ্ধান্তনির্ভর। যে অপরাধ ভুলক্রমে ঘটে, তাতে দিয়াতকে ভারী দিয়াতে পরিণত করা শরিয়তের মূলনীতির পরিপন্থি।
📄 দিয়াত কার উপর ওয়াজিব
দিয়াত কার কার উপর ওয়াজিব হত্যাকারীর উপর বাধ্যতামূলকভাবে আরোপিত দিয়াত দু'প্রকার: ১. অপরাধীর সম্পদের উপর আরোপিত দিয়াত। ইবনে আব্বাস বলেন: “হত্যাকারীর পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা ইচ্ছাকৃত হত্যায় আত্মস্বীকৃত হত্যার ও ইচ্ছাকৃত হত্যার আপোষ মীমাংসায় কোনো দায় বহন করবেনা।" ইবনে আব্বাসের এই মতের বিরোধিতা কোনো সাহাবি করেননি।
ইবনে শিহাব থেকে মালেক বর্ণনা করেন: "ইচ্ছাকৃত হত্যায় যখন নিহতের উত্তরাধিকারীরা কিসাস মাফ করে দেয় তখন শুধুমাত্র হত্যাকারীর সম্পদের উপরই দিয়াত আরোপিত হয়ে থাকে। এটা চিরাচরিত রীতি। তবে পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা যদি স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে তাকে সাহায্য করে, তবে সেটা ভিন্ন কথা।"
পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়দেরকে নিম্নলিখিত তিন ধরনের অবস্থার কোনোটিতেই দিয়াত দিতে হবেনা: ইচ্ছাকৃত হত্যায়, আত্মস্বীকৃত হত্যায় এবং হত্যার পর সন্ধি হলে দিয়াত দিতে হবেনা। কেননা ইচ্ছাকৃত হত্যায় শাস্তি অবধারিত। তাই পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা হত্যাকারীর পক্ষ থেকে দিয়াতের কোনো অংশ বহন করার মাধ্যমে তাকে ছাড় দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। অনুরূপ আত্মস্বীকৃত হত্যায়ও পিতৃসম্পর্কীয় কারণে ওয়াজিব হয়, খোদ হত্যার কারণে নয়। স্বীকারোক্তি এমন একটা প্রমাণ, যা শুধু স্বীকারোক্তিকারীর উপরই দিয়াত আরোপ করে, অন্য কারো উপর নয়। পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়রা সন্ধির মাধ্যমে স্বীকারোক্তির ক্ষেত্রেও দিয়াত দিতে বাধ্য নয়। কারণ সন্ধিতে যে বিনিময় দিতে হয়, তা হত্যার কারণে ওয়াজিব হয়না। বরং ওয়াজিব হয় সন্ধি চুক্তির কারণে। তাছাড়া স্বীকারোক্তির মাধ্যমে অপরাধী নিজেই তার অপরাধের দায় স্বীকার করে। তাই নিহত প্রাণের ক্ষতিপূরণ হন্তার উপরই বর্তায়।