📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 দিয়াতের উদ্দেশ্য

📄 দিয়াতের উদ্দেশ্য


অর্থ: কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়। তবে ভুলবশত: করলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত: হত্যা করলে এক মুমিন দাস মুক্ত করবে এবং নিহতের পরিজনবর্গকে রক্তপণ প্রদান করবে, যদি তারা ক্ষমা না করে। নিহত ব্যক্তি যদি তোমাদের শত্রুপক্ষের লোক হয় এবং মুমিন হয়, তবে এক মুমিন দাস মুক্ত করা বিধেয়। আর যদি সে এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত হয়, যার সাথে তোমরা অংগীকারাবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ এবং মুমিন দাস মুক্ত করা বিধেয়। যে সংগতিহীন সে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখবে। তওবার জন্য এটা আল্লাহর ব্যবস্থা। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।” (সূরা নিসা : আয়াত ৯২)
আমর বিন শুয়াইব থেকে আবু দাউদ বর্ণনা করেন রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে দিয়াতের মূল্য দাঁড়াতো আটশো দিনার বা আট হাজার দিরহাম। তখনকার দিনে আহলে কিতাবের দিয়াত ছিলো মুসলমানের দিয়াতের অর্ধেক। উমর রা. এর খেলাফতের পূর্ব পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। উমর রা. খলিফা হয়েই এক ভাষণ দিয়ে বললেন শুনে রাখো, এখন উটের দাম বেড়ে গেছে। অত:পর তিনি স্বর্ণমুদ্রাধারী দেশ সিরিয়া ও মিশরে এক হাজার দিনার, রৌপ্যমুদ্রাধারী দেশ ইরাকে বারো হাজার দিরহাম, গরু পালনকারীদের উপর দুইশো গরু, ছাগল পালনকারীদের উপর দু'হাজার ছাগল এবং যাদের কাপড় দিয়ে দিয়াত দেয়া সুবিধাজনক তাদের উপর দুশো জোড়া পাজামা পাঞ্জাবী অথবা চাদর লুংগী ধার্য করলেন।"
ইমাম শাফেয়ি মিশরে ঘোষণা করলেন: রৌপ্যমুদ্রাধারী বা স্বর্ণমুদ্রাধারীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক উটের দামই আদায় করা হবে, চাই তার দাম যতই হোক। তবে অগ্রগণ্য মত হলো, রসূলুল্লাহ সা. উট ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা দিয়াত ধার্য করেছেন বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। সম্ভবত: উমর রা. নব উদ্ভূত কোনো অনিবার্য কারণে দিয়াতের আরো কয়েকটি শ্রেণীর প্রচলন করেন।
দিয়াতের উদ্দেশ্য দিয়াতের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো, সতর্ক করা, অপরাধ প্রবণতা প্রতিহত করা ও জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা। এ কারণে দিয়াত এমন হওয়া জরুরি, যা পরিশোধ করা সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের পক্ষে অত্যধিক কষ্টকর ও বেদনাদায়ক হয়। দিয়াতের পরিমাণ যখন বিরাট ও বিপুল হবে, তা দিতে গেলে নিজের সম্পত্তি থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘাটতি হবে এবং সে কারণে তা ক্ষতিগ্রস্তদেরকে দিতে গিয়ে খুবই কষ্ট অনুভূত হবে, কেবল তখনই দিয়াত একটি কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক জিনিস বলে প্রমাণিত হবে। বস্তুত: দিয়াত এমন একটা কর্মফল, যাতে একাধারে শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ উভয়ের সমাবেশ ঘটেছে। -তারিখুল ফি, পৃ: ৮২।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 দিয়াতের পরিমাণ

📄 দিয়াতের পরিমাণ


রসূলুল্লাহ সা. নিজেই দিয়াত ধার্য করেছেন ও তার পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। স্বাধীন মুসলমান পুরুষের দিয়াত ধার্য করেছেন উটজীবীদের জন্য একশো উট, গরুজীবীদের জন্য দুশো গরু, ছাগলজীবীদের জন্য দু'হাজার ছাগল, স্বর্ণমুদ্রাধারীদের জন্য এক হাজার দিনার, রৌপ্যমুদ্রাধারীদের জন্য বারো হাজার দিরহাম এবং যাদের জন্য কাপড়ের মাধ্যমে দিয়াত
টিকাঃ
ফিস সুন্নাহ ২য় খণ্ড ফর্মা নং-৫৬

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যে হত্যাতে দিয়াত ওয়াজিব হয়

📄 যে হত্যাতে দিয়াত ওয়াজিব হয়


দেয়া সুবিধাজনক তাদের জন্য দু'শো জোড়া লুংগী-চাদর অথবা পাজামা পাঞ্জাবী। যার উপর দিয়াত দেয়া ওয়াজিব হয়েছে, সে উল্লিখিত শ্রেণীসমূহের মধ্য থেকে যে শ্রেণীর দিয়াত উপস্থিত করবে, নিহতের উত্তরাধিকারীকে তা গ্রহণ করতে হবে, চাই উত্তরাধিকারী উক্ত শ্রেণীর সাথে সংশ্লিষ্ট হোক বা না হোক। কারণ তার নিকট সেই মূল দিয়াতই উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ধার্য করা হয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদ বলেছেন: ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত হলো পঁচিশটি এক বছর বয়স্ক উটনী। পঁচিশটি ২ বছর বয়স্কা উটনী, পঁচিশটি ৪ বছর বয়স্কা উটনী এবং পঁচিশটি পাঁচ বছর বয়স্কা উটনী। আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াতই তাদের উভয়ের মতে অনুরূপ। ভিন্ন বর্ণনা অনুসারে ইমাম শাফেয়ির মতে, ত্রিশটি ৪ বছর বয়স্কা উটনী, ত্রিশটি পাঁচ বছর বয়স্কা উটনী, এবং চল্লিশটি গর্ভবতী উটনী। আর ভুলবশত হত্যার দিয়াত বিশটি পাঁচ বছর বয়স্কা উটনী, বিশটি চার বছর বয়স্কা উটনী, বিশটি দুই বছর বয়স্কা উটনী, বিশটি এক বছর বয়স্ক উট ও বিশটি এক বছর বয়স্কা উটনী। ইমাম মালেক ও শাফেয়ি এক বছর বয়স্ক উটের স্থলে দুই বছর বয়স্ক উট ধার্য করেছেন।
যে হত্যাকাণ্ডে দিয়াত ওয়াজিব হয় আলেমগণ একমত যে, ভুলবশত হত্যা, আধা ইচ্ছাকৃত হত্যা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক অথবা পাগলের হাতে সংঘটিত ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি হচ্ছে দিয়াত। (ইমাম আবু হানিফা ও মালেকের মতে পাগল বা অপ্রাপ্তবয়স্ক কর্তৃক সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে হত্যাকারীর পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়দের উপর দিয়াত ওয়াজিব হবে। আর ইমাম শাফেয়ির মতে দিয়াত ওয়াজিব হবে অপ্রাপ্তবয়স্কের সম্পত্তিতে।) অনুরূপ, নিহত যখন হত্যাকরীর চেয়ে কম সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোক হবে তখনও ইচ্ছাকৃত হত্যায় দিয়াত ওয়াজিব হবে, যেমন স্বাধীন ব্যক্তি যখন দাসকে হত্যা করে। যে ঘুমন্ত ব্যক্তি পাশ ফিরে শুতে গিয়ে আরেক জনের উপর পড়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে, যে জাগ্রত ব্যক্তি উপর থেকে আরেক জনের উপর পড়ে যাওয়ায় সে চাপা পড়ে নিহত হয় এবং যে ব্যক্তি কোনো গর্ত খনন করে ও তাতে পড়ে কেউ মারা যায়, এসব ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি মৃত্যুর কারণ হয়েছে তার উপর দিয়াত ওয়াজিব হবে।
আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসূলুল্লাহ সা. আমাকে ইয়ামানে পাঠালেন, আমরা এমন একটা গোত্রের কাছে পৌছলাম যারা সিংহকে আটকে রাখার একটা গভীর কূপ খনন করেছিল। লোকেরা ঐ কূপের পাশে পরস্পরে ধাক্কাধাক্কি করছিল। হঠাৎ একজন কূপে পড়ে যাওয়ার সময় অন্য একজনকে ধরে ঝুলে রইল। অত:পর সেও পড়ে যেতে গিয়ে অন্য একজনকে ধরে ঝুলে রইল। শেষ পর্যন্ত চারজন গর্তের ভেতরে পড়ে গেলো। সিংহটি তাদেরকে ক্ষতবিক্ষত করলো। তখন এক ব্যক্তি একটি বর্শা দিয়ে সিংহটাকে মেরে ফেললো এবং আহত চারজনও সবাই মারা গেলো। তখন মৃত ব্যক্তিদের উত্তরাধিকরীরা পরস্পরে সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। তারা অস্ত্র বের করে পরস্পরে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে গেলো। তাদের উত্তেজনা প্রশমিত করতে আলী রা. এসে বললেন: রসূলুল্লাহ সা. জীবিত থাকতে তোমরা যুদ্ধে লিপ্ত হতে যাচ্ছো? আমি তোমাদের বিরোধের একটা নিষ্পত্তি করে দিচ্ছি। তোমরা যদি এটা মেনে নাও তাহলে তো এটাই হবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। নচেত তোমরা পরস্পরকে সংযত রাখবে এবং রসূলুল্লাহর সা. কাছে চলে যাবে। তখন তিনিই

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হালকা ও ভারি দিয়াত

📄 হালকা ও ভারি দিয়াত


তোমাদের বিরোধের চূড়ান্ত ফায়সালা করবেন। যে ব্যক্তি সেই ফায়সালা মানবেনা সে কিছুই পাবেনা। এখন আমি যে ফায়সালা করছি তা হলো: তোমরা যে সকল গোত্র এই কূপ খনন করেছে তাদের কাছ থেকে একটা দিয়াতের এক চতুর্থাংশ, দিয়াতের এক তৃতীয়াংশ, দিয়াতের অর্ধেক ও একটা পূর্ণ দিয়াত একত্রিত করো। এরপর প্রথম জনের বাবদে এক চতুর্থাংশ দিয়াত দেয়া হবে। কেননা সে তিন জনের উপর থেকে মারা গেছে। আর দ্বিতীয় জনের বাবদে দিয়াতের এক তৃতীয়াংশ। তৃতীয়জনের বাবদে দিয়াতের অর্ধেক এবং চতুর্থ জনের বাবদে পূর্ণ দিয়াত দেয়া হবে।
আলী রা.-এর ফায়সালা শোনার পর তারা রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে যেতে কৃতসংকল্প হলো। রসূলুল্লাহ সা. যখন মাকামে ইবরাহিমে, তখন তারা তাঁর নিকট উপস্থিত হলো। পুরো ঘটনা শোনার পর রসূলুল্লাহ সা. আলীর ফায়সালা সঠিক বলে ঘোষণা করেন।" (আহমদ, আহমদের আরেক বর্ণনার ভাষা হলো, রসূলুল্লাহ সা. যে সকল গোত্র কূপের পাশে ভিড় করেছিল তাদের উপর দিয়াত ধার্য করলেন?)
আলী বিন রাবাহ লাখমির বর্ণনা থেকে জানা যায়, উমর রা. এর খেলাফতকালে জনৈক চক্ষুষ্মান ব্যক্তি জনৈক অন্ধকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলতো। একদিন তারা উভয়ে একটা কুয়ায় পড়ে গেলো। অন্ধ লোকটি চক্ষুষ্মানের উপর পড়লো এবং চক্ষুষ্মান লোকটি মারা গেলো। উমর রা. অন্ধ লোকটির উপর চক্ষুষ্মান লোকটির দিয়াত ধার্য করলেন (যেহেতু তার কারণেই চক্ষুম্মানের মৃত্যু হয়েছে) এ কারণে অন্ধ লোকটি হজ্জের মৌসুমে জনতার সামনে নিজের দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করে কবিতা আবৃত্তি করতো। তাতে সে বলতো: হে জনতা, আমি একটা অন্যায়ের শিকার হয়েছি। একজন অন্ধ কি একজন সুস্থ চক্ষুষ্মান ব্যক্তির হত্যার জন্য দায়ী ও দিয়াত দিতে বাধ্য হতে পারে। তারা দু'জনেই এক সাথে চলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল।" (দার কুতনি) একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: এক ব্যক্তি কিছু সংখ্যক গৃহবাসীর নিকট এসে পিপাসা নিভৃত করতে পানি চাইল। কিন্তু তারা পানি না দেয়ায় লোকটি মারা গেলো। উমর রা. উক্ত গৃহবাসীদের উপর দিয়াত আরোপ করলেন। কেউ যদি আকস্মিকভাবে কারো কাছে গিয়ে বিকট চিৎকার করে এবং তাতে সে মারা যায়, তবে তার উপর দিয়াত ওয়াজিব হবে। আর যদি কণ্ঠস্বর পাল্টে চিৎকার করে কোনো শিশু বা বালককে ভয় দেখিয়ে পাগল বা বেহুঁশ করে, তাহলে চিৎকারকারী ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।
হালকা ও ভারী দিয়াত
দিয়াত দু'রকমের হয়ে থাকে: হালাক ও ভারী। হালকা দিয়াত ভুলবশত সংঘটিত হত্যায় দিতে হয়। আর ভারী দিয়াত দিতে হয় আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডে। আর ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডে নিহতের উত্তরাধিকারীরা কিসাস মাফ করে দিলে শাফেয়ি ও হাম্বলিদের মতে ভারী দিয়াত দিতে হবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত হত্যায় ইমাম আবু হানিফার মতে কোনো দিয়াত দিতে হয়না। তাঁর মতে, দুই পক্ষ আপোষ রফার মাধ্যমে যা স্থির করে সেটা দিতে হয় এবং তা তাৎক্ষণিকভাবেই দিতে হয়, বাকি রাখার অনুমতি নেই। ভারী দিয়াত হচ্ছে একশোটা উট, যার মধ্যে চল্লিশটি গর্ভবতী। আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: জেনে রাখো, ইচ্ছাকৃতভাবে বেত, লাঠি ও পাথর

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00