📄 ক্ষমার পরিবর্তে কিসাসই যখন একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ায়
অর্থ : কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়, তবে ভুলবশতঃ করলে তা স্বতন্ত্র। কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করা এবং নিহতের পরিজনবর্গকে রক্তপণ (দিয়াত) অর্পণ করা বিধেয়, যদি না তারা ক্ষমা করে।" (সূরা আল মায়েদা : আয়াত ৪৫)
ইসলাম এই আর্থিক দণ্ড ভুলবশত সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বেলায়ই প্রয়োগ করেছে মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের খাতিরে, যাতে কেউ এই অপরাধকে গুরুত্বহীন মনে করতে না পারে, যাতে মানুষ প্রাণ হনন ও রক্তপাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে, যাতে গোলযোগের পথ বন্ধ হয় এবং যাতে 'ভুলক্রমে হত্যা করেছি' বলে একজন আরেকজনকে হত্যা করেও পার পেয়ে না যায়। মানুষের প্রাণ রক্ষায় ইসলাম কত কঠোরভাবে যত্নবান, তার প্রমাণের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে শিশুর শরীরে প্রাণ সঞ্চারিত হওয়ার পর গর্ভপাত ঘটানোকে হারাম করেছে। তবে এমন বাস্তব কারণ যদি থেকে থাকে, যা গর্ভপাতকে অনিবার্য করে তোলে, যেমন প্রসূতির মৃত্যুর আশংকা ইত্যাদি, কেবল সেক্ষেত্রেই গর্ভপাত করা যাবে।
কিসাস : ইসলাম ও জাহেলিয়তে
জাহেলি যুগে আরবে কিসাস (হত্যাকারীকে হত্যা করা) প্রথা চালু ছিলো বটে। তবে তার ভিত্তি ছিলো এই যে, কোনো গোত্রের এক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড ঘটালে তার সমগ্র গোত্রটিকে ঐ অপরাধের জন্য দায়ী করা হতো। এর ব্যতিক্রম হতো কেবল তখন, যখন গোত্র ঐ ব্যক্তিকে ত্যাজ্য ঘোষণা করতো এবং সকল সামাজিক সভা সমিতিতে তা প্রচার করতো। এজন্য নিহতের অভিভাবক হত্যাকারী ও তার গোত্রের অন্যান্যদের নিকট থেকে কিসাস দাবি করতো। এই দাবি কখনো কখনো এত ব্যাপক রূপ নিতো যে, তার ফলে খুনী ও নিহতের গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতো।
নিহত ব্যক্তি যদি অভিজাত কিংবা গোত্রপতি হতো, তাহলে তো কথাই নেই। কিসাসের দাবি আরো ব্যাপক রূপ ধারণ করতো। অপরদিকে কোনো কোনো গোত্র কিসাসের এই দাবিকে অগ্রাহ্য ও উপেক্ষা করতো এবং হত্যাকারীর পক্ষপাতিত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা করতো। নিহতের উত্তরাধিকারীদের দাবির প্রতি ভ্রুক্ষেপও করতোনা। ফলে যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়ে বহু নিরাপরাধ মানুষ মারা যেতো। ইসলাম এসে এই অবিচারমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটালো এবং ঘোষণা করলো যে, কেবলমাত্র অপরাধী নিজেই তার কৃত অপরাধের জন্য দায়ী। তার পাপের জন্য তাকেই পাকড়াও করতে হবে। আল্লাহ বলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلْقِصَاصُ فِى ٱلْقَتْلَى ۖ ٱلْحُرُّ بِٱلْحُرِّ وَٱلْعَبْدُ بِٱلْعَبْدِ وَٱلْأُنثَىٰ بِٱلْأُنثَىٰ ۚ فَمَنْ عُفِىَ لَهُۥ مِنْ أَخِيهِ شَىْءٌ فَٱتِّبَاعٌۢ بِٱلْمَعْرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَٰنٍ ۗ ذَٰلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ ۗ فَمَنِ ٱعْتَدَىٰ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَلَكُمْ فِى ٱلْقِصَاصِ حَيَوٰةٌ يَٰٓأُو۟لِى ٱلْأَلْبَٰبِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থ: হে মুমিনগণ, নিহতের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হলো। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাসের ও নারীর বদলে নারী। তবে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমতা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ
টিকাঃ
ফিন্তুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড ফর্মা নং-৫২
অর্থ : কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়, তবে ভুলবশতঃ করলে তা স্বতন্ত্র। কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করা এবং নিহতের পরিজনবর্গকে রক্তপণ (দিয়াত) অর্পণ করা বিধেয়, যদি না তারা ক্ষমা করে।" (সূরা আল মায়েদা : আয়াত ৪৫)
ইসলাম এই আর্থিক দণ্ড ভুলবশত সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বেলায়ই প্রয়োগ করেছে মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের খাতিরে, যাতে কেউ এই অপরাধকে গুরুত্বহীন মনে করতে না পারে, যাতে মানুষ প্রাণ হনন ও রক্তপাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে, যাতে গোলযোগের পথ বন্ধ হয় এবং যাতে 'ভুলক্রমে হত্যা করেছি' বলে একজন আরেকজনকে হত্যা করেও পার পেয়ে না যায়। মানুষের প্রাণ রক্ষায় ইসলাম কত কঠোরভাবে যত্নবান, তার প্রমাণের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে শিশুর শরীরে প্রাণ সঞ্চারিত হওয়ার পর গর্ভপাত ঘটানোকে হারাম করেছে। তবে এমন বাস্তব কারণ যদি থেকে থাকে, যা গর্ভপাতকে অনিবার্য করে তোলে, যেমন প্রসূতির মৃত্যুর আশংকা ইত্যাদি, কেবল সেক্ষেত্রেই গর্ভপাত করা যাবে।
কিসাস : ইসলাম ও জাহেলিয়তে
জাহেলি যুগে আরবে কিসাস (হত্যাকারীকে হত্যা করা) প্রথা চালু ছিলো বটে। তবে তার ভিত্তি ছিলো এই যে, কোনো গোত্রের এক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড ঘটালে তার সমগ্র গোত্রটিকে ঐ অপরাধের জন্য দায়ী করা হতো। এর ব্যতিক্রম হতো কেবল তখন, যখন গোত্র ঐ ব্যক্তিকে ত্যাজ্য ঘোষণা করতো এবং সকল সামাজিক সভা সমিতিতে তা প্রচার করতো। এজন্য নিহতের অভিভাবক হত্যাকারী ও তার গোত্রের অন্যান্যদের নিকট থেকে কিসাস দাবি করতো। এই দাবি কখনো কখনো এত ব্যাপক রূপ নিতো যে, তার ফলে খুনী ও নিহতের গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতো।
নিহত ব্যক্তি যদি অভিজাত কিংবা গোত্রপতি হতো, তাহলে তো কথাই নেই। কisass-এর দাবি আরো ব্যাপক রূপ ধারণ করতো। অপরদিকে কোনো কোনো গোত্র কিসাসের এই দাবিকে অগ্রাহ্য ও উপেক্ষা করতো এবং হত্যাকারীর পক্ষপাতিত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা করতো। নিহতের উত্তরাধিকারীদের দাবির প্রতি ভ্রুক্ষেপও করতোনা। ফলে যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়ে বহু নিরাপরাধ মানুষ মারা যেতো। ইসলাম এসে এই অবিচারমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটালো এবং ঘোষণা করলো যে, কেবলমাত্র অপরাধী নিজেই তার কৃত অপরাধের জন্য দায়ী। তার পাপের জন্য তাকেই পাকড়াও করতে হবে। আল্লাহ বলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلْقِصَاصُ فِى ٱلْقَتْلَى ۖ ٱلْحُرُّ بِٱلْحُرِّ وَٱلْعَبْدُ بِٱلْعَبْدِ وَٱلْأُنثَىٰ بِٱلْأُنثَىٰ ۚ فَمَنْ عُفِىَ لَهُۥ مِنْ أَخِيهِ شَىْءٌ فَٱتِّبَاعٌۢ بِٱلْمَعْرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَٰنٍ ۗ ذَٰلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ ۗ فَمَنِ ٱعْتَدَىٰ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَلَكُمْ فِى ٱلْقِصَاصِ حَيَوٰةٌ يَٰٓأُو۟لِى ٱلْأَلْبَٰبِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থ: হে মুমিনগণ, নিহতের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হলো। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাসের ও নারীর বদলে নারী। তবে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমতা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ
টিকাঃ
ফিন্তুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড ফর্মা নং-৫২
📄 প্রাণহানিতে কিসাস
করা ও সততার সাথে তার পাওনা প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি সীমালংঘন করে তার জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে যাতে তোমরা সাবধান হতে পারো।" (সূরা বাকারা: আয়াত ১৭৮)
ক্ষমার পরিবর্তে কিসাসই যখন একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ায়: উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে বায়হাকি বলেছেন: "জাহেলি যুগে আরবের দুটো গোত্রের মধ্যে খুন ও তার প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবণতা লেগেই থাকতো। এ ধরনের দুই গোত্রের একটি অপরটি থেকে অধিকতর শক্তিশালী হলে শপথ করতো যে, ক্রীতদাস হত্যার প্রতিশোধে আমরা তোমাদের স্বাধীন লোককে এবং নারী হত্যার বিনিময়ে পুরুষকে হত্যা করবো। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর তারা যখন রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এ বিষয়ে সুবিচার প্রার্থনা করলো, তখন উক্ত আয়াত নাযিল হলো এবং তিনি তাদেরকে আদেশ দিলেন যেন তাদের শপথ থেকে তারা পরস্পরে অব্যাহতি গ্রহণ করে।"
এ আয়াতটির বক্তব্য হলো: ১. আল্লাহ তায়ালা জাহেলি রীতিপ্রথাকে বাতিল করেছেন এবং হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে সমতাকে বাধ্যতামূলক করেছেন। কাজেই লোকেরা যখন ক্ষমার পরিবর্তে প্রতিশোধ গ্রহণ তথা কিসাসকেই অগ্রাধিকার দেয় এবং তা কার্যকর করার দাবি জানায় তখন একজন স্বাধীন ব্যক্তি আরেক জন স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করে থাকলে হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, অনুরূপ ক্রীতদাসকে হত্যা করার প্রতিশোধস্বরূপ খুনী ক্রীতদাসকেই হত্যা করা হবে এবং নারীকে হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ খুনী নারীকেই হত্যা করা হবে।
২. নিহতের উত্তরাধিকারী যখন অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়, তখন দিয়াত (রক্তপণ) দাবি করার অধিকার তার থাকবে। তবে দাবিটা হওয়া চাই ন্যায়সঙ্গত, তার সাথে যেন কোনো সহিংসতা বা নিষ্ঠুরতার সংমিশ্রণ না ঘটে, সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করা চাই। আর হত্যাকারীরও উচিত কোনো গড়িমসি ও কম বেশি না করে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমাকারীকে দিয়াত প্রদান করা।
৩. আল্লাহর প্রবর্তিত এই বিধি অর্থাৎ কিসাস কার্যকর করাও জায়েয এবং তা মাফ করিয়ে দিয়াত দেয়াও জায়েয। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিরাট রেয়াত ও দয়া। কেননা এই দুইটির মধ্যে যে কোনোটি অবলম্বনের অবকাশ তিনি রেখেছেন এবং এর যে কোনো একটিকে বাধ্যতামূলক করেননি।
৪. যে ব্যক্তি সীমালংঘনপূর্বক অপরাধীকে ক্ষমা করার পর হত্যা করে, তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এই মর্মন্তুদ শাস্তি ইহকালে মৃত্যুদণ্ডের আকারে অথবা পরকালে দোযখের আযাবের আকারে ভোগ করতে হতে পারে।
বুখারি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: "বনী ইসরাইলে কিসাসের প্রচলন ছিলো, দিয়াত ছিলোনা। তাই আল্লাহ এই উম্মাহকে দিয়াতের সুযোগ দিলেন। বললেন, নিহতের ব্যাপারে তোমাদের উপর কিসাস চালু করলাম ..... যাকে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কোনো ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়, সে যেন যথাযথ বিধির অনুসরণ করে ও সততার সাথে পাওনা প্রদান করে।" বস্তুত ক্ষমা হলো ইচ্ছাকৃত ক্ষেত্রে দিয়াত গ্রহণ করা।
করা ও সততার সাথে তার পাওনা প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি সীমালংঘন করে তার জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে যাতে তোমরা সাবধান হতে পারো।" (সূরা বাকারা: আয়াত ১৭৮)
ক্ষমার পরিবর্তে কিসাসই যখন একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ায়: উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে বায়হাকি বলেছেন: "জাহেলি যুগে আরবের দুটো গোত্রের মধ্যে খুন ও তার প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবণতা লেগেই থাকতো। এ ধরনের দুই গোত্রের একটি অপরটি থেকে অধিকতর শক্তিশালী হলে শপথ করতো যে, ক্রীতদাস হত্যার প্রতিশোধে আমরা তোমাদের স্বাধীন লোককে এবং নারী হত্যার বিনিময়ে পুরুষকে হত্যা করবো। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর তারা যখন রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এ বিষয়ে সুবিচার প্রার্থনা করলো, তখন উক্ত আয়াত নাযিল হলো এবং তিনি তাদেরকে আদেশ দিলেন যেন তাদের শপথ থেকে তারা পরস্পরে অব্যাহতি গ্রহণ করে।"
এ আয়াতটির বক্তব্য হলো: ১. আল্লাহ তায়ালা জাহেলি রীতিপ্রথাকে বাতিল করেছেন এবং হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে সমতাকে বাধ্যতামূলক করেছেন। কাজেই লোকেরা যখন ক্ষমার পরিবর্তে প্রতিশোধ গ্রহণ তথা কisassকেই অগ্রাধিকার দেয় এবং তা কার্যকর করার দাবি জানায় তখন একজন স্বাধীন ব্যক্তি আরেক জন স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করে থাকলে হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, অনুরূপ ক্রীতদাসকে হত্যা করার প্রতিশোধস্বরূপ খুনী ক্রীতদাসকেই হত্যা করা হবে এবং নারীকে হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ খুনী নারীকেই হত্যা করা হবে।
২. নিহতের উত্তরাধিকারী যখন অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়, তখন দিয়াত (রক্তপণ) দাবি করার অধিকার তার থাকবে। তবে দাবিটা হওয়া চাই ন্যায়সঙ্গত, তার সাথে যেন কোনো সহিংসতা বা নিষ্ঠুরতার সংমিশ্রণ না ঘটে, সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করা চাই। আর হত্যাকারীরও উচিত কোনো গড়িমসি ও কম বেশি না করে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমাকারীকে দিয়াত প্রদান করা।
৩. আল্লাহর প্রবর্তিত এই বিধি অর্থাৎ কisass কার্যকর করাও জায়েয এবং তা মাফ করিয়ে দিয়াত দেয়াও জায়েয। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিরাট রেয়াত ও দয়া। কেননা এই দুইটির মধ্যে যে কোনোটি অবলম্বনের অবকাশ তিনি রেখেছেন এবং এর যে কোনো একটিকে বাধ্যতামূলক করেননি।
৪. যে ব্যক্তি সীমালংঘনপূর্বক অপরাধীকে ক্ষমা করার পর হত্যা করে, তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এই মর্মন্তুদ শাস্তি ইহকালে মৃত্যুদণ্ডের আকারে অথবা পরকালে দোযখের আযাবের আকারে ভোগ করতে হতে পারে।
বুখারি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: "বনী ইসরাইলে কিসাসের প্রচলন ছিলো, দিয়াত ছিলোনা। তাই আল্লাহ এই উম্মাহকে দিয়াতের সুযোগ দিলেন। বললেন, নিহতের ব্যাপারে তোমাদের উপর কিসাস চালু করলাম ..... যাকে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কোনো ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়, সে যেন যথাযথ বিধির অনুসরণ করে ও সততার সাথে পাওনা প্রদান করে।" বস্তুত ক্ষমা হলো ইচ্ছাকৃত ক্ষেত্রে দিয়াত গ্রহণ করা।
📄 হত্যার প্রকারভেদ
"এ হচ্ছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ।" অর্থাৎ অতীতের জাতিগুলোর তুলনায় এটা ভার লাঘব ও অনুগ্রহ।
৫. আল্লাহ কিসাস প্রবর্তন করেছেন। কারণ এতেই রয়েছে মানুষের জীবন ও স্থিতির নিশ্চয়তা। হত্যাকারী যখন জানবে যে, সে হত্যা করলে নিজেও নিহত হবে, তখন সে ভয় পাবে ও সংযত হবে। তার এই সংযম দ্বারা একদিকে তার নিজের জীবনও বাঁচাবে, অপরদিকে যাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তার জীবনেও বাঁচাবে।
৬. ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বে হত্যার কিসাস বা শাস্তি দাবি করার যে অধিকার নিহত ব্যক্তির অভিভাবকের ছিল, ইসলাম সেটি বহাল রেখেছে। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيْهِ سُلْطنًا فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ طَ إِنَّهُ كَانَ مَنْصُورًاه
"কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি তার প্রতিকারের অধিকার দিয়েছি। কিন্তু হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে। সে তো সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছেই।" আয়াতে উত্তরাধিকারী অর্থ নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী, যার খুনের বদলা দাবি করার অধিকার রয়েছে। বস্তুত খুনের বদলা বা শান্তি দাবি করার অধিকার একমাত্র তারই, শাসক বা সরকারের নয়। সে যদি কিসাস দাবি না করে, তবে অপরাধীর কাছ থেকে কিসাস নেয়া যাবেনা। প্রতিকারের অধিকার দ্বারা হত্যাকরীর উপর কর্তৃত্ব বুঝায়। এই কর্তৃত্ব তাকে দেয়া হয়েছে, এজন্য যাতে তার অসম্মতিতেই খুনীকে কেউ ক্ষমা করে দিতে না পারে। কেননা অপরাধ দ্বারা সেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই স্বভাবতই তার মনই সংক্ষুব্ধ হবে, প্রতিশোধ নিতে চাইবে এবং হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
৭. এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাফসীর আল মানারের গ্রন্থাকার বলেছেন: "এ আয়াত থেকে জানা যাচ্ছে যে, জীবনের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা বিধানই মূল উদ্দেশ্য। কিসাস হলো তার একাধিক উপকরণের মধ্য হতে একটি উপকরণ। কারণ যে ব্যক্তি জানবে যে, সে কাউকে হত্যা করলে তার বদলে তাকে হত্যা করা অবধারিত, সে হত্যা থেকে নিবৃত্ত হবে। এভাবে সে নিজের জীবন ও যাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তার জীবন রক্ষা করবে। কেবলমাত্র দিয়াত (রক্তপণ বা ক্ষতিপূরণ) সবাইকে শত্রুর রক্তপাত থেকে নিবৃত করতে পারেনা। রক্তপণের সুযোগ থাকলে নিজের সাধ্য অনুসারে সে শত্রুকে হত্যা করতে পারে। কেননা শত্রুকে নিপাত করার উদ্দেশ্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে চাইবে- সমাজে এমন লোকের অভাব নেই। আর আয়াতটির বাচনভঙ্গী এত চমৎকার ও চিত্তাকর্ষক যে, শাস্তি হিসেবে অপরাধীর প্রাণ সংহারকে খারাপ ও বর্বরোচিত কাজ ভাবার মানসিকতা দূর করে দেয় এবং মানুষকে সমতার বিধান মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। কেননা এখানে কিসাসকে হত্যা বা মৃত্যুদণ্ড নামে অভিহিত না করে মানুষের মধ্যে সাম্য নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যা তাদের জীবনকে নিরাপদ ও সুখময় করে।
প্রাণহানিতে কিসাস প্রাণঘাতী আক্রমণ মাত্রই এর হোতাকে কিসাসের সম্মুখীন করে না। এ আক্রমণ ইচ্ছাকৃত হতে পারে, অনিচ্ছাকৃত তথা ভুলক্রমেও হতে পারে, আবার এতদুভয়ের মধ্যবর্তী ধরনেরও হতে পারে, অন্য কোনো ধরনেরও হতে পারে। এজন্য হত্যাকাণ্ড কত রকমের ও কি কি, তা বর্ণনা করা এবং কোন্ হত্যাকাণ্ডে কিসাস ওয়াজিব হয় তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
হত্যাকাণ্ডের প্রকারভেদ
হত্যাকাণ্ড তিন প্রকার : ১. ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, ২. আধা ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, ৩. অনিচ্ছাজনিত হত্যাকাণ্ড
ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড : যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্কিষ্ক ব্যক্তি কোনো নিরপরাধ মানুষকে স্বেচ্ছায় এমন কোনো উপায়ে হত্যা করে, যে উপায়টি হত্যার ব্যাপারে কার্যকর বলে প্রবল ধারণা জন্মে, তখন তাকেই ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। এই সংজ্ঞা থেকে বুঝা যায় ইচ্ছাকৃত হত্যার অপরাধ ততক্ষণ সংঘটিত হবেনা, যতক্ষণ তাতে নিম্নোক্ত উপাদানগুলো বিদ্যামান থাকবেনা:
১. হত্যাকারীর সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক ও হত্যায় ইচ্ছুক হওয়া। সুস্থ মস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া যে অপরিহার্য, তার প্রমাণ আলী রা. বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিস : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তিকে সকল দায়দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে : পাগল যতক্ষণ না সুস্থ মস্তিষ্ক হয়, ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হয় এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু যতক্ষণ না প্রাপ্তবয়স্ক হয়।" -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি।
আর ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার বিষয়টি নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়। আবু হুরায়রা রা. বলেছেন: "রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে হত্যা করলো। ঘটনাটা রসূলুল্লাহ সা. কে জানানো হলো। তিনি হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীর নিকট সমর্পণ করলেন। হত্যাকারী বললো : হে রসূলুল্লাহ সা., আমি তো তাকে হত্যা করতে ইচ্ছুক ছিলামনা। তখন রসূলুল্লাহ সা. উত্তরাধিকারীকে বললেন, হত্যাকারী যা বলছে, তা যদি সত্য হয় এবং তারপরও তাকে তুমি হত্যা করো। তবে তুমি দোযখবাসী হবে। একথা শুনে উত্তরাধিকারী তাকে ছেড়ে দিলো।" -আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি।
আবু দাউদ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী ক্ষমা না করলে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।" ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কাউকে হত্যা করবে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড। আর যে ব্যক্তি হত্যাকারী ও নিহতের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে (অর্থাৎ বিচারে বাধা হয়ে দাঁড়াবে) তার উপর আল্লাহর, ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার কাছ থেকে কোনো বিনিময় ও মুক্তিপণ গ্রহণ করবেন না।"
২. নিহত ব্যক্তির মানুষ হওয়া ও নিরপরাধ হওয়া অর্থাৎ তাকে হত্যা করা অবৈধ হওয়া জরুরি।
৩. যে অস্ত্র দ্বারা হত্যা করা হয়েছে, তা এমন হওয়া চাই, যা দ্বারা সচরাচর হত্যা করা হয়।
এই তিনটে উপাদান উপস্থিত না থাকলে হত্যাকাণ্ডটিকে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড গণ্য করা হবেনা।
হত্যার উপকরণ বা অস্ত্র: যে জিনিসটি দ্বারা হত্যা করা হয়, তা এমন হওয়াই যথেষ্ট যে, তা দ্বারা সচরাচর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকে, চাই তা ধারালো, হোক বা ধ্বংসকারী হোক। কেননা প্রাণ হননে উভয়ই সমান ক্ষমতার অধিকারী। বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. দুটি পাথরের মাঝে জনৈক ইহুদীর মাথা গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন।" এ হাদিস আবু হানিফা, শাবি, নাখয়ির এই মত খণ্ডন করে যে, ভারি কোনো জিনিস দ্বারা হত্যা করা হলে তাতে কিসাস নেই। আগুন দিয়ে পোড়ানো, পানিতে ডোবানো বা চুবানো,
"এ হচ্ছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ।" অর্থাৎ অতীতের জাতিগুলোর তুলনায় এটা ভার লাঘব ও অনুগ্রহ।
৫. আল্লাহ কিসাস প্রবর্তন করেছেন। কারণ এতেই রয়েছে মানুষের জীবন ও স্থিতির নিশ্চয়তা। হত্যাকারী যখন জানবে যে, সে হত্যা করলে নিজেও নিহত হবে, তখন সে ভয় পাবে ও সংযত হবে। তার এই সংযম দ্বারা একদিকে তার নিজের জীবনও বাঁচাবে, অপরদিকে যাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তার জীবনেও বাঁচাবে।
৬. ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বে হত্যার কিসাস বা শাস্তি দাবি করার যে অধিকার নিহত ব্যক্তির অভিভাবকের ছিল, ইসলাম সেটি বহাল রেখেছে। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيْهِ سُلْطنًا فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ طَ إِنَّهُ كَانَ مَنْصُورًاه
"কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি তার প্রতিকারের অধিকার দিয়েছি। কিন্তু হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে। সে তো সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছেই।" আয়াতে উত্তরাধিকারী অর্থ নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী, যার খুনের বদলা দাবি করার অধিকার রয়েছে। বস্তুত খুনের বদলা বা শান্তি দাবি করার অধিকার একমাত্র তারই, শাসক বা সরকারের নয়। সে যদি কিসাস দাবি না করে, তবে অপরাধীর কাছ থেকে কিসাস নেয়া যাবেনা। প্রতিকারের অধিকার দ্বারা হত্যাকরীর উপর কর্তৃত্ব বুঝায়। এই কর্তৃত্ব তাকে দেয়া হয়েছে, এজন্য যাতে তার অসম্মতিতেই খুনীকে কেউ ক্ষমা করে দিতে না পারে। কেননা অপরাধ দ্বারা সেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই স্বভাবতই তার মনই সংক্ষুব্ধ হবে, প্রতিশোধ নিতে চাইবে এবং হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
৭. এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাফসীর আল মানারের গ্রন্থাকার বলেছেন: "এ আয়াত থেকে জানা যাচ্ছে যে, জীবনের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা বিধানই মূল উদ্দেশ্য। কিসাস হলো তার একাধিক উপকরণের মধ্য হতে একটি উপকরণ। কারণ যে ব্যক্তি জানবে যে, সে কাউকে হত্যা করলে তার বদলে তাকে হত্যা করা অবধারিত, সে হত্যা থেকে নিবৃত্ত হবে। এভাবে সে নিজের জীবন ও যাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তার জীবন রক্ষা করবে। কেবলমাত্র দিয়াত (রক্তপণ বা ক্ষতিপূরণ) সবাইকে শত্রুর রক্তপাত থেকে নিবৃত করতে পারেনা। রক্তপণের সুযোগ থাকলে নিজের সাধ্য অনুসারে সে শত্রুকে হত্যা করতে পারে। কেননা শত্রুকে নিপাত করার উদ্দেশ্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে চাইবে- সমাজে এমন লোকের অভাব নেই। আর আয়াতটির বাচনভঙ্গী এত চমৎকার ও চিত্তাকর্ষক যে, শাস্তি হিসেবে অপরাধীর প্রাণ সংহারকে খারাপ ও বর্বরোচিত কাজ ভাবার মানসিকতা দূর করে দেয় এবং মানুষকে সমতার বিধান মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। কেননা এখানে কিসাসকে হত্যা বা মৃত্যুদণ্ড নামে অভিহিত না করে মানুষের মধ্যে সাম্য নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যা তাদের জীবনকে নিরাপদ ও সুখময় করে।
প্রাণহানিতে কিসাস প্রাণঘাতী আক্রমণ মাত্রই এর হোতাকে কিসাসের সম্মুখীন করে না। এ আক্রমণ ইচ্ছাকৃত হতে পারে, অনিচ্ছাকৃত তথা ভুলক্রমেও হতে পারে, আবার এতদুভয়ের মধ্যবর্তী ধরনেরও হতে পারে, অন্য কোনো ধরনেরও হতে পারে। এজন্য হত্যাকাণ্ড কত রকমের ও কি কি, তা বর্ণনা করা এবং কোন্ হত্যাকাণ্ডে কিসাস ওয়াজিব হয় তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
হত্যাকাণ্ডের প্রকারভেদ
হত্যাকাণ্ড তিন প্রকার : ১. ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, ২. আধা ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, ৩. অনিচ্ছাজনিত হত্যাকাণ্ড
ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড : যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্কিষ্ক ব্যক্তি কোনো নিরপরাধ মানুষকে স্বেচ্ছায় এমন কোনো উপায়ে হত্যা করে, যে উপায়টি হত্যার ব্যাপারে কার্যকর বলে প্রবল ধারণা জন্মে, তখন তাকেই ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। এই সংজ্ঞা থেকে বুঝা যায় ইচ্ছাকৃত হত্যার অপরাধ ততক্ষণ সংঘটিত হবেনা, যতক্ষণ তাতে নিম্নোক্ত উপাদানগুলো বিদ্যামান থাকবেনা:
১. হত্যাকারীর সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক ও হত্যায় ইচ্ছুক হওয়া। সুস্থ মস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া যে অপরিহার্য, তার প্রমাণ আলী রা. বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিস : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তিকে সকল দায়দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে : পাগল যতক্ষণ না সুস্থ মস্তিষ্ক হয়, ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হয় এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু যতক্ষণ না প্রাপ্তবয়স্ক হয়।" -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি।
আর ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার বিষয়টি নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়। আবু হুরায়রা রা. বলেছেন: "রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে হত্যা করলো। ঘটনাটা রসূলুল্লাহ সা. কে জানানো হলো। তিনি হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীর নিকট সমর্পণ করলেন। হত্যাকারী বললো : হে রসূলুল্লাহ সা., আমি তো তাকে হত্যা করতে ইচ্ছুক ছিলামনা। তখন রসূলুল্লাহ সা. উত্তরাধিকারীকে বললেন, হত্যাকারী যা বলছে, তা যদি সত্য হয় এবং তারপরও তাকে তুমি হত্যা করো। তবে তুমি দোযখবাসী হবে। একথা শুনে উত্তরাধিকারী তাকে ছেড়ে দিলো।" -আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি।
আবু দাউদ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী ক্ষমা না করলে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।" ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কাউকে হত্যা করবে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড। আর যে ব্যক্তি হত্যাকারী ও নিহতের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে (অর্থাৎ বিচারে বাধা হয়ে দাঁড়াবে) তার উপর আল্লাহর, ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার কাছ থেকে কোনো বিনিময় ও মুক্তিপণ গ্রহণ করবেন না।"
২. নিহত ব্যক্তির মানুষ হওয়া ও নিরপরাধ হওয়া অর্থাৎ তাকে হত্যা করা অবৈধ হওয়া জরুরি।
৩. যে অস্ত্র দ্বারা হত্যা করা হয়েছে, তা এমন হওয়া চাই, যা দ্বারা সচরাচর হত্যা করা হয়।
এই তিনটে উপাদান উপস্থিত না থাকলে হত্যাকাণ্ডটিকে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড গণ্য করা হবেনা।
হত্যার উপকরণ বা অস্ত্র: যে জিনিসটি দ্বারা হত্যা করা হয়, তা এমন হওয়াই যথেষ্ট যে, তা দ্বারা সচরাচর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকে, চাই তা ধারালো, হোক বা ধ্বংসকারী হোক। কেননা প্রাণ হননে উভয়ই সমান ক্ষমতার অধিকারী। বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. দুটি পাথরের মাঝে জনৈক ইহুদীর মাথা গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন।" এ হাদিস আবু হানিফা, শাবি, নাখয়ির এই মত খণ্ডন করে যে, ভারি কোনো জিনিস দ্বারা হত্যা করা হলে তাতে কিসাস নেই। আগুন দিয়ে পোড়ানো, পানিতে ডোবানো বা চুবানো,
📄 হত্যার পরিণতি
উপর থেকে নিচে ফেলে দেয়া, দেয়ালের নিচে চাপা দিয়ে পিষ্ট করা, শ্বাসরোধ করা, মানুষকে আটক করে খাদ্য ও পানীয় না দিয়ে ক্ষুধা পিপাসায় রাখা যতক্ষণ না মারা যায় এবং হিংস্র জন্তুর সামনে নিক্ষেপ করা ইত্যাদিও তদ্রূপ। এর সব কটিতেই কিসাস হবে। অনুরূপ, একজন নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে হত্যা করানো এবং তাকে হত্যা করানোর পর সাক্ষ্য প্রত্যাহার করা ও বলা যে, আমরা তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। এ সবই এমন উপকরণ যা দ্বারা সচরাচর হত্যা করা যায়। আর যে ব্যক্তি কাউকেও বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে অর্থাৎ সে জানে যে, তাতে বিষ মেশানো অথচ আহারকারী জানে না, অতপর সেই খাবার খেয়ে সে মারা যায়, সেই পরিবেশনকারীর উপর কিসাস কার্যকর করা হবে।
বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, জনৈকা ইহুদি মহিলা একটি বকরির গোশতে বিষ মিশিয়ে রসূলুল্লাহ সা. কে খেতে দিয়েছিল। তিনি তা থেকে এক গ্রাস খেয়েই উগরে ফেলে দেন। কিন্তু বিশর বিন বারা রা. তার সাথে খান। রসূলুল্লাহ সা. প্রথমে মহিলাটিকে কোনো শাস্তি না দিয়ে মাফ করে দেন। অর্থাৎ যারা খেয়েছিল তাদের কেউ মারা না যাওয়া পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু যেই মাত্র বিশর বিন বারা মারা গেলো, অমনি ইহুদি মহিলাকে তার বদলাস্বরূপ হত্যা করলো। আবু দাউদের বর্ণনায় তাকে হত্যা করার আদেশ দিলেন।" আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড: কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যখন একজন নিরপরাধ মানুষকে এমন উপায়ে হত্যা করে, যে উপায়ে সাধারণত হত্যা করা হয়না, যেমন হালকা লাঠি বা ছোট পাথর দ্বারা একটা কি দুটো আঘাত করলো এবং তাতেই সে মারা গেলো, তখন এই হত্যাকাণ্ডকে আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। (এটি আবু হানিফা, শাফেয়ি ও সাধারণ ফকিহদের মত। ইমাম মালেক ও লায়েসের মত এর বিপরীত। শেষোক্ত ফকিহদের মতানুসারে সচরাচর যে উপায়ে বা যে অস্ত্র দ্বারা হত্যা করা হয়না, যেমন লাঠি, চাবুক ও চড় থাপ্পড় ইত্যাদি, তা দ্বারা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে তাও ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড গণ্য হবে এবং তাতে কিসাস কার্যকর হবে। কেননা নীতিগতভাবে তারা প্রাণ হননের উপায় বা অস্ত্রের গুরুত্ব দেননা, তারা গুরুত্ব দেন প্রাণ হননের। তাদের মতে যে কোনো উপায়ে বা যে কোনো অস্ত্র দ্বারা প্রাণ হনন করা হোক না কেন, তা কিসাস যোগ্য) যদি কাউকে হত্যার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে প্রহার করা হয়, অথবা প্রহৃত ব্যক্তি এতটা অল্পবয়স্ক বা রুগ্ন যে, এ ধরনের প্রহারে সাধারণত মারা যায়, অথবা সুস্থ সবল ব্যক্তিকে ক্রমাগত পিটাতে পিটাতে হত্যা করা হয়, তাহলে সেটা ইচ্ছাকৃত হত্যা গণ্য হবে। কিন্তু আধা ইচ্ছাকৃত নামে আখ্যায়িত করার কারণ এই যে, এই হত্যাকাণ্ডটি ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দু ও সংশয় রয়েছে। কেননা এখানে প্রহারই উদ্দেশ্য, হত্যা উদ্দেশ্য নয়। তাই একে আধা-ইচ্ছাকৃত নাম দেয়া হয়েছে। কেননা এটা পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত নয়, পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃতও নয়। আর যেহেতু পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত নয়, তাই কিসাস রহিত। কেননা প্রাণ রক্ষাই মূলনীতি। সুতরাং সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া কারো উপর কিসাস কার্যকর করা বৈধ হতে পারেনা।
পক্ষান্তরে যেহেতু এটা পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃত নয়, কারণ প্রহার করাই আসল উদ্দেশ্য ছিলো, হত্যা করা নয়, তাই এতে কঠোর দিয়াত দিতে হবে। ইবনে আব্বাস রা. দার কুতনি থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "ইচ্ছাকৃত হত্যায় কিসাস অবধারিত। আর অনিচ্ছাকৃত হত্যা এমন অপরাধ, যাতে কিসাস নেই। আর যে ব্যক্তি পাথর, লাঠি বা
উপর থেকে নিচে ফেলে দেয়া, দেয়ালের নিচে চাপা দিয়ে পিষ্ট করা, শ্বাসরোধ করা, মানুষকে আটক করে খাদ্য ও পানীয় না দিয়ে ক্ষুধা পিপাসায় রাখা যতক্ষণ না মারা যায় এবং হিংস্র জন্তুর সামনে নিক্ষেপ করা ইত্যাদিও তদ্রূপ। এর সব কটিতেই কিসাস হবে। অনুরূপ, একজন নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে হত্যা করানো এবং তাকে হত্যা করানোর পর সাক্ষ্য প্রত্যাহার করা ও বলা যে, আমরা তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। এ সবই এমন উপকরণ যা দ্বারা সচরাচর হত্যা করা যায়। আর যে ব্যক্তি কাউকেও বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে অর্থাৎ সে জানে যে, তাতে বিষ মেশানো অথচ আহারকারী জানে না, অতপর সেই খাবার খেয়ে সে মারা যায়, সেই পরিবেশনকারীর উপর কিসাস কার্যকর করা হবে।
বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, জনৈকা ইহুদি মহিলা একটি বকরির গোশতে বিষ মিশিয়ে রসূলুল্লাহ সা. কে খেতে দিয়েছিল। তিনি তা থেকে এক গ্রাস খেয়েই উগরে ফেলে দেন। কিন্তু বিশর বিন বারা রা. তার সাথে খান। রসূলুল্লাহ সা. প্রথমে মহিলাটিকে কোনো শাস্তি না দিয়ে মাফ করে দেন। অর্থাৎ যারা খেয়েছিল তাদের কেউ মারা না যাওয়া পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু যেই মাত্র বিশর বিন বারা মারা গেলো, অমনি ইহুদি মহিলাকে তার বদলাস্বরূপ হত্যা করলো। আবু দাউদের বর্ণনায় তাকে হত্যা করার আদেশ দিলেন।" আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড: কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যখন একজন নিরপরাধ মানুষকে এমন উপায়ে হত্যা করে, যে উপায়ে সাধারণত হত্যা করা হয়না, যেমন হালকা লাঠি বা ছোট পাথর দ্বারা একটা কি দুটো আঘাত করলো এবং তাতেই সে মারা গেলো, তখন এই হত্যাকাণ্ডকে আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। (এটি আবু হানিফা, শাফেয়ি ও সাধারণ ফকিহদের মত। ইমাম মালেক ও লায়েসের মত এর বিপরীত। শেষোক্ত ফকিহদের মতানুসারে সচরাচর যে উপায়ে বা যে অস্ত্র দ্বারা হত্যা করা হয়না, যেমন লাঠি, চাবুক ও চড় থাপ্পড় ইত্যাদি, তা দ্বারা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে তাও ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড গণ্য হবে এবং তাতে কিসাস কার্যকর হবে। কেননা নীতিগতভাবে তারা প্রাণ হননের উপায় বা অস্ত্রের গুরুত্ব দেননা, তারা গুরুত্ব দেন প্রাণ হননের। তাদের মতে যে কোনো উপায়ে বা যে কোনো অস্ত্র দ্বারা প্রাণ হনন করা হোক না কেন, তা কিসাস যোগ্য) যদি কাউকে হত্যার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে প্রহার করা হয়, অথবা প্রহৃত ব্যক্তি এতটা অল্পবয়স্ক বা রুগ্ন যে, এ ধরনের প্রহারে সাধারণত মারা যায়, অথবা সুস্থ সবল ব্যক্তিকে ক্রমাগত পিটাতে পিটাতে হত্যা করা হয়, তাহলে সেটা ইচ্ছাকৃত হত্যা গণ্য হবে। কিন্তু আধা ইচ্ছাকৃত নামে আখ্যায়িত করার কারণ এই যে, এই হত্যাকাণ্ডটি ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দু ও সংশয় রয়েছে। কেননা এখানে প্রহারই উদ্দেশ্য, হত্যা উদ্দেশ্য নয়। তাই একে আধা-ইচ্ছাকৃত নাম দেয়া হয়েছে। কেননা এটা পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত নয়, পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃতও নয়। আর যেহেতু পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত নয়, তাই কিসাস রহিত। কেননা প্রাণ রক্ষাই মূলনীতি। সুতরাং সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া কারো উপর কিসাস কার্যকর করা বৈধ হতে পারেনা।
পক্ষান্তরে যেহেতু এটা পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃত নয়, কারণ প্রহার করাই আসল উদ্দেশ্য ছিলো, হত্যা করা নয়, তাই এতে কঠোর দিয়াত দিতে হবে। ইবনে আব্বাস রা. দার কুতনি থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "ইচ্ছাকৃত হত্যায় কিসাস অবধারিত। আর অনিচ্ছাকৃত হত্যা এমন অপরাধ, যাতে কিসাস নেই। আর যে ব্যক্তি পাথর, লাঠি বা