📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 জীবনের অধিকার

📄 জীবনের অধিকার


জীবনের বা বাঁচার অধিকার হচ্ছে এসব অধিকারের মধ্যে সর্বপ্রথম অধিকার। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং এমন পূত পবিত্র অধিকার যে, তার পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করা কারো জন্য বৈধ নয়। আল্লাহ বলেন: وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
"আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হতা করোনা।" (সূরা ইসরা: আয়াত ৩৩)
যে যথার্থ কারণ বা সঙ্গত কারণে প্রাণ হরণ করা বৈধ, তা ইবনে মাসউদ বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. নিম্নরূপ ব্যাখ্যা করেছেন: "আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং আমি তার রসূল, একথা স্বীকার করে এমন কোনো মুসলমানকে তিনটে কারণ ব্যতীত হত্যা করা যাবে না। তাহলো: বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার করা, কোনো মানুষকে হত্যা করেনি এমন ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং ইসলাম ত্যাগ করা, তথা মুরতাদ হওয়া।" -বুখারি ও মুসলিম।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادُكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ مَا نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ مَا إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خَطَا كَبِيرًا
"দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করোনা। তাদেরকে ও তোমাদেরকে আমিই রিযক দিয়ে থাকি। তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।" (সূরা ইসরা: আয়াত ৩১)
আল্লাহ আরো বলেন: وَإِذَا الْمَوْعِدَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ -
"যখন জীবন্ত প্রোথিত শিশু কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।" (সূরা আত তাকবীর: আয়াত ৮-৯)
মহান আল্লাহ প্রথম হত্যার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীর জন্য এমন কঠোর আযাব নির্ধারণ করে রেখেছেন, যা তার আর কোনো সৃষ্টির জন্য রাখেননি। রসূলুল্লাহ সা. বলেন: অন্যায়ভাবে যে কোনো মানুষ নিহত হয়, আদমের ছেলে (কাবিলকে) সেই অপরাধের শাস্তির একটা অংশ ভোগ করানো হবে, যে সর্বপ্রথম (হাবিলকে) হত্যা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।" -বুখারি, মুসলিম। ইসলাম মানুষের জীবন রক্ষায় যে অতিশয় ব্যাকুল ও যত্নবান, তার একটি প্রমাণ এই যে, সে মানুষের প্রাণ হননকে বৈধ গণ্যকারীকে কঠোরতম শাস্তির হুমকি দিয়ে রেখেছে। আল্লাহ বলেন: وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَلِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا .
অর্থ: যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে, তার প্রতিফল চিরস্থায়ী জাহান্নাম, তার উপর আল্লাহর কোপানল বর্ষিত হবে, অভিশাপ পড়বে এবং তার জন্য আল্লাহ ভয়াবহ আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।" (সূরা নিসা: আয়াত ৯৩)
এ আয়াত থেকে স্থির হলো যে, পরকালে একজন হত্যাকারীর শাস্তি হচ্ছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান, আল্লাহর গযব অভিশাপ ও কঠিন শাস্তি। এজন্য ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে যে হত্যা করে, তার তওবার সুযোগ নেই। কেননা এ আয়াত সর্বশেষে নাযিল হওয়া আয়াতসমূহের অন্যতম। পরবর্তীতে আর কোনো আয়াত এ আয়াতকে রহিত বা সংশোধিত করেনি। অবশ্য অধিকাংশ আলেম ইবনে আব্বাসের মতের সমর্থক নন।
রসূলুল্লাহ সা. বলেন: "একজন মুমিনের অন্যায়ভাবে নিহত হওয়ার চেয়ে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে তুচ্ছ।" -ইবনে মাজাহ।
আবু সাঈদ রা. থেকে তিরমিযি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আকাশ ও পৃথিবীর সকল প্রাণীও যদি একজন মুমিনের হত্যায় শরিক থাকতো, তবে তাদের সকলকে আল্লাহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করতেন।"
বায়হাকি ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের হত্যায় একটি শব্দের অর্ধেক উচ্চারণ করেও সাহায্য করে, কেয়ামতের দিন তার দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে: "আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতাশ।" কারণ হত্যা হচ্ছে আল্লাহ যা গড়তে চান তা ভাঙ্গার নামান্তর। আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাণ সংহারের পদক্ষেপ। তাকে নিয়ে তার যে আত্মীয় স্বজন গর্ববোধ করে ও তার দ্বারা উপকৃত হয়, তাকে হারিয়ে যারা অসহায় হয়ে পড়ে, তাদের উপর আগ্রাসনের শামিল। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় সকল হত্যাকাণ্ড এসে পড়ে, যেমন মুসলমান হত্যা, অমুসলিম হত্যা ও আত্মহত্যা। অমুসলিম হত্যা সম্পর্কে একাধিক সুস্পষ্ট হাদিস রয়েছে, যাতে হত্যাকারীর জন্য জাহান্নাম অবধারিত ঘোষণা করা হয়েছে। বুখারি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিক হত্যা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেনা। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।" (চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম সেই অমুসলিমকে বলা হয় যে, কোনো মুসলিম নাগরিক কর্তৃক নিরাপত্তা প্রদত্ত ও আশ্রিত, অথবা মুসলিম শাসকের সাথে সন্ধি চুক্তি অনুযায়ী মুসলিম দেশে বসবাস করে অথবা জিযিয়া প্রদানের চুক্তি অনুযায়ী নাগরিকত্ব লাভ করে। আর "জান্নাতের ঘ্রাণ পাবেনা, কথাটার অর্থ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা।)
আর আত্মহত্যা সম্পর্কে আল্লাহ স্বয়ং নিম্নরূপ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন: وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ - "তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করোনা।" (বাকারা: ১৯৫) আল্লাহ আরো বলেন: وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا "তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করোনা। আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।" (নিসা: ২৯)
আর বুখারি ও মুসলিম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো পাহাড়ের উপর থেকে নিজেকে নিচে ফেলে দেয় এবং নিজকে হত্যা করে, সে দোযখের আগুনে চিরদিন অবস্থান করে উপর থেকে নিচে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি বিষ পান করে নিজেকে হত্যা করে, সে দোযখের আগুনে অনন্তকাল অবস্থান করে নিজের হাতে বিষ নিয়ে পান করতে থাকবে, আর যে ব্যক্তি নিেেজকে কোনো লোহার অস্ত্র দিয়ে হত্যা করবে, সেই লোহার অস্ত্র হাতে নিয়েই সে অনন্ত কাল ব্যাপি দোযখে অবস্থান করে নিজেকে আঘাত করতে থাকবে।"
বুখারি আবু হুরায়রা রা. থেকে আরো বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজেকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, সে দোযখে নিজের শ্বাসরোধ করতে থাকবে, যে ব্যক্তি নিজেকে কোপায়, সে দোযখে নিজেকে কোপাতে থাকবে, আর যে নিজেকে ফেলে দেয়, সে দোযখে নিজেকে ফেলে দিতে থাকবে।"
জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বুখারি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক ব্যক্তির দেহে ক্ষত ছিলো। সে তার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লো। তারপর একখানা ছুরি দিয়ে নিজের হাত কাটলো। তারপর আর রক্তপাত বন্ধ হলোনা। অবশেষে মারা গেলো। আল্লাহ বললেন, আমার বান্দা নিজের ব্যাপারে আমাকে ডিঙ্গিয়ে গেলো। আমি তার উপর বেহেশত হারাম করে দিলাম।"
হাদিসে একথাও বলা হয়েছে, "কোনো ব্যক্তি যে জিনিস দিয়ে নিজেকে হত্যা করবে, তাকে কেয়ামতের দিন সেই জিনিস দিয়েই বারবার হত্যা করা হবে।" হত্যাকারীদের নিন্দায় ইতিপূর্বে যা কিছু বলা হয়েছে, তার অতিরিক্ত সর্বাধিক যে ধিক্কার বাণী উচ্চারিত হয়েছে তা হলো, ইসলাম কোনো একক ব্যক্তির হত্যাকারীকে গোটা মানবজাতির হত্যাকারী হিসেবে বিবেচনা করে। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় নিন্দাবাদ আর কিছু কল্পনা করা যায়না। আল্লাহ বলেন:
أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا ط অর্থ: নরহত্যা অথবা দেশে ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ছাড়াই কেউ একজন মানুষকে হত্যা করলে সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করলো, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণই রক্ষা করলো।" (আল মায়েদা: আয়াত ৩২)
আর মানুষের প্রাণের গুরুত্ব ও রক্তপাতের ভয়াবহতার কারণেই হত্যাকাণ্ড সেই অপরাধ যার বিচার কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হবে।" (মুসলিম) আর এই গুরুত্ব বিবেচনা করেই আল্লাহ হত্যাকারীর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ, যারা এখনো এ অপরাধে জড়িত হয়নি তাদেরকে সতর্কীকরণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হয় ও জননিরাপত্তা ব্যাহত হয় এমন অপরাধ থেকে সমাজকে পবিত্রকরণের নিমিত্তে কিসাসের বিধান প্রবর্তন ও হত্যাকারীর মৃত্যুণ্ডের ব্যবস্থা করেছেন এবং বলেছেন:
وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَوةٌ يَأْولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ .
অর্থ: হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমারে জন্য কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে যাতে তোমরা সাবধান হতে পারো।" (আল বাকারা: আয়াত ১৭৯)

জীবনের বা বাঁচার অধিকার হচ্ছে এসব অধিকারের মধ্যে সর্বপ্রথম অধিকার। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং এমন পূত পবিত্র অধিকার যে, তার পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করা কারো জন্য বৈধ নয়। আল্লাহ বলেন: وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
"আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হতা করোনা।" (সূরা ইসরা: আয়াত ৩৩)
যে যথার্থ কারণ বা সঙ্গত কারণে প্রাণ হরণ করা বৈধ, তা ইবনে মাসউদ বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. নিম্নরূপ ব্যাখ্যা করেছেন: "আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং আমি তার রসূল, একথা স্বীকার করে এমন কোনো মুসলমানকে তিনটে কারণ ব্যতীত হত্যা করা যাবে না। তাহলো: বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার করা, কোনো মানুষকে হত্যা করেনি এমন ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং ইসলাম ত্যাগ করা, তথা মুরতাদ হওয়া।" -বুখারি ও মুসলিম।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادُكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ مَا নَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ مَا إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خَطَا كَبِيرًا
"দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করোনা। তাদেরকে ও তোমাদেরকে আমিই রিযক দিয়ে থাকি। তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।" (সূরা ইসরা: আয়াত ৩১)
আল্লাহ আরো বলেন: وَإِذَا الْمَوْعِدَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ -
"যখন জীবন্ত প্রোথিত শিশু কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।" (সূরা আত তাকবীর: আয়াত ৮-৯)
মহান আল্লাহ প্রথম হত্যার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীর জন্য এমন কঠোর আযাব নির্ধারণ করে রেখেছেন, যা তার আর কোনো সৃষ্টির জন্য রাখেননি। রসূলুল্লাহ সা. বলেন: অন্যায়ভাবে যে কোনো মানুষ নিহত হয়, আদমের ছেলে (কাবিলকে) সেই অপরাধের শাস্তির একটা অংশ ভোগ করানো হবে, যে সর্বপ্রথম (হাবিলকে) হত্যা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।" -বুখারি, মুসলিম। ইসলাম মানুষের জীবন রক্ষায় যে অতিশয় ব্যাকুল ও যত্নবান, তার একটি প্রমাণ এই যে, সে মানুষের প্রাণ হননকে বৈধ গণ্যকারীকে কঠোরতম শাস্তির হুমকি দিয়ে রেখেছে। আল্লাহ বলেন: وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَلِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا .
অর্থ: যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে, তার প্রতিফল চিরস্থায়ী জাহান্নাম, তার উপর আল্লাহর কোপানল বর্ষিত হবে, অভিশাপ পড়বে এবং তার জন্য আল্লাহ ভয়াবহ আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।" (সূরা নিসা: আয়াত ৯৩)
এ আয়াত থেকে স্থির হলো যে, পরকালে একজন হত্যাকারীর শাস্তি হচ্ছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান, আল্লাহর গযব অভিশাপ ও কঠিন শাস্তি। এজন্য ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে যে হত্যা করে, তার তওবার সুযোগ নেই। কেননা এ আয়াত সর্বশেষে নাযিল হওয়া আয়াতসমূহের অন্যতম। পরবর্তীতে আর কোনো আয়াত এ আয়াতকে রহিত বা সংশোধিত করেনি। অবশ্য অধিকাংশ আলেম ইবনে আব্বাসের মতের সমর্থক নন।
রসূলুল্লাহ সা. বলেন: "একজন মুমিনের অন্যায়ভাবে নিহত হওয়ার চেয়ে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে তুচ্ছ।" -ইবনে মাজাহ।
আবু সাঈদ রা. থেকে তিরমিযি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আকাশ ও পৃথিবীর সকল প্রাণীও যদি একজন মুমিনের হত্যায় শরিক থাকতো, তবে তাদের সকলকে আল্লাহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করতেন।"
বায়হাকি ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের হত্যায় একটি শব্দের অর্ধেক উচ্চারণ করেও সাহায্য করে, কেয়ামতের দিন তার দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে: "আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতাশ।" কারণ হত্যা হচ্ছে আল্লাহ যা গড়তে চান তা ভাঙ্গার নামান্তর। আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাণ সংহারের পদক্ষেপ। তাকে নিয়ে তার যে আত্মীয় স্বজন গর্ববোধ করে ও তার দ্বারা উপকৃত হয়, তাকে হারিয়ে যারা অসহায় হয়ে পড়ে, তাদের উপর আগ্রাসনের শামিল। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় সকল হত্যাকাণ্ড এসে পড়ে, যেমন মুসলমান হত্যা, অমুসলিম হত্যা ও আত্মহত্যা। অমুসলিম হত্যা সম্পর্কে একাধিক সুস্পষ্ট হাদিস রয়েছে, যাতে হত্যাকারীর জন্য জাহান্নাম অবধারিত ঘোষণা করা হয়েছে। বুখারি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিক হত্যা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেনা। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।" (চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম সেই অমুসলিমকে বলা হয় যে, কোনো মুসলিম নাগরিক কর্তৃক নিরাপত্তা প্রদত্ত ও আশ্রিত, অথবা মুসলিম শাসকের সাথে সন্ধি চুক্তি অনুযায়ী মুসলিম দেশে বসবাস করে অথবা জিযিয়া প্রদানের চুক্তি অনুযায়ী নাগরিকত্ব লাভ করে। আর "জান্নাতের ঘ্রাণ পাবেনা, কথাটার অর্থ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা।)
আর আত্মহত্যা সম্পর্কে আল্লাহ স্বয়ং নিম্নরূপ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন: وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ - "তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করোনা।" (বাকারা: ১৯৫) আল্লাহ আরো বলেন: وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا "তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করোনা। আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।" (নিসা: ২৯)
আর বুখারি ও মুসলিম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো পাহাড়ের উপর থেকে নিজেকে নিচে ফেলে দেয় এবং নিজকে হত্যা করে, সে দোযখের আগুনে চিরদিন অবস্থান করে উপর থেকে নিচে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি বিষ পান করে নিজেকে হত্যা করে, সে দোযখের আগুনে অনন্তকাল অবস্থান করে নিজের হাতে বিষ নিয়ে পান করতে থাকবে, আর যে ব্যক্তি নিেেজকে কোনো লোহার অস্ত্র দিয়ে হত্যা করবে, সেই লোহার অস্ত্র হাতে নিয়েই সে অনন্ত কাল ব্যাপি দোযখে অবস্থান করে নিজেকে আঘাত করতে থাকবে।"
বুখারি আবু হুরায়রা রা. থেকে আরো বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজেকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, সে দোযখে নিজের শ্বাসরোধ করতে থাকবে, যে ব্যক্তি নিজেকে কোপায়, সে দোযখে নিজেকে কোপাতে থাকবে, আর যে নিজেকে ফেলে দেয়, সে দোযখে নিজেকে ফেলে দিতে থাকবে।"
জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বুখারি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক ব্যক্তির দেহে ক্ষত ছিলো। সে তার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লো। তারপর একখানা ছুরি দিয়ে নিজের হাত কাটলো। তারপর আর রক্তপাত বন্ধ হলোনা। অবশেষে মারা গেলো। আল্লাহ বললেন, আমার বান্দা নিজের ব্যাপারে আমাকে ডিঙ্গিয়ে গেলো। আমি তার উপর বেহেশত হারাম করে দিলাম।"
হাদিসে একথাও বলা হয়েছে, "কোনো ব্যক্তি যে জিনিস দিয়ে নিজেকে হত্যা করবে, তাকে কেয়ামতের দিন সেই জিনিস দিয়েই বারবার হত্যা করা হবে।" হত্যাকারীদের নিন্দায় ইতিপূর্বে যা কিছু বলা হয়েছে, তার অতিরিক্ত সর্বাধিক যে ধিক্কার বাণী উচ্চারিত হয়েছে তা হলো, ইসলাম কোনো একক ব্যক্তির হত্যাকারীকে গোটা মানবজাতির হত্যাকারী হিসেবে বিবেচনা করে। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় নিন্দাবাদ আর কিছু কল্পনা করা যায়না। আল্লাহ বলেন:
أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ নَفْسٍ أَوْ فَসَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا ط অর্থ: নরহত্যা অথবা দেশে ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ছাড়াই কেউ একজন মানুষকে হত্যা করলে সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করলো, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণই রক্ষা করলো।" (আল মায়েদা: আয়াত ৩২)
আর মানুষের প্রাণের গুরুত্ব ও রক্তপাতের ভয়াবহতার কারণেই হত্যাকাণ্ড সেই অপরাধ যার বিচার কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হবে।" (মুসলিম) আর এই গুরুত্ব বিবেচনা করেই আল্লাহ হত্যাকারীর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ, যারা এখনো এ অপরাধে জড়িত হয়নি তাদেরকে সতর্কীকরণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হয় ও জননিরাপত্তা ব্যাহত হয় এমন অপরাধ থেকে সমাজকে পবিত্রকরণের নিমিত্তে কিসাসের বিধান প্রবর্তন ও হত্যাকারীর মৃত্যুণ্ডের ব্যবস্থা করেছেন এবং বলেছেন:
وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَوةٌ يَأْولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ .
অর্থ: হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমারে জন্য কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে যাতে তোমরা সাবধান হতে পারো।" (আল বাকারা: আয়াত ১৭৯)

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কিসাস : ইসলাম ও জাহেলিয়াতে

📄 কিসাস : ইসলাম ও জাহেলিয়াতে


এই শাস্তি ইতিপূর্বে আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত সকল শরিয়তে নির্ধারিত ছিলো। মূসা আ.-এর শরিয়তের এ সংক্রান্ত বিধান তাওরাতে একবিংশ অধ্যায়ে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
"যে ব্যক্তি কোনো মানুষকে প্রহার করলো এবং প্রহারের ফলে সে মারা গেলো, তাকে হত্যা করতে হবে। আর যখন কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তির উপর আক্রমণ চালায় ও তাকে হত্যা করে, তখন তাকে হত্যা করতে হবে। আর যে ব্যক্তি তার বাবা ও মাকে হত্যা করে, তাকে হত্যা করতে হবে। আর যদি কেউ শুধু আহত করে, তবে (আহত হওয়ার পর মারা গেলে) প্রাণের বদলায় প্রাণ, চোখের বদলায় চোখ, দাঁতের বদলায় দাঁত, হাতের বদলায় হাত, পায়ের বদলায় পা, জখমের বদলে জখম এবং ভাঙ্গার বদলে ভাঙ্গার মাধ্যমে শাস্তি দাও।"
ঈসা আ.-এর শরিয়ত সম্পর্কে কারো কারো ধারণা, হত্যাকারীকে হত্যা করা এ শরিয়তের মূলনীতিতে ছিলোনা। মতির বাইবেলে উদ্ধৃত ঈসা আ.-এর নিম্নোক্ত উক্তি থেকে তারা এর প্রমাণ দর্শান:
"অন্যায়কে প্রতিহত করোনা। বরং যে তোমার ডান গালে চড় দিয়েছে, তার দিকে বাম গালটিও ফিরিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে ঝগড়া বাধাতে চায় এবং তোমার পোশাক কেড়ে নেয়, তাকে চাদরটাও দিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তি তোমাকে বিদ্রূপ করতে করতে এক মাইল যায়, তার সাথে দুই মাইল যাও।"
আবার কারো কারো ধারণা, ঈসা আ. এর শরিয়তে মৃত্যুদণ্ড রয়েছে। এ ব্যাপারে তারা তাঁর নিম্নোক্ত উক্তি থেকে প্রমাণ দেন:
"আমি ওহির প্রত্যাদেশকে বাতিল করতে আসিনি। আমি তো এসেছি শুধু তাকে পূর্ণতা দান করতে।" এই মতটি কুরআনের এই বাণী দ্বারা সমর্থিত হয়: (ঈসা বললেন, আমি এসেছি) "আমার সামনে যে তাওরাত রয়েছে, তার সমর্থক রূপে।" বস্তুত সূরা মায়েদার ৪৫ নং আয়াতটি এ দিকেই ইঙ্গিত করে:
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ
অর্থ: আমি তাতে (তাওরাতে) বিধান দিয়েছিলাম, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং সকল জখমের সমপরিমাণ বদলা নিতে হবে।"
শরিয়ত মানুষে মানুষে কোনো পার্থক্য করেনি। প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ হরণ একটা অধিকার, চাই নিহত ব্যক্তি অভিজাত শ্রেণীর হোক বা নিম্নতর শ্রেণীর হোক, পুরুষ হোক বা স্ত্রীলোক হোক। কারণ প্রত্যেকেরই বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কারো জীবনে এমনভাবে হস্তক্ষেপ করা যাবেনা, যা তাকে বিনষ্ট করে, তা সে যেভাবেই হোক। এমনকি অনিচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রেও আল্লাহ হত্যাকারীকে দায় থেকে অব্যাহতি দেননি, বরং তার উপর গোলাম আযাদ করা ও দিয়্যত দেয়া বাধ্যতামূলক করেছেন। আল্লাহ বলেন:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَاً وَمَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأً فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَنْ يَصَدَّقُوا

এই শাস্তি ইতিপূর্বে আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত সকল শরিয়তে নির্ধারিত ছিলো। মূসা আ.-এর শরিয়তের এ সংক্রান্ত বিধান তাওরাতে একবিংশ অধ্যায়ে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
"যে ব্যক্তি কোনো মানুষকে প্রহার করলো এবং প্রহারের ফলে সে মারা গেলো, তাকে হত্যা করতে হবে। আর যখন কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তির উপর আক্রমণ চালায় ও তাকে হত্যা করে, তখন তাকে হত্যা করতে হবে। আর যে ব্যক্তি তার বাবা ও মাকে হত্যা করে, তাকে হত্যা করতে হবে। আর যদি কেউ শুধু আহত করে, তবে (আহত হওয়ার পর মারা গেলে) প্রাণের বদলায় প্রাণ, চোখের বদলায় চোখ, দাঁতের বদলায় দাঁত, হাতের বদলায় হাত, পায়ের বদলায় পা, জখমের বদলে জখম এবং ভাঙ্গার বদলে ভাঙ্গার মাধ্যমে শাস্তি দাও।"
ঈসা আ.-এর শরিয়ত সম্পর্কে কারো কারো ধারণা, হত্যাকারীকে হত্যা করা এ শরিয়তের মূলনীতিতে ছিলোনা। মতির বাইবেলে উদ্ধৃত ঈসা আ.-এর নিম্নোক্ত উক্তি থেকে তারা এর প্রমাণ দর্শান:
"অন্যায়কে প্রতিহত করোনা। বরং যে তোমার ডান গালে চড় দিয়েছে, তার দিকে বাম গালটিও ফিরিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে ঝগড়া বাধাতে চায় এবং তোমার পোশাক কেড়ে নেয়, তাকে চাদরটাও দিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তি তোমাকে বিদ্রূপ করতে করতে এক মাইল যায়, তার সাথে দুই মাইল যাও।"
আবার কারো কারো ধারণা, ঈসা আ. এর শরিয়তে মৃত্যুদণ্ড রয়েছে। এ ব্যাপারে তারা তাঁর নিম্নোক্ত উক্তি থেকে প্রমাণ দেন:
"আমি ওহির প্রত্যাদেশকে বাতিল করতে আসিনি। আমি তো এসেছি শুধু তাকে পূর্ণতা দান করতে।" এই মতটি কুরআনের এই বাণী দ্বারা সমর্থিত হয়: (ঈসা বললেন, আমি এসেছি) "আমার সামনে যে তাওরাত রয়েছে, তার সমর্থক রূপে।" বস্তুত সূরা মায়েদার ৪৫ নং আয়াতটি এ দিকেই ইঙ্গিত করে:
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ
অর্থ: আমি তাতে (তাওরাতে) বিধান দিয়েছিলাম, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং সকল জখমের সমপরিমাণ বদলা নিতে হবে।"
শরিয়ত মানুষে মানুষে কোনো পার্থক্য করেনি। প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ হরণ একটা অধিকার, চাই নিহত ব্যক্তি অভিজাত শ্রেণীর হোক বা নিম্নতর শ্রেণীর হোক, পুরুষ হোক বা স্ত্রীলোক হোক। কারণ প্রত্যেকেরই বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কারো জীবনে এমনভাবে হস্তক্ষেপ করা যাবেনা, যা তাকে বিনষ্ট করে, তা সে যেভাবেই হোক। এমনকি অনিচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রেও আল্লাহ হত্যাকারীকে দায় থেকে অব্যাহতি দেননি, বরং তার উপর গোলাম আযাদ করা ও দিয়্যত দেয়া বাধ্যতামূলক করেছেন। আল্লাহ বলেন:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَأُ ج وَمَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأَ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَنْ يَصَدَّقُوا

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ক্ষমার পরিবর্তে কিসাসই যখন একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ায়

📄 ক্ষমার পরিবর্তে কিসাসই যখন একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ায়


অর্থ : কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়, তবে ভুলবশতঃ করলে তা স্বতন্ত্র। কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করা এবং নিহতের পরিজনবর্গকে রক্তপণ (দিয়াত) অর্পণ করা বিধেয়, যদি না তারা ক্ষমা করে।" (সূরা আল মায়েদা : আয়াত ৪৫)
ইসলাম এই আর্থিক দণ্ড ভুলবশত সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বেলায়ই প্রয়োগ করেছে মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের খাতিরে, যাতে কেউ এই অপরাধকে গুরুত্বহীন মনে করতে না পারে, যাতে মানুষ প্রাণ হনন ও রক্তপাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে, যাতে গোলযোগের পথ বন্ধ হয় এবং যাতে 'ভুলক্রমে হত্যা করেছি' বলে একজন আরেকজনকে হত্যা করেও পার পেয়ে না যায়। মানুষের প্রাণ রক্ষায় ইসলাম কত কঠোরভাবে যত্নবান, তার প্রমাণের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে শিশুর শরীরে প্রাণ সঞ্চারিত হওয়ার পর গর্ভপাত ঘটানোকে হারাম করেছে। তবে এমন বাস্তব কারণ যদি থেকে থাকে, যা গর্ভপাতকে অনিবার্য করে তোলে, যেমন প্রসূতির মৃত্যুর আশংকা ইত্যাদি, কেবল সেক্ষেত্রেই গর্ভপাত করা যাবে।
কিসাস : ইসলাম ও জাহেলিয়তে
জাহেলি যুগে আরবে কিসাস (হত্যাকারীকে হত্যা করা) প্রথা চালু ছিলো বটে। তবে তার ভিত্তি ছিলো এই যে, কোনো গোত্রের এক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড ঘটালে তার সমগ্র গোত্রটিকে ঐ অপরাধের জন্য দায়ী করা হতো। এর ব্যতিক্রম হতো কেবল তখন, যখন গোত্র ঐ ব্যক্তিকে ত্যাজ্য ঘোষণা করতো এবং সকল সামাজিক সভা সমিতিতে তা প্রচার করতো। এজন্য নিহতের অভিভাবক হত্যাকারী ও তার গোত্রের অন্যান্যদের নিকট থেকে কিসাস দাবি করতো। এই দাবি কখনো কখনো এত ব্যাপক রূপ নিতো যে, তার ফলে খুনী ও নিহতের গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতো।
নিহত ব্যক্তি যদি অভিজাত কিংবা গোত্রপতি হতো, তাহলে তো কথাই নেই। কিসাসের দাবি আরো ব্যাপক রূপ ধারণ করতো। অপরদিকে কোনো কোনো গোত্র কিসাসের এই দাবিকে অগ্রাহ্য ও উপেক্ষা করতো এবং হত্যাকারীর পক্ষপাতিত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা করতো। নিহতের উত্তরাধিকারীদের দাবির প্রতি ভ্রুক্ষেপও করতোনা। ফলে যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়ে বহু নিরাপরাধ মানুষ মারা যেতো। ইসলাম এসে এই অবিচারমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটালো এবং ঘোষণা করলো যে, কেবলমাত্র অপরাধী নিজেই তার কৃত অপরাধের জন্য দায়ী। তার পাপের জন্য তাকেই পাকড়াও করতে হবে। আল্লাহ বলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلْقِصَاصُ فِى ٱلْقَتْلَى ۖ ٱلْحُرُّ بِٱلْحُرِّ وَٱلْعَبْدُ بِٱلْعَبْدِ وَٱلْأُنثَىٰ بِٱلْأُنثَىٰ ۚ فَمَنْ عُفِىَ لَهُۥ مِنْ أَخِيهِ شَىْءٌ فَٱتِّبَاعٌۢ بِٱلْمَعْرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَٰنٍ ۗ ذَٰلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ ۗ فَمَنِ ٱعْتَدَىٰ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَلَكُمْ فِى ٱلْقِصَاصِ حَيَوٰةٌ يَٰٓأُو۟لِى ٱلْأَلْبَٰبِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থ: হে মুমিনগণ, নিহতের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হলো। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাসের ও নারীর বদলে নারী। তবে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমতা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ
টিকাঃ
ফিন্তুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড ফর্মা নং-৫২

অর্থ : কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়, তবে ভুলবশতঃ করলে তা স্বতন্ত্র। কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করা এবং নিহতের পরিজনবর্গকে রক্তপণ (দিয়াত) অর্পণ করা বিধেয়, যদি না তারা ক্ষমা করে।" (সূরা আল মায়েদা : আয়াত ৪৫)
ইসলাম এই আর্থিক দণ্ড ভুলবশত সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বেলায়ই প্রয়োগ করেছে মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের খাতিরে, যাতে কেউ এই অপরাধকে গুরুত্বহীন মনে করতে না পারে, যাতে মানুষ প্রাণ হনন ও রক্তপাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে, যাতে গোলযোগের পথ বন্ধ হয় এবং যাতে 'ভুলক্রমে হত্যা করেছি' বলে একজন আরেকজনকে হত্যা করেও পার পেয়ে না যায়। মানুষের প্রাণ রক্ষায় ইসলাম কত কঠোরভাবে যত্নবান, তার প্রমাণের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে শিশুর শরীরে প্রাণ সঞ্চারিত হওয়ার পর গর্ভপাত ঘটানোকে হারাম করেছে। তবে এমন বাস্তব কারণ যদি থেকে থাকে, যা গর্ভপাতকে অনিবার্য করে তোলে, যেমন প্রসূতির মৃত্যুর আশংকা ইত্যাদি, কেবল সেক্ষেত্রেই গর্ভপাত করা যাবে।
কিসাস : ইসলাম ও জাহেলিয়তে
জাহেলি যুগে আরবে কিসাস (হত্যাকারীকে হত্যা করা) প্রথা চালু ছিলো বটে। তবে তার ভিত্তি ছিলো এই যে, কোনো গোত্রের এক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড ঘটালে তার সমগ্র গোত্রটিকে ঐ অপরাধের জন্য দায়ী করা হতো। এর ব্যতিক্রম হতো কেবল তখন, যখন গোত্র ঐ ব্যক্তিকে ত্যাজ্য ঘোষণা করতো এবং সকল সামাজিক সভা সমিতিতে তা প্রচার করতো। এজন্য নিহতের অভিভাবক হত্যাকারী ও তার গোত্রের অন্যান্যদের নিকট থেকে কিসাস দাবি করতো। এই দাবি কখনো কখনো এত ব্যাপক রূপ নিতো যে, তার ফলে খুনী ও নিহতের গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতো।
নিহত ব্যক্তি যদি অভিজাত কিংবা গোত্রপতি হতো, তাহলে তো কথাই নেই। কisass-এর দাবি আরো ব্যাপক রূপ ধারণ করতো। অপরদিকে কোনো কোনো গোত্র কিসাসের এই দাবিকে অগ্রাহ্য ও উপেক্ষা করতো এবং হত্যাকারীর পক্ষপাতিত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা করতো। নিহতের উত্তরাধিকারীদের দাবির প্রতি ভ্রুক্ষেপও করতোনা। ফলে যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়ে বহু নিরাপরাধ মানুষ মারা যেতো। ইসলাম এসে এই অবিচারমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটালো এবং ঘোষণা করলো যে, কেবলমাত্র অপরাধী নিজেই তার কৃত অপরাধের জন্য দায়ী। তার পাপের জন্য তাকেই পাকড়াও করতে হবে। আল্লাহ বলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلْقِصَاصُ فِى ٱلْقَتْلَى ۖ ٱلْحُرُّ بِٱلْحُرِّ وَٱلْعَبْدُ بِٱلْعَبْدِ وَٱلْأُنثَىٰ بِٱلْأُنثَىٰ ۚ فَمَنْ عُفِىَ لَهُۥ مِنْ أَخِيهِ شَىْءٌ فَٱتِّبَاعٌۢ بِٱلْمَعْرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَٰنٍ ۗ ذَٰلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ ۗ فَمَنِ ٱعْتَدَىٰ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَلَكُمْ فِى ٱلْقِصَاصِ حَيَوٰةٌ يَٰٓأُو۟لِى ٱلْأَلْبَٰبِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থ: হে মুমিনগণ, নিহতের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হলো। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাসের ও নারীর বদলে নারী। তবে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমতা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ
টিকাঃ
ফিন্তুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড ফর্মা নং-৫২

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 প্রাণহানিতে কিসাস

📄 প্রাণহানিতে কিসাস


করা ও সততার সাথে তার পাওনা প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি সীমালংঘন করে তার জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে যাতে তোমরা সাবধান হতে পারো।" (সূরা বাকারা: আয়াত ১৭৮)
ক্ষমার পরিবর্তে কিসাসই যখন একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ায়: উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে বায়হাকি বলেছেন: "জাহেলি যুগে আরবের দুটো গোত্রের মধ্যে খুন ও তার প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবণতা লেগেই থাকতো। এ ধরনের দুই গোত্রের একটি অপরটি থেকে অধিকতর শক্তিশালী হলে শপথ করতো যে, ক্রীতদাস হত্যার প্রতিশোধে আমরা তোমাদের স্বাধীন লোককে এবং নারী হত্যার বিনিময়ে পুরুষকে হত্যা করবো। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর তারা যখন রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এ বিষয়ে সুবিচার প্রার্থনা করলো, তখন উক্ত আয়াত নাযিল হলো এবং তিনি তাদেরকে আদেশ দিলেন যেন তাদের শপথ থেকে তারা পরস্পরে অব্যাহতি গ্রহণ করে।"
এ আয়াতটির বক্তব্য হলো: ১. আল্লাহ তায়ালা জাহেলি রীতিপ্রথাকে বাতিল করেছেন এবং হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে সমতাকে বাধ্যতামূলক করেছেন। কাজেই লোকেরা যখন ক্ষমার পরিবর্তে প্রতিশোধ গ্রহণ তথা কিসাসকেই অগ্রাধিকার দেয় এবং তা কার্যকর করার দাবি জানায় তখন একজন স্বাধীন ব্যক্তি আরেক জন স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করে থাকলে হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, অনুরূপ ক্রীতদাসকে হত্যা করার প্রতিশোধস্বরূপ খুনী ক্রীতদাসকেই হত্যা করা হবে এবং নারীকে হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ খুনী নারীকেই হত্যা করা হবে।
২. নিহতের উত্তরাধিকারী যখন অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়, তখন দিয়াত (রক্তপণ) দাবি করার অধিকার তার থাকবে। তবে দাবিটা হওয়া চাই ন্যায়সঙ্গত, তার সাথে যেন কোনো সহিংসতা বা নিষ্ঠুরতার সংমিশ্রণ না ঘটে, সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করা চাই। আর হত্যাকারীরও উচিত কোনো গড়িমসি ও কম বেশি না করে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমাকারীকে দিয়াত প্রদান করা।
৩. আল্লাহর প্রবর্তিত এই বিধি অর্থাৎ কিসাস কার্যকর করাও জায়েয এবং তা মাফ করিয়ে দিয়াত দেয়াও জায়েয। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিরাট রেয়াত ও দয়া। কেননা এই দুইটির মধ্যে যে কোনোটি অবলম্বনের অবকাশ তিনি রেখেছেন এবং এর যে কোনো একটিকে বাধ্যতামূলক করেননি।
৪. যে ব্যক্তি সীমালংঘনপূর্বক অপরাধীকে ক্ষমা করার পর হত্যা করে, তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এই মর্মন্তুদ শাস্তি ইহকালে মৃত্যুদণ্ডের আকারে অথবা পরকালে দোযখের আযাবের আকারে ভোগ করতে হতে পারে।
বুখারি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: "বনী ইসরাইলে কিসাসের প্রচলন ছিলো, দিয়াত ছিলোনা। তাই আল্লাহ এই উম্মাহকে দিয়াতের সুযোগ দিলেন। বললেন, নিহতের ব্যাপারে তোমাদের উপর কিসাস চালু করলাম ..... যাকে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কোনো ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়, সে যেন যথাযথ বিধির অনুসরণ করে ও সততার সাথে পাওনা প্রদান করে।" বস্তুত ক্ষমা হলো ইচ্ছাকৃত ক্ষেত্রে দিয়াত গ্রহণ করা।

করা ও সততার সাথে তার পাওনা প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি সীমালংঘন করে তার জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে যাতে তোমরা সাবধান হতে পারো।" (সূরা বাকারা: আয়াত ১৭৮)
ক্ষমার পরিবর্তে কিসাসই যখন একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ায়: উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে বায়হাকি বলেছেন: "জাহেলি যুগে আরবের দুটো গোত্রের মধ্যে খুন ও তার প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবণতা লেগেই থাকতো। এ ধরনের দুই গোত্রের একটি অপরটি থেকে অধিকতর শক্তিশালী হলে শপথ করতো যে, ক্রীতদাস হত্যার প্রতিশোধে আমরা তোমাদের স্বাধীন লোককে এবং নারী হত্যার বিনিময়ে পুরুষকে হত্যা করবো। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর তারা যখন রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এ বিষয়ে সুবিচার প্রার্থনা করলো, তখন উক্ত আয়াত নাযিল হলো এবং তিনি তাদেরকে আদেশ দিলেন যেন তাদের শপথ থেকে তারা পরস্পরে অব্যাহতি গ্রহণ করে।"
এ আয়াতটির বক্তব্য হলো: ১. আল্লাহ তায়ালা জাহেলি রীতিপ্রথাকে বাতিল করেছেন এবং হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে সমতাকে বাধ্যতামূলক করেছেন। কাজেই লোকেরা যখন ক্ষমার পরিবর্তে প্রতিশোধ গ্রহণ তথা কisassকেই অগ্রাধিকার দেয় এবং তা কার্যকর করার দাবি জানায় তখন একজন স্বাধীন ব্যক্তি আরেক জন স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করে থাকলে হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, অনুরূপ ক্রীতদাসকে হত্যা করার প্রতিশোধস্বরূপ খুনী ক্রীতদাসকেই হত্যা করা হবে এবং নারীকে হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ খুনী নারীকেই হত্যা করা হবে।
২. নিহতের উত্তরাধিকারী যখন অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়, তখন দিয়াত (রক্তপণ) দাবি করার অধিকার তার থাকবে। তবে দাবিটা হওয়া চাই ন্যায়সঙ্গত, তার সাথে যেন কোনো সহিংসতা বা নিষ্ঠুরতার সংমিশ্রণ না ঘটে, সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করা চাই। আর হত্যাকারীরও উচিত কোনো গড়িমসি ও কম বেশি না করে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমাকারীকে দিয়াত প্রদান করা।
৩. আল্লাহর প্রবর্তিত এই বিধি অর্থাৎ কisass কার্যকর করাও জায়েয এবং তা মাফ করিয়ে দিয়াত দেয়াও জায়েয। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিরাট রেয়াত ও দয়া। কেননা এই দুইটির মধ্যে যে কোনোটি অবলম্বনের অবকাশ তিনি রেখেছেন এবং এর যে কোনো একটিকে বাধ্যতামূলক করেননি।
৪. যে ব্যক্তি সীমালংঘনপূর্বক অপরাধীকে ক্ষমা করার পর হত্যা করে, তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এই মর্মন্তুদ শাস্তি ইহকালে মৃত্যুদণ্ডের আকারে অথবা পরকালে দোযখের আযাবের আকারে ভোগ করতে হতে পারে।
বুখারি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: "বনী ইসরাইলে কিসাসের প্রচলন ছিলো, দিয়াত ছিলোনা। তাই আল্লাহ এই উম্মাহকে দিয়াতের সুযোগ দিলেন। বললেন, নিহতের ব্যাপারে তোমাদের উপর কিসাস চালু করলাম ..... যাকে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কোনো ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়, সে যেন যথাযথ বিধির অনুসরণ করে ও সততার সাথে পাওনা প্রদান করে।" বস্তুত ক্ষমা হলো ইচ্ছাকৃত ক্ষেত্রে দিয়াত গ্রহণ করা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00