📄 মানুষের নিজের জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষিত স্থান
মানুষ তার পোশাক পরিচ্ছদ ও ঘুমানোর খাট পালং ও ঘর বিছানার জন্য নিজেই সুরক্ষিত স্থান অর্থাৎ রক্ষক, চাই সে মসজিদের ভেতরে থাকুক বা অন্য কোথাও। যদি কেউ পথিমধ্যে বিশ্রাম নেয় এবং তার সাথে তার যাবতীয় দ্রব্যসামগ্রী থাকে, তবে সে নিজেই সেসব দ্রব্য সামগ্রীর রক্ষক, চাই সে ঘুমিয়ে থাকুক বা জেগে থাকুক। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো মানুষের কাছ থেকে তার নগদ অর্থ বা দ্রব্যসামগ্রী চুরি করে, তবে সে তা হস্তগত করা মাত্রই তার হাত কাটা যাবে। কেননা জিনিসগুলো তার মালিকের হাতছাড়া হয়ে গেছে। ফকিহগণ ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তির ব্যাপারে শর্ত আরোপ করেছেন যে, চুরি হওয়া দ্রব্যটি তার দেহের নিচে বা মাথার নিচে থাকা চাই। এই শর্তের পক্ষে তারা প্রমাণ দর্শান। আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, নাসায়ী ও হাকেম কর্তৃক বর্ণিত এই হাদিস থেকে: "সাফওয়ান বিন উমাইয়া বলেন: আমি মসজিদে আমার একটা চাদর বিছিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। সেই চাদর চুরি হয়ে গেলো। আমরা চোরকে ধরে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট নিয়ে গেলাম। তিনি তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। আমি বলমাল: হে রসূলুল্লাহ্ মাত্র ত্রিশ দিরহাম মূল্যের একটা চাদরের জন্য? ওটা আমি ওকে দান করলাম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তুমি এই কাজটি ওকে আমার কাছে নিয়ে আমার আগে করলেনা কেন? অর্থাৎ আমার কাছে নিয়ে আসার আগে তাকে ক্ষমা করলেনা কেন এবং চাদরটি দান করলেনা কেন?
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, চুরি হওয়া দ্রব্যটির দাবি জানানো ও অভিযোগ দায়ের করা হাত কাটার পূর্বশর্ত। মালিক যদি দ্রব্যটি চোরকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার আগে দিয়ে দেয় বা তার কাছে বিক্রি করে, তাহলে চোরের হাত কাটার শাস্তি রহিত হবে। এটা স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা. এর এই উক্তি থেকেই জানা যায় যে, আমার কাছে ওকে নিয়ে আসার আগে দান করলেনা কেন?
📄 পকেটমার
পকেটমার সম্পর্কে ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। একদল বলেন: পকেটমারের হাত কাটা হবে। চাই পকেটে হাত দিয়ে পকেটে যা আছে তুলে নিক অথবা পকেট কেটে যা আছে তা পড়ে যাওয়ার পর তুলে নিক। এটা ইমাম মালেক, আওযায়ি, আবু সাওর, ইয়াকুব, হাসান ও ইবনুল মুনযিরের মত। কিন্তু আবু হানিফা, মুহাম্মদ ও ইসহাকের মতে, পকেটে থাকা টাকা যদি বাহির থেকে দেখা যায় এবং তা কেটে চুরি করে, তবে হাত কাটা হবেনা। আর যদি পকেটের ভেতরে অদৃশ্য থাকে এবং তার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বের করে নেয়, তাহলে হাত কাটা হবে।
📄 মসজিদ সুরক্ষিত স্থান
মসজিদের বিছানা, বাতি, চাটাই ইত্যাদি সাধারণত: মসজিদেই রাখা হয়। সেগুলোর জন্য মসজিদ সুরক্ষিত স্থান গণ্য হয়। মসজিদে মহিলাদের নামাযের জায়গায় রক্ষিত তিন দিরহাম মূল্যের একটা ঢাল চুরি করার দায়ে রসূলুল্লাহ সা. চোরের হাত কেটে দিয়েছিলেন। (আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী) অনুরূপ যে চোর মসজিদের দরজা বা শোভা বর্ধক কোনো মূল্যবান উপকরণ চুরি করে, তারও হাত কাটা হবে। কেননা এগুলো যে সুরক্ষিত জিনিস, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শাফেয়ি আলেমগণ মসজিদের বাতি ও চাটাই চুরির দায়ে হাত কাটার বিরোধী। কারণ এগুলো মুসলমানদের সুবিধার জন্যই রাখা হয়। চোরেরও অধিকার রয়েছে এই সুবিধা ভোগ করার। তবে চোর অমুসলিম হলে ভিন্ন কথা। তখন তার হাত কাটা হবে। কেননা তার এতে কোনো অধিকার নেই।
📄 বাড়ি থেকে চুরি
বাড়ির দরজা বন্ধ না থাকলে বাড়ি সুরক্ষিত স্থান নয়- এটা সকল ফকিহর সর্বসম্মত মত। অনুরূপ এ ব্যাপারেও ফকিহগণ একমত যে, চোর একক মালিকানাধীন কোনো বাড়ি থেকে চুরি করে, সে ঐ বাড়ি থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত তার হাত কাটা হবেনা। কিন্তু যখন দুই ব্যক্তি যৌথভাবে কোনো বাড়িতে সিধ কাটে বা ছিদ্র করে অতপর একজন ঢুকে ভেতর থেকে কোনো জিনিস নিয়ে অপর জনের নিকট হস্তান্তর করে এবং শেষোক্ত জন বাড়ির বাইরে থাকে অথবা বাড়ির ভেতর থেকে একজন ছুড়ে দেয় এবং বাহির থেকে অপর জন নিয়ে নেয়। তবে সেই ক্ষেত্রে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আহমদের মতে, ভেতরের চোরের হাত কাটা হবে, বাইরের চোরের নয়। আবু হানিফার মতে, কারোই নয়। আর যখন একটি দল বাড়িতে প্রবেশের জন্য সিধ কাটে বা ছিদ্র করে এবং সবাই ভেতরে প্রবেশ করে, অতপর কয়েকজন নেসাব পরিমাণ মাল হস্তগত করে আর অপর কয়েকজন কিছুই হস্তগত করতে পারেনা এবং তাদের পক্ষ থেকে হস্তগতকারীদের কোনো সহযোগিতাও করা হয়না, তখন আবু হানিফা ও মুহাম্মদের মতে গোটা দলের হাত কাটা হবে। মালেক ও শাফেয়ির মতে কেবল যারা মাল হস্তগত করতে পেরেছে তাদেরই হাত কাটা হবে। পক্ষান্তরে যে ভেতরে ঢুকেছে, সে যদি মাল ছিদ্রের কাছে এনে রেখে দেয় এবং বাইরের জন হাত ঢুকিয়ে দিয়ে তা বাড়ির বাইরে নিয়ে আসে। তবে আবু হানিফার মতে দু'জনের কারোই হাত কাটা হবেনা। ইমাম মালেকের মতে যেজন মাল বাইরে এনেছে তার হাত কাটা হবে। আর ভেতরের যেজন ছিদ্রের কাছে এনে রেখেছে তার সম্পর্কে ইমাম মালেকের শিষ্যদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। কত লোক বলেন, তার হাত কাটা হবে। কত লোক বলেন, কাটা হবেনা। শাফেয়ির মতে, শুধু যেজন মাল বাইরে এনেছে তার হাত কাটা হবে। আহমদের মতে, উভয়েরই হাত কাটা হবে।
শেখ আবু ইসহাক বলেন: যদি দুই ব্যক্তি সিঁধ কেটে বাড়িতে ঢোকে অতপর তাদের একজন মাল ধরে এনে ছিদ্রের কাছে রাখে এবং অপরজন তা ধরে বাইরে আনে তাহলে এ ব্যাপারে দুটি মত রয়েছে : একটি হলো দু'জনেরই হাত কাটা হবে। কারণ এ দু'জনের হাত যদি না কাটা হয়, তাহলে এটা হাত কাটা রহিত করার একটি স্থায়ী কৌশলে রূপ নেবে। অপর মতটি হলো, দু'জনের কারোই হাত কাটা হবেনা। এই শেষোক্ত মতটি আবু হানিফার এবং এটাই সঠিক। কেননা দু'জনের কেউ সুরক্ষিত স্থান থেকে মাল বাইরে নিয়ে আসেনি। আর যদি একজন সিঁধ কাটে এবং অপরজন ভেতরে ঢোকে ও মাল বের করে, তবে এ সম্পর্কে দুটি মত রয়েছে। একটি পূর্বোক্ত মতের ন্যায় : অর্থাৎ একদল বলেন দু'জনেরই হাত কাটা হবে, আর আবু হানিফা বলেন দুজনকেই হাত কাটা থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। অপর মতটি হলো, দু'জনের কারোই হাত কাটা হবেনা। কেননা একজন সিঁধ কেটেছে কিন্তু মাল বাইরে আনেনি। আর অপরজন মাল বাইরে এনেছে বটে, তবে সুরক্ষিত স্থান থেকে নয়।