📄 যে জায়গা থেকে চুরি হয়েছে তার জন্য যে শর্তাবলী পূরণ জরুরি
যে স্থান থেকে চুরি হয়, তার জন্য অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে সুরক্ষিত হওয়া, যেমন বাড়ি, দোকান, আস্তাবল, খোয়াড় বা গোয়াল ঘর, শস্য মাড়ানো ও শুকানোর খোলান ইত্যাদি। এর জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা শরিয়তের পক্ষ থেকেও দেয়া হয়নি, অভিধানের দিক থেকেও দেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে একমাত্র প্রচলিত পরিভাষার উপরই নির্ভর করা হয়। শরিয়ত সে স্থানকেই সংরক্ষিত মনে করে, যা প্রমাণ করে যে, জিনিসটির মালিক জিনিসটিকে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষায় যথাসাধ্য সচেষ্ট ও যত্নবান। এর প্রমাণ হলো, আমর বিন শুয়াইবের দাদা কর্তৃক বর্ণিত হাদিস। তিনি বলেন : এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. কে তার চারণভূমিতে বিচরণশীল পশুর চুরি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিলেন : এ ধরনের পশু চুরি করলে তার দ্বিগুণ মূল্য আদায় করা হবে ও অপমানসূচক পিটুনি দেয়া হবে। আর গোয়াল থেকে যা নেয়া হবে তা যদি ঢালের সমমূল্যের হয়, তবে তার হাত কাটিা হবে। (অর্থাৎ গোয়াল থেকে ছাগল বা ভেড়া চুরি করলে চোরের হাত কাটা হবে। কেননা গোয়াল তার রক্ষণাবেক্ষণের স্থান। আর চারণভূমি থেকে চুরি করলে হাত কাটা হবেনা।) লোকটি বললো: হে রসূলুল্লাহ, যে কাপড়ের আঁচলে করে কিছু নিয়ে যায়? তিনি বললেন : যে ব্যক্তি তার মুখে করে কিছু নিয়ে যায় এবং কাপড়ের আঁচলে বেঁধে নেয়না, তার কোনো সাজা নেই। আর যে ব্যক্তি বহন করে কিছু নিয়ে যায়, তার কাছ থেকে তার মূল্যের দ্বিগুণ জরিমানা আদায় করা হবে ও অপমানসূচক প্রহার করা হবে। আর ফসল সংরক্ষণের জায়গা থেকে যা কিছু নেয়া হবে, তা ঢালের সমমূল্যের হলে হাত কাটা হবে। -আহমদ, নাসায়ী, হাকেম, তিরমিযি।
অপর হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেন: গাছে ঝুলন্ত খেজুর ও পাহাড়ে বিচরণরত পশু চুরিতে হাত কাটা হবেনা। তবে যদি তা খোয়াড়ে বা সংরক্ষিত চাতালে রক্ষিত হয়, তা হলে ঢালের সমমূল্যের হলে হাত কাটা হবে। এ দুটো হাদিস থেকেই প্রমাণিত হচ্ছে হাত কাটার জন্য সংরক্ষিত স্থান থেকে চুরি হওয়া চাই। ইবনুল কাইয়েম বলেন: রসূলুল্লাহ সা. গাছ থেকে ফল চুরির জন্য হাত কাটা রহিত ও সংরক্ষিত স্থান থেকে চুরির জন্য হাত কাটা কার্যকর করেছেন।
আবু হানিফা রহ. এর মতে, গাছের ফল চুরিতে হাত না কাটার। কারণ গাছের ফলমূল পচনশীল হওয়ার কারণে তার মূল্য কমে যায়। বস্তুত প্রত্যেক পচনশীল জিনিসের ক্ষেত্রেই এই নীতি প্রযোজ্য। তবে অধিকাংশ ফকিহর মতই সঠিক। কেননা রসূলুল্লাহ সা. গাছের ফলের তিনটে অবস্থা নির্দেশ কেরছেন। এক, কেউ ফল পেড়ে খেয়ে গেলে কোনো শাস্তি নেই। দুই, গাছ থেকে পেড়ে বা ছিড়ে ফল নিয়ে চলে গেলে দ্বিগুণ জরিমানা আদায় ও মারপিট করা হবে, কিন্তু হাত কাটা হবেনা। তিন, ফল শুকানো ও সংরক্ষণের জায়গা থেকে চুরি করলে হাত কাটা হবে, চাই তা পুরো শুকিয়ে থাকুক বা না শুকিয়ে থাকুক। সুতরাং গুরুত্ব হলো সংরক্ষণের ও সংরক্ষণের স্থানের। ফল শুকনো না কাঁচা তার কোনো গুরুত্ব নেই। এর প্রমাণ হলো, রসূলুল্লাহ সা. চারণক্ষেত্র থেকে ছাগল চুরির দায়ে হাত কাটার রহিত করেছেন। গোয়াল বা খোয়াড় থেকে চুরির জন্য হাত কাটা হবে। কেননা ওটা একটা সংরক্ষিত স্থান। অধিকাংশ ফকিহর মতে হাত কাটার জন্য সংরক্ষিত স্থান থেকে চুরি হওয়ার গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু তা শর্ত নয়। এই ফকিহদের মধ্যে রয়েছেন আহমদ, ইসহাক, যুফার ও যাহেরি মাযহাব। কেননা “পুরুষ ও মহিলা যে-ই চুরি করুক, তার হাত কেটে দাও” এ আয়াতে হাত কাটা কোনো শর্তের আওতাভুক্ত নয়। আর আমর বিন শুয়াইবের হাদিসগুলো বিতর্কিত হওয়ার কারণে কোনো শর্ত আরোপের অযোগ্য।
📄 সম্পদকে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার বিভিন্নতা
সম্পদের বিভিন্নতার কারণে সংরক্ষণ ব্যবস্থাও ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। প্রচলিত রীতি নীতিই এর চূড়ান্ত মানদণ্ড। বস্তুত: একই জিনিস কখনো সংরক্ষিত গণ্য হয়, আবার কখনো হয়না। যেমন বাড়ি তার ভেতরকার ফার্নিচার ইত্যাদির জন্য সুরক্ষিত স্থান, সুরক্ষিত ঘর ফলমূলের জন্য সুরক্ষিত স্থান, আস্তাবল পশুর জন্য সুরক্ষিত স্থান এবং খোয়াড় ছাগল ভেড়ার জন্য সুরক্ষিত স্থান।
📄 মানুষের নিজের জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষিত স্থান
মানুষ তার পোশাক পরিচ্ছদ ও ঘুমানোর খাট পালং ও ঘর বিছানার জন্য নিজেই সুরক্ষিত স্থান অর্থাৎ রক্ষক, চাই সে মসজিদের ভেতরে থাকুক বা অন্য কোথাও। যদি কেউ পথিমধ্যে বিশ্রাম নেয় এবং তার সাথে তার যাবতীয় দ্রব্যসামগ্রী থাকে, তবে সে নিজেই সেসব দ্রব্য সামগ্রীর রক্ষক, চাই সে ঘুমিয়ে থাকুক বা জেগে থাকুক। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো মানুষের কাছ থেকে তার নগদ অর্থ বা দ্রব্যসামগ্রী চুরি করে, তবে সে তা হস্তগত করা মাত্রই তার হাত কাটা যাবে। কেননা জিনিসগুলো তার মালিকের হাতছাড়া হয়ে গেছে। ফকিহগণ ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তির ব্যাপারে শর্ত আরোপ করেছেন যে, চুরি হওয়া দ্রব্যটি তার দেহের নিচে বা মাথার নিচে থাকা চাই। এই শর্তের পক্ষে তারা প্রমাণ দর্শান। আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, নাসায়ী ও হাকেম কর্তৃক বর্ণিত এই হাদিস থেকে: "সাফওয়ান বিন উমাইয়া বলেন: আমি মসজিদে আমার একটা চাদর বিছিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। সেই চাদর চুরি হয়ে গেলো। আমরা চোরকে ধরে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট নিয়ে গেলাম। তিনি তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। আমি বলমাল: হে রসূলুল্লাহ্ মাত্র ত্রিশ দিরহাম মূল্যের একটা চাদরের জন্য? ওটা আমি ওকে দান করলাম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তুমি এই কাজটি ওকে আমার কাছে নিয়ে আমার আগে করলেনা কেন? অর্থাৎ আমার কাছে নিয়ে আসার আগে তাকে ক্ষমা করলেনা কেন এবং চাদরটি দান করলেনা কেন?
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, চুরি হওয়া দ্রব্যটির দাবি জানানো ও অভিযোগ দায়ের করা হাত কাটার পূর্বশর্ত। মালিক যদি দ্রব্যটি চোরকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার আগে দিয়ে দেয় বা তার কাছে বিক্রি করে, তাহলে চোরের হাত কাটার শাস্তি রহিত হবে। এটা স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা. এর এই উক্তি থেকেই জানা যায় যে, আমার কাছে ওকে নিয়ে আসার আগে দান করলেনা কেন?
📄 পকেটমার
পকেটমার সম্পর্কে ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। একদল বলেন: পকেটমারের হাত কাটা হবে। চাই পকেটে হাত দিয়ে পকেটে যা আছে তুলে নিক অথবা পকেট কেটে যা আছে তা পড়ে যাওয়ার পর তুলে নিক। এটা ইমাম মালেক, আওযায়ি, আবু সাওর, ইয়াকুব, হাসান ও ইবনুল মুনযিরের মত। কিন্তু আবু হানিফা, মুহাম্মদ ও ইসহাকের মতে, পকেটে থাকা টাকা যদি বাহির থেকে দেখা যায় এবং তা কেটে চুরি করে, তবে হাত কাটা হবেনা। আর যদি পকেটের ভেতরে অদৃশ্য থাকে এবং তার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বের করে নেয়, তাহলে হাত কাটা হবে।