📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 চুরির শাস্তিযোগ্য হওয়ার জন্য চুরিকৃত দ্রব্যের মধ্যে যে শর্তাবলি জরুরি

📄 চুরির শাস্তিযোগ্য হওয়ার জন্য চুরিকৃত দ্রব্যের মধ্যে যে শর্তাবলি জরুরি


চুরিকৃত দ্রব্যের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলো বা শর্তাবলি থাকা জরুরি, তা হচ্ছে:
প্রথমত, দ্রব্যটি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়া চাই, তার ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এমন হওয়া চাই, তা বিক্রি করা ও তার বিনিময়ে অন্য কিছু গ্রহণ করা বৈধ হওয়া চাই। অতএব কেউ মদ ও শুকর চুরি করলে তার হাত কাটা হবেনা, এমনকি এ দুটির মালিক যদি অমুসলিম হয় তবুও না। কেননা আল্লাহ এ দুটির মালিক হওয়া ও এ দুটির দ্বারা উপকৃত হওয়া মুসলমান ও অমুসলমান উভয়ের জন্য হারাম করেছেন। (ইমাম আবু হানিফা যদিও অমুসলিমের মদ ও শুকরের মালিক হওয়া বৈধ এবং এ দুটি কেউ ধ্বংস করলে এর মূল্য পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন, তবে এ দুটি চুরি করলে তার কাটা হবেনা, একথা সমর্থন করেছেন। কেননা এ দুটি পূর্ণাঙ্গ সম্পদ নয়। অথচ দণ্ড প্রয়োগের জন্য পূর্ণাঙ্গ সম্পদ হওয়া শর্ত।) অনুরূপ, গান বাজনা ও নৃত্য ইত্যাদির যন্ত্র ও সরঞ্জামাদি যে ব্যক্তি চুরি করবে, তার হাতও কাটা যাবেনা। কেননা এসব যন্ত্র ও সরঞ্জামের ব্যবহার বহু সংখ্যক আলেমের নিকট বৈধ নয়। কেননা এগুলো সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়না। এগুলোর উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়না, এগুলোর বিক্রিও বৈধ নয়। তবে যারা এগুলোর ব্যবহার বৈধ বলেন, তারাও এগুলোর চোরের হাত কাটা হবেনা- এ বিষয়ে একমত। কেননা এসব দ্রব্যসামগ্রীতে সন্দেহ রয়েছে যা দণ্ড রহিত করে।
স্বাধীন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, যার ন্যায়-অন্যায়, বাছবিচারের ক্ষমতা তখনো হয়নি, তাকে চুরি করার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আবু হানিফা ও শাফেয়ির মতে যেহেতু সম্পদ নয়, তাই তার চোরের হাত কাটা হবে না, তবে তাযীর অবশ্যই করা হবে। এ ধরনের শিশুর পরনে যদি কাপড় বা সোনা রূপার গহনাও থাকে, তাহলেও তার চোরের হাত কাটা হবেনা (কেননা তার গায়ে যেসব গহনা থাকে, তা তারই অনুসঙ্গ, পৃথকভাবে তা চুরি করা ঈপ্সিত নয়। আবু ইউসুফ বলেন, গহনা যদি নেসাব পরিমাণ হয়, তাহলে হাত কাটা হবে।) ইমাম মালেক বলেছেন, শিশুকে চুরি করার জন্য চোরের হাত কাটা হবে। কারণ সে হচ্ছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এখানে নির্দিষ্ট কোনো সম্পদ চুরির কারণে চোরের হাত কাটা হবেনা, কাটা হবে শুধু এর সাথে জীবন্ত মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণে। আর স্বাধীন মানুষের সাথে সংশ্লিষ্টতা দাসদাসীর সাথে সংশ্লিষ্টতার চেয়ে বেশি। ন্যায়-অন্যায় বাছবিচারের ক্ষমতা এখনো জন্মেনি। এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক দাসের চোরের হাত কাটা হবে। কেননা এ ধরনের দাস সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। পক্ষান্তরে যে দাসের ন্যায়-অন্যায় বাছবিচারের ক্ষমতা জন্মেছে, তাকে চুরি করলে চোরের হাত কাটা হবেনা। কেননা সে ক্রয়বিক্রয় যোগ্য সম্পদ হলেও তার নিজের উপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। তাই সে মালিকের সংরক্ষিত মালিকানায় আছে বলে বিবেচিত হবেনা। পক্ষান্তরে যেসব জিনিসের মালিক হওয়া বৈধ, কিন্তু বিক্রয় বৈধ নয়, যেমন পাহারা দেয়া, শিকার ধরা ও কৃষি কাজের নিমিত্তে পালিত কুকুর এবং কুরবানীর গোশত। এগুলো সম্পর্কে মালেকি মাযহাবের আশহাব বলেন, এ ধরনের কুকুরের চোরের হাত কাটা হবে। কিন্তু পাহারা দেয়া, শিকার ধরা ও কৃষিকাজ ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পালিত কুকুরের চোরের হাত কাটা হবেনা। কুরবানীর গোশতের চোর সম্পর্কে মালেকি মাযহাবের আসবাগ বলেন, কুরবানীর জানোয়ারকে যবাই করার আগে চুরি করলে তার হাত কাটা হবে, যবাইয়ের পরে চুরি করলে তার কাটা হবেনা।
পানি, বরফ, ঘাস, লবণ ও মাটির চোর সম্পর্কে মতভেদ আছে। আল মুগনির লেখক বলেন, পানি চোরের হাত কাটা হবেনা। কেননা এটা (শরিয়তের দৃষ্টিতে) সম্পদ বলে গণ্য হয়না। এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। তবে ঘাস ও লবণ সম্পর্কে মতভেদ আছে। আবু বকর বলেছেন, এ দুটির চোরের হাত কাটা হবেনা। কেননা শরিয়ত যে কটি জিনিসে সকল মানুষের সম্মিলিত মালিকানা রয়েছে বলে ঘোষণা করেছে, এ দুটি তার আওতাভুক্ত। আবু ইসহাক বলেন, হাত কাটা হবে। কেননা এ দুটি সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। বরফ সম্পর্কে কাযী বলেছেন, এটা পানির মতোই। কেননা এটা জমাট পানি মাত্র। আর মাটি যদি এমন হয়, যার প্রতি সাধারণত খুব কম লোকেরই আগ্রহ দেখা যায়, যেমন প্রলেপ দেয়া বা নির্মাণ কাজের জন্য ব্যবহার্য মাটি (অথবা মৃৎ শিল্প বা ইট বানানোর মাটি) তবে কাটা হবেনা। কেননা এ ধরনের মাটি সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়না। যদি খুব মূল্যবান মাটি হয়, যেমন ওষুধ বা সাবান তৈরিতে রং দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয় এমন মাটি হয়, তাহলে তা নিয়ে দুটি মত লক্ষ্য করা যায়: (১) হাত কাটা হবেনা। কেননা তা পানির মতোই সম্পদ পদবাচ্য নয়। (২) হাত কাটা হবে। কেননা তা সাধারণ সম্পদ রূপে গণ্য হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে রপ্তানী হয়।
আর যে সমস্ত জিনিস মৌলিকভাবে হালাল ও সকলের জন্য উন্মুক্ত, যেমন মাছ ও পাখি (মোরগ, মুরগী, হাঁস ও কবুতরসহ) সেগুলো চুরি করলে হাত কাটা হবেনা যদি তা কোনো ব্যক্তি বিশেষের মালিকানার আওতাধীন সুরক্ষিত থাকা অবস্থায় চুরি না হয়। সুরক্ষিত থাকা অবস্থায় চুরি হলে সে সম্পর্কে ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। মালেকি ও শাফেয়ি মাযহাব অনুযায়ী হাত কাটা হবে। কেননা চোর এমন একটা জিনিস চুরি করেছে, যার সুরক্ষিত ছিলো এবং যার মূল্য ছিলো। হাম্বলি ও হানাফি মাযহাব মতে, হাত কাটা হবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি শিকার ধরবে, শিকার তারই। এ হাদিস এমন একটা সন্দেহের উদ্রেক করে, যা দণ্ড রহিত করে।
আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াসার বলেন, এক ব্যক্তি মুরগী চুরি করে ধরা পড়ে ও উমর ইবনে আব্দুল আযীযের দরবারে নীত হয়। তিনি তার হাত কাটার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন সালেম ইবনে আব্দুর রহমান তাকে বললেন, উসমান (রা) বলেছেন, পাখি চুরিতে হাত কাটা হবেনা। অন্য বর্ণনায় আছে, উমর ইবনে আব্দুল আযীয নিজেই সায়েব ইবনে ইয়াযীদের নিকট ফতোয়া জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমি পাখি চুরির জন্য কারো হাত কাটা হতে দেখিনি এবং এজন্য হাত কাটা জরুরিও নয়। তখন উমর ইবনে আব্দুল আযীয মুরগী চোরটির হাত কাটা হতে নিবৃত্ত হলেন। কোনো কোনো ফকিহ বলেছেন, যে পাখি সকলের জন্য বৈধ, তা হলো শিকার করা হয়ে থাকে এমন পাখি। মোরগ মুরগী ও হাঁস এর অন্তর্ভুক্ত নয়। হাঁস ও মুরগীর চুরিতে হাত কাটা অপরিহার্য। কেননা তারা গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে গণ্য। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, তাজা খাবার, যথা দুধ, গোশত ও তাজা ফল চুরিতে, ঘাস ও জ্বালানী কাঠ চুরিতে এবং ত্বরিত বিনষ্ট হয় এমন জিনিস চুরিতে হাত কাটা হবেনা, এমনকি চোরাই মাল যদি ন্যূনতম নেসাবের সমপরিমাণও হয় তবু নয়। কেননা এসব জিনিসের প্রতি সাধারণ মানুষের তেমন কোনো আকর্ষণ থাকেনা। আর এর মালিক সাধারণত কৃপণতা করেনা যে তাকে শায়েস্তা করার প্রয়োজন হবে। তাছাড়া এখানে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ। আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "তিনটে জিনিসে সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে : পানি, আগুন ও ঘাস।” ফকিহদের আরেকটি মতভেদপূর্ণ বিষয় হলো কুরআন শরিফ চুরি করা। আবু হানিফা বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন শরিফ চুরি করবে, তার হাত কাটা হবেনা। কেননা এটা কোনো সম্পদ নয়। তাছাড়া এতে সকলেরই অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আবু সাওর, আবু ইউসুফ ও ইবনুল মুনযির বলেন, কুরআন শরিফের মূল্য হাত কাটার ন্যূনতম নেসাবের সমান হলে যে তা চুরি করবে তার হাত কাটা হবে।
দ্বিতীয় যে শর্তটি চুরিকৃত মালে পূরণ হওয়া জরুরি তা হলো, তা হাত কাটার ন্যূনতম নেসাবের সমান হবে। কারণ হদ কার্যকর করার জন্য এমন একটা জিনিস জরুরি, যা তার মাপকাঠি হবে। তাছাড়া জিনিসটির এতটা মূল্য থাকা চাই, যার কারণে জিনিসটি খোয়া গেলে জনগণের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামান্য মূল্যের জিনিস খোয়া গেলে জনগণ তা মেনে নিতে অভ্যস্ত। তাই প্রাচীন মনীষীগণ তুচ্ছ জিনিস চুরি করার দায়ে চোরের হাত কাটতেন না। নেসাবের পরিমাণ কত, তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে, স্বর্ণের তৈরি এক দিনারের এক চতুর্থাংশ অথবা রূপার তৈরি তিন দিরহামের সমান হওয়া জরুরি। এভাবে পরিমাণ নির্ধারণের যৌক্তিকতা সুস্পষ্ট। এটা একজন মধ্যম ধরনের মানুষের নিজের ও তার পরিবারের একদিনের খরচের অনুরূপ। আর একজন মানুষের নিজের ও পরিবারের একদিনের খরচই হলো নেসাব। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. সিকি দিনার বা তদূর্ধ্ব পরিমাণ সামগ্রী চুরির জন্য চোরের হাত কেটে দিতেন। -আহমদ, মুসলিম ইবনে মাজাহ।
নাসায়ীর অপর একটি রেওয়ায়াতে আছে : "ঢালের চেয়ে কম দামী জিনিসের জন্য হাত কাটা হবেনা।" আয়েশা রা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো : ঢালের দাম কত? তিনি বললেন : সিকি দিনার। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত ইবনে উমরের এই রেওয়ায়াতটি উপরোক্ত হাদিসের সমর্থক যে, রসূলুল্লাহ সা. তিন দিরহামের একটি ঢালের জন্য চোরের হাত কেটেছিলেন।
হানাফিদের মাযহাব হলো, দশ দিরহাম বা তদূর্ধের জন্য হাত কাটা হবে, তার চেয়ে কমের জন্য হাত কাটা হবেনা। বায়হাকি, তাহাবি ও নাসায়ীর হাদিস দ্বারা তাদের মতের পক্ষে প্রমাণ দর্শান। পক্ষান্তরে হাসান বসরি ও দাউদ যাহেরির মত হলো, আয়াতে যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণের উল্লেখ নেই, তাই কম হোক, বেশি হোক, চুরি করলেই হাত কাটা হবে। তাছাড়া বুখারি ও মুসলিমের আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : "আল্লাহ চোরের উপর অভিশাপ বর্ষণ করুন। সে একটা ডিম চুরি করলেও তার হাত কাটা হয়, একটা উট চুরি করলেও তার হাত কাটা হয়।" অন্যান্য ফকিহ হাসান বসরি ও দাউদ যাহেরির মত খণ্ডন করে এই হাদিসটি সম্পর্কে বলেন: “এ হাদিসের বর্ণনাকারী আ'মাশ হাদিসটির ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, ডিম দ্বারা লোহার ডিম বুঝানো হয়েছে, যা যুদ্ধের পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং তা ঢালের মতোই। এর মূল্য ঢালের মূল্যের চেয়ে বেশিও হয়ে থাকে। আর উটের মূল্য কয়েক দিরহাম বলে মনে করা হতো। আর সিকি দিনার তিন দিরহাম দিয়ে ভাঙানো হতো। কেননা ইমাম শাফেয়ি 'আর রওযাতুন নাদিয়া' গ্রন্থে বলেছেন: সিকি দিনার তিন দিরহামের রেওয়ায়াতের সাথে সংগতিপূর্ণ। রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে এক দিনারকে বারো দিরহাম দ্বারা ভাঙানো হতো। এটা দিয়াত নির্ধারণ সংক্রান্ত রেওয়াতগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ। দিয়াত স্বর্ণ দিয়ে দিতে হলে এক হাজার দিনার এবং রৌপ্য দিয়ে দিতে হলে বারো হাজার দিরহাম দিতে হতো। আবু হানিফা ও তাঁর শিষ্যগণ কমের পক্ষে দশ দিরহাম বা এক দিনার চুরি করলেই হাত কাটা বাধ্যতামূলক মনে করেন। নগদ মুদ্রা ছাড়া অন্য কোনো দ্রব্যসামগ্রী চুরি করলে তা দশ দিরহাম বা এক দিনার মূল্যের হলে হাত কাটা হবে। এর চেয়ে কম হলে হাত কাটা হবেনা। কেননা আমর বিন শুয়াইবের রেওয়ায়াত অনুসারে রসূলুল্লাহ সা. এর সময়ে একটা ঢালের মূল্য ছিলো দশ দিরহাম। ইবনে আব্বাস প্রমুখ থেকেও এই মূল্যায়ন বর্ণিত আছে। তাদের মতে, এই মূল্যায়ন অনুসারে ঢালের মূল্য নির্ধারণ করাই অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। তবে প্রকৃত ব্যাপার হলো, ঢালের মূল্য দশ দিরহাম নির্ধারণ করা হলে তা হবে নির্ভুলতম হাদিসের লঙ্ঘন। মালেক ও আহমদ বলেন: চুরির সর্বনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে, সিকি দিনার অথবা তিন দিরহাম অথবা তিন দিরহাম মূল্যের সামগ্রী। মূল্য নির্ধারণের কাজটা বিশেষভাবে দিরহাম দ্বারা সম্পন্ন করা উচিত।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন যে, হাত কাটার দিয়াত বা ক্ষতিপূরণ যেখানে পাঁচশো দিনার, সেখানে মাত্র সিকি দিনারের জন্য হাত কাটা কিভাবে ন্যায়সঙ্গত হয়! এর জবাব এই যে, ইসলাম এত কম পরিমাণ সম্পদ চুরিতে হাত কাটার বিধান রেখেছে কেবল সম্পদের সুরক্ষা করার উদ্দেশ্যে, আর হাতের দিয়াত পাঁচশো দিনার নির্ধারণ করেছে হাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। হাত যখন আমানতদ্বার ও সৎ ছিলো তখন তা দামী ছিলো। আর যখন তা অসৎ ও চোর হয়েছে, তখন তার দাম কমে গেছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 চোরাই মালের মূল্য নির্ধারণ কখন করা হবে?

📄 চোরাই মালের মূল্য নির্ধারণ কখন করা হবে?


মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাব অনুসারে চোরাই মালের মূল্য নির্ধারণ করা হবে যেদিন চুরি হয়েছে সেই দিনের বাজার দর অনুসারে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 দলগত চুরি

📄 দলগত চুরি


যখন এক দল চোর এতটা সম্পদ চুরি করে যে, তা দলের সকল সদস্যের মধ্যে বণ্টন করলে প্রত্যেকের অংশে যা পড়ে, তাতে হাত কাটা অনিবার্য হয়ে পড়ে, তখন ফকিহদের সর্বসম্মত মতানুসারে সকলের হাত কাটা হবে। কিন্তু যদি চোরাই মালের পরিমাণ এমন হয় যে, তা একত্রে হাত কাটার নেসাবের সমান হয়, কিন্তু বন্ট করে দিলে নেসাবের সমান হয়না, তখন ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ফকিহর মতানুসারে সকলের হাত কাটা হবে। আবু হানিফা বলেন: প্রত্যেকের অংশ নেসাব পরিমাণ না হলে হাত কাটা হবেনা। ইবনে রুশদ বলেন: যারা মনে করেন সবার হাত কাটা হবে, তাদের দৃষ্টিতে শাস্তিটা চোরাই মালের পরিমাণের সাথে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ মানুষের সম্পদের সুরক্ষার স্বার্থে এই পরিমাণ সম্পদই চুরিতে হাত কাটাকে অপরিহার্য করে। আর যারা মনে করেন শুধু এই পরিমাণের উপরই হাত কাটা নির্ভরশীল, এর কমে হাত কাটা যাবেনা হাতের সম্মানের খাতিরে, তারা বলেন : শরিয়ত যে পরিমাণ সম্পদ চুরিতে হাত কাটা বাধ্যতামূলক করেছে, তাতে অধিক সংখ্যক হাত কাটা যাবেনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যে জায়গা থেকে চুরি হয়েছে তার জন্য যে শর্তাবলী পূরণ জরুরি

📄 যে জায়গা থেকে চুরি হয়েছে তার জন্য যে শর্তাবলী পূরণ জরুরি


যে স্থান থেকে চুরি হয়, তার জন্য অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে সুরক্ষিত হওয়া, যেমন বাড়ি, দোকান, আস্তাবল, খোয়াড় বা গোয়াল ঘর, শস্য মাড়ানো ও শুকানোর খোলান ইত্যাদি। এর জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা শরিয়তের পক্ষ থেকেও দেয়া হয়নি, অভিধানের দিক থেকেও দেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে একমাত্র প্রচলিত পরিভাষার উপরই নির্ভর করা হয়। শরিয়ত সে স্থানকেই সংরক্ষিত মনে করে, যা প্রমাণ করে যে, জিনিসটির মালিক জিনিসটিকে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষায় যথাসাধ্য সচেষ্ট ও যত্নবান। এর প্রমাণ হলো, আমর বিন শুয়াইবের দাদা কর্তৃক বর্ণিত হাদিস। তিনি বলেন : এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. কে তার চারণভূমিতে বিচরণশীল পশুর চুরি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিলেন : এ ধরনের পশু চুরি করলে তার দ্বিগুণ মূল্য আদায় করা হবে ও অপমানসূচক পিটুনি দেয়া হবে। আর গোয়াল থেকে যা নেয়া হবে তা যদি ঢালের সমমূল্যের হয়, তবে তার হাত কাটিা হবে। (অর্থাৎ গোয়াল থেকে ছাগল বা ভেড়া চুরি করলে চোরের হাত কাটা হবে। কেননা গোয়াল তার রক্ষণাবেক্ষণের স্থান। আর চারণভূমি থেকে চুরি করলে হাত কাটা হবেনা।) লোকটি বললো: হে রসূলুল্লাহ, যে কাপড়ের আঁচলে করে কিছু নিয়ে যায়? তিনি বললেন : যে ব্যক্তি তার মুখে করে কিছু নিয়ে যায় এবং কাপড়ের আঁচলে বেঁধে নেয়না, তার কোনো সাজা নেই। আর যে ব্যক্তি বহন করে কিছু নিয়ে যায়, তার কাছ থেকে তার মূল্যের দ্বিগুণ জরিমানা আদায় করা হবে ও অপমানসূচক প্রহার করা হবে। আর ফসল সংরক্ষণের জায়গা থেকে যা কিছু নেয়া হবে, তা ঢালের সমমূল্যের হলে হাত কাটা হবে। -আহমদ, নাসায়ী, হাকেম, তিরমিযি।
অপর হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেন: গাছে ঝুলন্ত খেজুর ও পাহাড়ে বিচরণরত পশু চুরিতে হাত কাটা হবেনা। তবে যদি তা খোয়াড়ে বা সংরক্ষিত চাতালে রক্ষিত হয়, তা হলে ঢালের সমমূল্যের হলে হাত কাটা হবে। এ দুটো হাদিস থেকেই প্রমাণিত হচ্ছে হাত কাটার জন্য সংরক্ষিত স্থান থেকে চুরি হওয়া চাই। ইবনুল কাইয়েম বলেন: রসূলুল্লাহ সা. গাছ থেকে ফল চুরির জন্য হাত কাটা রহিত ও সংরক্ষিত স্থান থেকে চুরির জন্য হাত কাটা কার্যকর করেছেন।
আবু হানিফা রহ. এর মতে, গাছের ফল চুরিতে হাত না কাটার। কারণ গাছের ফলমূল পচনশীল হওয়ার কারণে তার মূল্য কমে যায়। বস্তুত প্রত্যেক পচনশীল জিনিসের ক্ষেত্রেই এই নীতি প্রযোজ্য। তবে অধিকাংশ ফকিহর মতই সঠিক। কেননা রসূলুল্লাহ সা. গাছের ফলের তিনটে অবস্থা নির্দেশ কেরছেন। এক, কেউ ফল পেড়ে খেয়ে গেলে কোনো শাস্তি নেই। দুই, গাছ থেকে পেড়ে বা ছিড়ে ফল নিয়ে চলে গেলে দ্বিগুণ জরিমানা আদায় ও মারপিট করা হবে, কিন্তু হাত কাটা হবেনা। তিন, ফল শুকানো ও সংরক্ষণের জায়গা থেকে চুরি করলে হাত কাটা হবে, চাই তা পুরো শুকিয়ে থাকুক বা না শুকিয়ে থাকুক। সুতরাং গুরুত্ব হলো সংরক্ষণের ও সংরক্ষণের স্থানের। ফল শুকনো না কাঁচা তার কোনো গুরুত্ব নেই। এর প্রমাণ হলো, রসূলুল্লাহ সা. চারণক্ষেত্র থেকে ছাগল চুরির দায়ে হাত কাটার রহিত করেছেন। গোয়াল বা খোয়াড় থেকে চুরির জন্য হাত কাটা হবে। কেননা ওটা একটা সংরক্ষিত স্থান। অধিকাংশ ফকিহর মতে হাত কাটার জন্য সংরক্ষিত স্থান থেকে চুরি হওয়ার গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু তা শর্ত নয়। এই ফকিহদের মধ্যে রয়েছেন আহমদ, ইসহাক, যুফার ও যাহেরি মাযহাব। কেননা “পুরুষ ও মহিলা যে-ই চুরি করুক, তার হাত কেটে দাও” এ আয়াতে হাত কাটা কোনো শর্তের আওতাভুক্ত নয়। আর আমর বিন শুয়াইবের হাদিসগুলো বিতর্কিত হওয়ার কারণে কোনো শর্ত আরোপের অযোগ্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00