📄 চুরির শাস্তিযোগ্য হওয়ার জন্য চোরের মধ্যে যে শর্তাবলি জরুরি
১. চোরের সুস্থ বুদ্ধি সম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া জরুরি। সুতরাং পাগল এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও বালক-বালিকা দণ্ডের (হাত কাটা) যোগ্য নয়। কেননা তাদের উপর শরিয়তের বিধান বলবত হয়নি। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক চুরি করলে তাকে লঘু শাস্তি দিতে হবে। হদের জন্য চোরের মুসলমান হওয়া শর্ত নয়। কাজেই অমুসলিম ও মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী) যখন চুরি করে, তখন তার হাত কাটা হবে। অনুরূপ, কোনো মুসলমান যখন অমুসলমানের সম্পদ চুরি করে, তখন তারও হাত কাটা হবে।
২. স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী হওয়া চাই। অন্য কথায়, চৌর্য কর্মটি চোরের স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে সংঘটিত হওয়া জরুরি। কাউকে যদি চুরি করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তাকে চোর বলে গণ্য করা হবেনা। কেননা যখনই তাকে বাধ্য করা হয়, তখনই তার স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়। আর স্বাধীনতা যার থাকেনা, তার উপর শরিয়তের বিধান বলবত হয় না।
৩. চোরাই মালের মালিকানা সম্পর্কে চোরের মনে কোনো সন্দেহ না থাকা চাই। কোনো সন্দেহ থাকলে তার হাত কাটা হবেনা। যেমন ছেলের মাল চুরি করার জন্য পিতা বা মাতার হাত কাটা হবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "তুমি ও তোমার যাবতীয় সম্পত্তি তোমার পিতার।" অনুরূপ, মা-বাবার বা তাদের কোনো একজনের সম্পত্তি চুরি করার দায়ে সন্তানের হাত কাটা যাবেনা। কেননা সন্তান সাধারণত তার মা-বাবার সম্পত্তি খরচ করার অধিকার রাখে বলে মনে করে। অনুরূপ দাদা ও দাদার দাদা এবং পৌত্র ও প্রপৌত্রের হাত কাটা যাবেনা।
এরপর আসে রক্ত সম্পর্কীয় মাহরাম আত্মীয়দের প্রসঙ্গ, যেমন খালা, ফুফু, বোন, চাচা, মামা ও ভাই। আবু হানিফা ও সাওরির মতে, এই শ্রেণীর কারও হাত কাটা হবেনা। কেননা তাদের হাত কাটার পরিণামে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে, যা আল্লাহ বহাল রাখার আদেশ দিয়েছেন। তাছাড়া যেহেতু বাড়িতে প্রবেশে তাদের অধিকার রয়েছে, তাই তারা বাড়ির মালিকের বন্ধু। এ কারণে তাদের হাত থেকে বাড়ির দ্রব্যসামগ্রী পুরোপুরি সংরক্ষিত নয়। এক্ষেত্রে এই আত্মীয়তা বাড়িতে আগত অতিথির মতো, যাকে বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ কারণেই অতিথি চুরি করলে তার হাত কাটা যায়না।
মালেক, শাফেয়ি, আহমদ ও ইসহাক বলেন, এদের মধ্য থেকে কেউ চুরি করলে তার হাত কাটা হবে। কেননা চুরিকৃত মালের মালিকানায় কোনো সন্দেহ নেই। আর স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জিনিস চুরি করলে তাদের হাত কাটা হবেনা। কারণ তাদের পারস্পরিক মেলামেশা ও একত্র অবস্থানের কারণে তাদের দ্রব্যসামগ্রী একদিকে যেমন পুরোপুরি সংরক্ষিত নয় এবং অনিবার্যভাবে দ্রব্যাদির মালিকানায় সন্দেহের সৃষ্টি করে। তাই হাত কাটা রহিত হবে। এটা আবু হানিফার মাযহাব। এক বর্ণনা অনুযায়ী এটা শাফেয়ি ও আহমদেরও মাযহাব। কিন্তু মালেক ও সাওরির মত এবং আহমদ ও শাফেয়ির দুটি মতের একটি অনুসারে, স্বামী ও স্ত্রীর যদি আলাদা আলাদা ঘর থাকে এবং নিজ নিজ ঘরে উভয়ের জিনিসপত্র সংরক্ষিত থাকে, তাহলে দু'জনের যে কেউ অপরজনের দ্রব্য চুরি করলে তার হাত কাটা হবে। কেননা এখানে দ্রব্যগুলো পুরোপুরি সংরক্ষিত এবং স্বামী স্ত্রীর প্রত্যেকের অবস্থান স্বতন্ত্র। যে ভৃত্য স্বয়ং মনিবের সেবা করে, সে চুরি করলে তার হাত কাটা হবেনা। কারণ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি তার এক ভৃত্যকে নিয়ে উমর রা. এর কাছে এসে বললেন, এর হাত কাটুন। এ আমার স্ত্রীর আয়না চুরি করেছে। তখন উমর রা. বললেন, না, ওর হাত কাটা হবেনা। সে তোমাদের সেবক হিসেবে তোমাদের জিনিস নিয়েছে। এটা উমর রা. ও ইবনে মাসউদের মত হলেও কোনো সাহাবী তাদের মতের বিরোধিতা করেনি। কোনো মুসলমান সরকারের কোষাগার থেকে চুরি করলে তার হাত কাটা যাবেনা। কেননা বর্ণিত আছে যে, উমর রা. এর অধীনস্থ কোনো এক কর্মকর্তা তার কাছে চিঠি লিখে জানতে চাইলেন বাইতুল মাল (সরকারি কোষাগার) থেকে কেউ চুরি করলে তার কি করা হবে। তিনি বললেন, তার হাত কেটনা। কেননা প্রত্যেক মুসলমানেরই বাইতুল মালে হক রয়েছে। শাবি বর্ণনা করেছেন: এক ব্যক্তি বাইতুল মাল থেকে চুরি করেছে শুনে আলী রা. মন্ত্রব্য করলেন, ওরও তো বাইতুল মালে অংশ রয়েছে। তিনি তার হাত কাটলেন না। এখানে আলী রা. ও উমর রা. এর কথার মধ্যে বাইতুল মাল থেকে চুরি করার কারণে হাত না কাটার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। কারণটি হলো, বাইতুল মালে সবার অংশ থাকায় কিছুটা সন্দেহের উদ্রেক করে এবং সেই সন্দেহটুকু দণ্ড রহিত করে। ইবনে কুদামা বলেন, কোনো সম্পত্তিতে যার অংশীদারত্ব রয়েছে, কেউ ঐ সম্পত্তি থেকে এবং গণিমতের অংশীদার কেউ গণিমত থেকে চুরি করলে তার হাত কাটা হবেনা। এটা অধিকাংশ আলেমের মত। তবে ইমাম মালেকের মতে, হাত কাটা হবে। কেননা সংশ্লিষ্ট আয়াতটিতে যে কোনো ধরনের চোরেরই হাত কাটার আদেশ রয়েছে।
ইবনে মাজাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, গনিমত হিসেবে প্রাপ্ত গোলামদের একজন গনিমতের সম্পদ চুরি করে ধরা পড়লে রসূলুল্লাহ সা. তার হাত কাটেননি। তিনি বললেন, "চোর ও চুরিকৃত সামগ্রী উভয়েই আল্লাহর সম্পদ। তারা একে অপরকে চুরি করেছে।”
ঋণ নিয়ে তা পরিশোধে টালবাহানাকারী বা ঋণ অস্বীকারকারী খাতকের সম্পদ থেকে ঋণদাতা চুরি করলে ঋণদাতার হাত কাটা হবেনা। কেননা এর মাধ্যমে ঋণ ফেরত নেয়া হয়েছে। তবে খাতক যখন ঋণ স্বীকার করে ও ঋণ ফেরত দিতে সক্ষম থাকে, তখন ঋণদাতা খাতকের সম্পদ চুরি করলে তার হাত কাটা হবে। কেননা এক্ষেত্রে তার চুরিতে কোনো সন্দেহ নেই। ধার গ্রহণকারীর নিকট থেকে ধারে নেয়া দ্রব্য চুরি হলে তাতে চোরের হাত কাটা যাবে না। কেননা ধার গ্রহণকারী ধারে নেয়া দ্রব্যের মালিক নয়, আমানতদার। আর যদি কোনো ব্যক্তি কোনো জিনিস জবর দখল করে বা চুরি করে ও নিজের কাছে সংরক্ষণ করে, অতপর তার কাছ থেকে কোনো চোর তা চুরি করে, তবে এই চোরের হাত শাফেয়ি ও আহমদের মতে কাটা হবেনা। কেননা চোরাই দ্রব্যটি এমন জায়গায় সংরক্ষিত ছিলো, যার প্রতি তার মালিক সম্মত ছিলনা। কিন্তু ইমাম মালেকের মতে হাত কাটা হবে। কেননা সে এমন দ্রব্য চুরি করেছে, যা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই এবং সংরক্ষিত স্থান থেকে চুরি করেছে। আর যখন জনসাধারণ কোনো দুর্যাগের কবলে পড়ে এবং কোনো ব্যক্তি কোনো খাদ্য দ্রব্য চুরি করে, তবে সেই খাদ্য যদি বর্তমান থেকে থাকে, তাহলে চোরের হাত কাটা হবে। কেননা জিনিসটি চুরি করা তার জন্য জরুরি ছিলনা। আর যদি না থেকে থাকে, তবে হাত কাটা হবেনা। কেননা তার প্রয়োজন ছিলো বিধায় জিনিসটি নেয়ার অধিকার তার ছিলো। উমর রা. বলেছেন, দুর্ভিক্ষের বছর কোনো হাত কাটা হবেনা। মুয়াত্তায় ইমাম মালেক বর্ণনা করেছেন হাতেবের কতিপয় দাস মুযায়না গোত্রের এক ব্যক্তির একটি উন্নী চুরি করলো এবং তা যবাই করলো। বিষয়টি উমর রা. এর নিকট নীত হলে তিনি কুসাইয়ির ইবনুস সাল্ভকে তাদের হাত কেটে দেয়ার আদেশ দিলেন।" তারপর উমর রা. বললেন, "আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমি তাদেরকে অভুক্ত রেখে কষ্ট দিয়ে থাকো।” আল্লাহর কসম, আমি তোমার উপর এমন জরিমানা আরোপ করবো, যা দিতে তুমি হিমসিম খাবে।" তারপর মুযায়না গোত্রের লোকটাকে বললেন, তোমার উটনীর দাম কত? সে বললো, আল্লাহর কসম, আমি চারশো দিরহাম দাম হলেও উটনীটা দেইনি। উমর রা. বললেন, ওকে আটশো দিরহাম দিয়ে দাও। ইবনে ওহাব বর্ণনা করেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. চোরদের হাত কেটে দিতে কুসাইয়ির ইবনুস সাল্তকে আদেশ দেয়ার পর একজন দূতকে পাঠিয়ে দিলেন যেন সে দাসগুলোকে তার দরবারে নিয়ে আসে। সে যথাসময় তাদেরকে নিয়ে এলো। তখন উমর রা. হাতেবের ছেলে আব্দুর রহমানকে বললেন, আমি যদি না মনে করতাম যে, তোমরা তাদেরকে কাজে খাটাও, অথচ খাবার দাওনা, এমনকি তাদের অবস্থা এমন হয় যে, হারাম খাবার পেলেও তা খেতো, তাহলে তাদের হাত কেটে দিতাম। তবে আল্লাহর কসম, ওদেরকে যখন ছেড়ে দিয়েছি, তখন তোমার উপর এমন জরিমানা আরোপ করবো, যা তোমার জন্য কষ্টকর হবে।
📄 চুরির শাস্তিযোগ্য হওয়ার জন্য চুরিকৃত দ্রব্যের মধ্যে যে শর্তাবলি জরুরি
চুরিকৃত দ্রব্যের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলো বা শর্তাবলি থাকা জরুরি, তা হচ্ছে:
প্রথমত, দ্রব্যটি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়া চাই, তার ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এমন হওয়া চাই, তা বিক্রি করা ও তার বিনিময়ে অন্য কিছু গ্রহণ করা বৈধ হওয়া চাই। অতএব কেউ মদ ও শুকর চুরি করলে তার হাত কাটা হবেনা, এমনকি এ দুটির মালিক যদি অমুসলিম হয় তবুও না। কেননা আল্লাহ এ দুটির মালিক হওয়া ও এ দুটির দ্বারা উপকৃত হওয়া মুসলমান ও অমুসলমান উভয়ের জন্য হারাম করেছেন। (ইমাম আবু হানিফা যদিও অমুসলিমের মদ ও শুকরের মালিক হওয়া বৈধ এবং এ দুটি কেউ ধ্বংস করলে এর মূল্য পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন, তবে এ দুটি চুরি করলে তার কাটা হবেনা, একথা সমর্থন করেছেন। কেননা এ দুটি পূর্ণাঙ্গ সম্পদ নয়। অথচ দণ্ড প্রয়োগের জন্য পূর্ণাঙ্গ সম্পদ হওয়া শর্ত।) অনুরূপ, গান বাজনা ও নৃত্য ইত্যাদির যন্ত্র ও সরঞ্জামাদি যে ব্যক্তি চুরি করবে, তার হাতও কাটা যাবেনা। কেননা এসব যন্ত্র ও সরঞ্জামের ব্যবহার বহু সংখ্যক আলেমের নিকট বৈধ নয়। কেননা এগুলো সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়না। এগুলোর উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়না, এগুলোর বিক্রিও বৈধ নয়। তবে যারা এগুলোর ব্যবহার বৈধ বলেন, তারাও এগুলোর চোরের হাত কাটা হবেনা- এ বিষয়ে একমত। কেননা এসব দ্রব্যসামগ্রীতে সন্দেহ রয়েছে যা দণ্ড রহিত করে।
স্বাধীন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, যার ন্যায়-অন্যায়, বাছবিচারের ক্ষমতা তখনো হয়নি, তাকে চুরি করার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আবু হানিফা ও শাফেয়ির মতে যেহেতু সম্পদ নয়, তাই তার চোরের হাত কাটা হবে না, তবে তাযীর অবশ্যই করা হবে। এ ধরনের শিশুর পরনে যদি কাপড় বা সোনা রূপার গহনাও থাকে, তাহলেও তার চোরের হাত কাটা হবেনা (কেননা তার গায়ে যেসব গহনা থাকে, তা তারই অনুসঙ্গ, পৃথকভাবে তা চুরি করা ঈপ্সিত নয়। আবু ইউসুফ বলেন, গহনা যদি নেসাব পরিমাণ হয়, তাহলে হাত কাটা হবে।) ইমাম মালেক বলেছেন, শিশুকে চুরি করার জন্য চোরের হাত কাটা হবে। কারণ সে হচ্ছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এখানে নির্দিষ্ট কোনো সম্পদ চুরির কারণে চোরের হাত কাটা হবেনা, কাটা হবে শুধু এর সাথে জীবন্ত মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণে। আর স্বাধীন মানুষের সাথে সংশ্লিষ্টতা দাসদাসীর সাথে সংশ্লিষ্টতার চেয়ে বেশি। ন্যায়-অন্যায় বাছবিচারের ক্ষমতা এখনো জন্মেনি। এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক দাসের চোরের হাত কাটা হবে। কেননা এ ধরনের দাস সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। পক্ষান্তরে যে দাসের ন্যায়-অন্যায় বাছবিচারের ক্ষমতা জন্মেছে, তাকে চুরি করলে চোরের হাত কাটা হবেনা। কেননা সে ক্রয়বিক্রয় যোগ্য সম্পদ হলেও তার নিজের উপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। তাই সে মালিকের সংরক্ষিত মালিকানায় আছে বলে বিবেচিত হবেনা। পক্ষান্তরে যেসব জিনিসের মালিক হওয়া বৈধ, কিন্তু বিক্রয় বৈধ নয়, যেমন পাহারা দেয়া, শিকার ধরা ও কৃষি কাজের নিমিত্তে পালিত কুকুর এবং কুরবানীর গোশত। এগুলো সম্পর্কে মালেকি মাযহাবের আশহাব বলেন, এ ধরনের কুকুরের চোরের হাত কাটা হবে। কিন্তু পাহারা দেয়া, শিকার ধরা ও কৃষিকাজ ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পালিত কুকুরের চোরের হাত কাটা হবেনা। কুরবানীর গোশতের চোর সম্পর্কে মালেকি মাযহাবের আসবাগ বলেন, কুরবানীর জানোয়ারকে যবাই করার আগে চুরি করলে তার হাত কাটা হবে, যবাইয়ের পরে চুরি করলে তার কাটা হবেনা।
পানি, বরফ, ঘাস, লবণ ও মাটির চোর সম্পর্কে মতভেদ আছে। আল মুগনির লেখক বলেন, পানি চোরের হাত কাটা হবেনা। কেননা এটা (শরিয়তের দৃষ্টিতে) সম্পদ বলে গণ্য হয়না। এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। তবে ঘাস ও লবণ সম্পর্কে মতভেদ আছে। আবু বকর বলেছেন, এ দুটির চোরের হাত কাটা হবেনা। কেননা শরিয়ত যে কটি জিনিসে সকল মানুষের সম্মিলিত মালিকানা রয়েছে বলে ঘোষণা করেছে, এ দুটি তার আওতাভুক্ত। আবু ইসহাক বলেন, হাত কাটা হবে। কেননা এ দুটি সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। বরফ সম্পর্কে কাযী বলেছেন, এটা পানির মতোই। কেননা এটা জমাট পানি মাত্র। আর মাটি যদি এমন হয়, যার প্রতি সাধারণত খুব কম লোকেরই আগ্রহ দেখা যায়, যেমন প্রলেপ দেয়া বা নির্মাণ কাজের জন্য ব্যবহার্য মাটি (অথবা মৃৎ শিল্প বা ইট বানানোর মাটি) তবে কাটা হবেনা। কেননা এ ধরনের মাটি সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়না। যদি খুব মূল্যবান মাটি হয়, যেমন ওষুধ বা সাবান তৈরিতে রং দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয় এমন মাটি হয়, তাহলে তা নিয়ে দুটি মত লক্ষ্য করা যায়: (১) হাত কাটা হবেনা। কেননা তা পানির মতোই সম্পদ পদবাচ্য নয়। (২) হাত কাটা হবে। কেননা তা সাধারণ সম্পদ রূপে গণ্য হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে রপ্তানী হয়।
আর যে সমস্ত জিনিস মৌলিকভাবে হালাল ও সকলের জন্য উন্মুক্ত, যেমন মাছ ও পাখি (মোরগ, মুরগী, হাঁস ও কবুতরসহ) সেগুলো চুরি করলে হাত কাটা হবেনা যদি তা কোনো ব্যক্তি বিশেষের মালিকানার আওতাধীন সুরক্ষিত থাকা অবস্থায় চুরি না হয়। সুরক্ষিত থাকা অবস্থায় চুরি হলে সে সম্পর্কে ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। মালেকি ও শাফেয়ি মাযহাব অনুযায়ী হাত কাটা হবে। কেননা চোর এমন একটা জিনিস চুরি করেছে, যার সুরক্ষিত ছিলো এবং যার মূল্য ছিলো। হাম্বলি ও হানাফি মাযহাব মতে, হাত কাটা হবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি শিকার ধরবে, শিকার তারই। এ হাদিস এমন একটা সন্দেহের উদ্রেক করে, যা দণ্ড রহিত করে।
আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াসার বলেন, এক ব্যক্তি মুরগী চুরি করে ধরা পড়ে ও উমর ইবনে আব্দুল আযীযের দরবারে নীত হয়। তিনি তার হাত কাটার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন সালেম ইবনে আব্দুর রহমান তাকে বললেন, উসমান (রা) বলেছেন, পাখি চুরিতে হাত কাটা হবেনা। অন্য বর্ণনায় আছে, উমর ইবনে আব্দুল আযীয নিজেই সায়েব ইবনে ইয়াযীদের নিকট ফতোয়া জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমি পাখি চুরির জন্য কারো হাত কাটা হতে দেখিনি এবং এজন্য হাত কাটা জরুরিও নয়। তখন উমর ইবনে আব্দুল আযীয মুরগী চোরটির হাত কাটা হতে নিবৃত্ত হলেন। কোনো কোনো ফকিহ বলেছেন, যে পাখি সকলের জন্য বৈধ, তা হলো শিকার করা হয়ে থাকে এমন পাখি। মোরগ মুরগী ও হাঁস এর অন্তর্ভুক্ত নয়। হাঁস ও মুরগীর চুরিতে হাত কাটা অপরিহার্য। কেননা তারা গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে গণ্য। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, তাজা খাবার, যথা দুধ, গোশত ও তাজা ফল চুরিতে, ঘাস ও জ্বালানী কাঠ চুরিতে এবং ত্বরিত বিনষ্ট হয় এমন জিনিস চুরিতে হাত কাটা হবেনা, এমনকি চোরাই মাল যদি ন্যূনতম নেসাবের সমপরিমাণও হয় তবু নয়। কেননা এসব জিনিসের প্রতি সাধারণ মানুষের তেমন কোনো আকর্ষণ থাকেনা। আর এর মালিক সাধারণত কৃপণতা করেনা যে তাকে শায়েস্তা করার প্রয়োজন হবে। তাছাড়া এখানে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ। আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "তিনটে জিনিসে সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে : পানি, আগুন ও ঘাস।” ফকিহদের আরেকটি মতভেদপূর্ণ বিষয় হলো কুরআন শরিফ চুরি করা। আবু হানিফা বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন শরিফ চুরি করবে, তার হাত কাটা হবেনা। কেননা এটা কোনো সম্পদ নয়। তাছাড়া এতে সকলেরই অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আবু সাওর, আবু ইউসুফ ও ইবনুল মুনযির বলেন, কুরআন শরিফের মূল্য হাত কাটার ন্যূনতম নেসাবের সমান হলে যে তা চুরি করবে তার হাত কাটা হবে।
দ্বিতীয় যে শর্তটি চুরিকৃত মালে পূরণ হওয়া জরুরি তা হলো, তা হাত কাটার ন্যূনতম নেসাবের সমান হবে। কারণ হদ কার্যকর করার জন্য এমন একটা জিনিস জরুরি, যা তার মাপকাঠি হবে। তাছাড়া জিনিসটির এতটা মূল্য থাকা চাই, যার কারণে জিনিসটি খোয়া গেলে জনগণের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামান্য মূল্যের জিনিস খোয়া গেলে জনগণ তা মেনে নিতে অভ্যস্ত। তাই প্রাচীন মনীষীগণ তুচ্ছ জিনিস চুরি করার দায়ে চোরের হাত কাটতেন না। নেসাবের পরিমাণ কত, তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে, স্বর্ণের তৈরি এক দিনারের এক চতুর্থাংশ অথবা রূপার তৈরি তিন দিরহামের সমান হওয়া জরুরি। এভাবে পরিমাণ নির্ধারণের যৌক্তিকতা সুস্পষ্ট। এটা একজন মধ্যম ধরনের মানুষের নিজের ও তার পরিবারের একদিনের খরচের অনুরূপ। আর একজন মানুষের নিজের ও পরিবারের একদিনের খরচই হলো নেসাব। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. সিকি দিনার বা তদূর্ধ্ব পরিমাণ সামগ্রী চুরির জন্য চোরের হাত কেটে দিতেন। -আহমদ, মুসলিম ইবনে মাজাহ।
নাসায়ীর অপর একটি রেওয়ায়াতে আছে : "ঢালের চেয়ে কম দামী জিনিসের জন্য হাত কাটা হবেনা।" আয়েশা রা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো : ঢালের দাম কত? তিনি বললেন : সিকি দিনার। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত ইবনে উমরের এই রেওয়ায়াতটি উপরোক্ত হাদিসের সমর্থক যে, রসূলুল্লাহ সা. তিন দিরহামের একটি ঢালের জন্য চোরের হাত কেটেছিলেন।
হানাফিদের মাযহাব হলো, দশ দিরহাম বা তদূর্ধের জন্য হাত কাটা হবে, তার চেয়ে কমের জন্য হাত কাটা হবেনা। বায়হাকি, তাহাবি ও নাসায়ীর হাদিস দ্বারা তাদের মতের পক্ষে প্রমাণ দর্শান। পক্ষান্তরে হাসান বসরি ও দাউদ যাহেরির মত হলো, আয়াতে যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণের উল্লেখ নেই, তাই কম হোক, বেশি হোক, চুরি করলেই হাত কাটা হবে। তাছাড়া বুখারি ও মুসলিমের আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : "আল্লাহ চোরের উপর অভিশাপ বর্ষণ করুন। সে একটা ডিম চুরি করলেও তার হাত কাটা হয়, একটা উট চুরি করলেও তার হাত কাটা হয়।" অন্যান্য ফকিহ হাসান বসরি ও দাউদ যাহেরির মত খণ্ডন করে এই হাদিসটি সম্পর্কে বলেন: “এ হাদিসের বর্ণনাকারী আ'মাশ হাদিসটির ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, ডিম দ্বারা লোহার ডিম বুঝানো হয়েছে, যা যুদ্ধের পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং তা ঢালের মতোই। এর মূল্য ঢালের মূল্যের চেয়ে বেশিও হয়ে থাকে। আর উটের মূল্য কয়েক দিরহাম বলে মনে করা হতো। আর সিকি দিনার তিন দিরহাম দিয়ে ভাঙানো হতো। কেননা ইমাম শাফেয়ি 'আর রওযাতুন নাদিয়া' গ্রন্থে বলেছেন: সিকি দিনার তিন দিরহামের রেওয়ায়াতের সাথে সংগতিপূর্ণ। রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে এক দিনারকে বারো দিরহাম দ্বারা ভাঙানো হতো। এটা দিয়াত নির্ধারণ সংক্রান্ত রেওয়াতগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ। দিয়াত স্বর্ণ দিয়ে দিতে হলে এক হাজার দিনার এবং রৌপ্য দিয়ে দিতে হলে বারো হাজার দিরহাম দিতে হতো। আবু হানিফা ও তাঁর শিষ্যগণ কমের পক্ষে দশ দিরহাম বা এক দিনার চুরি করলেই হাত কাটা বাধ্যতামূলক মনে করেন। নগদ মুদ্রা ছাড়া অন্য কোনো দ্রব্যসামগ্রী চুরি করলে তা দশ দিরহাম বা এক দিনার মূল্যের হলে হাত কাটা হবে। এর চেয়ে কম হলে হাত কাটা হবেনা। কেননা আমর বিন শুয়াইবের রেওয়ায়াত অনুসারে রসূলুল্লাহ সা. এর সময়ে একটা ঢালের মূল্য ছিলো দশ দিরহাম। ইবনে আব্বাস প্রমুখ থেকেও এই মূল্যায়ন বর্ণিত আছে। তাদের মতে, এই মূল্যায়ন অনুসারে ঢালের মূল্য নির্ধারণ করাই অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। তবে প্রকৃত ব্যাপার হলো, ঢালের মূল্য দশ দিরহাম নির্ধারণ করা হলে তা হবে নির্ভুলতম হাদিসের লঙ্ঘন। মালেক ও আহমদ বলেন: চুরির সর্বনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে, সিকি দিনার অথবা তিন দিরহাম অথবা তিন দিরহাম মূল্যের সামগ্রী। মূল্য নির্ধারণের কাজটা বিশেষভাবে দিরহাম দ্বারা সম্পন্ন করা উচিত।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন যে, হাত কাটার দিয়াত বা ক্ষতিপূরণ যেখানে পাঁচশো দিনার, সেখানে মাত্র সিকি দিনারের জন্য হাত কাটা কিভাবে ন্যায়সঙ্গত হয়! এর জবাব এই যে, ইসলাম এত কম পরিমাণ সম্পদ চুরিতে হাত কাটার বিধান রেখেছে কেবল সম্পদের সুরক্ষা করার উদ্দেশ্যে, আর হাতের দিয়াত পাঁচশো দিনার নির্ধারণ করেছে হাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। হাত যখন আমানতদ্বার ও সৎ ছিলো তখন তা দামী ছিলো। আর যখন তা অসৎ ও চোর হয়েছে, তখন তার দাম কমে গেছে।
📄 চোরাই মালের মূল্য নির্ধারণ কখন করা হবে?
মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাব অনুসারে চোরাই মালের মূল্য নির্ধারণ করা হবে যেদিন চুরি হয়েছে সেই দিনের বাজার দর অনুসারে।
📄 দলগত চুরি
যখন এক দল চোর এতটা সম্পদ চুরি করে যে, তা দলের সকল সদস্যের মধ্যে বণ্টন করলে প্রত্যেকের অংশে যা পড়ে, তাতে হাত কাটা অনিবার্য হয়ে পড়ে, তখন ফকিহদের সর্বসম্মত মতানুসারে সকলের হাত কাটা হবে। কিন্তু যদি চোরাই মালের পরিমাণ এমন হয় যে, তা একত্রে হাত কাটার নেসাবের সমান হয়, কিন্তু বন্ট করে দিলে নেসাবের সমান হয়না, তখন ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ফকিহর মতানুসারে সকলের হাত কাটা হবে। আবু হানিফা বলেন: প্রত্যেকের অংশ নেসাব পরিমাণ না হলে হাত কাটা হবেনা। ইবনে রুশদ বলেন: যারা মনে করেন সবার হাত কাটা হবে, তাদের দৃষ্টিতে শাস্তিটা চোরাই মালের পরিমাণের সাথে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ মানুষের সম্পদের সুরক্ষার স্বার্থে এই পরিমাণ সম্পদই চুরিতে হাত কাটাকে অপরিহার্য করে। আর যারা মনে করেন শুধু এই পরিমাণের উপরই হাত কাটা নির্ভরশীল, এর কমে হাত কাটা যাবেনা হাতের সম্মানের খাতিরে, তারা বলেন : শরিয়ত যে পরিমাণ সম্পদ চুরিতে হাত কাটা বাধ্যতামূলক করেছে, তাতে অধিক সংখ্যক হাত কাটা যাবেনা।