📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 চুরির শাস্তি এতো কঠোর হওয়ার যৌক্তিকতা

📄 চুরির শাস্তি এতো কঠোর হওয়ার যৌক্তিকতা


মানুষের ধনসম্পদের উপর অন্যায় আগ্রাসনমূলক অপরাধ আরো অনেক রয়েছে। কিন্তু চুরি ছাড়া অন্যান্য অপরাধে এতো কঠোর শাস্তি নির্ধারিত হয়নি। ইমাম নববী সহীহ মুসলিমের যে টীকা লিখেছেন, তাতে এর যৌক্তিকতা এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: কাযী ইয়ায রা. বলেছেন, চোরের হাত কাটা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে আল্লাহ ধনসম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন। চুরি ছাড়া অন্যান্য অপরাধে এটা করেননি, যেমন লুটপাট, আত্মসাত করা ও জবর দখল। কেননা ঐসব অপরাধের সংখ্যা চুরির চেয়ে কম। তাছাড়া শাসকদের নিকট অভিযোগ দায়ের করে এগুলোর প্রতিকার করা সম্ভব। এগুলোর বিরুদ্ধে সাক্ষী উপস্থিত করাও অপেক্ষাকৃত সহজ। চুরি তেমন নয়। চুরির সাক্ষী উপস্থিত করা খুবই বিরল ব্যাপার ও কঠিন। তাই এটা একটা মারাত্মক অপরাধ এবং এর শাস্তিও কঠোর যাতে এর বিরুদ্ধে অধিকতর কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 চুরির প্রকারভেদ

📄 চুরির প্রকারভেদ


চুরি প্রথমত দু'প্রকারের: ১. যে চুরিতে তাযীর জরুরি। ২. যে চুরিতে দণ্ড জরুরি।
যে চুরিতে হদ কার্যকর করার শর্তাবলি পূরণ হয়না, তাতে তাযীর জরুরি। যে চুরিতে হাত কাটার শাস্তি ধার্য নেই। তাতে রসূলুল্লাহ সা. চোরের উপর দ্বিগুণ জরিমানা ধার্য করেছেন। এটা করেছেন, গাছে ঝুলন্ত ফল ও মাঠে চরণশীল ছাগলের চোরের ক্ষেত্রে। প্রথম প্রকারের ক্ষেত্রে খেজুর ও অন্যান্য ফলমূলের চোরকে হাত কাটার শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, কেউ যদি এসব ফলমূল থেকে কিছু খেয়ে নেয় এবং সে তার প্রয়োজনও বোধ করে, তবে এজন্য তার কোনো শাস্তি বা জরিমানা হবেনা। আর যদি কেউ এর কিছু নিয়ে চলে যায়, তবে তাকে এর দ্বিগুণ পরিমাণ জরিমানা ও শাস্তি দেয়া হবে। আর যদি কেউ এর কিছু অংশ তার থলিতে করে চুরি করে নিয়ে যায়, তবে তার হাত কেটে দিতে হবে। তবে এজন্য শর্ত হলো, চোরাই মাল সেই নেসাবের পরিমাণ হওয়া চাই, যা হাত কাটার জন্য জরুরি।
দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে চারণ ক্ষেত্র থেকে ছাগল চুরি করে নিলে চোরকে ছাগলের মূল্যের দ্বিগুণ জরিমানা করা হবে এবং কিছু মারধোর করা হবে। আর যে পশুকে তার গোয়াল থেকে নেয়া হয়, তার মূল্য যদি হাত কাটার নেসাবের সমান হয়, তবে এই চোরের হাত কাটা হবে। -আহমদ, নাসায়ী ও হাকেম।
শরিয়ত নির্ধারিত হদ যে চুরিতে প্রযোজ্য, তা দু'প্রকারের এক, ছোট চুরি। এই চুরিতে হাত কাটা ওয়াজিব। দুই, বড় চুরি: সশস্ত্র অবস্থায় বলপূর্বক সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া, যাকে ডাকাতি বলা হয়। এ সম্পর্কে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এখানে শুধু ছোট চুরির মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 চুরির সংজ্ঞা

📄 চুরির সংজ্ঞা


চুরি হচ্ছে গোপনে অন্যের সম্পদ হরণ করা। চুরি করে কথা শোনাকে বলা হয় গোপনে আড়ি পেতে শোনা। লুকিয়ে চুরি করে দেখা অর্থ করে দেখা। পবিত্র কুরআনের সূরা আল হিজরের ১৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে: إِلَّا مَنِ اسْتَرَقَ السَّمْعَ فَاتَّبَعَهُ شِهَابٌ مُبِينٌ "কেউ চুরি করে সংবাদ শুনতে চাইলে প্রদীপ্ত অগ্নিশিখা তার পিছু ধাওয়া করে।" এখানে লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু শোনাকে বলা হয়েছে চুরি করে শোনা। 'কামুসে' বলা হয়েছে: "চুরি হচ্ছে সংরক্ষিত অবস্থান থেকে অন্যের সম্পদ নেয়ার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে আসা।" ইবনে আরাফা বলেন: আরবদের নিকট 'সারেক' বা চোর হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে, সংরক্ষিত স্থানে সংগোপনে আসে তার মালিকানাভুক্ত নয় এমন সম্পদ নেয়ার জন্য।" কামুস ও ইবনে 'আরাফার সংজ্ঞা থেকে জানা যায়, চুরির উপাদান তিনটি (১) অন্যের সম্পদ নেয়া (২) সংগোপনে ও লুকিয়ে লুকিয়ে নেয়া (৩) সংরক্ষিত স্থান থেকে নেয়া।
সুতরাং সম্পদ যদি অন্যের না হয়। কিংবা প্রকাশ্যে নেয়া হয় কিংবা যে সম্পদ নেয়া হয় তা নেয়ার সময় সংরক্ষিত ছিলনা, তাহলে এই চুরিতে হাতকাটার শাস্তি কার্যকর হবেনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 আত্মসাতকারী লুটেরা ও খেয়ানতকারী চোর নয়

📄 আত্মসাতকারী লুটেরা ও খেয়ানতকারী চোর নয়


উল্লিখিত কারণেই খেয়ানতকারী, লুটপাটকারী ও আত্মসাতকারীকে চোর গণ্য করা হয়না এবং এদের কাউকেই হাত কাটার শাস্তি দেয়া হবেনা। তবে তাযীর করতেই হবে। কেননা জাবের রা. বর্ণনা করেছেন রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "কোনো খেয়ানতকারী, লুটেরা ও আত্মসাতকারীর হাত কাটা লাগবেনা। -আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, হাকেম ও বায়হাকি।
খেয়ানতকারী হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে অন্যের সম্পদ হরণ করে এবং মালিকের শুভাংকাঙ্ক্ষী সাজে। আর লুটেরা হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে প্রকাশ্যে জোরপূর্বক অন্যের সম্পদ হরণ করে। আর আত্মসাতকারী হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে অন্যের সম্পদ প্রকাশ্যে হরণ করে ও পালিয়ে যায়। মুহাম্মদ বিন শিহাব যুহরি বলেছেন, একবার মারওয়ান ইবনুল হাকামের নিকট এমন এক ব্যক্তিকে আনা হলো, যে একটা জিনিস আত্মসাত করেছিল। মারওয়ান তার হাত কাটার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন এ কাজটা ঠিক হবে কিনা জানার জন্য যায়দ বিন ছাবেতের রা. নিকট দূত পাঠানো হলো। যায়দ বললেন: "আত্মসাতের জন্য হাতকাটা হয়না।" -মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক।
ইবনুল কাইয়েম বলেছেন, নূন্যপক্ষে তিন দিরহাম চুরিতে চোরের হাত কাটা এবং আত্মসাতকারী ও লুটেরার হাত না কাটা শরিয়তের খুবই বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত। কেননা চোর থেকে পুরোপুরি আত্মরক্ষা সম্ভব নয়। সে ঘরবাড়িতে সিধ কাটে, সংরক্ষিত স্থানে প্রবেশ করে ও তালা ভাঙ্গে। সম্পদের মালিক এর চেয়ে বেশি সম্পদ চোরের হাত থেকে বাঁচাতে সক্ষম নয়। এমতাবস্থায় তার হাত যদি কাটা না হতো, তাহলে লোকেরা পাইকারি হারে একে অপরের মাল চুরি করতো, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতো এবং চোরদের কারণে সমাজে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হতো। লুটেরা ও আত্মসাতকারীর অবস্থা এর বিপরীত। লুটেরা তো প্রকাশ্যে সম্পদ লুণ্ঠন করে ও লোক চক্ষুর সামনেই করে। তাই তাকে পাকড়াও করে লুণ্ঠন থেকে বিরত রাখা, মজলুমের হক বুঝিয়ে দেয়া অথবা আদালতে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া জনগণের পক্ষে সম্ভব। আর আত্মসাতকারী তো তার মালিকের অসাবধানতার মুহূর্তে তার সম্পদ নিয়ে নেয়। কাজেই এক্ষেত্রে মালিক এক ধরনের শৈথিল্য দেখায় যা আত্মসাতকারীর আত্মসাত কার্যে সহায়ক হয়। নচেত পূর্ণ সতর্কতা ও নিশ্ছিদ্র প্রহরা বহাল থাকলে আত্মসাত করা সম্ভব নয়। তাই আত্মসাতকারী চোরের মতো নয়, বরং খেয়ানতকারীর সাথে তার সাদৃশ্য অধিক। তাছাড়া আত্মসাতকারী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মালিকের অসতর্ক অবস্থায়ই সম্পদ হরণ করে। প্রকৃতপক্ষে আত্মসাতকারী নিজেই মালিককে অসাবধান করে দেয় এবং তার সম্পদের প্রতি অসাবধান হওয়া ও চোখের আড়ালে থাকার মুহূর্তেই তার সম্পদ হরণ করে। তাই এটি থেকে আত্মরক্ষা করা অনেকাংশেই সম্ভব। সুতরাং আত্মসাতকারী ও লুণ্ঠনকারী একই পর্যায়ের। কিন্তু জবর দখলকারীর অপরাধটা সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য। সে লুণ্ঠনকারীর চেয়েও হাত কাটার শাস্তি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার অধিক হকদার। তবে এসব অপরাধীর উপদ্রব ঠেকানো প্রহার, অপমান, দীর্ঘ কারাদণ্ড ও জরিমানা দ্বারা সম্ভব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00