📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অপরাধীকে শাসকের নিকট নেয়ার আগে তওবা করলে শাস্তি মাফ

📄 অপরাধীকে শাসকের নিকট নেয়ার আগে তওবা করলে শাস্তি মাফ


ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রদ্রোহী বা ডাকাত গ্রেফতার হওয়ার আগে তওবা করলে তাকে ডাকাতি বা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। কেননা সূরা মায়েদার ৩৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ "তবে তোমাদের আয়ত্তাধীন আসবার আগে যারা তওবা করবে, তাদের জন্য আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" এই অব্যাহতি শুধু ডাকাত বা বিদ্রোহীর জন্য নির্দিষ্ট নয়, রবং এটা সকল শাস্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যে ব্যক্তি কোনো 'হদ' যোগ্য অপরাধ করে এবং ধরা পড়ে শাসকের নিকট নীত হওয়ার আগে তওবা করে, তার হদ রহিত হবে। কেননা ডাকাত, সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহীর হদ যদি রহিত হয়, তাহলে অন্যদের হদ রহিত হওয়া অধিকতর অগ্রগণ্য। কেননা তারা এদের চেয়ে অনেক হালকা অপরাধের জন্য দায়ী। ইবনে তাইমিয়াও একই ধরনের মত ব্যক্ত করে বলেছেন: "যে ব্যক্তি গ্রেফতার হওয়ার আগে ব্যভিচার, চুরি ও মদপান থেকে তওবা করে, তার হদ রহিত হবে। যেমন গ্রেফতার হওয়ার আগে তওবা করলে বিদ্রোহী ও ডাকাতের হদও সর্বসম্মতক্রমে রহিত হয়।" কুরতুবি বলেন, মদখোর, ব্যভিচারী ও চোর যখন তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে এবং এই তওবার কথা জানাজানি হয়ে যায়, অতপর ধরা পড়ে শাসকের নিকট নীত হয়, তার উপর হদ কার্যকর করা সমীচীন নয়। আর শাসকের কাছে নীত হওয়ার পর সে যদি বলে, আমি তওবা করেছি, তবে তাকে ছাড়া হবেনা। এ অবস্থায় সে সেই বিদ্রোহীর মতো যে পরাজিত হয়েছে।
এই মতভেদটি খোলাসা করে ইবনে কুদামা বলেছেন, শাস্তিযোগ্য ডাকাত বা রাষ্ট্রদ্রোহী যদি তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে, তবে তার সম্পর্কে দুটো রেওয়ায়াত রয়েছে: এক, তার শাস্তি রহিত হবে। কেননা আল্লাহ সূরা নিসার ১৬ নং আয়াতে বলেন:
وَالَّذِينَ يَأْتِينِهَا مِنْكُمْ فَآذُوهُمَا ، فَإِنْ تَابَا وَأَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا عَنْهُمَا ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ تَوَّابًا رَّحِيمًا "তোমাদের মধ্যে যে দুজন ব্যভিচারে লিপ্ত হবে, তাদেরকে শাসন করো, যদি তারা তওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তবে তাদেরকে রেহাই দেবে।" আর চোরের শাস্তির উল্লেখ করার পর আল্লাহ সূরা মায়েদায় বলেন:
فَمَنْ تَابَ مِنْ بَعْدِ ظُلْمِهِ وَأَصْلَحَ فَإِنَّ اللَّهَ يَتُوبُ عَلَيْهِ وَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ "যে ব্যক্তি নিজের উপর অবিচার করার পর তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তার জন্য আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, গুনাহ থেকে তওবাকারী যার কোনো গুনাহ নেই তার মতো।" আর যার গুনাহ নেই, তার কোনো হদও নেই।
রজমের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মায়েয রা. ছুটে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন শুনে রসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে না কেন? তাহলে সে তওবা করতো এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতেন। তাছাড়া যেহেতু এটা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হক, তাই তওবা দ্বারা এর শাস্তি রহিত হয়ে যায় যেমন ডাকাতি ও সন্ত্রাসের অপরাধে তওবা দ্বারা শাস্তি রহিত হয়।
দুই. তার শাস্তি রহিত হবেনা। এটা মালেকও আবু হানিফার মত এবং শাফেয়ির দুটি মতের একটি। আল্লাহ যে বলেছেন, "ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারীকে একশ'টি কশাঘাত করো" এটা তওবাকারী ও অতওবাকারী উভয়ের জন্য। অনুরূপ পুরুষ চোর ও নারী চোরের হাত কেটে দেয়ার আদেশ যে আয়াতে দিয়েছেন তাও তওবার শর্তমুক্ত। তাছাড়া রসূলুল্লাহ সা. মায়েয ও গামেদি গোত্রের মহিলাকে এবং আরো একজনকে চুরির স্বীকারোক্তি করা সত্ত্বেও শাস্তি দিয়েছিলেন। অথচ তারা সবাই তওবা করে এসেছিল এবং নিজেদের উপর হদ কার্যকরী করিয়ে নিজেদেরকে পবিত্র করার ইচ্ছা নিয়ে এসেছিল। রসূলুল্লাহ সা. তাদের কাজকে তওবা আখ্যা দিয়েছিলেন। গামেদি মহিলা সম্পর্কে তিনি মন্ত্রব্য করেছিলেন যে, "সে এমন তওবা করেছে যা মদিনার সত্তরজন অধিবাসীর মধ্যে বণ্টন করলেও তা তাদের জন্য যথেষ্ট হবে।" আমর ইবনে সামুরা রা. রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট এসে বললো, হে রসূলুল্লাহ সা., আমি অমুক গোত্রের উট চুরি করেছি, আমাকে পবিত্র করে দিন।” তখন রসূলুল্লাহ সা. তার উপর হদ কার্যকর করলেন। তাছাড়া যেহেতু হদ হচ্ছে কাফফারা। তাই কাফফারা রহিত হয়না। উপরন্তু সে আয়ত্তাধীন। তাই তার হদ রহিত হবেনা যেমন ডাকাত ও সন্ত্রাসীর হদ ধরা পড়ার পর রহিত হয়না। এখন আমরা যদি তওবা করলে হd রহিত হবে, এই মতটি গ্রহণ করি, তাহলে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, সেক্ষেত্রে শুধু তওবাই কি যথেষ্ট, না তওবার সাথে সাথে নিজেকে সংশোধন করতে হবে? এ ব্যাপারে দুটো মত রয়েছে। একটি হলো, শুধু তওবা করলেই হd রহিত হবে। এটাই আমাদের ইমামদের অধিকাংশের মত। কেননা এটা হd রহিতকারী তওবা। তাই ডাকাত, সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহীর ধরা পড়ার আগে তওবা করার সাথে এর সাদৃশ্য রয়েছে। দ্বিতীয় মতটি হলো, তওবাকারীর চরিত্রে সংশোধনও জরুরি। কেননা আল্লাহ বলেছেন, তারা যদি তওবা করে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে নয়, তাহলে তাদেরকে অব্যাহতি দাও। এমত অনুসারে অপরাধীর তওবা সঠিক কিনা ও তার নিয়ত আন্তরিক কিনা তা জানার জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করা দরকার। তবে এর জন্য কোনো মেয়াদ নির্দিষ্ট নেই। শাফেয়ি মাযহাবের কিছু আলেম এক বছর মেয়াদ নির্ধারণ করেছেন। তবে এ মেয়াদ নির্ধারণ অনধিকার চর্চা ও অবৈধ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মানুষের আত্মরক্ষা ও অন্যের জানমাল রক্ষার লড়াই

📄 মানুষের আত্মরক্ষা ও অন্যের জানমাল রক্ষার লড়াই


যখন কোনো আক্রমণকারী হত্যা করার লক্ষ্যে কারো উপর আক্রমণ চালায়, অথবা তার সম্পদ হরণ বা তার পরিবারের মহিলাদের সম্ভ্রম হানির অপচেষ্টা চালায়, তখন নিজের জান, মাল ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে আগ্রাসীর বিরুদ্ধে লড়াই করার অধিকার আক্রান্ত ব্যক্তির রয়েছে। সে সহজতর উপায়ে প্রতিরোধ শুরু করে ক্রমান্বয়ে কঠোরতর উপায় অবলম্বন করতে পারে। যেমন প্রথমে কথা তারপর চিৎকার, তারপর মানুষের সাহায্য নিতে হবে। এর কোনোটিতে প্রতিহত না হলে প্রহারে কাজ হয় কিনা দেখার জন্য প্রহার করতে হবে, তাতেও যদি কাজ না হয় এবং হত্যা ছাড়া যদি প্রতিহত করা না যায় তবে তাকে হত্যা করতে হবে। এমতাবস্থায় হত্যাকারীর উপর কোনো কিসাস আরোপিত হবেনা, কোনো কাফফারাও নয়। নিহত ব্যক্তির কোনো দিয়াতও প্রাপ্য হবেনা। কেননা সে হত্যাকারী ও আগ্রাসী। আগ্রাসী অত্যাচারীর রক্ত হালাল। এর জন্য কোনো ক্ষতিপূরণের প্রয়োজন নেই। এই আত্মরক্ষার লড়াই এ যদি আক্রান্ত ব্যক্তি নিহত হয় তবে সে শহীদ হবে।
আল্লাহ বলেন: وَلَمَنِ انْتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَئِكَ مَا عَلَيْهِمْ مِنْ سَبِيلِ . "যে ব্যক্তি অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ নেয়, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।" (সূরা শূরা: আয়াত ৪১)
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা.এর নিকট এসে বললো, হে রসূলুল্লাহ সা., যদি কেউ আমার সম্পদ কেড়ে নিতে আসে তাহলে আমি কী করবো? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাকে তোমার সম্পদ দেবেনা। সে বললো, লোকটি যদি আমার সাথে যুদ্ধ করতে উদ্যত হয়? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাহলে তুমি তার সাথে যুদ্ধ করবে। সে বললো, সে যদি আমাকে হত্যা করে? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাহলে তুমি শহীদ। সে বললো, আর যদি আমি তাকে হত্যা করি? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাহলে সে দোযখবাসী হবে।
বুখারি বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। আর যে ব্যক্তি নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ।
বর্ণিত আছে, জনৈক মহিলা কাঠ আহরণ করতে গেলে এক ব্যক্তি খারাপ মতলব নিয়ে তার দিকে অগ্রসর হলো। তখন ঐ মহিলা পাথর নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করলো। পরে ঘটনাটা উমর রা. এর নিকট ব্যক্ত করা হলে তিনি বললেন, সে আল্লাহর হাতে নিহত। আল্লাহ কখনো তাকে দিয়াত দেবেন না (অর্থাৎ সে দিয়ত পাবেনা)। নিজের জানমাল ও সম্ভ্রম আক্রান্ত হলে তা রক্ষার জন্য চেষ্টা করা কর্তব্য। তবে শর্ত হলো, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত রেখে তা করতে হবে। কেননা অন্যের জানমালও সম্ভ্রম রক্ষার চেষ্টা, অন্যায় প্রতিরোধ ও অন্যের হক রক্ষার দায়িত্বের আওতাভুক্ত। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ অন্যায় দেখলে তা হাত দিয়ে প্রতিহত করো, তা না পারলে মুখ দিয়ে প্রতিহত করো, তা না পারলে মন দিয়ে ঘৃণা করো। আর মন দিয়ে ঘৃণা করা সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের কাজ।” বস্তুত এটা অন্যায় প্রতিহত করার শামিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00