📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যারা বলে ‘অথবা’ কথাটি স্বাধীনতা নয় ভেদাভেদ বুঝায় তাদের যুক্তি

📄 যারা বলে ‘অথবা’ কথাটি স্বাধীনতা নয় ভেদাভেদ বুঝায় তাদের যুক্তি


দ্বিতীয় দলটি তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে সাহাবিদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় ভাষাবিদ ও কুরআন বিশারদ ইবনে আব্বাসের বর্ণিত একটি উক্তিকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন, যা ইমাম শাফেয়ি স্বীয় মুসনাদে উদ্ধৃত করেছেন। সেটি হচ্ছে:
"যখন অপরাধীরা হত্যাও করবে এবং সম্পদও লুণ্ঠন করবে তখন তাদেরকে শূলে চড়াতে হবে। আর যখন শুধু হত্যা করবে, সম্পদ লুণ্ঠন করবেনা, তখন তাদেরকে হত্যা করা হবে, শূলে চড়ানো হবেনা। আর যখন শুধু সম্পদ লুণ্ঠন করবে, হত্যা করবেনা, তখন তাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে। আর যখন শুধু পথিকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করবে ও আতঙ্ক ছড়াবে এবং কোনো সম্পদ লুণ্ঠন করবেনা এবং হত্যাও করবেনা, তখন তাদেরকে নির্বাসনে পাঠানো হবে।" ইবনে কাছির বলেছেন, ইবনে জারীরের তাফসিরে বর্ণিত হাদিস সহি হয়ে থাকলে তা ইবনে আব্বাসের উক্ত বিবরণের যথার্থতা প্রমাণ করে।
হাদিসটি হচ্ছে: "ইয়াযিদ বিন হাবিব থেকে বর্ণিত হয়েছে, মালেক ইবনে মারওয়ান আনাস বিন মালেককে একটি চিঠি লিখে এ আয়াত সম্পর্কে জানতে চান। তখন আনাস তাকে চিঠি লিখে জানান যে, এ আয়াত বুজায়লা গোত্রের সেই দলটি সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, যারা ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, রাখালকে হত্যা করে উটের পাল হাকিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, ভীতি ও সন্ত্রাস ছড়িয়েছিল এবং নারীদেরকে ধর্ষণ করেছিল। তাদের সম্পর্কে ও রাষ্ট্রদ্রোহীদের সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. জিবরীল (আ.)কে জিজ্ঞাসা করলে জিবরীল বললেন, যে ব্যক্তি সম্পদ চুরি করবে ও ত্রাস ছড়াবে, চুরির জন্য তার হাত কাটবে এবং ত্রাস ছড়ানোর জন্য তার পা কাটবে। আর যে ব্যক্তি হত্যা করবে তাকে হত্যা করবে। আর যে হত্যা, ত্রাস ছড়ানো ও নারী ধর্ষণ-ছিনতাই করবে তাকে শূলে ছড়াবে।"
এই দলটি বলেছে, অগ্রগণ্য মত হলো, আয়াতে শাস্তির শ্রেণী বিন্যাস করা হয়েছে, নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। আল্লাহ এই বিপর্যয় ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধের জন্য কয়েক মাত্রার শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। কেননা এই নৈরাজ্য সৃষ্টিরও কয়েকটি মাত্রা রয়েছে, যেমন হত্যা, সম্পদ লুণ্ঠন, সম্ভ্রমহানি এবং ফসল ও জীবজন্তুর বংশ বিনাশ করা। কোনো কোনো দস্যু এ অপরাধগুলোর মধ্যে হতে এক বা একাধিক অপরাধ সংঘটিত করে থাকে। এটা যুক্তিসংগত হতে পারে না যে, শাসক এসব অপরাধীর মধ্য হতে যাকে যে শাস্তি দিতে চান, দিতে পারবেন। বরং তার কর্তব্য, এদের প্রত্যেককে তার নৈরাজ্য ও অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী যথোপযুক্ত শাস্তি দেয়া। এটাই যথাযথ সুবিচার। আল্লাহ সূরা আশ শূরার ৪০ নং আয়াতে বলেছেন, "মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ" এ হচ্ছে শাফেয়ি মাযহাবের মত। সর্বাধিক বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী এটা ইমাম আহমদেরও মত। ইমাম আবু হানিফাও এই মত পোষণ করেন, তবে তার মতে এর কিছু বিশদ বিবরণ রয়েছে। ফাসানি বাদায়ে গ্রন্থে 'অথবা'কে নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়ার অর্থে গ্রহণকারীদের মতের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে বলেন, "বিভিন্ন বিধিতে বাহ্যত স্বাধীনতা বোধক 'অথবা' অব্যয় দ্বারা যে স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে, সেটিকে বাহ্যিক অর্থে তখনই গ্রহণ করা হবে যখন সব কটির ওয়াজিব হওয়ার কারণ একই থাকে, যেমন কসমের কাফফারা ও শিকার হত্যার কাফফারার ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু যখন কারণটি বিভিন্ন হয়, তখন প্রত্যেক বিধিতে তা পৃথকভাবে ঐ বিধির বিবরণ অনুযায়ী অর্থ ব্যক্ত করবে। যেমন সূরা কাহফের ৮৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
قُلْنَا يُذَا الْقَرْنَيْنِ إِمَّا أَنْ تُعَذِّبَ وَإِمَّا أَنْ تَتَّخِذَ فِيْهِمْ حُسْنًاه "আমি বললাম, হে যুলকারনাইন, হয় শাস্তি দাও, না হয় এদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো।" এখানে 'হয়' ও 'না হয়' (যা 'অথবা'র অর্থবোধক) উল্লিখিত দুটি জিনিসের যে কোনোটি গ্রহণের স্বাধীনতা প্রদান বুঝায় না, বরং প্রত্যেকটার আলাদা ব্যাখ্যা দান বুঝায়। কারণ এখানে উভয় বিধির কারণ ভিন্ন ভিন্ন। অর্থাৎ 'হয় যে যুলুম করে তাকে শাস্তি দাও, না হয় যে ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তার সাথে উত্তম ব্যবহার করো।" কেননা এর পরবর্তী আয়াতে যুলকারনাইনের জবাব উল্লেখ করা হয়েছে:
قَالَ أَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهُ ثُمَّ يُرَدُّ إِلَى رَبِّهِ فَيُعَذِّبَهُ عَذَابًا نُّكْرَاهِ وَأَمَّا مَنْ امَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاءَنِ الْحُسْنَى : ج "সে বললো, যে যুলুম করবে তাকে আমি শাস্তি দেব, অতপর সে তার প্রভুর নিকট ফিরে যাবে, তিনিও তাকে কঠোর শাস্তি দেবেন। আর যে ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তার জন্য তার বিনিময়ে উত্তম পুরস্কার রয়েছে।"
ডাকাতির শ্রেণীভেদ রয়েছে। যেমন এটা শুধু সম্পদ লুণ্ঠন হতে পারে, শুধু হত্যাকাণ্ডও হতে পারে, আবার উভয়টির সমাবেশও ঘটানো হতে পারে। আবার কখনো এটা শুধু ভয় দেখানোর মধ্যেও সীমিত থাকতে পারে। সুতরাং বিধিটির কারণ বিভিন্ন হয়ে যাওয়ায় একে স্বাধীনতা দানের অর্থে নেয়া চলবেনা, বরং প্রত্যেকটি বিধি পৃথক বিবরণের অর্থে নেয়া হবে। অথবা এই দুটির যে কোনো একটির অর্থে নেয়া হবে। তবে নির্দিষ্ট না হওয়ায় এটা প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যাবেনা। আর যখন সংশ্লিষ্ট আয়াতকে সাধারণ ডাকাত বা সন্ত্রাসীর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান স্বাধীনতা প্রদানের অর্থে গ্রহণ করা সম্ভব হবেনা।' তখন প্রত্যেক বিধিতে ডাকাতির বিভিন্ন শ্রেণীর বিবরণ সুপ্ত রয়েছে ধরে নেয়া হবে। অর্থাৎ আয়াতটিতে আল্লাহর বক্তব্য এ রকম ধরে নেয়া হবে: "যারা আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের একমাত্র শাস্তি এই যে, তারা যদি কাউকে হত্যা করে থাকে তবে তাদেরকে হত্যা করা হবে, অথবা সম্পদ হরণ ও হত্যাকাণ্ড উভয়টি করলে শূলে চড়ানো হবে, অথবা শুধু সম্পদ হরণ করলে হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে, অথবা শুধু ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ালে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে।” একদল মানুষ ইসলাম গ্রহণের জন্য মদিনায় এলে তাদের উপর আবু বুরদা আসলামি যখন ডাকাতি করলো, তখন রসূলুল্লাহ সা.কে জিবরীল এভাবেই ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. বলেন: “যে হত্যা করবে, তাকে হত্যা করা হবে, যে সম্পদ লুণ্ঠন করবে কিন্তু হত্যা করবেনা, তার হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে, আর যে হত্যাও করবে সম্পদও লুণ্ঠন করবে, তাকে শূলে চড়ানো হবে। আর যে ব্যক্তি মুসলমান হয়ে যাবে তার অতীতের শিরকের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অপরাধের শ্রেণীভেদে শাস্তির প্রকারভেদের ব্যাখ্যা

📄 অপরাধের শ্রেণীভেদে শাস্তির প্রকারভেদের ব্যাখ্যা


আমরা বলেছি, অধিকাংশ ফকিহর মত হলো, অপরাধের শ্রেণীভেদ অনুসারে শাস্তিতে পার্থক্য হবে। শাস্তির এই পার্থক্যটা নিম্নরূপ হবে:
১. নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধটা শুধু পথচারীকে ভীতিপ্রদর্শন ও তার দ্রব্যসামগ্রী কেড়ে নেয়ার মধ্যে সীমিত থাকবে, এর বেশি কিছু ঘটবেনা। এদেরকে নির্বাসিত করা হবে। অথবা যে শহরে তারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে, তাদেরকে সেখান থেকে মুসলিম দেশের অন্য কোনো শহরে নির্বাসিত করা হবে। তবে তারা কাফের হলে তাদেরকে অমুসলিম দেশেও দেশান্তরিত করা যাবে। এর যৌক্তিকতা এই যে, এতে তারাও নিজেদের কর্মফল ভোগ করবে ও নির্বাসনের মজা টের পাবে, আর যে এলাকায় তারা নৈরাজ্য ছড়িয়েছে সে এলাকা তাদের অপরাধ ও ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে এবং এলাকাবাসী তাদের অপতৎপরতার কুপ্রভাব থেকে মুক্ত হবে। ইমাম মালেক থেকে বর্ণিত, নির্বাসনের অর্থ নিজ শহর থেকে অন্য শহরে তাদেরকে বহিস্কার করা এবং সেখানে তাদের তওবা প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত কারাগারে রাখা। এটা ইবনে জারীরেরও মত। পক্ষান্তরে হানাফিরা মনে করেন নির্বাসন অর্থ কারাগারে পাঠানো এবং তারা কারাগারেই থাকবে যতক্ষণ না প্রকাশ পাবে যে, তারা ভালো হয়ে গেছে। কারণ কারাগার অতি সংকীর্ণ জায়গা। তাই কারাবন্দী নির্বাসিতের মতই। সে যেন তার এলাকা থেকে কারাগারে নির্বাসিত হয়েছে।
২. নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হত্যাকাণ্ড ছাড়া শুধু সম্পদ হরণের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হলে তার শাস্তি হলো, ডান হাত ও বাম পা কেটে দেয়া। কেননা এই অপরাধটাতে চুরির চেয়ে অতিরিক্ত কিছু যুক্ত হয়েছে। সেটি হলো সশস্ত্রভাবে ভীতির প্রদর্শন বা আক্রমণ। হাত ও পায়ের অংশ কাটা হলে তার অবশিষ্টাংশে তাৎক্ষণিকভাবে রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে, যাতে করে সে রক্তক্ষরণের কারণে মরে না যায়। বিপরীত দিক থেকে কর্তনের কারণ হলো, এক হাত ও এক পা থাকলে তা দিয়ে সে কাজ চালাতে পারবে। এভাবে এক হাত ও এক পা কর্তিত হওয়ার পর সে যদি পুনরায় ডাকাতি করে, তাহলে তার অবশিষ্ট বাম হাত ও ডান পা কেটে দেয়া হবে। অধিকাংশ ফকিহদের মতে, কেড়ে নেয়া সম্পদ 'নেছাব' পরিমাণ হওয়া এবং সংরক্ষিত স্থান থেকে নেয়া শর্ত। কেননা চুরি ও ডাকাতি একটা অপরাধ, যার জন্য নির্ধারিত শাস্তি রয়েছে। অপরাধ যখনই সংঘটিত হয়, তখনই তার প্রতিফল দেয়া হবে চাই তা কোনো ব্যক্তি দ্বারা অথবা দল দ্বারা সংঘটিত হোক। হৃত সম্পদ বা সামগ্রী যদি নেছাব পরিমাণ না হয় এবং সংরক্ষিত স্থান থেকে না নেয়া হয়, তাহলে হাত পা কর্তন করা হবেনা। আর যদি অপরাধী একাধিক হয়, তাহলে প্রত্যেকের অংশ নেছাব পরিমাণ হওয়া শর্ত কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সম্মিলিতভাবে ডাকাতদের অপহৃত সম্পদ যদি নেছাব সমান হয়, তাহলে পৃথকভাবে প্রত্যেকের অংশ নেছাব সমান না হলেও সবার হাত পা কাটা হবে, যেমন চুরির ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। তবে শাফেয়ি ও যুক্তিবাদীদের মতানুসারে প্রত্যেকের অংশ নেছাব পরিমাণ না হলে হাত পা কাটা হবেনা। আর এটাও শর্ত যে, তাদের ব্যাপারে কোনো রকম সন্দেহ সংশয় যেন না থাকে। মালেকি মাযহাব ও যাহেরি মাযহাব এই মত সমর্থন করেন না। তারা অপহৃত সম্পদের কোনো পরিমাণ নির্ধারণের পক্ষপাতী নন এবং তা সংরক্ষিত স্থানে থাকাও শর্ত মনে করেন না। কেননা ডাকাতি স্বয়ং একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, চাই তা নেছাব পরিমাণ হোক বা না হোক এবং সংরক্ষিত স্থান থেকে নেয়া হোক বা না হোক। ডাকাতি চুরি থেকে ভিন্ন অপরাধ। উভয়ের শাস্তি ভিন্ন রকমের। আল্লাহ চুরির জন্য সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন, কিন্তু ডাকাতির জন্য করেননি। বরং ডাকাতের শাস্তিরই শুধু উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, কেউ ডাকাতি করলেই তাকে শাস্তি দেয়া হবে।
অপরাধীদের মধ্যে কেউ যদি হৃত সম্পদের মালিকের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় থাকে, তাহলে তার হাত পা কাটা হবেনা, অবশিষ্টদের কাটা হবে। এটা হাম্বলি ও শাফেয়ির মত। হানাফিদের মতে, কারোই হাত পা কাটা হবে না। কারণ আত্মীয়ের কারণে সন্দেহের সৃষ্টি হয়ে গেছে। আর অপরাধীরা একে অপরের লাভক্ষতির যিম্মাদার। তাই আত্মীয়ের উপর থেকে যখন শাস্তি রহিত হয়েছে তখন অন্যদের উপর থেকেও শাস্তি রহিত হবে। ইবনে কুদামা শাফেয়ি ও হাম্বলিদের মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেন, সন্দেহ কেবল একজনের সাথে সংশ্লিষ্ট। কাজেই অবশিষ্টদের শাস্তি রহিত হবেনা। অর্থাৎ রহিত হওয়ার কারণটা একজেরন মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই শাস্তি শুধু ঐ একজনেরই রহিত হবে। কেননা সন্দেহ তাকে ছাড়িয়ে অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছেনা।
৩. ডাকাতির অপরাধটা যদি শুধু হত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সম্পদ হরণ তার সাথে যুক্ত না হয়, তাহলে অপরাধী অবশ্যই মৃত্যুদন্ডযোগ্য। শাসক যখনই তাকে ধরতে পারবেন, তখনই হত্যা করবেন। সকল ডাকাতকেই হত্যা করা হবে যদিও হত্যাকারী তাদের একজন হয়। সাহায্যকারীদেরও হত্যা করা হবে। কেননা তারাও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ও অরাজকতায় অংশীদার। নিহত ব্যক্তির অভিভাবক যদি ক্ষমা করে দেয় বা দিয়াতে সম্মত হয় তাহলেও তা গ্রহণযোগ্য হবেনা। কারণ নিহতের অভিভাবকের ক্ষমা বা দিয়াতে সম্মতি কিসাস অর্থাৎ খুনের মামলায় গ্রহণযোগ্য, ডাকাতিতে নয়।
৪. ডাকাতির সময় যদি অপরাধীরা হত্যা ও লুঠতরাজ দুটোই চালায়, তাহলে তাদেরকে হত্যা ও ক্রুশবিদ্ধ দুটোই করা হবে। অর্থাৎ জীবিতাবস্থায় শূলে চড়ানো হবে যাতে মারা যায়। অপরাধীকে একটা কাঠ বা স্তম্ভ বা অনুরূপ কিছুর সাথে দাঁড় করিয়ে দু'হাত ঝুলন্ত রেখে বাধা হবে, তারপর মেরে ফেলা হবে। কোনো কোনো ফকিহর মতে, প্রথমে হত্যা করা হবে, তারপর অন্যদেরকে শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে শূলে চড়ানো হবে। কেউ কেউ বলেন, শূলের কাঠের উপর অপরাধীকে তিন দিনের বেশি রাখা হবেনা।
এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হলো তার সবই ইমামদের ইজতিহাদ এবং আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এই ইজতিহাদ করা হয়েছে। বস্তুত প্রত্যেক ইমামেরই সঠিক যুক্তি রয়েছে। যিনি মনে করেন, নির্ধারিত শাস্তিগুলোর যে কোনো একটা নির্বাচনে শাসককে ক্ষমতা দেয়া উচিত, তার যুক্তি হলো 'অথবা' অব্যয়টি দ্বারাই এটা বুঝা যায়। বিষয়টি সম্পূর্ণ শাসকের বিবেচনার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যাকে যে শাস্তি দিলে অপরাধী দমন হবে ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত হবে বলে তিনি মনে করবেন, তাকে সেই শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে।
যিনি মনে করেন, আয়াতে প্রত্যেক অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে, তার যুক্তি হলো, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের সাথে সাথে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কাজেই শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য যে অপরাধ দমন ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা (অন্য কথায় দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন) এবং সেটি বাস্তবায়িত করাই যে জরুরি সে ব্যাপারে সবাই একমত। এই ইজতিহাদ সকল পর্যায়ের দায়িত্বশীলদেরকে কুরআন ও হাদিসের উক্তিসমূহ উপলব্ধি করা ও ইজতিহাদের সঠিক পথ অনুসরণ করা সহজ করে দেয়। আর শিক্ষার্থীদের জন্যও সত্যোপলব্ধির সহায়ক। তবে ফকিহগণ যে কয়টি ধ্বংসাত্মক কাজের উল্লেখ করেছেন, নৈরাজ্যসৃষ্টিকারীরা ও ডাকাতরা যে এছাড়াও আরো বহু ধরনের নাশকতাকারী তৎপরতা চালিয়ে থাকে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। উল্লিখিত আয়াত থেকে ফকিহগণ শরিয়তের যেসব খুটিনাটি বিধি প্রণয়ন করেছেন, তার আলোকে নিত্যনতুন যাবতীয় ধ্বংসাত্মক কাজের জন্যও উপযুক্ত বিধি প্রণয়ন করা সম্ভব।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 একটি আপত্তির জবাব

📄 একটি আপত্তির জবাব


তফসির আলমানারে বলা হয়েছে, ইবনে জারীর মুজাহিদের এই উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, এ আয়াতে 'ফাসাদ' অর্থাৎ ধ্বংসাত্মক কাজ দ্বারা ব্যভিচার, চুরি, নরহত্যা এবং ফসল ও পশুর বংশ বিনাশকে বুঝানো হয়েছে। এ চারটি কাজ নিঃসন্দেহে ধ্বংসাত্মক কাজ। কিন্তু কোনো কোনো ফকিহ মুজাহিদের এই উক্তির উপর একটি আপত্তি তুলেছেন। সেটি হলো, এ সকল পাপ কাজ ও ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য আয়াতে যে শাস্তি উল্লেখ করা হয়েছে, শরিয়তে তার জন্য তো তা থেকে ভিন্নতর হদ বা শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। ব্যভিচার ও চুরির জন্য হদ এবং হত্যার জন্য কিসাস ও দিয়াত ইত্যাদি-নির্ধারিত রয়েছে। আর শস্য ও পশু হত্যার জন্য ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে এবং সেই ক্ষতিপূরণে দায়ী ব্যক্তিকে বাধ্য করা হবে, উপরন্তু শাসক স্বীয় বিচার বিবেচনা অনুযায়ী তাকে তাযীর বা স্বতন্ত্র শাস্তিও দিতে পারবেন। এমতাবস্থায় এ আয়াতে একই অপরাধের পৃথক শাস্তি নির্ধারণের হেতু কী? এর জবাব এই যে, এ আয়াতে যে বিশেষ ধরনের শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে, তা কেবল সেই সব অপরাধীর জন্য নির্দিষ্ট, যারা শাসকদের প্রতিও আনুগত্যহীন, শরিয়তের প্রতিও আস্থাহীন। আর ঐসব হদ হলো সেই সব ব্যভিচারী ও চোরদের জন্য ব্যক্তিগত শাস্তি, যারা কার্যত শরিয়তের বিধানের অনুগত। পবিত্র কুরআনে এই দুই শ্রেণীর অপরাধীকে এক বচনের কর্তাবাচক শব্দ দ্বারা উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন সূরা মায়েদার ৩৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন : وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا “পুরুষ চোর ও নারী চোর, উভয়ের হাত কেটে দাও।” আর সূরা নূরের ২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন : الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ . “ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশো কষাঘাত করো।” এই সব অপরাধী নিজেদের কৃত কাজকে ঘৃণ্য কাজ বলে স্বীকার করে এবং প্রকাশ্যে অপরাধ ও অরাজকতা করে বেড়ায়না যে, তাদের অপকর্মের পদাংক অনুসরণ অন্যদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করবে। তাছাড়া তারা নিজেদের সশস্ত্র বাহিনী সৃষ্টি করে নিজেদেরকে শরিয়তের শাস্তি থেকে রক্ষা করার জন্য শক্তি ও সহিংসতার আশ্রয় নেয় না। তাই তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত বলা মানানসই নয়। অথচ এ আয়াতে যে শাস্তি বর্ণনা করা হয়েছে, তা উল্লিখিত দুটি বৈশিষ্ট্যধারীদের জন্য (আইন ও শরিয়তের অবাধ্য এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রকাশ্যে অপরাধ করা ও তার প্রসার করানো)। ফকিহগণ যখন যুদ্ধে লিপ্ত শব্দটির উল্লেখ করেন, তখন তা দ্বারা সহিংস পন্থায় প্রকাশ্য ধ্বংসাত্মক অপরাধীদেরকেই বুঝান।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ডাকাতি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার ব্যাপারে শাসক ও সমাজের করণীয়

📄 ডাকাতি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার ব্যাপারে শাসক ও সমাজের করণীয়


শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা, ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করা এবং জনগণের প্রাণ, সম্পদ ও সম্ভ্রম রক্ষার জন্য শাসক ও সমাজ উভয়েই দায়িত্বশীল। যখন একটি গোষ্ঠী সমাজ ও রাষ্ট্রের অবাধ্য হয়ে ত্রাস ছড়ায় ও ডাকাতি করে এবং মানুষের জীবনে বিভীষিকাময় অরাজকতা ও অস্থিরতার সৃষ্টি করে, তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শাসকের কর্তব্য, ঠিক যেমন রসূলুল্লাহ সা. বুজায়লা গোত্রের ‘উরনী’ বিদ্রোহীদের সাথে করেছিলেন এবং তাঁর পরে খলিফাগণ যেমন করেছিলেন। সর্বস্তরের মুসলমানদেরও কর্তব্য তাদের দাপট খর্ব করতেও মূলোৎপাটন করতে শাসককে সহযোগিতা করা, যতক্ষণ না জনগণের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং প্রত্যেকটি মানুষ নিজের, পরিবারের ও সমাজের কল্যাণার্থে সর্বাত্মক চেষ্টা সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হয়। কোনো হত্যা ও লুণ্ঠন সংঘটিত করার আগেই যদি এসব সন্ত্রাসী রণে ভঙ্গ দেয়, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের দাপট চূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে আর তাদের পিছু ধাওয়া করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাদের অপতৎপরতা যদি খুন ও রাহাজানির পর্যায়ে উপনীত হয়, তাহলে তাদেরকে পুরোপুরি পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত তাদেরকে পাকড়াও করার জন্য সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে এবং তাদের উপর ডাকাতি রাহাজানির শাস্তি কার্যকর করতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00