📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ডাকাতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের শাস্তি

📄 ডাকাতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের শাস্তি


ডাকাতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ নাযিল করেছেন: إِنَّمَا جَزَؤُا الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ طَ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ অর্থ: "যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি হলো, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।" (বিপরীত দিক থেকে অর্থ ডান হাত ও বাম পা অথবা বাম হাত ও ডান পা) তবে তোমাদের আয়ত্তাধীন আসবার আগে যারা তওবা করবে তাদের জন্য নয়। সুতরাং জেনে রাখো আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (আল মায়েদা: আয়াত ৩৩-৩৪)
এ আয়াত কাফেরদের সম্পর্কে নয়, বরং মুসলমানদের মধ্য থেকে যারা ডাকাতি, নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস সৃষ্টির কাজে ব্যাপৃত তাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। কাফেররা যখন মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে মুসলমান হয়ে যাবে, তখন তাদের ইসলাম গ্রহণের বদৌলতে তাদের প্রাণ ও সম্পদ নিরাপদ হয়ে যাবে। এমনকি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তারা যদি এমন অপরাধ করে থাকে যা ইহকালেও শাস্তিযোগ্য, তাহলেও তারা ঐ শাস্তি থেকে অব্যাহতি পাবে। সূরা আনফালের ৩৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন:
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرُ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ "যারা কুফরী করে তাদের বলো : যদি তারা বিরত হয় তবে অতীতে যা কিছু হয়েছে, তা ক্ষমা করে দেয়া হবে।” এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সূরা মায়েদার ৩৩ ও ৩৪ নং আয়াত মুসলমানদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।” আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করার অর্থ হলো, গোলযোগ, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সন্ত্রাস করা এবং ইসলামের নীতিমালা ও নির্দেশাবলী লঙ্ঘন ও অমান্য করার মাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উড়ানো। কাজেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াকে আল্লাহ ও রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া আখ্যায়িত করে এ কথাই বুঝানো হয়েছে যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করারই শামিল। যেমন আল্লাহ বলেছেন : يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا "তারা আল্লাহ ও মুমিনদের ধোকা দেয়।” (আল বাকারা: আয়াত আয়াত ৯)
এখানে আল্লাহ ও মুমিনদেরকে ধোকা দেয়া যেমন প্রকৃত অর্থে নয় বরং রূপক অর্থে, তেমনি সূরা মায়েদায় আল্লাহ ও রসূলের সাথে তারা যুদ্ধ করে একথাও রূপক অর্থে, প্রকৃত অর্থে নয়। কুরতুবী বলেছেন, "তারা আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এ কথাটা রূপক। কেননা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করা যায়না এবং তাঁকে পরাস্ত করা যায়না। তিনি সকল গুণাবলির পূর্ণ ও সর্বোচ্চ মানের অধিকারী এবং তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই প্রতিপক্ষও কেউ নেই-একথা বিশ্বাস করা ওয়াজিব। এর অর্থ হলো, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রিয়জনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ দ্বারা তিনি মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়া যে কত বড় পাপ, সে কথাই বুঝিয়েছেন। এভাবে তিনি সূরা বাকারার ২৪৫ নং আয়াতে مَنْ ذَالَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا "যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে” দ্বারাও তাঁর বান্দাদেরকে ঋণ দেয়া বুঝিয়েছেন এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টির জন্যই এভাবে কথাটা বলেছেন। একটি সহীহ হাদিসে কুদসিতে আল্লাহর উক্তি "আমি তোমার কাছে খাবার রেখেছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে খাবার দাওনি" দ্বারাও আল্লাহর বান্দাদেরকে আহার করানোর গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে।
সূরা মায়েদার এ আয়াত দুটি নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে অধিকাংশ আলেম বলেন: একটি দল মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করলো। এরপর মদিনার আবহাওয়া তাদের শরীরের উপযোগী না হওয়ায় তারা মারাত্মক চর্মরোগে আক্রান্ত হলো। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে যাকাতের উটের পাল যেখানে রক্ষিত, সেখানে গিয়ে দুগ্ধেল উটের দুধ পান করার আদেশ দিলেন। আদেশ অনুযায়ী তারা কাজ করলো। তারপর যখন সুস্থ হলো, তখন উটের রাখালকে হত্যা করে চোখে উপড়ে রেখে ইসলাম ত্যাগ করে ও উটগুলো হাকিয়ে নিয়ে যায়।
এ ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে রসূলুল্লাহ সা. তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে তাদেরকে ধরে আনতে লোকজন পাঠালেন। তাদেরকে ধরে আনা হলে রসূলুল্লাহ সা. এর আদেশে তাদের হাত ও পা কেটে, চোখ উপড়ে, মদিনার বাইরে হাররা নামক কালো পাথরে পূর্ণ স্থানে ফেলে রাখা হলো। তারা ঐ অবস্থায় ক্ষুধায় ও পিপাসায় ছটফট করে মারা গেলো। এরা ডাকাতি, হত্যা, ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম ত্যাগ এবং আল্লাহ ও রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দায়ে দোষী ছিলো। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ সূরা মায়েদার উক্ত আয়াত দুটি নাযিল করলেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 আয়াতে যে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে

📄 আয়াতে যে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে


এ আয়াতে আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির দায়ে চারটি শাস্তির যে কোনো একটি প্রয়োগের আদেশ দেয়া হয়েছে : (১) মৃত্যুদন্ড, (২) শূলে চড়ানো (৩) বিপরীত দিক থেকে হাত ও পা কেটে দেয়া, (৪) দেশ থেকে নির্বাসিত করা। এই শাস্তিগুলো 'অথবা' অব্যয় ব্যবহার করে উল্লেখ করা হয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায় শাসক এই শাস্তিগুলোর মধ্য থেকে যে কোনো একটি প্রয়োগ করার স্বাধীনতার অধিকারী। তিনি এর মধ্যে যেটি অধিকতর কল্যাণকর মনে করবেন, সেটাই প্রয়োগ করবেন, অপরাধের মাত্রা যাই হোক নাকেন। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, এখানে 'অথবা' বাছাই করার স্বাধীনতাবোধক নয়, বরং বৈচিত্রবোধক। অর্থাৎ অপরাধের গুরুত্বের মাত্রা অনুপাতে শাস্তির রকমফের হবে, যেটা ইচ্ছা প্রয়োগ করা যাবে তা নয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ‘অথবা’ কথাটি স্বাধীনতাবোধক এই মতের প্রবক্তাদের যুক্তি

📄 ‘অথবা’ কথাটি স্বাধীনতাবোধক এই মতের প্রবক্তাদের যুক্তি


প্রথমোক্ত দলটি বলেন, আয়াতের শাব্দিক অর্থ থেকে এটাই বুঝায়, আর আয়াতের ভাষাগত বিন্যাসও এর সমর্থক। ওদিকে হাদিস থেকে এর বিপরীত কিছু জানা যায়না। আয়াতের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকারী ও দেশে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী যেই হোক না কেন, তার শাস্তি হয় হত্যা, নতুবা শূলে আরোহণ, নতুবা হাত পা বিপরীত দিক থেকে কর্তন অথবা দেশান্তরিত হওয়া। এর মধ্যে কার জন্য কোন্টি প্রযোজ্য হবে, তা শাসক স্থির করবেন এবং এই শাস্তিগুলোর যে কোনো একটি কার্যকর করা হবে, চাই অপরাধী উল্লিখিত অপরাধগুলোর সবকটি করুক বা যে কোনো একটি করুক। আয়াতে শাসককে এমন ক্ষমতা দেয়া হয়নি যে, অপরাধীর উপর একাধিক শাস্তি কার্যকর করবেন কিংবা কোনোটাই করবেননা। কুরতুবি বলেন: "আয়াত থেকে সুষ্ঠভাবে জানা যায় যে, উক্ত চারটি শাস্তির যে কোনো একটি কার্যকর করার ব্যাপারে শাসকের স্বাধীনতা রয়েছে।" এটা আবু সাওর, মালেক, ইবনে আব্বাস, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, উমর ইবনে আব্দুল আযিয, মুজাহিদ, দাহহাক ও নাখয়ির অভিমত। ইবনে আব্বাস বলেছেন, কুরআনে যেখানেই অথবা থাকবে সেখানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাধীনতা থাকবে। আয়াত থেকে সুষ্ঠভাবেই এটা প্রতীয়মান।
ইবনে কাসির বলেন, 'অথবা' স্পষ্টতই একাধিকের মধ্যে যে কোনো একটি গ্রহণের স্বাধীনতা ব্যক্ত করে। যেমন সূরা মায়েদার ১৫ নং আয়াতে ইহরামকারী শিকার বধ করলে যে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
فَجَزَاءُ مِثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِنْكُمْ هَدِيَّا ، بَلِغَ الْكَعْبَةِ أَوْ كَفَّارَةٌ طَعَامٌ مَسْكِينَ أَوْ عَدْلُ ذَلِكَ صِيَامًا.
"তোমাদের ইহ্রামকারীদের মধ্যে কেউ শিকার হত্যা করলে তার উপর হত্যাকৃত জন্তুর সমান বিনিময় বর্তাবে, যার ফয়সালা তোমাদের মধ্যে দুজন ন্যায়বান লোক করবে, সে জন্তুটি হাদিয়া হিসেবে কাবার পৌঁছাতে হবে। অথবা তার উপর কাফফারা বর্তাবে কয়েকজন মিসকিনের খাবার, অথবা তার সমপরিমাণ রোযা রাখবে।"
ফিদিয়ার ব্যাপারে আল্লাহ আরো বলেন:
فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَّرِيضًا أَوْ بِهِ أَذًى مِنْ رَأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِنْ صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْنُسُكِ ج
"তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা তার মাথায় কোনো কষ্ট থাকে, তবে রোযা কিংবা সদকা অথবা কুরবানি দিয়ে তার ফিদিয়া দেবে।"
অনুরূপ কসমের কাফফারার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:
فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسْكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ "দশজন মিসকিনকে খাদ্য দান করা, মধ্যম ধরনের খাদ্য, যা সাধারণত তোমাদের পরিবারের লোকদেরকে খেতে দাও, অথবা তাদেরকে পোশাক দান করা অথবা একজন দাস বা দাসীকে মুক্ত করা।"
এর সবকটিতেই নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কাজেই অনুরূপ স্বাধীনতা এ আয়াতের মধ্যেও রয়েছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যারা বলে ‘অথবা’ কথাটি স্বাধীনতা নয় ভেদাভেদ বুঝায় তাদের যুক্তি

📄 যারা বলে ‘অথবা’ কথাটি স্বাধীনতা নয় ভেদাভেদ বুঝায় তাদের যুক্তি


দ্বিতীয় দলটি তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে সাহাবিদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় ভাষাবিদ ও কুরআন বিশারদ ইবনে আব্বাসের বর্ণিত একটি উক্তিকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন, যা ইমাম শাফেয়ি স্বীয় মুসনাদে উদ্ধৃত করেছেন। সেটি হচ্ছে:
"যখন অপরাধীরা হত্যাও করবে এবং সম্পদও লুণ্ঠন করবে তখন তাদেরকে শূলে চড়াতে হবে। আর যখন শুধু হত্যা করবে, সম্পদ লুণ্ঠন করবেনা, তখন তাদেরকে হত্যা করা হবে, শূলে চড়ানো হবেনা। আর যখন শুধু সম্পদ লুণ্ঠন করবে, হত্যা করবেনা, তখন তাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে। আর যখন শুধু পথিকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করবে ও আতঙ্ক ছড়াবে এবং কোনো সম্পদ লুণ্ঠন করবেনা এবং হত্যাও করবেনা, তখন তাদেরকে নির্বাসনে পাঠানো হবে।" ইবনে কাছির বলেছেন, ইবনে জারীরের তাফসিরে বর্ণিত হাদিস সহি হয়ে থাকলে তা ইবনে আব্বাসের উক্ত বিবরণের যথার্থতা প্রমাণ করে।
হাদিসটি হচ্ছে: "ইয়াযিদ বিন হাবিব থেকে বর্ণিত হয়েছে, মালেক ইবনে মারওয়ান আনাস বিন মালেককে একটি চিঠি লিখে এ আয়াত সম্পর্কে জানতে চান। তখন আনাস তাকে চিঠি লিখে জানান যে, এ আয়াত বুজায়লা গোত্রের সেই দলটি সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, যারা ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, রাখালকে হত্যা করে উটের পাল হাকিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, ভীতি ও সন্ত্রাস ছড়িয়েছিল এবং নারীদেরকে ধর্ষণ করেছিল। তাদের সম্পর্কে ও রাষ্ট্রদ্রোহীদের সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. জিবরীল (আ.)কে জিজ্ঞাসা করলে জিবরীল বললেন, যে ব্যক্তি সম্পদ চুরি করবে ও ত্রাস ছড়াবে, চুরির জন্য তার হাত কাটবে এবং ত্রাস ছড়ানোর জন্য তার পা কাটবে। আর যে ব্যক্তি হত্যা করবে তাকে হত্যা করবে। আর যে হত্যা, ত্রাস ছড়ানো ও নারী ধর্ষণ-ছিনতাই করবে তাকে শূলে ছড়াবে।"
এই দলটি বলেছে, অগ্রগণ্য মত হলো, আয়াতে শাস্তির শ্রেণী বিন্যাস করা হয়েছে, নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। আল্লাহ এই বিপর্যয় ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধের জন্য কয়েক মাত্রার শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। কেননা এই নৈরাজ্য সৃষ্টিরও কয়েকটি মাত্রা রয়েছে, যেমন হত্যা, সম্পদ লুণ্ঠন, সম্ভ্রমহানি এবং ফসল ও জীবজন্তুর বংশ বিনাশ করা। কোনো কোনো দস্যু এ অপরাধগুলোর মধ্যে হতে এক বা একাধিক অপরাধ সংঘটিত করে থাকে। এটা যুক্তিসংগত হতে পারে না যে, শাসক এসব অপরাধীর মধ্য হতে যাকে যে শাস্তি দিতে চান, দিতে পারবেন। বরং তার কর্তব্য, এদের প্রত্যেককে তার নৈরাজ্য ও অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী যথোপযুক্ত শাস্তি দেয়া। এটাই যথাযথ সুবিচার। আল্লাহ সূরা আশ শূরার ৪০ নং আয়াতে বলেছেন, "মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ" এ হচ্ছে শাফেয়ি মাযহাবের মত। সর্বাধিক বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী এটা ইমাম আহমদেরও মত। ইমাম আবু হানিফাও এই মত পোষণ করেন, তবে তার মতে এর কিছু বিশদ বিবরণ রয়েছে। ফাসানি বাদায়ে গ্রন্থে 'অথবা'কে নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়ার অর্থে গ্রহণকারীদের মতের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে বলেন, "বিভিন্ন বিধিতে বাহ্যত স্বাধীনতা বোধক 'অথবা' অব্যয় দ্বারা যে স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে, সেটিকে বাহ্যিক অর্থে তখনই গ্রহণ করা হবে যখন সব কটির ওয়াজিব হওয়ার কারণ একই থাকে, যেমন কসমের কাফফারা ও শিকার হত্যার কাফফারার ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু যখন কারণটি বিভিন্ন হয়, তখন প্রত্যেক বিধিতে তা পৃথকভাবে ঐ বিধির বিবরণ অনুযায়ী অর্থ ব্যক্ত করবে। যেমন সূরা কাহফের ৮৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
قُلْنَا يُذَا الْقَرْنَيْنِ إِمَّا أَنْ تُعَذِّبَ وَإِمَّا أَنْ تَتَّخِذَ فِيْهِمْ حُسْنًاه "আমি বললাম, হে যুলকারনাইন, হয় শাস্তি দাও, না হয় এদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো।" এখানে 'হয়' ও 'না হয়' (যা 'অথবা'র অর্থবোধক) উল্লিখিত দুটি জিনিসের যে কোনোটি গ্রহণের স্বাধীনতা প্রদান বুঝায় না, বরং প্রত্যেকটার আলাদা ব্যাখ্যা দান বুঝায়। কারণ এখানে উভয় বিধির কারণ ভিন্ন ভিন্ন। অর্থাৎ 'হয় যে যুলুম করে তাকে শাস্তি দাও, না হয় যে ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তার সাথে উত্তম ব্যবহার করো।" কেননা এর পরবর্তী আয়াতে যুলকারনাইনের জবাব উল্লেখ করা হয়েছে:
قَالَ أَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهُ ثُمَّ يُرَدُّ إِلَى رَبِّهِ فَيُعَذِّبَهُ عَذَابًا نُّكْرَاهِ وَأَمَّا مَنْ امَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاءَنِ الْحُسْنَى : ج "সে বললো, যে যুলুম করবে তাকে আমি শাস্তি দেব, অতপর সে তার প্রভুর নিকট ফিরে যাবে, তিনিও তাকে কঠোর শাস্তি দেবেন। আর যে ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তার জন্য তার বিনিময়ে উত্তম পুরস্কার রয়েছে।"
ডাকাতির শ্রেণীভেদ রয়েছে। যেমন এটা শুধু সম্পদ লুণ্ঠন হতে পারে, শুধু হত্যাকাণ্ডও হতে পারে, আবার উভয়টির সমাবেশও ঘটানো হতে পারে। আবার কখনো এটা শুধু ভয় দেখানোর মধ্যেও সীমিত থাকতে পারে। সুতরাং বিধিটির কারণ বিভিন্ন হয়ে যাওয়ায় একে স্বাধীনতা দানের অর্থে নেয়া চলবেনা, বরং প্রত্যেকটি বিধি পৃথক বিবরণের অর্থে নেয়া হবে। অথবা এই দুটির যে কোনো একটির অর্থে নেয়া হবে। তবে নির্দিষ্ট না হওয়ায় এটা প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যাবেনা। আর যখন সংশ্লিষ্ট আয়াতকে সাধারণ ডাকাত বা সন্ত্রাসীর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান স্বাধীনতা প্রদানের অর্থে গ্রহণ করা সম্ভব হবেনা।' তখন প্রত্যেক বিধিতে ডাকাতির বিভিন্ন শ্রেণীর বিবরণ সুপ্ত রয়েছে ধরে নেয়া হবে। অর্থাৎ আয়াতটিতে আল্লাহর বক্তব্য এ রকম ধরে নেয়া হবে: "যারা আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের একমাত্র শাস্তি এই যে, তারা যদি কাউকে হত্যা করে থাকে তবে তাদেরকে হত্যা করা হবে, অথবা সম্পদ হরণ ও হত্যাকাণ্ড উভয়টি করলে শূলে চড়ানো হবে, অথবা শুধু সম্পদ হরণ করলে হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে, অথবা শুধু ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ালে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে।” একদল মানুষ ইসলাম গ্রহণের জন্য মদিনায় এলে তাদের উপর আবু বুরদা আসলামি যখন ডাকাতি করলো, তখন রসূলুল্লাহ সা.কে জিবরীল এভাবেই ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. বলেন: “যে হত্যা করবে, তাকে হত্যা করা হবে, যে সম্পদ লুণ্ঠন করবে কিন্তু হত্যা করবেনা, তার হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে, আর যে হত্যাও করবে সম্পদও লুণ্ঠন করবে, তাকে শূলে চড়ানো হবে। আর যে ব্যক্তি মুসলমান হয়ে যাবে তার অতীতের শিরকের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00