📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সংজ্ঞা

📄 সংজ্ঞা


বিদ্রোহ, সন্ত্রাস, ডাকাতি ও রাহাজানি দ্বারা এমন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতাকে বুঝায়, যারা সমাজে অরাজকতা, রক্তপাত, ধনসম্পদ লুণ্ঠন, ছিনতাই, সম্ভ্রমহানি, ফসল ও গবাদিপশু বিনাশ প্রভৃতি অপরাধ সংঘটিত করে।
এর মাধ্যমে তারা ধর্ম, নৈতিকতা, প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ করে। এ ধরনের অপরাধী গোষ্ঠী মুসলিম, অমুসলিম নাগরিক, চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায় কিংবা যুদ্ধরত অমুসলিম যে দলভুক্তই হোক না কেন, যতক্ষণ তারা মুসলিম শাসিত দেশের অভ্যন্তরে থাকে এবং যতক্ষণ তাদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড সকল শ্রেণীর নিরীহ নাগরিকের উপর আঘাত হানতে থাকে, ততক্ষণ তাদের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই এবং আইনের চোখে তারা সবাই সমান। দেশের আইন শৃঙ্খলা ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এ ধরনের আইন ও রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা একটি দল করুক অথবা কোনো ব্যক্তি করুক, তা সমভাবে বিদ্রোহী ও অপরাধমূলক তৎপরতা হিসেবেই গণ্য হবে। কোনো ব্যক্তি বিশেষ যদি এত বেশি শক্তি ও প্রতাপের অধিকারী হয় যা দ্বারা সে সমাজের জান, মাল ও সম্ভ্রমের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে, তাহলে সেই ব্যক্তিকে একাধারে দস্যু ও দেশদ্রোহী উভয় নামে আখ্যায়িত করা হবে। এই দস্যুবৃত্তি ও বিদ্রোহের আওতায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও গেরিলা গোষ্ঠীও এসে যায়, যেমন হত্যাকারী দল, শিশু অপহরণকারী দল, আবাসিক এলাকায় হামলা চালানো চোর ডাকাতের দল, ব্যাংক ডাকাতের দল, গণিকাবৃত্তিতে নিযুক্ত করার উদ্দেশ্যে কুমারী মেয়ে ও অপ্রাপ্তবয়স্কা মেয়ে অপহরণকারী দল, দেশে গোলযোগ ও শান্তি শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ও নৈরাজ্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে শাসক ও রাজনীতিকদেরকে গুপ্ত হত্যাকারী দল এবং ফসল ধ্বংসকারী ও গবাদি পশু হত্যাকারী দল ইত্যাদি।
এ ধরনের সন্ত্রাসী শান্তিশৃঙ্খলা বিনাসী গোষ্ঠীকে একদিকে যেমন রাষ্ট্রদ্রোহীও গণ্য করা হয়, অন্যদিকে তেমনি ইসলামেরও শত্রু ও ইসলামী শিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত বলেও আখ্যায়িত করা হয়। কেননা ইসলাম এসেছেই সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, যা সমাজের প্রতিটি সদস্যের অধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমেই করে থাকে।
সুতরাং এ ধরনের একটি গোষ্ঠীর রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত হওয়া প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রে বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ারই নামান্তর। তাছাড়া একে রাহাজানিও বলা হয়। কেননা জনগণ এ ধরনের সন্ত্রাসী ও সমাজদ্রোহী গোষ্ঠীর অপরাধী তৎপরতার কারণে রাস্তাঘাটে বের হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। কারণ তারা যে কোনো সময় শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষের রক্তপাত, দ্রব্যসামগ্রী ছিনতাই ও লুণ্ঠন, সম্ভ্রমহানি অথবা এমন আরো বহু অপরাধ করে বসবে বলে আশংকা করা হয়, যা প্রতিহত করা নিরস্ত্র নিরীহ পথযাত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো কোনো ফকিহ একে ডাকাতি রাহাজানি দস্যুবৃত্তি, নাশকতা, (সাম্প্রতিক কালের পরিভাষায় সন্ত্রাস ও ছিনতাই ইত্যাদি) নামে আখ্যায়িত করে থাকেন। (চুরি ও ডাকাতির পার্থক্য হলো, চুরিতে সাধারণত অস্ত্র ব্যবহৃত হয়না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বা গৃহেরই আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয় আর ডাকাতি একই সাথে একাধিক ব্যক্তি বা গৃহের ক্ষতিসাধন করে, তাতে অস্ত্র ব্যবহৃত হয় ও রক্তপাত পর্যন্তও গড়ায়)

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ডাকাতি, রাহাজানি, সন্ত্রাস ও বিদ্রোহ বৃহত্তর অপরাধ

📄 ডাকাতি, রাহাজানি, সন্ত্রাস ও বিদ্রোহ বৃহত্তর অপরাধ


বস্তুত ডাকাতি, রাহাজানি, সন্ত্রাস ও বিদ্রোহ বৃহত্তর অপরাধরূপে গণ্য হয়ে থাকে। এজন্য পবিত্র কুরআনে এসব অপরাধে লিপ্তদেরকে 'আল্লাহ ও রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত' ও 'দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টায় ব্যাপৃত' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সেই সাথে এর জন্য পরকালে কঠিন শাস্তির পাশাপাশি ইহকালেও এমন ভয়াবহ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অন্য কোনো অপরাধের জন্য করা হয়নি। আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا جَزَوا الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ طَ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ অর্থ: "যারা আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় বিপর্যয়করও ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে। অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে। অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।" (সূরা আল মায়দা: আয়াত ৩৩)
আর রসূলুল্লাহ সা. এ ধরনের অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করে, সে আমাদের কেউ নয়।" অর্থাৎ যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়, সে আমাদের আদর্শের উপর নেই। কেননা ইসলামের আদর্শ হলো, মুসলমানদেরকে সাহায্য করা ও তাদেরকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা, অস্ত্র ব্যবহার করে মুসলমানদের ক্ষতিসাধন ও ভীতসন্ত্রস্ত করা নয়।
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে আনুগত্য ত্যাগ করে এবং মুসলমানদের সমাজ থেকে পৃথক হয়ে যায়, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করবে।” অর্থাৎ কোনো দেশের জনগণ যে শাসকের আনুগত্য করতে সংঘবদ্ধ থাকে, সেই শাসকের আনুগত্য ত্যাগ করা জাহেলিয়াতের পর্যায়ভুক্ত।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ডাকাতি, সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তির শর্তাবলি

📄 ডাকাতি, সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তির শর্তাবলি


এই অপরাধের শাস্তির জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলি পূরণ হওয়া জরুরি: ১. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া চাই। ২. অপরাধীর নিকট অস্ত্র পাওয়া চাই। ৩. অপরাধের স্থান হওয়া চাই সমাজ থেকে দূরে। ৪. অপরাধীর আক্রমণগুলো প্রকাশ্যে সংঘটিত হওয়া চাই।
তবে বিশেষজ্ঞদের সবাই এসব শর্তে একমত নন। এ বিষয়ে বিশদ বিবরণ নিম্নে দেয়া হলো:
১. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া : ইসলামী ও যে কোনো আইন মানার বাধ্যবাধকতার জন্য এ শর্ত দুটি পূরণ অপরিহার্য। তাই এই অপরাধের শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তি বা হদ কার্যকর করার জন্যও এ দুটি জিনিসের উপস্থিতি শর্ত।
বস্তুত অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক ও পাগলকে যুদ্ধে লিপ্ত বলে গণ্য করা যাবেনা, চাই এ জাতীয় অপরাধে যত লোকই অংশগ্রহণ করে থাকুক না কেন। কেননা শরিয়তের বিধান অনুযায়ী শরিয়তের আইন মান্য করার দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা তাদের উপর এখনও আরোপিত হয়নি। এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ নেই। মতভেদ রয়েছে এ বিষয়ে যে, এসব অপরাধে যখন বালক ও পাগলরা অংশগ্রহণ করে, তখন তাদের সাথে সাথে এই অপরাধে জড়িত অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কদেরকেও শরিয়তের শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে কিনা?
হানাফিদের মতে, তাদেরকেও অব্যাহতি দেয়া হবে। কেননা একই অপরাধে জড়িত কতক লোককে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেয়া হলে সকলেই অব্যাহতি পাওয়ার অধিকারী। কেননা তারা সকলেই সামগ্রিকভাবে দায়ী। তবে শুধু ডাকাতি, রাহাজানি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের অপরাধের শাস্তিই রহিত হবে। এই সাথে সংঘটিত অন্যান্য অপরাধের শাস্তি বিধি অনুযায়ী দিতে হবে। যদি হত্যার অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তবে ব্যাপারটা নিহত ব্যক্তির অভিভাবকের এখতিয়ারে চলে যাবে। সে ক্ষমাও করতে পারে, খুনের বদলে খুনের দাবিও করতে পারে। এভাবে অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রেও ফায়সালা হবে। মালেকি ও যাহেরি মাযহাব অনুযায়ী বালক ও পাগলের শাস্তি রহিত হলেও অন্যদের শাস্তি রহিত হবেনা। কেননা এ শাস্তি আল্লাহর হক, যা থেকে কেউ রেহাই পেতে পারেনা। এ অপরাধের শাস্তির জন্য স্বাধীন হওয়া ও পুরুষ হওয়া শর্ত নয়। নারী ও গোলাম হওয়াতে ডাকাতির অপরাধের উপর কোনো প্রভাব পড়ে না। কেননা নারী ও গোলাম অস্ত্র বহন ও বিদ্রোহাত্মক তৎপরতায় সমভাবেই অংশগ্রহণ করতে পারে। তাই তারাও সমভাবে শাস্তি পাবে। (এক বর্ণনা অনুযায়ী আবু হানিফার মতে, অপরাধীর পুরুষ হওয়া শর্ত। অপর বর্ণনা অনুযায়ী শর্ত নয়।)
অস্ত্র বহনের শর্ত : সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহীদের শাস্তিযোগ্য হওয়ার জন্য তাদের কাছে অস্ত্র থাকা শর্ত। কেননা তারা অস্ত্রের শক্তির উপর নির্ভর করেই তাদের সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। তাদের কাছে অস্ত্র না থাকলে তারা সন্ত্রাসী নয় বলে বিবেচিত হবে। কেননা বিনা অস্ত্রে তারা কাউকে কোনো কাজে বাধ্য করতে বা বাধা পারেনা। লাঠি ও পাথর ব্যবহারকারীরা সন্ত্রাসী বলে বিবেচিত হবে কিনা, তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি, আবু সাওর, আবু ইউসুফ ও ইবনে হাযমের মতে, তারাও সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা অস্ত্রের ধরন ও আধিক্য বিবেচ্য বিষয় নয়, বিবেচ্য বিষয় হলো, তারা ডাকাতি, লুটপাট, ছিনতাই বা রাহাজানি করে কিনা। আবু হানিফার মতে, তারা সন্ত্রাসী নয়।
লোকালয়ের বাইরে সংঘটিত হওয়ার শর্ত : কোনো কোনো ফকিহর মতে, এ ধরনের সন্ত্রাসী ও সহিংস কর্মকাণ্ড মরুভূমিতে সংঘটিত হওয়া শর্ত। লোকালয়ে এ ধরনের অপরাধ করলে তারা সন্ত্রাসী ও ডাকাত হিসেবে গণ্য হবেনা। যেহেতু ও জাতীয় অপরাধের জন্য ডাকাতির শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে, অথচ ডাকাতি জনবসতিহীন এলাকায় সংঘটিত হয়ে থাকে এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে প্রায়ই আক্রান্তদের সাহায্যে লোকজন ছুটে আসে, তাই অপরাধীদের ঔদ্ধত্য ও দাপট বাধাগ্রস্ত হয়, সেহেতু এরা আত্মসাতকারী গণ্য হবে। আর আত্মসাতকারীর জন্য শরিয়তে কোনো হদ নির্ধারিত নেই। এটা আবু হানিফা, সাওরি, ইসহাক ও অধিকাংশ শিয়া ফকিহদের মত। হাম্বলিদের মধ্য হতে খারকীও এই মত পোষণ করেন। অপর একদল ফকিহর মতে এদের সম্পর্কে শরিয়তের বিধি লোকালয় ও অলোকালয়ে একই রকম। কেননা আয়াতে শুধু সন্ত্রাস বা ডাকাতিরই উল্লেখ করা হয়েছে, কোথায় সংঘটিত হয় তার উল্লেখ নেই। তাই সকল ডাকাত ও সন্ত্রাসী এর আওতাভুক্ত। তাছাড়া লোকালয়ে যখন ডাকাতি ও সন্ত্রাস সংঘটিত হয়, তখন তা অধিকতর ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। তাই লোকালয় সন্ত্রাসীদের শাস্তি পাওয়ার অধিকতর যোগ্য। আর যে সকল অপরাধী চক্র হত্যা, লুণ্ঠন ও ছিনতাই এর কাজে সংঘবদ্ধ, তারাও এদেরই অন্তর্ভুক্ত। এটা শাফেয়ি, হাম্বলি, আবু সাওর, আওযায়ি, লায়স, মালেকি ও যাহেরি মাযহাবের মত।
প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এই মতভেদ লোকালয়ের প্রকৃতির বিভিন্নতা কারণে হয়েছে। যিনি লোকালয়ের শর্ত আরোপ করেছেন তিনি সেখানকার অধিকাংশ সময়ে বিরাজমান অবস্থাটাই বিবেচনা করেছেন, অথবা তার আমলে তার শহরে বা জনপদে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে না দেখে সেই অবস্থার আলোকেই মত প্রদান করেছেন। আর যিনি এ শর্ত আরোপ করেননি, তিনি তার আমলে ও তার লোকালয়ে এর বিপরীত অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন। এজন্যই ইমাম শাফেয়ি বলেছেন, শাসক যখন দুর্বল হয় এবং শহরে বা লোকালয়ে সহিংস ঘটনা ঘটে তখন সেটা সন্ত্রাস ও ডাকাতি গণ্য হবে। অন্যথায় সেটা নিছক আত্মসাৎ বলে তিনি মনে করেন।
প্রকাশ্যে সংঘটিত হওয়ার শর্ত: ডাকাতি ও সন্ত্রাসের ঘটনা শাস্তিযোগ্য হওয়ার জন্য প্রকাশ্যে সম্পদ হরণ শর্ত। গোপনে কোনো কিছু নিলে সে চোর সাব্যস্ত হবে (চোরের শাস্তি ডাকাতের থেকে ভিন্ন)। আর যদি লুণ্ঠন করে নিয়ে পালিয়ে যায় তবে সে লুণ্ঠনকারী বা লুটেরা। তার কোনো অঙ্গ কাটা হবেনা। অনুরূপ, যখন কোনো একজন বা দুজন কাফেলার শেষপ্রান্তে থাকে এবং লুটেরারা তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তখন এই ছিনতাইকারীর কোনো অঙ্গ কর্তন করা হবেনা। কেননা তারা কোনো প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়না। আর যদি স্বল্পসংখ্যক লোকের উপর চড়াও হয় এবং তাদেরকে পর্যুদস্ত করে, তাহলে আক্রমণকারীরা ডাকাত ও দস্যু গণ্য হবে। এটা হানাফি শাফেয়ি ও হাম্বলিদের মত। মালেকি ও যাহেরিরা এ মতের বিরোধী। মালেকি মাযহাবের ইমাম ইবনুল আরবি বলেছেন: "আমাদের মত হলো, ডাকাতি ও সন্ত্রাস লোকালয়ে বা অলোকালয়ে সর্বত্রই ঘটে থাকে, যদিও একটির চেয়ে অপরটি অধিকতর বিভৎস হতে পারে। যে রকমই ঘটুক, তাকে ডাকাতি বা সন্ত্রাস নামেই আখ্যায়িত করা হয় এবং ডাকাতি ও সন্ত্রাসের চরিত্র তাতে বিদ্যমান থাকে। যদি কেউ লোকালয়ে লাঠি নিয়ে বের হয়, তবে তাকে তরবারি দিয়ে হত্যা করা হবে এবং তাকে অধিকতর কঠোর উপায়ে পাকড়াও করা হবে, সহজতর উপায়ে নয়। কেননা এটা গোপন লুণ্ঠনের ঘটনা। আর গোপন অপরাধ প্রকাশ্য অপরাধের চেয়ে খারাপ। এজন্য প্রকাশ্য হত্যা কিসাসের আওতাধীন এবং ক্ষমারও যোগ্য। কিন্তু গুপ্তহত্যা ক্ষমাযোগ্য নয়। এইধরনের ডাকাতি এবং ডাকাত হত্যার যোগ্য।"
তিনি আরো বলেন: "আমি বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ে আমার নিকট এমন একটি দল সম্পর্কে অভিযোগ দায়ের করা হয়, যারা সংঘবদ্ধভাবে ডাকাতিতে ও সন্ত্রাসে লিপ্ত ছিলো। তারা মহিলাকে ধরে নিয়ে যায় এবং বল প্রয়োগে ধর্ষণ করে। অতপর যখন ডাকাত দলটি ধরা পড়লো, তখন আমি আমার সহযোগী মুফতি ও বিচারকদের নিকট জিজ্ঞাসা করলাম এরা ডাকাতির দায়ে দোষী কিনা? তারা বললেন, ওরা ডাকাত নয়। কেননা ডাকাতি হয়ে থাকে দ্রব্যসামগ্রীর লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে, নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে নয়। আমি বললাম, কী সর্বনাশ! তোমরা কি জাননা, নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠন সম্পদ লুণ্ঠনের চেয়েও জঘন্য ব্যাপার? সম্পদ চলে যাক এবং চোখের সামনে তা লুণ্ঠিত হোক এটা মানুষ বরদাশত করতে পারে, কিন্তু বৌ ঝির ইজ্জত লুণ্ঠিত হোক-এটা কখনো বরদাশত করতে পারেনা। ডাকাতির জন্য আল্লাহ যে শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তার চেয়ে বড় কোনো শাস্তি যদি থাকতো, তবে তা নারীর ইজ্জত লুণ্ঠনকারীদের জন্যই নির্ধারিত হতো। বস্তুত মূর্খ কাযী ও মুফতিদের সাহচর্য বর্জন করা উচিত।”
কুরতুবি বলেছেন, কারো সম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে গোপনে বা প্রতারণার মাধ্যমে তাকে হত্যা করা ডাকাতির সমপর্যায়ের অপরাধ, চাই সে নিজের অস্ত্র প্রকাশ করুক বা না করুক। যেমন কোনো ব্যক্তি অপর একজনের বাড়িতে অতিথি হলো বা সফরসঙ্গী হলো, অতপর তাকে সুকৌশলে বিষ খাইয়ে হত্যা করলো। এ ধরনের ব্যক্তিকে কিসাস হিসেবে নয়, ডাকাতির শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে।
ইবনে হাযম বলেন: ডাকাত বা সন্ত্রাসী একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী। সে মানুষের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ও দেশে নৈরাজ্য ছড়ায়, চাই অস্ত্র দিয়ে হোক বা অস্ত্র ছাড়া রাতে হোক বা দিনে হোক, জনপদে হোক বা নির্জন প্রান্তরে হোক, রাজপ্রাসাদে হোক বা মসজিদে হোক, একাকী করুক বা নিজ বাহিনী সাথে নিয়ে করুক, নির্জন মরুভূমিতে করুক বা গ্রামে করুক, বাড়িতে করুক বা কোনো সুরক্ষিত দুর্গে করুক, বড় শহরে বা ছোট শহরে করুক। অনুরূপ যে ব্যক্তি পথচারীদের উপর আক্রমণ চালায় ও হত্যা, যখম, সম্পদ লুণ্ঠন, সম্ভ্রম লুণ্ঠন ইত্যাদির মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়ায়, সে সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত, চাই তাদের সংখ্যা কম হোক বা বেশি হোক।”
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ডাকাতি সন্ত্রাস ও বিদ্রোহ সম্পর্কে ইবনে হাযমের মতই সবচেয়ে প্রশস্ত ও ব্যাপক। মালেকি মাযহাবও অদ্রূপ। পথেঘাটে বা জনপদে যে কোনো পন্থায় ত্রাস সৃষ্টিকারী ডাকাত, সন্ত্রাসীর বিদ্রোহীর এবং ডাকাতির শাস্তিই তার সমুচিত শাস্তি।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ডাকাতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের শাস্তি

📄 ডাকাতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের শাস্তি


ডাকাতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ নাযিল করেছেন: إِنَّمَا جَزَؤُا الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ طَ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ অর্থ: "যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি হলো, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।" (বিপরীত দিক থেকে অর্থ ডান হাত ও বাম পা অথবা বাম হাত ও ডান পা) তবে তোমাদের আয়ত্তাধীন আসবার আগে যারা তওবা করবে তাদের জন্য নয়। সুতরাং জেনে রাখো আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (আল মায়েদা: আয়াত ৩৩-৩৪)
এ আয়াত কাফেরদের সম্পর্কে নয়, বরং মুসলমানদের মধ্য থেকে যারা ডাকাতি, নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস সৃষ্টির কাজে ব্যাপৃত তাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। কাফেররা যখন মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে মুসলমান হয়ে যাবে, তখন তাদের ইসলাম গ্রহণের বদৌলতে তাদের প্রাণ ও সম্পদ নিরাপদ হয়ে যাবে। এমনকি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তারা যদি এমন অপরাধ করে থাকে যা ইহকালেও শাস্তিযোগ্য, তাহলেও তারা ঐ শাস্তি থেকে অব্যাহতি পাবে। সূরা আনফালের ৩৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন:
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرُ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ "যারা কুফরী করে তাদের বলো : যদি তারা বিরত হয় তবে অতীতে যা কিছু হয়েছে, তা ক্ষমা করে দেয়া হবে।” এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সূরা মায়েদার ৩৩ ও ৩৪ নং আয়াত মুসলমানদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।” আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করার অর্থ হলো, গোলযোগ, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সন্ত্রাস করা এবং ইসলামের নীতিমালা ও নির্দেশাবলী লঙ্ঘন ও অমান্য করার মাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উড়ানো। কাজেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াকে আল্লাহ ও রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া আখ্যায়িত করে এ কথাই বুঝানো হয়েছে যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করারই শামিল। যেমন আল্লাহ বলেছেন : يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا "তারা আল্লাহ ও মুমিনদের ধোকা দেয়।” (আল বাকারা: আয়াত আয়াত ৯)
এখানে আল্লাহ ও মুমিনদেরকে ধোকা দেয়া যেমন প্রকৃত অর্থে নয় বরং রূপক অর্থে, তেমনি সূরা মায়েদায় আল্লাহ ও রসূলের সাথে তারা যুদ্ধ করে একথাও রূপক অর্থে, প্রকৃত অর্থে নয়। কুরতুবী বলেছেন, "তারা আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এ কথাটা রূপক। কেননা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করা যায়না এবং তাঁকে পরাস্ত করা যায়না। তিনি সকল গুণাবলির পূর্ণ ও সর্বোচ্চ মানের অধিকারী এবং তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই প্রতিপক্ষও কেউ নেই-একথা বিশ্বাস করা ওয়াজিব। এর অর্থ হলো, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রিয়জনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ দ্বারা তিনি মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়া যে কত বড় পাপ, সে কথাই বুঝিয়েছেন। এভাবে তিনি সূরা বাকারার ২৪৫ নং আয়াতে مَنْ ذَالَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا "যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে” দ্বারাও তাঁর বান্দাদেরকে ঋণ দেয়া বুঝিয়েছেন এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টির জন্যই এভাবে কথাটা বলেছেন। একটি সহীহ হাদিসে কুদসিতে আল্লাহর উক্তি "আমি তোমার কাছে খাবার রেখেছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে খাবার দাওনি" দ্বারাও আল্লাহর বান্দাদেরকে আহার করানোর গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে।
সূরা মায়েদার এ আয়াত দুটি নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে অধিকাংশ আলেম বলেন: একটি দল মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করলো। এরপর মদিনার আবহাওয়া তাদের শরীরের উপযোগী না হওয়ায় তারা মারাত্মক চর্মরোগে আক্রান্ত হলো। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে যাকাতের উটের পাল যেখানে রক্ষিত, সেখানে গিয়ে দুগ্ধেল উটের দুধ পান করার আদেশ দিলেন। আদেশ অনুযায়ী তারা কাজ করলো। তারপর যখন সুস্থ হলো, তখন উটের রাখালকে হত্যা করে চোখে উপড়ে রেখে ইসলাম ত্যাগ করে ও উটগুলো হাকিয়ে নিয়ে যায়।
এ ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে রসূলুল্লাহ সা. তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে তাদেরকে ধরে আনতে লোকজন পাঠালেন। তাদেরকে ধরে আনা হলে রসূলুল্লাহ সা. এর আদেশে তাদের হাত ও পা কেটে, চোখ উপড়ে, মদিনার বাইরে হাররা নামক কালো পাথরে পূর্ণ স্থানে ফেলে রাখা হলো। তারা ঐ অবস্থায় ক্ষুধায় ও পিপাসায় ছটফট করে মারা গেলো। এরা ডাকাতি, হত্যা, ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম ত্যাগ এবং আল্লাহ ও রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দায়ে দোষী ছিলো। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ সূরা মায়েদার উক্ত আয়াত দুটি নাযিল করলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00