📄 যাদুকর-এর শাস্তি
আবু হাতেম মিজিস্তানি বলেছেন, 'যিন্দিক' মূল ফারসি 'যিন্দা করো' শব্দ থেকে আরবিকৃত শঙ্কর শব্দ। এর অর্থ হলো, কালের চিরস্থায়িত্ব। সালাব বলেন, মূল আরবি ভাষায় যিন্দিক শব্দটি নেই। 'যিন্দাকি' অর্থ ভীষণ চতুর। নাস্তিকের প্রতিশব্দ হচ্ছে 'মুলহিদ' ও 'দাহরি'। দাহরি অর্থ 'দাহর' অর্থাৎ কালের চিরস্থায়িত্বের প্রবক্তা। জাওহারি বলেন, যিন্দিক একটি বিদেশী শব্দ, যা আরবিকৃত হয়েছে। হাফেয ইবনে হাজর বলেন, 'আল মিলাল ওয়ান নিহাল' গ্রন্থে বলা হয়েছে, যিন্দিক মতাদর্শের মূল তত্ত্ব হলো, প্রথমে দীসান ও পরে মানি ও মুযদুকের অনুসরণ। (তাদের মতাদর্শের মূল কথা হলো, আলো ও অন্ধকার দুটো আদি সত্তা। এ দুটি যখন একত্রিত হলো, তখন তা থেকে সারা বিশ্বের উৎপত্তি হলো। যারা দুষ্ট প্রকৃতির তারা অন্ধকার থেকে সৃষ্ট। আর যারা সৎ প্রকৃতির, তারা আলো থেকে সৃষ্ট। অন্ধকার থেকে আলোকে মিশ্রণমুক্ত করার জন্য প্রবৃত্তিকে পরাভূত করা জরুরি। পারস্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাহরাম প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মানীকে নিজের কাছে হাজির করলেন এবং তার কাছে ব্যক্ত করলেন যে, তিনি তার আদর্শ মেনে নিয়েছেন। অতপর তাকে ও তার শিষ্যদেরকে হত্যা করলেন। তাদের মধ্য থেকে যে কয়জন প্রাণে বেঁচে গেলো, তারা উল্লিখিত মুযদুকের অনুসারী। অতপর ইসলামের অভ্যুদয় ঘটে। উল্লিখিত আলো ও অন্ধকারের তত্ত্বের বিশ্বাসীদেরকে যিন্দিক বলা হয়। এই যিন্দিকদের একটি গোষ্ঠী মুসলমানদের হাতে নিহত হওয়ার ভয়ে নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়।
এই হচ্ছে যিন্দিকদের মূল তত্ত্ব। শাফেয়িদের একটি দল প্রকাশ্যে ইসলাম ও গোপনে কুফরী মত পোষণকারী প্রত্যেককে যিন্দিক বা নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করে থাকে।
ইমাম ননবী বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজেকে অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী বলে পরিচয় দেয়, তাকে যিন্দিক বলা হয়। 'আল মুসাওয়া' গ্রন্থে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি সত্য ধর্মের বিরোধী, তাকে স্বীকারও করেনা এবং গোপনে বা প্রকাশ্যে তাতে বিশ্বাসও করেনা, সে কাফের। আর যে ব্যক্তি মুখে ইসলামকে স্বীকার করে, কিন্তু মনে মনে অস্বীকার করে, সে মুনাফেক। আর যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে ও মনে মনে ইসলামকে স্বীকার করে, কিন্তু যেসব জিনিস ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেসব জিনিসের কোনো কোনোটির এমন ব্যাখ্যা দেয়, যা সাহাবি তাবেয়ী ও সমগ্র উম্মতের ব্যাখ্যার বিপরীত, সে যিন্দিক বা নাস্তিক। যেমন স্বীকার করে যে, কুরআন সত্য, কুরআনে যে জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা রয়েছে তাও সত্য কিন্তু জান্নাতের অর্থ হলো, প্রশংসনীয় গুণাবলীর কারণে অর্জিত আনন্দ ও তৃপ্তি। আর জাহান্নামের অর্থ হলো, নিন্দনীয় স্বভাবের দারুন অর্জিত ধিক্কার ও তিরস্কার। এছাড়া বাইরে কোনো বেহেশত ও দোযখ নেই। এ ধরনের লোকেরাই যিন্দিক বা নাস্তিক। আর রসূলুল্লাহ সা. যে বলেছেন, তাদের থেকে আল্লাহ আমাকে নিষেধ করেছেন, এটা মুনাফেকদের সম্পর্কে তার উক্তি, যিন্দিক বা নাস্তিকদের সম্পর্কে নয়। শরিয়ত যেমন মুরতাদের শাস্তি হত্যা নির্ধারণ করেছে। যাতে তা মুরতাদের জন্য হুঁশিয়ারি হিসেবে গণ্য হয় এবং তার অনুমোদিত আদর্শকে সংরক্ষণ করা যায়, তেমনি যিন্দিকত্বের জন্যও মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে, যাতে তা নাস্তিকতার বিরুদ্ধে সাবধান বাণীরূপে কাজ করে এবং ইসলামের অশুদ্ধ ও মনগড়া ব্যাখ্যাকে প্রতিরোধ করা যায়। ইসলামের ব্যাখ্যা দু'রকমের হতে পারে: (১) এমন ব্যাখ্যা, যা কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট উক্তি ও মুসলমানদের সর্বসম্মত মতের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, (২) এমন ব্যাখ্যা, যা কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট উক্তি ও মুসলমানদের সর্বসম্মত মতের পরিপন্থী। শেষোক্ত ব্যাখ্যাই যিন্দিক রূপধারণকারীদের মতাদর্শ। যারা রসূলুল্লাহর সা. শাফায়াত, কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ, কবরের আযাব, মুনকার ও নকীরের প্রশ্ন, হিসাব নিকাশ ও জাহান্নামের উপর দিয়ে পুল পার হওয়া এসব তত্ত্বকে অস্বীকার করে, সে নিঃসন্দেহে যিন্দিক ও নাস্তিক, চাই সে বলুক, আমি এসব হাদিসের বর্ণনাকারীকে বিশ্বাস করিনা, অথবা তাদেরকে বিশ্বাস করি, কিন্তু হাদিসের একটা স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা আছে, অতপর এমন মনগড়া ব্যাখ্যা হাজির করে, যা ইতিপূর্বে কেউ কখনো শোনেনি। অনুরূপ যে ব্যক্তি আবু বকর ও উমর রা. সম্পর্কে বলে যে, তারা জান্নাতবাসী নয়, অথচ তাদের জান্নাতবাসী হওয়ার সুসংবাদ সম্বলিত হাদিস এত বেশি সংখ্যক বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী সূত্রে প্রাপ্ত যে তা মিথ্যা হওয়া অসম্ভব। অথবা বলে যে, রসূলুল্লাহ সা. শেষ নবী সত্য, তবে এর অর্থ হলো, তারপরে আর কাউকে নবী নামে আখ্যায়িত করা যাবেনা। কিন্তু নবুয়্যতের মূল যে অর্থ আল্লাহর পক্ষ হতে মানবজাতির নিকট প্রেরিত হওয়া, তার আনুগত্য করা সকলের জন্য ফরয হওয়া, প্রেরিত ব্যক্তির নিষ্পাপ হওয়া ও ভুলত্রুটি থেকে সুরক্ষিত হওয়া, এ অর্থে অনেক ইমাম রয়েছে। এরূপ মত ও বিশ্বাস যারা পোষণ করে, তারাও যিন্দিক, নাস্তিক ও কাফের। এদের হত্যার ব্যাপারে হানাফি, শাফেয়ি ও পরবর্তীকালের আলেমদের অধিকাংশই একমত।
📄 যাদুকর কি হত্যাযোগ্য?
যে জাদুর ব্যাপারে আলেমগণ একমত : জাদুর কার্যকর প্রভাব রয়েছে। জাদু হারাম এবং জাদুকে হালাল বলে বিশ্বাসকারী কাফের। তবে জাদু কোনো বাস্তব জিনিস, না কাল্পনিক এবং জাদু করা কুফরী কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এই মতভেদের সূত্র ধরে জাদুকর কাফের কিনা তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
আবু হানিফা ও মালেক বলেছেন, জাদু শেখা মাত্রই জাদুকর হত্যাযোগ্য হয়ে যায়। অতপর জাদু দ্বারা কাজ করলে তো সে হত্যাযোগ্য হবেই। তাকে তওবার আহ্বান জানানো শর্ত নয়। শাফেয়ি ও যাহেরি মাযহাবের মতে, যে কথা ও কাজ দ্বারা সে জাদু করে, তা যদি কুফরী কালাম ও কুফরী কাজ হয়, তাহলে জাদুকর মুরতাদ এবং তওবা না করলে তার উপর মুরতাদের যাবতীয় হুকুম কার্যকর হবে। আর তার কথা ও কাজ যদি কুফরী সূচক না হয়, তবে তাকে হত্যা করা হবেনা। কেননা সে কাফের নয়। সে শুধু গুনাহগার।
একথা সুবিদিত যে, জাদু একটা কবীরা গুনাহ। জাদুকরকে তার জাদুর জন্য হত্যা করা হবেনা। কেবল যখন সে জাদুকে হালাল বলে বিশ্বাস করবে, তখন তাকে হত্যা করা হবে। কেননা হারামকে হালাল গণ্য করার কারণে সে মুরতাদ বলে হত্যাযোগ্য হয়েছে, জাদুর কারণে নয়। রসূলুল্লাহ সা. যে সাতটি গুনাহকে ধ্বংসকারী মহাপাপ বলে আখ্যায়িত করেছেন, তার মধ্যে জাদু অন্যতম।*
যারা জাদুকরকে কাফের মনে করে ও তাকে হত্যাযোগ্য বলে, তাদের যুক্তিপ্রমাণ পর্যালোচনার পর ইবনে হাযম বলেন, বিশুদ্ধ মত এই যে, জাদু কুফরী নয়। আর কুফরী যখন নয়, তখন জাদুকরকে হত্যা করা বৈধ হতে পারেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. মুসলমান হওয়ার পর কাফের হওয়া, বিয়ে করার পর ব্যভিচার করা ও নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করা অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনার আলোকে জাদুকর কাফেরও নয়, হত্যাকারীও নয় এবং বিয়ে করার পর ব্যভিচারের দায়েও অভিযুক্ত নয় এবং কুরআন ও হাদিসের কোথাও তাকে হত্যা করার আদেশও দেয়া হয়নি যে, উক্ত তিনটি কারণের উপর এটিও সংযোজন করা হবে। যেমন রাষ্ট্রদ্রোহীকে সংযোজন করা হয়। কাজেই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, জাদুকরকে হত্যা করা অবৈধ। শিয়ারা অবশ্য জাদুকরকে মুরতাদ ও হত্যার যোগ্য মনে করে।
টিকা:
*. এখানে মনে রাখা দরকার, জাদু হলো সেই জিনিস যা মানুষের ক্ষতি সাধনের জন্যে বা কারো উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্যে বিশেষ ধরণের মন্ত্র তন্ত্র দ্বারা করা হয়। জাদু আর ম্যাজিক এক জিনিস নয়। ম্যাজিক হলো একটা কৌশল। জাদু নিষিদ্ধ, ম্যাজিক নয়। -সম্পাদক
📄 জ্যোতিষী ও গণক-এর শাস্তি
যে ব্যক্তি জিনদের মধ্য থেকে গোয়েন্দা লালন করে, যে তাকে সাধারণ মানুষের অজানা বিভিন্ন খবর জানায়, তাকে জ্যোতিষী বা কাহেন বলা হয়। আর যে ব্যক্তি আন্দায অনুমানের ভিত্তিতে বিভিন্ন খবর জানায় এবং গায়েব বা অদৃশ্য তথ্য জানে বলে দাবি করে, তাকে গণক বলা হয়। ইমাম আবু হানিফার মতে, গণক ও জ্যোতিষী উভয়ে হত্যারযোগ্য। কেননা উমর রা. বলেছেন, "প্রত্যেক জাদুকর ও জ্যোতিষীকে হত্যা কর।" অন্য এক বর্ণনা মতে উমর রা. বলেছেন, "এ দুজন তওবা করলে তাদেরকে হত্যা করোনা।" প্রাচীন হানাফি ফকিহদের মতে, গণক ও জ্যোতিষী যদি বিশ্বাস করে যে, শয়তানেরা তার জন্য যা চায় তাই করতে পারে। তবে তারা কাফের। আর যদি বিশ্বাস করে যে, এসব কল্পনা মাত্র, এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই, তাহলে কাফের নয়।