📄 মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা
ইসলাম একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এতে একদিকে যেমন ধর্মীয় বিধান ও রাষ্ট্রীয় বিধানের সমন্বয় ঘটেছে, তেমনি ইবাদত ও সমর পরিচালনার নীতিমালারও সমাবেশ ঘটেছে। এতে কুরআন ও তরবারির যেমন রয়েছে পাশাপাশি অবস্থান, তেমনি আধ্যাত্মিকতা ও বাস্তবতা এবং ইহকাল ও পরকালের মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র। এ জীবন বিধান যুক্তি ও প্রমাণভিত্তিক। এর আকিদা বিশ্বাসে ও আইন কানুনে এমন কিছু নেই, যা মানুষের জন্মগত স্বভাব প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক কিংবা যা তার বস্তুগত ও নৈতিক পূর্ণতা অর্জনে অন্তরায়। যে ব্যক্তি ইসলামকে নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করে, সে এর প্রকৃত পরিচয় জানে ও স্বাদ পায়। তাই সে যখন ইসলামকে গ্রহণ ও অনুধাবন করার পর তা আবার ত্যাগ করে, সে আসলে সত্য ও যুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, দলিল ও প্রমাণকে অস্বীকার করে এবং সুস্থ বিবেক ও নির্মল স্বভাব প্রকৃতির আওতা বহির্ভূত হয়ে যায়। মানুষ যখন এই পর্যায়ে পৌঁছে, তখন সে অবনতি ও অধোপতনের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। এ ধরনের মানুষের জীবন রক্ষা করা ও তার বেঁচে থাকা নিশ্চিত করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা তার জীবনের কোনো উচ্চ লক্ষ্য নেই এবং কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই।
অপরদিকে ইসলাম একটা সর্বব্যাপী জীবনব্যবস্থা ও পূর্ণাঙ্গ মানবীয় আচরণ বিধির ধারক হিসেবে তার একটা নিরাপত্তা ব্যুহ ও সুরক্ষা প্রাচীর থাকা অপরিহার্য। কেননা প্রতিটি বিধান ও ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য তার রক্ষণাবেক্ষণের সুষ্ঠু ও অটুট পদ্ধতি অবলম্বন করা জরুরি। আর এক্ষেত্রে ঐ ব্যবস্থাকে তার অনুসারীদের মধ্য থেকে সৃষ্ট বিদ্রোহের কবল থেকে মুক্ত করা সবচেয়ে জরুরিও সবচেয়ে শক্তিশালী পন্থা। কেননা বিদ্রোহ তার অস্তিত্বের প্রতি হুমকি এবং তার পতনের অশনি সংকেত। ইসলাম গ্রহণ ও অনুসরণের পর তা ত্যাগ করা নিঃসন্দেহে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল। আর বিদ্রোহের শাস্তি সর্বকালেই সেই একই শাস্তি, যার উপর মানবরচিত আইনগুলোও একমত। পুঁজিবাদি রাষ্ট্রে হোক বা কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে হোক, কোনো মানুষ যখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তখন তার সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং ইসলাম যখন মুরতাদদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করে, তখন সে নিজের সাথেও যৌক্তিক আচরণ করে, অন্যান্য মতাদর্শের সাথেও সমন্বয় রক্ষা করে।
📄 মুরতাদের তওবা করানোর চেষ্টার আবশ্যকতা
প্রায় ক্ষেত্রেই নানা ধরনের সন্দেহ সংশয় থেকে উদ্ভূত কুপ্ররোচনাই ঈমানের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং পরিণামে ইসলাম ত্যাগে প্ররোচিত করে। এসব সন্দেহ সংশয় থেকে মুক্ত করার জন্য মুরতাদকে কিছু সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। তার মনে যাতে ঈমান পুনরুজ্জীবিত হয়, বিশ্বাস ও প্রত্যয় ফিরে আসে এবং সন্দেহ সংশয় দূরীভূত হয়। সেজন্য তার সামনে যুক্তিপ্রমাণ তুলে ধরা আবশ্যক। তাই মুরতাদকে তওবা করিয়ে ঈমানের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা ওয়াজিব। এমনকি সে যদি বারবার মুরতাদ হয়, তবুও এই চেষ্টা প্রতিবার চালানো জরুরি। তাকে কিছুটা অবকাশ দিতে হবে, যাতে সে আত্মসমালোচনা করার সময় পায়। যেনো তার অন্তরে উদ্ভূত কুপ্ররোচণা ও ভুল বুঝাবুঝি দূরীভূত হয় ও তার চিন্তাধারার পর্যালোচনা করতে পারে। এভাবে যদি তার সন্দেহ দূরীভূত হয় এবং সে তার বিভ্রান্তি থেকে ফিরে আসে, কলেমায়ে শাহাদাত ঘোষণা ইসলামে প্রত্যাবর্তন করে এবং ইসলাম বিরোধী যে ধর্মই গ্রহণ করে থাকুক, তা বর্জন করে, তাহলে তা তার তওবা হিসেবে গৃহীত হবে, নচেত তার উপর শাস্তি কার্যকর করা হবে। কোনো কোনো আলেম তিন দিন সময় নির্ধারণ করেছেন। অন্যেরা সময় নির্ধারণ থেকে বিরত থেকেছেন এবং বলেছেন, তাকে উপদেশ দান ও তার সাথে আলোচনা চালাতে থাকতে হবে। যখন দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হবে যে, তার ইসলামে ফিরে আসার আশা নেই, তখন তার উপর শাস্তি কার্যকর করা হবে। (এটা অধিকাংশ আলেমের মত। কিন্তু হাসান, তাউস ও যাহেরি মাযহাবের মতে, তাকে তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করতে হবে। মুয়ায বর্ণিত হাদিস এর প্রমাণ। ইবনে আব্বাসের মতে সে যদি জন্মগতভাবে মুসলমান থেকে থাকে, তবে তাকে তওবা করানো হবেনা। অন্যথায় করানো হবে।) যারা তিন দিন সময় দানের প্রবক্তা, তাদের দলীল হলো, এক ব্যক্তি সিরিয়া থেকে উমর রা.এর নিকট এলো। উমর রা. বললেন, দূরবর্তী অঞ্চল থেকে কোনো খবর এনেছো নাকি? সে বললো, হ্যাঁ। জনৈক মুসলমান কাফের হয়েছে উমর রা. বললেন, তোমরা তার সাথে কী আচরণ করেছ? সে বললো, আমরা তার কাছে গেলাম এবং তাকে হত্যা করলাম। তিনি বললেন, তোমরা তাকে একটা ঘরে তিনদিন আটক করে রাখলে না কেন? প্রতিদিন মাত্র একটা করে রুটি খাইয়ে তাকে তওবা করাতে চেষ্টা করলে না কেন? হয়তো সে তওবা করতো এবং আল্লাহর বিধানের দিকে ফিরে আসতো। হে আল্লাহ, আমি উপস্থিত ছিলামনা, আমি কোনো আদেশ দেইনি এবং যখন জানতে পেরেছি, তখন আমি এতে সম্মতি দেয়নি। হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট এই ব্যক্তির হত্যার দায় থেকে অব্যাহতি চাই। (শাফেয়ি কর্তৃক বর্ণিত)
আর যারা দ্বিতীয় মতের পক্ষপাতী, তারা আবু দাউদের এই বর্ণনা থেকে প্রমাণ দেন: মুয়ায আবু মূসা আশয়ারীর পর ইয়ামানে যান। সেখানে আবু মূসার নিকট এক ব্যক্তিকে বন্দী অবস্থায় পান। তিনি বললেন, এ কী ব্যাপার? আবু মূসা লেলেন, সে প্রথমে ইহুদি ছিলো। পরে মুসলমান হয়। তারপর আবার নিজ ধর্মে ফিরে যায় এবং ইহুদি হয়ে যায়। মুয়ায, ওকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি বসবোনা। এটা রসূলুল্লাহ সা. এর ফায়সালা।" তিনি তিনবার একথা বললেন। অতপর তাকে হত্যা করা হলো। আবু মূসা মুয়ায আসার আগে বিশ দিন ব্যাপী তাকে তওবা করানোর চেষ্টা করেছেন। আব্দুর রাজ্জাক থেকে বর্ণিত, তাকে দু'মাস ধরে ইসলাম গ্রহণ করানের চেষ্টা চলছিল। ইমাম শওকানি বলেন, যারা তওবা করানোর পক্ষপাতী, তারা কয়বার চেষ্টা করতে হবে, তা নিয়ে মতভেদে লিপ্ত হয়েছেন। কারো মতে, একবার যথেষ্ট। কারো মতে, তিনবার করাতে হবে। কারো মতে, তিন দিন ধরে চেষ্টা চালাতে হবে। ইবনুল বাত্তাল আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তাকে এক মাস ধরে তওবা করাতে হবে। ইবরাহিম নাখয়ির মতে, আজীবন তওবা করানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
📄 মুরতাদের আইনী বিধি বিধান
কোনো মুসলমান যখন মুরতাদ হয় এবং ইসলাম থেকে ফিরে যায়, তখন তার অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং একজন মুসলমান হিসেবে তার সাথে যে আচরণ করা হচ্ছিল, তাতেও পরিবর্তন আসে। তার সম্পর্কে শরিয়তের বেশ কিছু বিধি নির্দিষ্ট রয়েছে, যার সংক্ষিপ্তসার নিম্নে তুলে ধরছি:
দাম্পত্য সম্পর্ক: স্বামী বা স্ত্রী মুরতাদ হলে তার সাথে অপর জনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। কেননা স্বামী বা স্ত্রীর যে কোনো একজন মুরতাদ হলে অনিবার্যভাবে দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান ঘটে। এই সম্পর্কচ্ছেদ বিয়ে বাতিল হওয়ার সমার্থক। পরে যদি মুরতাদ তওবা করে ও পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে, তবে নতুন মহর ধার্য করে নতুন আকদ সম্পাদন করতে হবে, যদি সে দাম্পত্য জীবন পুনর্বহাল করতে চায়। (হানাফি মাযহাব মতে, স্বামীর মুরতাদ হওয়া প্রথম বায়েন তালাকের শামিল) সে যে ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, সেই ধর্মের অনুসারী স্ত্রীর উপস্থিতিতে অন্য স্ত্রী গ্রহণ তার জন্য বৈধ নয়। কেননা সে হত্যার যোগ্য একজন অপরাধী।
উত্তরাধিকার: মুরতাদের মুসলিম আত্মীয় স্বজনদের কেউ মারা গেলে সে তার উত্তরাধিকারী হয়না। কেননা মুরতাদ অমুসলিম। তাই সে তার মুসলমান আত্মীয়ের উত্তরাধিকারী হবেনা। সে ইসলামে প্রত্যাবর্তন না করেই মারা যায় বা নিহত হয়, তবে তার সম্পত্তি তার মুসলিম উত্তরাধিকারীদের নিকট হস্তান্তরিত হবে। কেননা মুরতাদ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই সে মৃত বলে বিবেচিত হয়।
একবার আলী রা. এর নিকট এক বৃদ্ধকে আনা হলো। সে ছিলো খৃস্টান। পরে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারপর আবার ইসলাম ত্যাগ করেছে। আলী রা. তাকে বললেন, তুমি বোধ হয় কোনো উত্তরাধিকার পাওয়ার আশায় মুরতাদ হয়েছো। সেটা পাওয়ার পর আবার ইসলামের দিকে ফিরবে?
বৃদ্ধ বললো: না।
আলী রা. বললেন, তাহলে সম্ভবত কোনো মহিলাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে। কিন্তু তার অভিভাবকরা সম্মত হয়নি। এখন তাকে বিয়ে করতে চাও। তারপর ইসলাম গ্রহণ করবে?
বৃদ্ধ বললো: না।
আলী রা. এবার বললেন, তাহলে তোমাকে আহ্বান জানাচ্ছি, ইসলামে ফিরে এসো। সে বললো: না, যতক্ষণ না ঈসা মসিহর সাক্ষাৎ পাই।
তখন আলী রা. তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। তাকে হত্যা করা হলো এবং তার মুসলমান সন্তানদের তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি দেয়া হলো।
ইবনে হাযম বলেছেন, ইবনে মাসউদ থেকেও এ ধরনের মত বর্ণিত হয়েছে। লায়েছ বিন সাদ ইসহাক বিন রাহওয়াই, আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ ও আহমদের মতও অভিন্ন।
মুরতাদ কারো অভিভাবক হতে পারে না: মুরতাদের কারো অভিভাবক হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি তার নিজের অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের বিয়েতেও সে অভিভাবক হতে পারবেনা। তাদের জন্য সে আকদ সম্পাদন করলে তা বাতিল গণ্য হবে। কেননা মুরতাদ হওয়ার কারণে তার অভিভাবকত্বের বিলুপ্তি ঘটেছে।
মুরতাদের সম্পত্তি: মুরতাদ হওয়ার কারণে তার সম্পত্তির উপর তার মালিকানা বিলুপ্ত হয়না। সে মূল কাফেরের মতো নিজের সম্পত্তির মালিকানা ভোগ করবে, নিজের ধন সম্পদকে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার ও ভোগ দখল করতে পারবে এবং তার উপর তার ক্ষমতা প্রয়োগ কার্যকর হবে। সে হত্যার যোগ্য হওয়ার কারণে তার সম্পত্তির ভোগ দখলের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেনা। কেননা শরিয়ত মুরতাদের জন্য হত্যা ব্যতীত আর কোনো হদ বা শাস্তি নির্ধারণ করেনি। রজম ও কিসাসের কারণেও কেউ সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগ দখল থেকে বঞ্চিত হয়না।
মুরতাদ যদি অমুসলিম শত্রু রাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়: মুরতাদ যদি অমুসলিম শত্রু রাষ্ট্রে গিয়ে আশ্রয় নেয়, তাহলেও তার সম্পত্তির উপর তার মালিকানা অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং তার সম্পত্তিকে একজন বিশ্বস্ত লোকের তত্ত্বাবধানে অর্পণ করা হবে।
📄 যাদুকর-এর শাস্তি
আবু হাতেম মিজিস্তানি বলেছেন, 'যিন্দিক' মূল ফারসি 'যিন্দা করো' শব্দ থেকে আরবিকৃত শঙ্কর শব্দ। এর অর্থ হলো, কালের চিরস্থায়িত্ব। সালাব বলেন, মূল আরবি ভাষায় যিন্দিক শব্দটি নেই। 'যিন্দাকি' অর্থ ভীষণ চতুর। নাস্তিকের প্রতিশব্দ হচ্ছে 'মুলহিদ' ও 'দাহরি'। দাহরি অর্থ 'দাহর' অর্থাৎ কালের চিরস্থায়িত্বের প্রবক্তা। জাওহারি বলেন, যিন্দিক একটি বিদেশী শব্দ, যা আরবিকৃত হয়েছে। হাফেয ইবনে হাজর বলেন, 'আল মিলাল ওয়ান নিহাল' গ্রন্থে বলা হয়েছে, যিন্দিক মতাদর্শের মূল তত্ত্ব হলো, প্রথমে দীসান ও পরে মানি ও মুযদুকের অনুসরণ। (তাদের মতাদর্শের মূল কথা হলো, আলো ও অন্ধকার দুটো আদি সত্তা। এ দুটি যখন একত্রিত হলো, তখন তা থেকে সারা বিশ্বের উৎপত্তি হলো। যারা দুষ্ট প্রকৃতির তারা অন্ধকার থেকে সৃষ্ট। আর যারা সৎ প্রকৃতির, তারা আলো থেকে সৃষ্ট। অন্ধকার থেকে আলোকে মিশ্রণমুক্ত করার জন্য প্রবৃত্তিকে পরাভূত করা জরুরি। পারস্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাহরাম প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মানীকে নিজের কাছে হাজির করলেন এবং তার কাছে ব্যক্ত করলেন যে, তিনি তার আদর্শ মেনে নিয়েছেন। অতপর তাকে ও তার শিষ্যদেরকে হত্যা করলেন। তাদের মধ্য থেকে যে কয়জন প্রাণে বেঁচে গেলো, তারা উল্লিখিত মুযদুকের অনুসারী। অতপর ইসলামের অভ্যুদয় ঘটে। উল্লিখিত আলো ও অন্ধকারের তত্ত্বের বিশ্বাসীদেরকে যিন্দিক বলা হয়। এই যিন্দিকদের একটি গোষ্ঠী মুসলমানদের হাতে নিহত হওয়ার ভয়ে নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়।
এই হচ্ছে যিন্দিকদের মূল তত্ত্ব। শাফেয়িদের একটি দল প্রকাশ্যে ইসলাম ও গোপনে কুফরী মত পোষণকারী প্রত্যেককে যিন্দিক বা নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করে থাকে।
ইমাম ননবী বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজেকে অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী বলে পরিচয় দেয়, তাকে যিন্দিক বলা হয়। 'আল মুসাওয়া' গ্রন্থে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি সত্য ধর্মের বিরোধী, তাকে স্বীকারও করেনা এবং গোপনে বা প্রকাশ্যে তাতে বিশ্বাসও করেনা, সে কাফের। আর যে ব্যক্তি মুখে ইসলামকে স্বীকার করে, কিন্তু মনে মনে অস্বীকার করে, সে মুনাফেক। আর যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে ও মনে মনে ইসলামকে স্বীকার করে, কিন্তু যেসব জিনিস ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেসব জিনিসের কোনো কোনোটির এমন ব্যাখ্যা দেয়, যা সাহাবি তাবেয়ী ও সমগ্র উম্মতের ব্যাখ্যার বিপরীত, সে যিন্দিক বা নাস্তিক। যেমন স্বীকার করে যে, কুরআন সত্য, কুরআনে যে জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা রয়েছে তাও সত্য কিন্তু জান্নাতের অর্থ হলো, প্রশংসনীয় গুণাবলীর কারণে অর্জিত আনন্দ ও তৃপ্তি। আর জাহান্নামের অর্থ হলো, নিন্দনীয় স্বভাবের দারুন অর্জিত ধিক্কার ও তিরস্কার। এছাড়া বাইরে কোনো বেহেশত ও দোযখ নেই। এ ধরনের লোকেরাই যিন্দিক বা নাস্তিক। আর রসূলুল্লাহ সা. যে বলেছেন, তাদের থেকে আল্লাহ আমাকে নিষেধ করেছেন, এটা মুনাফেকদের সম্পর্কে তার উক্তি, যিন্দিক বা নাস্তিকদের সম্পর্কে নয়। শরিয়ত যেমন মুরতাদের শাস্তি হত্যা নির্ধারণ করেছে। যাতে তা মুরতাদের জন্য হুঁশিয়ারি হিসেবে গণ্য হয় এবং তার অনুমোদিত আদর্শকে সংরক্ষণ করা যায়, তেমনি যিন্দিকত্বের জন্যও মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে, যাতে তা নাস্তিকতার বিরুদ্ধে সাবধান বাণীরূপে কাজ করে এবং ইসলামের অশুদ্ধ ও মনগড়া ব্যাখ্যাকে প্রতিরোধ করা যায়। ইসলামের ব্যাখ্যা দু'রকমের হতে পারে: (১) এমন ব্যাখ্যা, যা কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট উক্তি ও মুসলমানদের সর্বসম্মত মতের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, (২) এমন ব্যাখ্যা, যা কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট উক্তি ও মুসলমানদের সর্বসম্মত মতের পরিপন্থী। শেষোক্ত ব্যাখ্যাই যিন্দিক রূপধারণকারীদের মতাদর্শ। যারা রসূলুল্লাহর সা. শাফায়াত, কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ, কবরের আযাব, মুনকার ও নকীরের প্রশ্ন, হিসাব নিকাশ ও জাহান্নামের উপর দিয়ে পুল পার হওয়া এসব তত্ত্বকে অস্বীকার করে, সে নিঃসন্দেহে যিন্দিক ও নাস্তিক, চাই সে বলুক, আমি এসব হাদিসের বর্ণনাকারীকে বিশ্বাস করিনা, অথবা তাদেরকে বিশ্বাস করি, কিন্তু হাদিসের একটা স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা আছে, অতপর এমন মনগড়া ব্যাখ্যা হাজির করে, যা ইতিপূর্বে কেউ কখনো শোনেনি। অনুরূপ যে ব্যক্তি আবু বকর ও উমর রা. সম্পর্কে বলে যে, তারা জান্নাতবাসী নয়, অথচ তাদের জান্নাতবাসী হওয়ার সুসংবাদ সম্বলিত হাদিস এত বেশি সংখ্যক বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী সূত্রে প্রাপ্ত যে তা মিথ্যা হওয়া অসম্ভব। অথবা বলে যে, রসূলুল্লাহ সা. শেষ নবী সত্য, তবে এর অর্থ হলো, তারপরে আর কাউকে নবী নামে আখ্যায়িত করা যাবেনা। কিন্তু নবুয়্যতের মূল যে অর্থ আল্লাহর পক্ষ হতে মানবজাতির নিকট প্রেরিত হওয়া, তার আনুগত্য করা সকলের জন্য ফরয হওয়া, প্রেরিত ব্যক্তির নিষ্পাপ হওয়া ও ভুলত্রুটি থেকে সুরক্ষিত হওয়া, এ অর্থে অনেক ইমাম রয়েছে। এরূপ মত ও বিশ্বাস যারা পোষণ করে, তারাও যিন্দিক, নাস্তিক ও কাফের। এদের হত্যার ব্যাপারে হানাফি, শাফেয়ি ও পরবর্তীকালের আলেমদের অধিকাংশই একমত।