📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুরতাদের সংজ্ঞা

📄 মুরতাদের সংজ্ঞা


মুরতাদ শব্দটির মূল ধাতু হলো 'রিদ্দাহ' যার শাব্দিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা। আর মুরতাদ শব্দের শাব্দিক অর্থ প্রত্যাবর্তনকারী। কিন্তু এখানে বিশেষভাবে কুফরির দিকে প্রত্যাবর্তন বুঝানো হয়েছে। এর পারিভাষিক অর্থ হলো, সুস্থ মস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে ও কোনো প্রকার বল প্রয়োগ ব্যতিরেকে ইসলাম থেকে কুফরির দিকে প্রত্যাবর্তন করা, চাই সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। সুতরাং পাগল ও বালকের মুরতাদ হওয়া বিবেচ্য বিষয় নয়। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তিনজনকে দায়দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, বালক যতক্ষণ না যৌবনপ্রাপ্ত হয় এবং পাগল যতক্ষণ না সুস্থ মস্তিষ্ক হয়।" (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ) বল প্রয়োগে কাউকে কুফরিসূচক কথা বলতে বাধ্য করলে তা তাকে ইসলাম থেকে বাইরে নিক্ষেপ করেনা, যতক্ষণ তার মন ঈমানের উপর অবিচল থাকে। আম্মার বিন ইয়াসারকে কুফরিসূচক কথা বলতে বাধ্য করা হয়েছিল। ফলে তিনি কুফরিসূচক কথা বলেছিলেন। সেই প্রসংগে আল্লাহ নাযিল করলেন:
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبَهُ مُطْمَئِنُّ بِالْإِيْمَانِ وَلَكِنْ مِّنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيره অর্থ: কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরির জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আল্লাহর গযব আপতিত হবে এবং তার জন্য রয়েছে মহাশান্তি। তবে যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার চিত্ত ঈমানের উপর অবিচলিত, তার জন্য নয়।" (সূরা আন্-নাহল: আয়াত ১০৬)
ইবনে আব্বাস বলেন, মোশরেকরা আম্মারকে, তার পিতাকে, তার মাতা সুমাইয়াকে, সুহায়েবকে, বিলালকে ও খাব্বাবকে ধরে নিয়ে যায় এবং নির্যাতন করে। সুমাইয়াকে দুটি উটের মাঝখানে বেঁধে দেয় এবং তার লজ্জাস্থানে বর্শা ঢুকিয়ে দেয়া হয় এবং সুমাইয়াকে বলা হয়, "তুই তো ঐ লোকটার জন্য (ইয়াসারের জন্য) ইসলাম গ্রহণ করেছিস।" অতপর তাকে ও তার স্বামীকে হত্যা করা হয়। এরা দু'জনই ইসলামের প্রথম শহীদ।" আম্মার বাধ্য হয়ে মুখ দিয়ে তাদের ঈপ্সিত কুফরী কথা উচ্চারণ করেন ও হত্যা থেকে রেহাই পান। পরে রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট এ ঘটনা বিবৃত করলে তিনি আম্মারকে বলেন, তুমি তোমার মনের অবস্থা কেমন অনুভব করছো? আম্মার বললেন, "ঈমানের উপর অবিচল।" তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, "তারা যদি পুনরায় কুফরী কথা উচ্চারণ করতে বল প্রয়োগ করে, তবে তুমিও পুনরায় তা উচ্চারণ করবে।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কোনো কাফের তার ধর্মত্যাগ করে অন্য কুফরি ধর্মে প্রবেশ করলে সেও কি মুরতাদ গণ্য হবে?

📄 কোনো কাফের তার ধর্মত্যাগ করে অন্য কুফরি ধর্মে প্রবেশ করলে সেও কি মুরতাদ গণ্য হবে?


এ বিষয়ে আমাদের জবাব হলো, মুসলমান যখন ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়, তখনই সে মুরতাদ হয় এবং মুরতাদ সম্পর্কে আল্লাহর বিধান প্রযোজ্য হয়। প্রশ্ন জাগে যে, মুরতাদ হওয়া কি শুধু ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়া মুসলমানদের মধ্যেই সীমিত; নাকি কোনো অমুসলিম যখন তার ধর্ম ত্যাগ করে অন্য কোনো কুফরী ধর্মে প্রবেশ করে, তখন সেও মুরতাদ নামে আখ্যায়িত হবে? এর সুস্পষ্ট জবাব হলো, কোনো কাফের নিজের ধর্ম ত্যাগ করে অন্য একটা কুফরী ধর্ম গ্রহণ করলে তাকে তার পরিবর্তিত ধর্মে বহাল থাকতে দেয়া হবে এবং এ ব্যাপারে তার উপর কোনো বাধা আরোপ করা হবেনা। কেননা সে একটা বাতিল ধর্ম থেকে অন্য এমন একটা ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, যা বাতিল হওয়ার দিক দিয়ে তার আগেকার ধর্মের সাথেই সাদৃশ্যপূর্ণ। আর ইসলামের দৃষ্টিতে সকল কুফরী ধর্ম একই ধর্ম। পক্ষান্তরে কেউ যখন ইসলাম থেকে অন্য কোনো ধর্মে ধর্মান্তরিত হয় (নাউজুবিল্লাহ!) তখন সে হেদায়াত ও সত্য ধর্ম থেকে গোমরাহি ও কুফরির ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এই মতটি ইমাম মালেক ও আবু হানিফার। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يَقْبَلَ مِنْهُ : ج "কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবেনা। (সূরা আলে-ইমরান: আয়াত ৮৫)
তাবরানি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে তার ধর্শকে ইসলামের বিরুদ্ধে নিলো, তাকে হত্যা করো।"
এ ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ির দুটি মত পাওয়া যায় : একটি হলো ধর্মান্তরিত ব্যক্তি ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে থাকলে তা গ্রহণ করা হবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। ইমাম আহমদের দু'টি মতের একটি এর অনুরূপ। অপরটি হলো, সে যদি তার পূর্বের ধর্মের সমমানের বা তার চেয়ে উচ্চতর ধর্মে ধর্মান্তরিত হয় তাহলে তা মেনে নেয়া হবে, আর যদি তার চেয়ে নিকৃষ্টতর ধর্মে দীক্ষিত হয়, তাহলে তা মেনে নেয়া হবেনা। যেমন কোনো ইহুদি যদি খৃস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়, তাহলে তা মেনে নেয়া হবে। কারণ এই উভয় ধর্মই ঐশী ধর্ম হওয়ার দিক দিয়ে সমান ও সমমান সম্পন্ন। উভয় ধর্মই বিকৃত হয়েছে এবং ইসলাম উভয় ধর্মকেই রহিত ও বাতিল করেছে। অনুরূপ কোনো অগ্নি উপাসক যদি ইহুদি বা খৃস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়, তাহলে তাও মেনে নেয়া হবে। কেননা সে উচ্চতর ধর্মে (অর্থাৎ শেরক থেকে ঐশী ধর্মে) ধর্মান্তরিত হয়েছে। যেহেতু সমমানের ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার অনুমতি আছে, তাই উচ্চতর ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া আরো ভালো কাজ হিসেবে সমাদৃত হওয়া উচিত।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পাপে লিপ্ত হওয়ার দরুন কোনো মুসলমানকে কাফের বলা যাবে না

📄 পাপে লিপ্ত হওয়ার দরুন কোনো মুসলমানকে কাফের বলা যাবে না


ইসলামের দুটি অংশ: আকিদা ও শরিয়ত। আকিদার অন্তর্ভুক্ত হলো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, নবুয়্যতের প্রতি বিশ্বাস, আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস। শariয়ত ছয়টি বিষয় নিয়ে গঠিত:
১. ইবাদত, যথা- নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি। ২. আদব ও আখলাক: যথা- সত্যবাদিতা, ওয়াদা পালন, আমানতদারি ইত্যাদি। ৩. মুয়ামালাত: যথা- ক্রয় বিক্রয়, ও লেনদেন পারিবারিক সম্পর্ক সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকাণ্ড। ৪. পারিবারিক সম্পর্ক: যথা- বিয়ে, তালাক ইত্যাদি। ৫. দণ্ডবিধি: যথা- হুদুদ ও কিসাস। ৬. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: যথা বিভিন্ন রকমের চুক্তি ও সন্ধি ইত্যাদি।
এভাবে আমরা দেখতে পাই, ইসলাম একটা সঠিক জীবন ব্যবস্থা, যার আওতায় রয়েছে জীবনের সকল দিক ও বিভাগের যাবতীয় বিধি ব্যবস্থা। ইসলাম দ্বারা সাধারণত এটাই বুঝা হয়। কুরআন ও সুন্নাহ থেকেও এটাই জানা যায়। অনুরূপ মুসলমানরা ইসলামের শুরু থেকেই এটা বুঝে আসছে এবং নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে বাস্তবায়িত করে আসছে।
তবে মানুষের মধ্যে সবার মেধা, ক্ষমতা, দৃঢ়তা ও সচেতনতা সমান নয়। কেউবা প্রখর মেধাবী কেউবা স্বল্প মেধাবী, কেউবা প্রবল কর্মক্ষমতার অধিকারী কেউবা স্বল্প কর্মক্ষমতার অধিকারী, কেউবা কর্ম তৎপর কেউবা কর্মহীন, কেউবা অধ্যবসায়ী কেউবা অলস ও কর্মবিমুখ। শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিক দিক দিয়ে প্রত্যেকের শক্তি ও সামর্থ্যে পার্থক্য রয়েছে। আর এই পার্থক্যের কারণেই কেউবা পরিপূর্ণ ইসলামের নিকটবর্তী, আবার কেউবা তা থেকে কম বা বেশি দূরে অবস্থিত। আর এই দূরত্বের হ্রাস বৃদ্ধি প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সার্বিক পরিস্থিতি ও পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আল্লাহ বলেন:
ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَبَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا ، فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ ، وَمِنْهُمْ مُقْتَصِلٌ ج وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْغَيْرَتِ بِإِذْنِ اللَّهِ .
অর্থ: অতপর আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে মনোনীত করেছি তাদেরকে কিতাবের অধিকারী করলাম। তবে তাদের মধ্য কেউবা নিজের প্রতি যালিম, কেউবা মধ্যপন্থী এবং কেউবা আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।" (সূরা ফাতির: ৩২)
তবে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম থেকে এই দূরত্ব দূরে অবস্থানকারীকে ইসলামের আওতা থেকে ততক্ষণ বাইরে নিক্ষেপ করেনা যতক্ষণ সে এই দীনের প্রতি অকুণ্ঠ ও অবিচল আনুগত্য পোষণ করে। সুতরাং যখন কোনো মুসলমানের মুখ দিয়ে এমন কোনো শব্দ উচ্চারিত হয়, যা কুফরির অর্থ ব্যক্ত করে, কিন্তু উচ্চারণকারী সেই অর্থটি ব্যক্ত করতে চায়নি, অথবা এমন কোনো কাজ তার দ্বারা সংঘটিত হয়, যা ব্যাহত তাকে কাফের বা অমুসলিম হিসেবে চিহ্নিত বা পরিচিত করে, অথচ এ কাজের কর্তা তা দ্বারা ইসলামকে ত্যাগ করতে ও কাফেরে পরিণত হতে চায়নি, তখন তাকে কাফের বলে রায় দেয়া যাবেনা। মুসলমান যতই পাপ কাজে লিপ্ত হোক ও অপরাধ সংঘটিত করুক, সে মুসলমানই থাকবে, তাকে মুরতাদ বলা যাবেনা। বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে: "রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আমাদের কিবলা অভিমুখী হয়, আমাদের মতো নামায পড়ে এবং আমাদের যবাই করা জন্তুর গোশত খায়, সে মুসলমান। সে অন্যান্য মুসলমানের সমান অধিকার ভোগ করবে এবং অন্যান্য মুসলমানের সমান দায়িত্ব বহন করবে।"
রসূলুল্লাহ সা. মুসলমানদেরকে সাবধান করে দিয়েছেন যেন কেউ কাউকে কাফের বলে অপবাদ না দেয়। কেননা এটা মারাত্মক অপরাধ। ইবনে উমর রা. থেকে মুসলিম বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যখন কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফের আখ্যায়িত করবে, তখন ঐ দু'জনের যে কোনো একজনের উপর অবশ্যই কুফরী আপতিত হবে।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুসলমান কখন মুরতাদ হয়?

📄 মুসলমান কখন মুরতাদ হয়?


কোনো মুসলমানকে ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের আওতা বহির্ভূত ও মুরতাদ বলে রায় দেয়া যাবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত তার হৃদয় কুফরীর জন্য উন্মুক্ত হয়ে না যায়, তার মনমস্তিষ্ক প্রশান্তি লাভ না করে এবং কার্যত কুফরিতে প্রবেশ না করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "যার হৃদয় কুফরির জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, তার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।” আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "উদ্দেশ্য দ্বারাই কাজের পরিচিতি। মানুষ মন দিয়ে যা স্থির করে, তাই পায়।" যেহেতু মানুষের মনে যা থাকে, তা গায়েবী বিষয় এবং আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তা জানেন, তাই তার মন যে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে, এমন অকাট্য প্রমাণ প্রকাশ পাওয়া অপরিহার্য, যার কোনো ব্যাখ্যার অবকাশ থাকবেনা। এমনকি ইমাম মালেক বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন কিছু বলে বা করে, যা নিরানব্বইটি ব্যাখ্যায় কুফরি সাব্যস্ত হয় এবং মাত্র একটি ব্যাখ্যায় ঈমান সাব্যস্ত হয়, তার ঐ কাজ বা কথাকে ঈমান সাব্যস্ত করা হবে।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00