📄 অপবাদ প্রাপ্ত ব্যক্তির মধ্যে যে শর্তাবলি থাকা জরুরি
যে ব্যক্তি অপবাদের শিকার, তার মধ্যে নিন্মোক্ত শর্তাবলি পূর্ণ হওয়া জরুরি: ১. সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া কেননা অপবাদ আরোপের 'হদ' এজন্য প্রবর্তিত হয়েছে যেন অপবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিসাধনপূর্বক কষ্ট দান ও উত্যক্ত করার কারণে অপবাদকারীকে ধিক্কার দেয়া যায় ও ভর্ৎসনা করা যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি সুস্থ মস্তিষ্ক নয়, অপবাদে তার কোনো ক্ষতি হয়না। তাই তার প্রতি অপবাদ আরোপকারীর উপর 'হদ' কার্যকর করা হবেনা।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া: একইভাবে অপবাদের শিকার ব্যক্তির প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত। সুতরাং অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক ছেলে ও মেয়ের উপর অপবাদ আরোপকারীর উপর 'হদ' জারি হবেনা। তবে যে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সাথে সহবাস করা সম্ভব, তাকে তার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে কেউ ব্যভিচারের অপবাদ দিলে অধিকাংশ আলেমের মতে এটা হদযোগ্য অপবাদ নয়। এটা ব্যভিচার নয়। কেননা এই মেয়ে ব্যভিচারের হদের যোগ্য নয়। তবে অপবাদদাতাকে তাযীর করা হবে। ইমাম মালেক বলেছেন: এ অপবাদ হদযোগ্য। ইবনুল আরাবি বলেছেন: বিষয়টি সন্দেহযুক্ত। তবে ইমাম মালেক অপবাদ প্রাপ্তের সম্ভ্রমকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর অন্যরা অপবাদদাতার পিঠ বাঁচানোর বিষয়টাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অপবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তির সম্ভ্রমকেই অগ্রাধিকার দেয়া উত্তম। কেননা অপবাদদাতা তার জিহ্বা দ্বারা গোপনীয়তা লংঘন করেছেন। তাই তার 'হদ' অবধারিত হয়েছে।
ইবনুল মুনযির বলেছেন: ইমাম আহমদ নয় বছর বয়সী মেয়ের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপকারীর উপর এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপকারীর উপর 'হদ' জারি করার পক্ষে। ইসহাক বলেছেন: যখন এমন কোনো কিশোরকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া হয়, যার সমান ছেলে সহবাস করতে সক্ষম এবং নয় বছরের বেশি বয়সী মেয়েকে যখন ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া হয়, তখন অপবাদ আরোপকারীর উপর হদ জারি করা হবে। ইবনুল মুনযির বলেছেন: অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বা মেয়ের উপর অপবাদ আরোপকারী হদযোগ্য নয়। কেননা এটা একটা মিথ্যাচার। তবে এটা কষ্টদায়ক হওয়ায় অপবাদদাতাকে তাযীর করা হবে।
৩. মুসলমান হওয়া: যাকে অপবাদ দেয়া হয় তার মুসলমান হওয়া শর্ত। সে যদি অমুসলমান হয়, তবে অধিকাংশ আলেমের মতে তার উপর 'হদ' কার্যকর করা হবেনা। আর যদি অমুসলমান ব্যক্তি অপবাদ আরোপকারী হয় এবং ইহুদী বা খৃষ্টান ব্যক্তি স্বাধীন মুসলমানদের উপর অপবাদ আরোপ করে, তবে তার উপর একজন মুসলমানের মতোই আশি বেত্রাঘাত কার্যকর করা হবে।
৪. স্বাধীন হওয়া: কোনো গোলামের বিরুদ্ধে স্বাধীন ব্যক্তি অপবাদ আরোপ করলে উক্ত গোলামের উপর হদ কার্যকর হবেনা, চাই ঐ গোলাম অপবাদ আরোপকারীর মালিকানাভুক্ত হোক বা অন্য কারো। কেননা স্বাধীন ব্যক্তির তুলনায় তার মর্যাদা ভিন্নতর। তবে স্বাধীন মানুষ কর্তৃক গোলামের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ হারাম। কেননা বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি তার গোলামের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করে, তবে সেই অপবাদ যদি সত্য না হয়, তাহলে কেয়ামতের দিন তার উপর 'হদ' কার্যকর করা হবে।
আলেমগণ বলেছেন: এই শাস্তিটা আখেরাতে কার্যকরী হওয়ার কারণ হলো, তখন মানুষের উপর মানুষের কোনো মালিকানা থাকবেনা, ছোট বড়, গোলাম ও স্বাধীন সব সমান হয়ে যাবে। সেখানে তাকওয়া ব্যতীত আর কোনো কারণে কেউ কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করবেনা। তাই সেদিন মযলুম যালেমের নিকট থেকে প্রতিশোধ নেবে, যদি না সে তাকে ক্ষমা করে দেয়। দুনিয়ায় স্বাধীনের কাছ থেকে গোলামের প্রতিশোধ নেয়ার ব্যবস্থা হয়নি এজন্য যে, তাতে স্বাধীন ও গোলামদের মধ্যকার সম্পর্ক বিকৃত হয়ে যাবে। স্বাধীনদের কোনো আলাদা মর্যাদা থাকবেনা, এবং গোলামদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবেনা। যে ব্যক্তি কোনো মানুষকে গোলাম ভেবে তার বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করলো এবং পরে ফাঁস হলো যে, সে স্বাধীন মানুষ, তার উপর 'হদ' আরোপ করা হবে। এটা ইবনুল মুনযিরের মত। হাসান বসরীর মতে, হদ আরোপ করা হবেনা। ইবনে হাযম অধিকাংশ আলেমের বিরোধিতা করে বলেছেন: গোলামের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপকারীর উপর হদ কার্যকর করা হবে। তার মতে, গোলাম ও স্বাধীনের মধ্যে এ ক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ নেই। তিনি বলেছেন: এ কথার কোনোই মূল্য নেই যে, গোলাম ও বাঁদীর কোনো মান মর্যাদা নেই। প্রকৃতপক্ষে মুমিন মাত্রই বিপুল মর্যাদার অধিকারী। একটা মূর্খ গোলামও অনেক সময় আল্লাহর দৃষ্টিতে কুরাইশী খলিফার চেয়ে উত্তম।” বস্তুত ইবনে হাযমের এই মতই যথার্থ ও ন্যায় সংগত যদি তা উপরোক্ত হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।
৫. সতিত্ব: এ দ্বারা ব্যভিচার থেকে মুক্ত থাকা বুঝায়। যার উপর অপবাদ আরোপিত হয়েছে, চাই অন্যান্য অপরাধ থেকে সে মুক্ত থাকুক বা না থাকুক, এমনকি কোনো ব্যক্তি যদি তার প্রথম যৌবনে ব্যভিচার করে থাকে, অত:পর সে তওবা করে ও পরিশুদ্ধ হয় এবং তার জীবন প্রলম্বিত হয়, অতপর কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করে, তবে সেই অপবাদ আরোপকারীর উপর হদ কার্যকর হবেনা। তবে এই অপবাদ তাযীরের যোগ্য। কেননা সে এমন একটা জিনিস প্রকাশ করেছে, যা গোপন করা ওয়াজিব।
📄 যে অপরাধের জন্য অপবাদ আরোপিত হয়েছে তার শর্তাবলি
যে অপরাধের জন্য অপবাদ আরোপিত হয়েছে, সে ব্যাপারে যে শর্তাবলি পূরণ হওয়া হদ কার্যকর হওয়ার জন্য জরুরি, তা হলো, ব্যভিচারের কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা চাই অথবা এমন ইংগিত করতে হবে, যার অভিব্যক্তি সুস্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে বলা বা লিখে জানানো সমান।
স্পষ্ট ভাষায় বলার উদাহরণ: যেমন বক্তা বললো: 'হে ব্যভিচারী।' অথবা এরূপ অর্থবোধক কোনো বক্তব্য। যেমন, তার সাথে বংশীয় সম্পর্ক অস্বীকার করা। আর ইশারা ইংগিতে অপবাদ আরোপের উদাহরণ হলো ঝগড়া বা তর্ক বিতর্কের সময় বলা: "আমিও ব্যভিচারী নই, আমার মাও ব্যভিচারিণী ছিলেননা।" ইশারা ইংগিতে অপবাদ আরোপ সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক বলেছেন: ইশারা ইংগিতের ভাষা যদি বোধগম্য হয়, তাহলে তা স্পষ্ট অপবাদ আরোপেরই পর্যায়ভুক্ত। কেননা প্রচলিত ব্যবহার পদ্ধতি ও পরিভাষার আলোকে কখনো কখনো ইশারা ইংগিত বাক্যের বিকল্প হয়ে থাকে, যদিও শব্দ সেখানে অন্য অর্থে ব্যবহৃত হয়। উমার রা. এ মতটি গ্রহণ করেছেন। ইমাম মালেক উমারা বিনতে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণনা করেছেন : দুই ব্যক্তি উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে পরস্পরে গালাগালি বিনিময় করেছিল। একজন অপর জনকে বললো: "আল্লাহর কসম, আমার বাবাও ব্যভিচারী নন, আমার মাও ব্যভিচারী নন।" উমর রা. এ ব্যাপারে সাহাবিদের পরামর্শ আহ্বান করলেন। একজন বললেন: সে তো নিজের বাবা ও মার প্রশংসা করেছে। অন্যেরা বললেন: সে তার বাবা মার অন্য রকম প্রশংসাও করতে পারতো। আমরা মনে করি, তার উপর হদ কার্যকর করা উচিত। উমর রা. তাকে আশিটি বেত্রাঘাত করে হদ কার্যকর করলে। পক্ষান্তরে ইবনে মাসউদ, আবু হানিফা, শাফেয়ি, সাওরি, ইবনে আবি লায়লা, ইবনে হাযম, যায়েদি শিয়া ও এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আহমদ বলেছেন: ইশারা ইংগিতে কোনো হদ হয়না। কেননা এতে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে। আর একাধিক অর্থ থাকলেই সন্দেহ সংশয়ের সৃষ্টি হয়, যা হদকে রহিত করে। তবে আবু হানিফা ও শাফেয়ি এরূপ ইংগিতে অপবাদ আরোপকারী বা কটাক্ষকারীকে তাযীর করা উচিত বলে রায় দিয়েছেন। অপরদিকে আর রওযাতুল নাদিয়া গ্রন্থে এ ব্যাপারে সঠিক পন্থা নির্দেশ করে বলেছেন: প্রকৃত ব্যাপার হলো, আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত সতী মহিলাদের প্রতি অপবাদ আরোপের তাৎপর্য এই যে, অপবাদ আরোপকারী এমন কথা উচ্চারণ করবে, যা আভিধানিক, পারিভাষিক অথবা শরয়ি অর্থ অনুযায়ী ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা বুঝায় এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকেও বুঝা যায় যে, বক্তা তার কথা দ্বারা ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা ছাড়া অন্য কিছু বুঝাতে চায়নি। তাছাড়া সে এর এমন কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও দেয়নি, যা দ্বারা, তার কথার অন্য অর্থ গ্রহণ করা যায়। এরূপ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অপবাদ আরোপের 'হদ' পাওয়া বক্তার জন্য অবধারিত হয়ে যাবে। অনুরূপ, সে যদি এমন কথা বলে, যা দ্বারা সচরাচর ব্যভিচার বুঝায় না অথবা কদাচিত বুঝায়, কিন্তু সে স্বীকার করে যে, সে ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করতেই চেয়েছে, তাহলে তার উপর অপবাদ আরোপ করার হদ কার্যকর করা অপরিহার্য হবে। পক্ষান্তরে সে যদি এমন শব্দ দ্বারা কটাক্ষ করে, যার অর্থ ব্যভিচার হওয়া সম্ভব, কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা পূর্বাপর কোনো কথা প্রমাণ করেনা যে, সে ব্যভিচারের অপবাদ করতে চেয়েছে, তাহলে তার উপর কোনো দায় দায়িত্ব বর্তাবেনা। কেননা নিছক সম্ভাব্যতা দ্বারা কাউকে অভিযুক্ত করার অবকাশ নেই।
📄 হদুল কাযাফ বা অপবাদের শাস্তি কিভাবে প্রমাণিত হয়
এই হদ দুই উপায়ে প্রমাণিত হয়: ১. অপবাদকারীর স্বীকারোক্তি দ্বারা, ২. দু'জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্য দ্বারা।
📄 অপবাদ আরোপকারীর ইহকালীন শাস্তি
অপবাদ আরোপকারী যা বলেছে, তার স্বপক্ষে সাক্ষ্য উপস্থিত করতে না পারলে তার জন্য দুটো শাস্তি অবধারিত হয়ে যাবে: এক, আশিটি বেত্রাঘাত; দুই: চিরতরে তার সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান এবং তাকে ফাসেক বলে আখ্যায়িত করা। কেননা সে আল্লাহ ও মানুষের নিকট অন্যায়পরায়ণ ও অবিশ্বস্ত হয়ে যায়। এই দুটো শাস্তিই সূরা নূরের ইতিপূর্বে উল্লিখিত ৫নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অপবাদ আরোপকারী তওবা করে শুধরে না গেলে তার এই শাস্তি সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে কোনোই মতভেদ নেই।
এই 'হদ' সম্পর্কে আরো দুইটি প্রশ্ন রয়েছে, যার জবাবে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন হলো: দাস দাসীর শাস্তি ও স্বাধীন মানুষের শাস্তি কি সমান? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো: অপবাদ আরোপকারী যখন তওবা করে, তখন তার বিশ্বস্ততা কি ফিরে আসবে এবং তার সাক্ষ্য কি গৃহীত হবে?
প্রথম প্রশ্নের জবাব এই যে, একজন দাস যখন একজন সৎ ও স্বাধীন ব্যক্তিকে ব্যভিচারের অপবাদ দেবে, তখন তার উপর নির্ঘাত হদ ওয়াজিব হবে। তবে সেই হদ স্বাধীন ব্যক্তির সমান, না অর্ধেক, সে ব্যাপারে হাদিস সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেনি। এজন্য ফকিহদের মতামত বিভিন্ন হয়েছে। অধিকাংশ ফকিহের মতে, দাসের শাস্তি হবে স্বাধীন মানুষের শাস্তির অর্ধেক অর্থাৎ চল্লিশটি বেত্রাঘাত। কেননা ব্যভিচারের শাস্তির মতো এই শাস্তি দানের বেলায় অর্ধেক হয়ে যায়। সূরা নিসার ৬৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন:
فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَتِ مِنَ الْعَذَابِ . "(দাসীরা) যদি ব্যভিচার করে, তবে তাদের শাস্তি স্বাধীন নারীদের অর্ধেক।”
ইমাম মালেক বলেছেন: ............ "আব্দুল্লাহ ইবনের আমের বলেছেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব, উসমান ইবনে আফফান ও অন্যান্য খলিফাদের যুগ পেয়েছি। তাদের কাউকে দেখিনি, কোনো গোলামকে অপবাদের শাস্তি চল্লিশ বেত্রাঘাতের বেশি দিয়েছেন। পক্ষান্তরে ইবনে মাসউদ, যুহরি, উমর ইবনে আব্দুল আযীয, কুবায়সা, আওযায়ি ও ইবনে হাযম বলেছেন: তাকে আশিটি বেত্রাঘাত করা হবে। কেননা এটা এমন একটি শাস্তি, যা মানুষের প্রাপ্য হিসেবে প্রবর্তিত হয়েছে। যার প্রতি অপবাদ আরোপিত হয়, এ অপরাধটা তার মান সম্ভ্রমের উপর আঘাত হানে। আর স্বাধীনতা ও দাসত্বের কারণে কখনো অপরাধের রকমফের হয়না।
ইবনুল মুনযির বলেছেন: মুসলিম বিশ্বের সকল অঞ্চলে প্রথমোক্ত মতটিই চালু আছে এবং আমিও তার পক্ষে। 'আল-মুসাওয়া' গ্রন্থে বলা হয়েছে, আলেমগণের নিকট এই মতোই গৃহীত। "আররওযাতুন নাদিয়া” গ্রন্থের লেখক দ্বিতীয় মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলেছেন: "আয়াতটি স্বাধীন ও গোলাম উভয়ের উপর পরিব্যপ্ত। তবে স্বাধীন ব্যক্তি কর্তৃক স্বাধীন ব্যক্তিকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া অপেক্ষা গোলাম কর্তৃক স্বাধীন ব্যক্তিকে অপবাদ দেয়া অনেক বেশি বিপদজনক। অপবাদের শাস্তির ব্যপারে কুরআনে ও হাদিসে কোথাও নেই যে, গোলামের ক্ষেত্রে তা অধিক হবে। সূরা নিসার ৬৫ নং আয়াতে যে অর্ধেক শাস্তির বিধান দেয়া হয়েছে, সেটা ব্যভিচারের শাস্তির সাথে সংশ্লিষ্ট। এর একটির সাথে অন্যটিকে জুড়ে দেয়া যুক্তিবিরোধী। বিশেষত: যখন এর একটি নির্ভেজাল আল্লাহর হকের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং অপরাধী (অপবাদের শাস্তি) বান্দার হকের সাথে জড়িত।
দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব হলো ফকিহগণ সর্বসম্মতভাবে বলেছেন: অপবাদ রটনাকারী তওবা না করা পর্যন্ত তার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। কেননা সে যে কাজ করেছে, তা তাকে ফাসেকে রূপান্তরিত করেছে। আর যে ব্যক্তি ফাসেক হয়, সে ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বাসযোগ্য থাকেনা। অথচ ন্যায়পরায়ণতা সাক্ষ্য গ্রহণের শর্ত। আর তওবা না করায় তার ফাসেকী অক্ষুণ্ণ থাকে। বেত্রাঘাতের শাস্তি যদিও তার গুনাহের কাফফারা হয় এবং আখেরাতের শাস্তি থেকে তাকে নিস্তার দেয়, কিন্তু এ দ্বারা তার ফাসেকী দূর হয়না, যা তার সাক্ষ্য অগ্রাহ্য হওয়ার কারণ। তবে সে যদি তওবা করে এবং তা পাক্কা তওবা হয়, তাহলে তার বিশ্বস্ততা ফিরবে কিনা এবং তার সাক্ষ্য গৃহীত হবে কিনা, সে সম্পর্কে ফকিহদের দু'রকমের মত পাওয়া যায়:
১. প্রথম মত হলো, খাঁটি তওবা করলে অপবাদের শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে। এটি ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমদ, লায়েস, আতা, সুফিয়ান বিন উয়াইনা, শা'বি, কাসেম, সালেম, ও যুহরির মত। উমর রা. অপবাদের জন্য শাস্তি দিয়েছেন এমন একজনকে বললেন: তুমি যদি তওবা করো, তবে তোমার সাক্ষ্য গ্রহণ করবো।
২. দ্বিতীয় মত হলো, তওবা করলেও তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবেনা। এ মতটি হানাফিদের, আওযায়ির, সাওরির, হাসানের। সাঈদ বিন মুসাইয়্যেবের, শুরাইহের ইবরাহিম নখয়ির ও সাদ্দাদ বিন জুবাইরের। এই মতভেদের ভিত্তি হলো। সূরা নূরের এই উক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ: "তাদের সাক্ষ্য কখনো গ্রহণ করোনা তারা ফাসেক। কিন্তু যারা তওবা করে...." শেষোক্ত ব্যতিক্রমী উক্তি "কিন্তু যারা তওবা করে..." এ দ্বারা সাক্ষ্য গ্রহণ ও ফাসেক হওয়া এই দুটিই যারা বুঝবে তারা বলেছেন, তওবার পরে তাদের সাক্ষ্য গৃহীত হবে। আর যারা এ দ্বারা শুধু ফasেক হওয়াকে বুঝিয়েছেন। তাদের মতে, সে যত তওবাই করুক, তার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। তওবার ফলে সে শুধু ফাসেকী থেকে মুক্ত হবে অর্থাৎ আখেরাতের আযাব থেকে রেহাই পাবে।