📄 হস্ত মৈথুন
পুরুষের হস্ত মৈথুন সচ্চরিত্র ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী। ফকীহগণ এর সম্পর্কে বিভিন্ন মত পোষণ করেন: কেউ বলেছেন: এটা হারাম। কারো মতে, অবস্থাভেদে হারাম এবং অবস্থাভেদে ওয়াজিব। কারো মতে, এটা মাকরূহ। যারা একে হারাম মনে করেন তারা হচ্ছেন মালেকি, শাফেয়ি ও যায়দি। এ ব্যাপারে তাদের প্রমাণ এই যে, আল্লাহ বিবাহিত স্ত্রী ও দাসী ব্যতীত আর কোথাও কাম চরিতার্থ করতে নিষেধ করেছেন এবং সর্বাবস্থায় লজ্জাস্থানকে হেফাযত করতে বলেছেন। এ দুটি ব্যতিক্রমী অবস্থার বাইরে কেউ যখন হস্ত মৈথুন করে, তখন সে আল্লাহর হালালের সীমা অতিক্রম করে হারাম কাজে লিপ্ত হয়। আল্লাহ সূরা মুমিনুনের ৫, ৬ ও ৭নং আয়াতে বলেন: وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرَ مَلُومِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعُدُونَ "যারা নিজেদের যৌন অংগকে সংযত রাখে, নিজেদের স্ত্রী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। এতে তারা নিন্দনীয় হবেনা। কেউ এদের ছাড়া অন্য কাউকে কামনা করলে তারা হবে সীমালঙ্ঘনকারী।"
যারা একে অবস্থাভেদে হারাম ও অবস্থাভেদে ওয়াজিব বলেছেন, তারা হচ্ছেন হানাফি। তারা বলেন: হস্ত মৈথুন না করলে যার ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে, তার জন্য হস্ত মৈথুন ওয়াজিব। কেননা দুটি ক্ষতিকর কাজের মধ্যে যেটি অপেক্ষাকৃত হালকা, তা করা বৈধ।” তারা আরো বলেছেন: কামোত্তেজনা সৃষ্টির জন্য এটা করা হারাম। তারা আরো বলেন: যখন কামোত্তেজনা অদম্য হয়ে ওঠে, তার কাছে স্ত্রী বা দাসী থাকেনা এবং শুধু উত্তেজনা প্রশমিত করার উদ্দেশ্যেই হস্ত মৈথুন করে, তখন এটা জায়েয। হাম্বলীদের মত হলো, কেবলমাত্র ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া অথবা স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার আশংকা রয়েছে, অথচ কাছে স্ত্রী বা দাসী নেই- এবং বিয়ে করারও সামর্থ্য নেই এরূপ অবস্থায় ব্যতিত এ কাজ হারাম। ইবনে হাযমের মতে, এটা মাকরূহ এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। কেননা বাম হাত দিয়ে পুরুষাংগ স্পর্শ করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। এটুকু যখন বৈধ, তখন এরপর বীর্যপাত ঘটানো হারাম হবেনা। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
وَقَدْ فَصْلَ اللَّهُ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ
"আল্লাহ তোমাদের উপর যা যা হারাম করেছেন, তা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন”। এ কাজটি এ ধরনের কাজসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়, যার হারাম হওয়ার কথা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এটা হালাল। কারণ আল্লাহ বলেছেন "পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” হস্ত মৈথুন মাকরূহ হওয়ার কারণ হলো, এটা কোনো মহৎ নৈতিক গুণ নয়। বর্ণিত আছে যে, প্রাচীন মনীষীদের কেউ কেউ একে বৈধ এবং অন্যরা মাকরূহ মনে করতেন। যারা মাকরূহ মনে করতেন তাদের মধ্যে ইবনে উমর ও আতা রয়েছেন। আর ইবনে আব্বাস, হাসান ও কতক শীর্ষস্থানীয় সাহাবি একে বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। হাসান বলেন: সাহাবিগণ যুদ্ধবিগ্রহ চলাকালে এটা করতেন। মুজাহিদ বলেছেন: অতীতের লোকেরা যুবকদেরকে হস্ত মৈথুন করার আদেশ দিতেন, যাতে তারা ব্যভিচার থেকে বিরত থাকে। এ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের উভয়ের জন্য একই বিধি প্রযোজ্য।
📄 নারীদের সমকাম
নারীদের সমকাম হারাম। এ ব্যাপারে সকল আলেম একমত। আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযি বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কোনো পুরুষ অন্য পুরুষের গোপন অংগের প্রতি এবং কোনো নারী অন্য নারীর গোপন অংগের প্রতি দৃষ্টি দেবেনা। কোনো পুরুষ অন্য পুরুষের সাথে একই কাপড়ের মধ্যে অবস্থান করবেনা এবং কোনো নারী অন্য নারীর সাথে একই কাপড়ের মধ্যে অবস্থান করবেনা।" নারীদের সমকাম সহবাস বটে। তবে এতে একের লিংগে অন্যের লিংগ প্রবেশ করেনা। তাই এতে 'হদ' (বেত্রাঘাত বা রজম) নেই, তবে 'তাযীর' অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত লঘু যে কোনো শাস্তি দিতে হবে, যেমন কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর সাথে যোনিতে পুরুষাংগ না ঢুকিয়েই ব্যভিচার করে, তাহলেও একইভাবে 'তাযীর' দেয়া হবে।
📄 পশুর সাথে ব্যভিচার
পশুর সাথে সহবাস হারাম হওয়ার ব্যাপারেও আলেমগণ একমত। তবে অপরাধীর শাস্তি নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। জাবের বিন যায়দ থেকে বর্ণিত: যে ব্যক্তি পশুর সাথে সহবাস করবে, তার উপর 'হদ' কার্যকর করা হবে। আলি রা. বলেছেন: সে বিবাহিত হলে তাকে রজম করা হবে। হাসান বলেছেন: এ কাজ ব্যভিচারের শামিল। আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ি, মুয়াইয়িদ বিল্লাহ, নাসের ও ইমাম ইয়াহিয়ার মতে, পশুর সাথে সহবাসের জন্য তাযীর করা যথেষ্ট এবং ওয়াজিব। কেননা এটা ব্যভিচার নয়। অন্য বর্ণনা অনুসারে ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: তাকে হত্যা করা হবে। কেননা আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : “যে ব্যক্তি কোনো পশুর সাথে সহবাস করবে, তাকে ও উক্ত পশুকে হত্যা করো।"
ইবনে আব্বাস থেকে ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : “যে ব্যক্তি কোনো মুহাররম (চির নিষিদ্ধ) নারীর সাথে ব্যভিচার করবে, তাকে হত্যা করো, যে ব্যক্তি কোনো পশুর সাথে সহবাস করবে, তাকে হত্যা করো।"
ইমাম শওকানি বলেছেন : “এ হাদিস দ্বারা পশুকে হত্যা করা উচিত এটা প্রমাণিত হয়। এর কারণ সম্পকে আবু দাউদ ও নাসায়ি বর্ণনা করেন : ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, পশুটার অপরাধ কী? তিনি বলেন : “আমার মনে হয়না, রসূলুল্লাহ সা. একথা বলেছেন। তবে এ পশুর গোশত খাওয়া যে মাকরূহ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা তার সাথে সেই জঘন্য কাজটি করা হয়েছে।”
আলী রা. ও ইমাম শাফেয়ির মতে, ধর্ষিত পশুর গোশত খাওয়া হারাম এবং তাকে যবাই করা হবে। কাসেমি, অন্য বর্ণনা মোতাবেক শাফেয়ি, আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ এ পশুর গোশত খাওয়া মাকরূহ তানযিহি বলেছেন। বাহরের লেখক বলেছেন : পশুটি যদি নিষিদ্ধও হয়ে থাকে, তবু তাকে হত্যা করে ফেলতে হবে যাতে তার পেটে কোনো বিকৃত শাবক না জন্মে। কেননা কথিত আছে, জনৈক রাখাল একটি পশুকে ধর্ষণ করার ফলে তার পেটে বিকৃত শাবক জন্মেছিল।
📄 ধর্ষণ বা বলাৎকার
যখন কোনো নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ তথা ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়, তখন সেই নারীর উপর কোনো 'হদ' কার্যকর করা হবেনা। কেননা আল্লাহ সূরা বাকারার ১৭৩ নং আয়াতে বলেন : “যে ব্যক্তি অনন্যোপায়, কিন্তু নাফরমান কিংবা সীমা লঙ্ঘনকারী নয়, তার কোনো পাপ পাপ নাই।” আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : “আমার উম্মতের উপর থেকে ভুলক্রমে, অনিচ্ছাকৃতভাবে ও বাধ্য হয়ে কৃত যাবতীয় কাজের দায় রহিত করা হয়েছে।” রসূলুল্লাহ সা.-এর আমলে জনৈক মহিলাকে ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়েছিল, তাই তিনি তার হদ রহিত করেছিলেন।
ব্যভিচারে বাধ্য করা দু'ভাবে হতে পারে : শারীরিকভাবে নারীর উপর চড়াও হয়ে জোরপূর্বক সংগম করা তথা ধর্ষণ করা, আর নারীকে ভয় দেখিয়ে তাকে সম্মত করে সংগম করা। এই দুটোই সমান এবং বলাৎকারের পর্যায়ে পড়ে। এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কোনোই মতভেদ নেই। মতভেদ হয়েছে শুধু ব্যভিচারে বাধ্যকৃত নারীকে মহর দেয়া লাগবে কিনা তাই নিয়ে। ইমাম মালেক ও শাফেয়ির মতে মহর দেয়া লাগবে। ইমাম মালেক মুয়াত্তায় বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ান (উমাইয়া শাসক) জনৈক ধর্ষিত মহিলাকে মহর দিতে ধর্ষণকারীকে আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা বলেছেন : ঐ মহিলা কোনো মহর পাবেনা। 'বিদায়াতুল মুজতাহিদ' গ্রন্থে বলা হয়েছে : মতভেদের মূল কারণ হলো, মহর কি শুধু যৌন সংগমের বিনিময়, না স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দান, এই বিষয় নিয়ে মতভেদ। যারা বলে, এটা শুধু যৌন সংগমের বিনিময়, তাদের দৃষ্টিতে মহর হালাল সঙ্গম ও হারাম সঙ্গম উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর যারা বলেন, এটা শুধু স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দান, যা আল্লাহ শুধু বিবাহিত দম্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট করেছেন, তাদের দৃষ্টিতে এটি ব্যভিচারীর উপর ওয়াজিব নয়। তবে এ বিষয়ে আবু হানিফার মতই সঠিক।