📄 সমকাম সম্পর্কে ফকিহদের মতামত
যদিও এই অপরাধের হারাম হওয়া ও এর হোতাদেরকে কঠোরভাবে দমন ও শাস্তি দানের অপরিহার্যতার পক্ষে আলেমদের ইজমা তথা ঐকমত্য রয়েছে, তথাপি এর জন্য নির্ধারিত শাস্তির আকার ও পরিমাণ নির্ণয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে মোটামুটি তিনটি মত লক্ষ্য করা যায়:
১. একটি মত হলো, সমকামিকে হত্যা করা।
২. অপর মতানুসারে সমকামির শাস্তি ব্যভিচারের মতো। অবিবাহিতকে বেত্রদণ্ড ও বিবাহিতকে রজম করা হবে।
৩. তৃতীয় মতে, সমকামিকে তাযীর বা ব্যভিচারের শাস্তির চেয়ে লঘুদণ্ড দেয়া হবে। প্রথম মত: এ মতটি সাহাবিগণের, নাসেরের, কাসেম বিন ইবরাহীমের ও ইমাম শাফেয়ির। তাঁরা বলেন: সমকামে জড়িত দু'জনেরই শাস্তি মৃত্যুদন্ড, চাই বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত হোক। এর স্বপক্ষে তারা নিম্নোক্ত প্রমাণগুলো উল্লেখ করেন: ১. নাসায়ী ব্যতীত অবশিষ্ট পাঁচটি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ, হাকেম ও বায়হাকি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তোমরা ভূতের জাতির অপকর্মে জড়িত দু'জনকেই হত্যা করবে।" ২. বায়হাকি বর্ণনা করেছেন, আলি রা. তার উপর রজম কার্যকর করেছেন। ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: এ দ্বারাই আমরা বিবাহিত অবিবাহিত নির্বিশেষে এই ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত উভয় বক্তির রজমের প্রমাণ পাই। ৩. বায়হাকি আবু বকর রা. থেকে বর্ণনা করেনে, জনৈক পুরুষের সমকাম সম্পর্কে তিনি রসূলুল্লাহ সা. এর সাহাবিদের মতামত জিজ্ঞাসা করলেন। সেদিন আলী রা. সবচেয়ে কঠোর মত ব্যক্ত করে বলেন: একজন নবীর উম্মত ব্যতীত আর কোনো উম্মত এই ঘৃণ্য অপরাধে লিপ্ত হয়নি। সেই উম্মতকে আল্লাহ কি শাস্তি দিয়েছিলেন, তাতো আপনাদের জানাই আছে। আমার মত হলো, এই ব্যক্তিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিন। আবু বকর রা. তৎক্ষণাত খালেদ বিন ওয়ালিদকে চিঠি লিখে আদেশ দিলেন, যেন লোকটিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন। ইমাম শওকানি বলেন: এসব হাদিস সম্মিলিতভাবে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। তবে কিভাবে এই অপরাধীর উপর এ শাস্তি কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে তারা ভিন্ন ভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। আবু বকর ও আলী রা. বলেন: তাকে প্রথমে তরবারি দিয়ে হত্যা করে তারপর আগুন দিয়ে পোড়ানো হবে। কারণ অপরাধটি অতীব গুরুতর। উমর ও উসমান রা. এর মতে, তার উপর একটা প্রাচীর কুলে দিয়ে পিষ্ট করা হবে। ইবনে আব্বাস বলেন: তাকে একটা উঁচু ভবন থেকে ফেলে দেয়া হবে। আর শা'বি, যুহরি, মালেক, আহমদ ও ইসহাকের মতে, তাকে রজম করা হবে। তিরমিযি মালেক, শাফেয়ি আহমদ ও ইসহাক থেকে উক্ত মত উদ্ধৃত করেছেন। নাসায়ী বলেছেন: ব্যভিচারীকে যদি দু'বার রজম করার সুযোগ থাকতো, তাহলে সমকামিকে রজম করা যেত। মুনযেরি বলেছেন: আবু বকর, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর ও হিশাম বিন আব্দুল মালেক সমকামিকে আগুনে পুড়িয়েছেন।
দ্বিতীয় মত: সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব, আতা বিন আবি রাবাহ, হাসান, কাতাদা, নাখায়ি, সাওরি, আওযায়ি, আবু তালেব, ইমাম ইয়াহিয়া ও শাফেয়ি বলেছেন, সমকামিকে ব্যভিচারীর মতই শাস্তি দেয়া হবে, অবিবাহিতকে বেত্রদণ্ড ও দেশান্তর, আর বিবাহিতকে রজম করা হবে। তাদের প্রমাণ নিম্নরূপ: ১. এটা এক ধরনের ব্যভিচার। কেননা এখানে একটা গোপন অঙ্গে আর এটি গোপন অঙ্গ ঢুকানো হয়। তাই সমকামের উভয় হোতা বিবাহিত ও অবিবাহিত ব্যভিচারী সংক্রান্ত প্রমাণাদির আওতাধীন। এর সমর্থন পাওয়া যায় রসূলুল্লাহ সা. এর এ হাদিস দ্বারা : "যখন এক পুরুষ অপর পুরুষের সাথে সঙ্গম করবে, তখন তারা উভয়ে ব্যভিচারী।"
২. যদি ধরেও নেয়া হয় যে, ব্যভিচারের শাস্তি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিস সমকামী দু'জনকে অন্তর্ভুক্ত করেনা, তবুও কেয়াস দ্বারা তারা ব্যভিচারীর পর্যায়ভুক্ত।
তৃতীয় মত: আবু হানিফা, আল মুয়াইয়াদ বিল্লাহ, আল মুরতাযা ও শাফেয়ি সমকামিকে তাযীর তথা ব্যভিচারের শাস্তির চেয়ে লঘুতর শাস্তি দেয়ার পক্ষপাতী। তাদের যুক্তি হলো, সমকাম আর ব্যভিচার এক জিনিস নয়। সুতরাং উভয়ের একই বিধি হতে পারেনা।
ইমাম শওকানি যারা হত্যার পক্ষে মত দিয়েছেন, তাদের মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং শেষোক্ত মতকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এটা হাদিসের পরিপন্থী। দ্বিতীয় মতটির পর্যালোচনা করে তিনি বলেছেন: ঢালাওভাবে উভয় সমকামিকে হত্যার পক্ষে যে হাদিস উল্লেখ করা হয়, তা শুধু সমকামির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ ব্যভিচারের শাস্তি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিস বিবাহিত ও অবিবাহিতের মধ্যে পার্থক্য করে। তাই ব্যভিচার সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিসের আওতায় সমকামকে আনা হলে সে ক্ষেত্রেও ঐ পার্থক্য ধর্তব্য হবে। কেয়াস করে সমকামকে এর আওতা বহির্ভূত করা যাবেনা। কেননা হাদিস বা কুরআনের সুস্পষ্ট বাণীর উপস্থিতিতে কেয়াসের অবকাশ থাকেনা।
📄 হস্ত মৈথুন
পুরুষের হস্ত মৈথুন সচ্চরিত্র ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী। ফকীহগণ এর সম্পর্কে বিভিন্ন মত পোষণ করেন: কেউ বলেছেন: এটা হারাম। কারো মতে, অবস্থাভেদে হারাম এবং অবস্থাভেদে ওয়াজিব। কারো মতে, এটা মাকরূহ। যারা একে হারাম মনে করেন তারা হচ্ছেন মালেকি, শাফেয়ি ও যায়দি। এ ব্যাপারে তাদের প্রমাণ এই যে, আল্লাহ বিবাহিত স্ত্রী ও দাসী ব্যতীত আর কোথাও কাম চরিতার্থ করতে নিষেধ করেছেন এবং সর্বাবস্থায় লজ্জাস্থানকে হেফাযত করতে বলেছেন। এ দুটি ব্যতিক্রমী অবস্থার বাইরে কেউ যখন হস্ত মৈথুন করে, তখন সে আল্লাহর হালালের সীমা অতিক্রম করে হারাম কাজে লিপ্ত হয়। আল্লাহ সূরা মুমিনুনের ৫, ৬ ও ৭নং আয়াতে বলেন: وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرَ مَلُومِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعُدُونَ "যারা নিজেদের যৌন অংগকে সংযত রাখে, নিজেদের স্ত্রী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। এতে তারা নিন্দনীয় হবেনা। কেউ এদের ছাড়া অন্য কাউকে কামনা করলে তারা হবে সীমালঙ্ঘনকারী।"
যারা একে অবস্থাভেদে হারাম ও অবস্থাভেদে ওয়াজিব বলেছেন, তারা হচ্ছেন হানাফি। তারা বলেন: হস্ত মৈথুন না করলে যার ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে, তার জন্য হস্ত মৈথুন ওয়াজিব। কেননা দুটি ক্ষতিকর কাজের মধ্যে যেটি অপেক্ষাকৃত হালকা, তা করা বৈধ।” তারা আরো বলেছেন: কামোত্তেজনা সৃষ্টির জন্য এটা করা হারাম। তারা আরো বলেন: যখন কামোত্তেজনা অদম্য হয়ে ওঠে, তার কাছে স্ত্রী বা দাসী থাকেনা এবং শুধু উত্তেজনা প্রশমিত করার উদ্দেশ্যেই হস্ত মৈথুন করে, তখন এটা জায়েয। হাম্বলীদের মত হলো, কেবলমাত্র ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া অথবা স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার আশংকা রয়েছে, অথচ কাছে স্ত্রী বা দাসী নেই- এবং বিয়ে করারও সামর্থ্য নেই এরূপ অবস্থায় ব্যতিত এ কাজ হারাম। ইবনে হাযমের মতে, এটা মাকরূহ এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। কেননা বাম হাত দিয়ে পুরুষাংগ স্পর্শ করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। এটুকু যখন বৈধ, তখন এরপর বীর্যপাত ঘটানো হারাম হবেনা। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
وَقَدْ فَصْلَ اللَّهُ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ
"আল্লাহ তোমাদের উপর যা যা হারাম করেছেন, তা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন”। এ কাজটি এ ধরনের কাজসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়, যার হারাম হওয়ার কথা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এটা হালাল। কারণ আল্লাহ বলেছেন "পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” হস্ত মৈথুন মাকরূহ হওয়ার কারণ হলো, এটা কোনো মহৎ নৈতিক গুণ নয়। বর্ণিত আছে যে, প্রাচীন মনীষীদের কেউ কেউ একে বৈধ এবং অন্যরা মাকরূহ মনে করতেন। যারা মাকরূহ মনে করতেন তাদের মধ্যে ইবনে উমর ও আতা রয়েছেন। আর ইবনে আব্বাস, হাসান ও কতক শীর্ষস্থানীয় সাহাবি একে বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। হাসান বলেন: সাহাবিগণ যুদ্ধবিগ্রহ চলাকালে এটা করতেন। মুজাহিদ বলেছেন: অতীতের লোকেরা যুবকদেরকে হস্ত মৈথুন করার আদেশ দিতেন, যাতে তারা ব্যভিচার থেকে বিরত থাকে। এ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের উভয়ের জন্য একই বিধি প্রযোজ্য।
📄 নারীদের সমকাম
নারীদের সমকাম হারাম। এ ব্যাপারে সকল আলেম একমত। আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযি বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কোনো পুরুষ অন্য পুরুষের গোপন অংগের প্রতি এবং কোনো নারী অন্য নারীর গোপন অংগের প্রতি দৃষ্টি দেবেনা। কোনো পুরুষ অন্য পুরুষের সাথে একই কাপড়ের মধ্যে অবস্থান করবেনা এবং কোনো নারী অন্য নারীর সাথে একই কাপড়ের মধ্যে অবস্থান করবেনা।" নারীদের সমকাম সহবাস বটে। তবে এতে একের লিংগে অন্যের লিংগ প্রবেশ করেনা। তাই এতে 'হদ' (বেত্রাঘাত বা রজম) নেই, তবে 'তাযীর' অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত লঘু যে কোনো শাস্তি দিতে হবে, যেমন কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর সাথে যোনিতে পুরুষাংগ না ঢুকিয়েই ব্যভিচার করে, তাহলেও একইভাবে 'তাযীর' দেয়া হবে।
📄 পশুর সাথে ব্যভিচার
পশুর সাথে সহবাস হারাম হওয়ার ব্যাপারেও আলেমগণ একমত। তবে অপরাধীর শাস্তি নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। জাবের বিন যায়দ থেকে বর্ণিত: যে ব্যক্তি পশুর সাথে সহবাস করবে, তার উপর 'হদ' কার্যকর করা হবে। আলি রা. বলেছেন: সে বিবাহিত হলে তাকে রজম করা হবে। হাসান বলেছেন: এ কাজ ব্যভিচারের শামিল। আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ি, মুয়াইয়িদ বিল্লাহ, নাসের ও ইমাম ইয়াহিয়ার মতে, পশুর সাথে সহবাসের জন্য তাযীর করা যথেষ্ট এবং ওয়াজিব। কেননা এটা ব্যভিচার নয়। অন্য বর্ণনা অনুসারে ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: তাকে হত্যা করা হবে। কেননা আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : “যে ব্যক্তি কোনো পশুর সাথে সহবাস করবে, তাকে ও উক্ত পশুকে হত্যা করো।"
ইবনে আব্বাস থেকে ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : “যে ব্যক্তি কোনো মুহাররম (চির নিষিদ্ধ) নারীর সাথে ব্যভিচার করবে, তাকে হত্যা করো, যে ব্যক্তি কোনো পশুর সাথে সহবাস করবে, তাকে হত্যা করো।"
ইমাম শওকানি বলেছেন : “এ হাদিস দ্বারা পশুকে হত্যা করা উচিত এটা প্রমাণিত হয়। এর কারণ সম্পকে আবু দাউদ ও নাসায়ি বর্ণনা করেন : ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, পশুটার অপরাধ কী? তিনি বলেন : “আমার মনে হয়না, রসূলুল্লাহ সা. একথা বলেছেন। তবে এ পশুর গোশত খাওয়া যে মাকরূহ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা তার সাথে সেই জঘন্য কাজটি করা হয়েছে।”
আলী রা. ও ইমাম শাফেয়ির মতে, ধর্ষিত পশুর গোশত খাওয়া হারাম এবং তাকে যবাই করা হবে। কাসেমি, অন্য বর্ণনা মোতাবেক শাফেয়ি, আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ এ পশুর গোশত খাওয়া মাকরূহ তানযিহি বলেছেন। বাহরের লেখক বলেছেন : পশুটি যদি নিষিদ্ধও হয়ে থাকে, তবু তাকে হত্যা করে ফেলতে হবে যাতে তার পেটে কোনো বিকৃত শাবক না জন্মে। কেননা কথিত আছে, জনৈক রাখাল একটি পশুকে ধর্ষণ করার ফলে তার পেটে বিকৃত শাবক জন্মেছিল।