📄 বেত্রাঘাতের ফলে অপরাধী মারা গেলে দিয়ত দিতে হবে কি
বেত্রাঘাত প্রাপ্ত অপরাধী (প্রহার সহ্য করতে না পেরে) মারা গেলে তার জন্য কোনো দিয়ত রক্তমূল্য দেয়া লাগবেনা। মুসলিমের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী বলেন: "আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত, যার উপর হদ ওয়াজিব হয়েছে, অতপর শাসক বা তার নিযুক্ত প্রতিনিধি তার উপর শরয়ি 'হদ' কার্যকর করার দরুন মারা গেলো, তার জন্য শাসক বা প্রতিনিধির উপর কোনো দিয়ত আরোপিত হবেনা। বাইতুল মাল থেকেও দিয়ত দেয়া লাগবেনা।
এ পর্যন্ত ব্যভিচারের বিধান আলোচিত হলো। আরো কয়েকটা অপরাধের বিষয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে। এবার সেগুলো নিয়ে আলোচনা করছি:
📄 পুরুষকে সমকাম বা পুং মৈথুন
পুরুষে পুরুষে সমকাম অতি জঘন্য অপরাধ। এটা এমন একটা অশ্লীল কাজ, যা শুধু চরিত্রই ধ্বংস করেনা, বরং স্বভাব প্রকৃতি, ধর্ম, দুনিয়া ও গোটা জীবনকেই ধ্বংস করে। আল্লাহ এর জন্য নিষ্ঠুরতম শাস্তি দিয়েছেন। দূত আ. এর জাতিকে গোটা দেশ ধ্বসিয়ে দিয়ে এবং তাদের উপর আকাশ থেকে কংকর জাতীয় পাথর বর্ষণ করে ধ্বংস করে দিয়ে তাদের এই নিকৃষ্ট নোংরা অপরাধের শাস্তি দিয়েছিলেন। আর এই ঘটনাকে পবিত্র কুরআনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাতে তা কেয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকে ও তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা হতে থাকে। সূরা আ'রাফের ৮০ থেকে ৮৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন: وَلُوْطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِمَا مِنْ أَحَدٍ مِّنَ الْعَلَمِينَ الْكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَمْوَةٌ مِّنْ دُونِ النِّسَاءِ مَا بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ وَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوهُمْ مِنْ قَرْيَتِكُمْ : إِنَّهُمْ أَنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ فَانْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْعَبِرِينَ وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا ۖ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ অর্থ: আমি দূতকে পাঠিয়েছিলাম, সে তার জাতিকে বলেছিল, 'তোমরা এমন কুকর্ম করছো, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষের নিকট গমন করো, তোমরা তো সীমালজ্জনকারী সম্প্রদায়। উত্তরে তার জাতির লোকেরা শুধু বললো: এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বহিষ্কৃত করো, এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়।' অতপর আমি তাকে ও তার স্ত্রী ব্যতীত পরিজনবর্গকে উদ্ধার করেছিলাম, তার স্ত্রী ছিলো পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল তা লক্ষ্য করো।"
সূরা হূদের ৭৭ থেকে ৮২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন: وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوْطًا سِيَّ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالَ هَذَا يَوْمٌ عَصِيْبٌ وَجَاءَهُ قَوْمَهُ يُهْرَعُوْنَ إِلَيْهِ ، وَمِنْ قَبْلُ كَانُوا يَعْمَلُونَ السَّيِّاتِ طَ قَالَ يُقَوْمِ هَؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ فِي ضَيْفِي طَ أَلَيْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَّشِيدٌ طَ قَالُوا لَقَدْ عَلِمْتَ مَا لَنَا فِي بَنْتِكَ مِنْ حَقَّ : وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَا تُرِيدُهُ قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةٌ أَوْ أُوِى إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٌ طَ قَالُوا يَلُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ يُصِلُوا إِلَيْكَ فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِّنَ اللَّيْلِ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ إِلَّا امْرَأَتَكَ وَ إِنَّهُ مُصِيْبُهَا مَا أَصَابَهُمْ ، إِنَّ مَوْعِدَهُمُ الصُّبْحُ ، أَلَيْسَ الصُّبْحُ بِقَرِيبٍ فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِنْ سَعِيلٍ مَنْضُودٍ مُسَوَّمَةٌ عِنْدَ رَبِّكَ طَ وَمَا هِيَ مِنَ الظَّلِمِينَ بِبَعِيدِ অর্থ: যখন আমার প্রেরিত ফিরিশতাগণ দূতের নিকট এলো যখন তাদের আগমনে সে বিষণ্ণ হলো এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করলো। তারা বললো, এটা একটা নিদারুণ দিন। তার সম্প্রদায় তার নিকট উদভ্রান্ত হয়ে ছুটে এলো এবং তারা আগে থেকেই কুকর্মে লিপ্ত ছিলো। সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়, এরা আমার কন্যা, এদের বিয়ে করো তোমাদের জন্য এরা অধিকতর পবিত্র। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার মেহমানদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে আমাকে হেয় করোনা। তোমাদের মধ্যে কি একজনও ভালো মানুষ নেই? তারা বললো: তুমি তো জানো, তোমার কন্যাদেরকে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা কি চাই তা তো তুমি জানোই। সে বললো: 'তোমাদের উপর যদি আমার শক্তি থাকতো অথবা যদি আমি কোনো শক্তিশালী আশ্রয় নিতে পারতাম!' তারা বললো, হে দূত, আমরা তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত ফিরিশতা। ওরা কখনো তোমার নিকট পৌঁছুতে পারবেনা। সুতরাং তুমি রাতের কোনো এক সময়ে তোমার পরিবারবর্গসহ বেরিয়ে পড়ো এবং তোমাদের মধ্যে কেউ যেন পেছনের দিকে না তাকায় তোমার স্ত্রী ব্যতীত। তাদের যা ঘটবে, তারও তাই ঘটবে। প্রভাত হচ্ছে তাদের জন্য নির্ধারিত সময়। প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়? অতপর যখন আমার আদেশ এলো তখন আমি গোটা জনপদকে উল্টিয়ে দিলাম এবং তাদের উপর ক্রমাগত পাথর কংকর বর্ষণ করলাম, যা তোমার প্রতিপালকের নিকট চিহ্নিত ছিলো। এটা যালিমদের থেকে দূরে নয়।"
রসূলুল্লাহ সা. সমকামীকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন এবং তাকে অভিশাপ দিয়েছেন। আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যখন তোমরা কাউকে লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের কুকর্মে লিপ্ত পাবে, তখন যে ব্যক্তি একাজ করে এবং যার সাথে করে, উভয়কে হত্যা করবে।" নাসায়ীর ভাষা হলো: যে ব্যক্তি লুতের সম্প্রদায়ের কুকর্মে লিপ্ত হয় আল্লাহ তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করেন। যে ব্যক্তি লুতের সম্প্রদায়ের কুকর্মে লিপ্ত হয়, আল্লাহ তার উপর অভিসম্পাত করান। যে ব্যক্তি লুতের সম্প্রদায়ের কুকর্ম করে, আল্লাহ তার উপর অভিসম্পাত করান।"
ইমাম শওকানি বলেন: এই জঘন্য অপরাধ যারা করে, তারা এমন শাস্তির উপযুক্ত, যা সকলের জন্য দৃষ্টান্ত ও শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে, তাদেরকে এমন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা উচিত যা খোদাদ্রোহী ফাসেকদের কামাবেগকে দমন করবে। কুরআনের ভাষায় এটি এমন একটি অশ্লীল কাজ, যা দূতের জাতির পূর্বে পৃথিবীতে আর কেউ করেনি। তাই এদের কুকর্ম যে করে, তার শাস্তিও হওয়া উচিত দূতের জাতির শাস্তির মতোই কঠোর ও ভয়ঙ্কর। আল্লাহ তাদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিয়েছেন। সেই শাস্তিতে তাদের সকলেই সমূলে ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসলাম এই অপরাধের শাস্তিকে এতো কঠিন ও ভয়াবহ করেছে শুধু এজন্য যে, ব্যক্তি ও সমাজের উপর এর খারাপ প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত মারাত্মক এবং বিপুল। "ইসলাম ও চিকিৎসা বিজ্ঞান' (আল ইসলাম ওয়াতিব্বুত্তিব্বি) নামক গ্রন্থ থেকে এই ক্ষয়ক্ষতিগুলো নিম্নে উদ্ধৃত করছি:
নারীর প্রতি বিতৃষ্ণা : সমকাম পুরুষদেরকে নারীর প্রতি বিরাগী ও বিতৃষ্ণ করে তোলে, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে তা পুরুষকে স্ত্রী সহবাসেও অক্ষম করে দেয়। এভাবে বিয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য নস্যাৎ হয়ে যায়। সেটি হচ্ছে বংশবিস্তার। এ ধরনের কোনো পুরুষ যদি ঘটনাক্রমে বিয়ে করেও, তবে তার স্ত্রী হবে চরম হতভাগী। সুখ, শান্তি, প্রেম, ভালোবাসা, আদর সোহাগ যা দাম্পত্য জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ এবং স্বাভাবিক প্রাপ্তি, তা থেকে সে বঞ্চিত থাকতে বাধ্য। ফলে সে সীমাহীন মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে একটা অনিশ্চিত ও ঝুলন্ত জীবন কাটায় মাত্র। এ ধরনের পুরুষের স্ত্রী বিবাহিত স্ত্রীর মর্যাদা নিয়েও থাকেনা। আবার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর মতোও নয়।
স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি : এই বদভ্যাস অপরাধীর মনের উপর নিরন্তর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় এবং তার স্নায়ুর উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের ফলে সে এমন এক ধরনের বিরল মানসিক ব্যাধিতে ভোগে, যা তার অন্তরে এই ধারণা বদ্ধমূল করে দেয় যে, সে পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি হয়নি। ফলে সে তারই সমলিংগের প্রতি আকৃষ্ট হয়, নারীর প্রতি কোনো মোহ ও আকর্ষণ অনুভব করেনা। সমকামী শুধু যে বিরল ধরনের মানসিক ব্যাধিতেই আক্রান্ত হয় তা নয়, বরং সে নানা ধরনের স্নায়বিক রোগেও ভোগে, যা তাকে জীবনের স্বাভাবিক সুখ ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত করে এবং তার মানবিক ও পুরুষোচিত গুণাবলী কেড়ে নেয়। এই মানসিক ও স্নায়বিক রোগ থেকে এক সময়ে তার মধ্যে নানা রকমের দুরারোগ্য শারীরিক ব্যাধিও জন্ম নেয়।
মস্তিষ্কের ভারসাম্যহীনতা : এ ছাড়াও সমকাম মানুষের মস্তিষ্কের ভারসাম্যে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। তার চিন্তাকে বিক্ষিপ্ত, ধ্যান ধারণাকে স্থবির, বোধ শক্তিকে নির্জীব ও ইচ্ছা শক্তিকে দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এর ফলে মানব দেহের অভ্যন্তরের অনালগ্রন্থি, কিডনির উপরিভাগের গ্রন্থি ও অন্যান্য গ্রন্থিগুলোর স্বভাবসুলভ বর্জ্য নিঃসরণ তৎপরতা হ্রাস পায় এবং এ সবের কর্মক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়। একজন সমকামির সাথে স্নায়ু প্রদাহের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ফলে তার মধ্যে নির্বুদ্ধিতা, সিদ্ধান্তহীনতা, চিন্তার বিক্ষিপ্ততা এবং সঠিক উপলব্ধির অভাব দেখা দেয়।
বিষণ্ণতা : সমকাম বিষণ্ণতার প্রত্যক্ষ কারণ অথবা তার উৎপত্তির শক্তিশালী উপকরণ হয়ে থাকে। বিষণ্ণতা নামক ব্যাধিতে যারা আগে থেকেই আক্রান্ত, সমকাম তাদের এই রোগকে দ্বিগুণ করে দেয়।
সমকামির কামাবেগ অতৃপ্ত থাকে : সমকাম কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার একটা অস্বাভাবিক, বিরল ও অপর্যাপ্ত পদ্ধতি। এতে পুরুষের কামাবেগ অতৃপ্ত ও অপূর্ণ থাকে। কারণ এটা স্বাভাবিক মিলন নয়। তাই গোটা স্নায়ুতন্ত্রকে তৃপ্তি দিতে ব্যর্থ হয় মাংসপেশীর চাহিদাকে ভীষণভাবে পদদলিত করে এবং সামগ্রিকভাবে গোটা দেহের উপর খারাপ প্রভাব বিস্তার করে। নর নারীর স্বাভাবিক যৌন সংগমের দৈহিক প্রকৃতি ও সংগমকালে উভয়ের জননেন্দ্রিয় যে স্বভাবসুলভ ভূমিকা পালন করে, তার প্রতি যদি আমরা দৃষ্টি দেই, অতপর সমকামে যা হয়, তার সাথে যদি এর তুলনা করি, তবে উভয়ের মধ্যে ব্যাপক ও সুদূর প্রসারী পার্থক্য দেখতে পাই। উপরন্তু যে স্থানটিতে এ কাজটি করা হয় তা যে এ কাজের আদৌ উপযোগী নয়, তাতো বলাই বাহুল্য।
মলদ্বারের মাংসপেশী ঢিলা হয়ে যাওয়া ও ছিন্ন ভিন্ন হওয়া: অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে সমকামকে দেখলে দেখা যাবে ওটা মলদ্বারের ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া। তার মাংসপেশী ঢিলা হওয়া এবং মল ধরে রাখায় অক্ষমতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে এই পাপিষ্ঠদের খোঁজ নিলেই জানা যাবে, তারা ঘৃণিত বর্জ্য দ্বারা সব সময়ই নোংরা থাকে এবং তা তাদের মলদ্বার থেকে অসাড়ে বেরুতে থাকে।
নৈতিকতা ও সমকাম: সমকাম একটা মারাত্মক চারিত্রিক বিকৃতি ও মানসিক ব্যাধি। এই দোষে দুষ্ট প্রতিটি লোকই চরম দুশ্চরিত্র ও বিকৃত স্বভাব বিশিষ্ট হয়ে থাকে। ন্যায় অন্যায়ের বাছ বিচারের ক্ষমতাও তাদের লুপ্ত প্রায় হয়ে যায়। তাদের ইচ্ছা শক্তি দুর্বল থাকে। তাদের না থাকে কোনো নৈতিক চেতনা, যা তাদেরকে খারাপ কাজে ধিক্কার দেবে, না থাকে কোনো বিবেক, যা তাদেরকে তিরস্কার করে অন্যায় থেকে ফেরাবে। এমনকি শিশু কিশোরদের উপর চড়াও হওয়া থেকেও তাদের কেউ স্বেচ্ছায় বিরত হয়না এবং তাদের বিকৃত ও নিকৃষ্ট যৌন চাহিদা মেটাতে কঠোর ও সহিংস পন্থা অবলম্বনেও তারা কুণ্ঠিত হয়না।
স্বাস্থ্যের সাথে সমকামের সম্পর্ক: এ পর্যন্ত যা যা উল্লেখ করেছি, তা ছাড়াও সমকামিরা হৃদরোগেও আক্রান্ত হয় এবং তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে তারা প্রায়ই নানা ধরনের রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
জননেন্দ্রিয়গুলোর উপর এর প্রভাব: সমকাম পুরুষের দেহের প্রধান বীর্যপাত কেন্দ্রগুলোকে দুর্বল করে দেয়, এই কেন্দ্রে বীর্যের শক্তি তৈরির প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে দেয় এবং বীর্যের উপাদানসহ নির্মাণকে ব্যাহত করে। এর অল্প কিছুকাল পরে বংশ বৃদ্ধির ক্ষমতা লোপ পায় ও বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়। এভাবে সমকামিরা ক্রমশ নির্বংশ ও বিলীন হবার দিকে এগিয়ে যায়।
টাইফয়েড ও আমাশয়: সমকামের অনিবার্য পরিণামস্বরূপ যেসব সংক্রামক ব্যাধি সৃষ্টির কথা ইতিপূর্বে উল্লেখ করছি, তাছাড়া মলদ্বার থেকে নির্গত বর্জ্যজাত জীবাণুর মাধ্যমে টাইফয়েড জ্বর, আমাশয় ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধিরও বিস্তার ঘটে।
সমকামীদের অন্যান্য রোগসমূহ: এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ব্যভিচার দ্বারা যেসব রোগ বিস্তার লাভ করে, সেসব রোগ সমকামের ফলেও ছড়িয়ে পড়ে। এসব রোগ সবচেয়ে মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে খোদ সমকামিদেরকে, তাদের দেহকে করে জরাজীর্ণ, তারপর তাদের প্রাণ পর্যন্ত সংহার করে।
এ পর্যন্ত যেসব ক্ষয়ক্ষতির উল্লেখ করা হলো, তা থেকে আমরা স্পষ্টভাবে জানতে পারি ইসলামী আইনে সমকামকে হারাম ঘোষণা করার যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, জানতে পারি এই অপরাধের হোতাদের উপর চরম শাস্তি প্রয়োগের আদেশের যথার্থতা এবং তাদেরকে খতম করে বিশ্বকে তাদের অকল্যাণ ও অমঙ্গল থেকে মুক্ত করার বিধানের উপকারিতা।
📄 সমকাম সম্পর্কে ফকিহদের মতামত
যদিও এই অপরাধের হারাম হওয়া ও এর হোতাদেরকে কঠোরভাবে দমন ও শাস্তি দানের অপরিহার্যতার পক্ষে আলেমদের ইজমা তথা ঐকমত্য রয়েছে, তথাপি এর জন্য নির্ধারিত শাস্তির আকার ও পরিমাণ নির্ণয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে মোটামুটি তিনটি মত লক্ষ্য করা যায়:
১. একটি মত হলো, সমকামিকে হত্যা করা।
২. অপর মতানুসারে সমকামির শাস্তি ব্যভিচারের মতো। অবিবাহিতকে বেত্রদণ্ড ও বিবাহিতকে রজম করা হবে।
৩. তৃতীয় মতে, সমকামিকে তাযীর বা ব্যভিচারের শাস্তির চেয়ে লঘুদণ্ড দেয়া হবে। প্রথম মত: এ মতটি সাহাবিগণের, নাসেরের, কাসেম বিন ইবরাহীমের ও ইমাম শাফেয়ির। তাঁরা বলেন: সমকামে জড়িত দু'জনেরই শাস্তি মৃত্যুদন্ড, চাই বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত হোক। এর স্বপক্ষে তারা নিম্নোক্ত প্রমাণগুলো উল্লেখ করেন: ১. নাসায়ী ব্যতীত অবশিষ্ট পাঁচটি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ, হাকেম ও বায়হাকি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তোমরা ভূতের জাতির অপকর্মে জড়িত দু'জনকেই হত্যা করবে।" ২. বায়হাকি বর্ণনা করেছেন, আলি রা. তার উপর রজম কার্যকর করেছেন। ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: এ দ্বারাই আমরা বিবাহিত অবিবাহিত নির্বিশেষে এই ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত উভয় বক্তির রজমের প্রমাণ পাই। ৩. বায়হাকি আবু বকর রা. থেকে বর্ণনা করেনে, জনৈক পুরুষের সমকাম সম্পর্কে তিনি রসূলুল্লাহ সা. এর সাহাবিদের মতামত জিজ্ঞাসা করলেন। সেদিন আলী রা. সবচেয়ে কঠোর মত ব্যক্ত করে বলেন: একজন নবীর উম্মত ব্যতীত আর কোনো উম্মত এই ঘৃণ্য অপরাধে লিপ্ত হয়নি। সেই উম্মতকে আল্লাহ কি শাস্তি দিয়েছিলেন, তাতো আপনাদের জানাই আছে। আমার মত হলো, এই ব্যক্তিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিন। আবু বকর রা. তৎক্ষণাত খালেদ বিন ওয়ালিদকে চিঠি লিখে আদেশ দিলেন, যেন লোকটিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন। ইমাম শওকানি বলেন: এসব হাদিস সম্মিলিতভাবে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। তবে কিভাবে এই অপরাধীর উপর এ শাস্তি কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে তারা ভিন্ন ভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। আবু বকর ও আলী রা. বলেন: তাকে প্রথমে তরবারি দিয়ে হত্যা করে তারপর আগুন দিয়ে পোড়ানো হবে। কারণ অপরাধটি অতীব গুরুতর। উমর ও উসমান রা. এর মতে, তার উপর একটা প্রাচীর কুলে দিয়ে পিষ্ট করা হবে। ইবনে আব্বাস বলেন: তাকে একটা উঁচু ভবন থেকে ফেলে দেয়া হবে। আর শা'বি, যুহরি, মালেক, আহমদ ও ইসহাকের মতে, তাকে রজম করা হবে। তিরমিযি মালেক, শাফেয়ি আহমদ ও ইসহাক থেকে উক্ত মত উদ্ধৃত করেছেন। নাসায়ী বলেছেন: ব্যভিচারীকে যদি দু'বার রজম করার সুযোগ থাকতো, তাহলে সমকামিকে রজম করা যেত। মুনযেরি বলেছেন: আবু বকর, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর ও হিশাম বিন আব্দুল মালেক সমকামিকে আগুনে পুড়িয়েছেন।
দ্বিতীয় মত: সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব, আতা বিন আবি রাবাহ, হাসান, কাতাদা, নাখায়ি, সাওরি, আওযায়ি, আবু তালেব, ইমাম ইয়াহিয়া ও শাফেয়ি বলেছেন, সমকামিকে ব্যভিচারীর মতই শাস্তি দেয়া হবে, অবিবাহিতকে বেত্রদণ্ড ও দেশান্তর, আর বিবাহিতকে রজম করা হবে। তাদের প্রমাণ নিম্নরূপ: ১. এটা এক ধরনের ব্যভিচার। কেননা এখানে একটা গোপন অঙ্গে আর এটি গোপন অঙ্গ ঢুকানো হয়। তাই সমকামের উভয় হোতা বিবাহিত ও অবিবাহিত ব্যভিচারী সংক্রান্ত প্রমাণাদির আওতাধীন। এর সমর্থন পাওয়া যায় রসূলুল্লাহ সা. এর এ হাদিস দ্বারা : "যখন এক পুরুষ অপর পুরুষের সাথে সঙ্গম করবে, তখন তারা উভয়ে ব্যভিচারী।"
২. যদি ধরেও নেয়া হয় যে, ব্যভিচারের শাস্তি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিস সমকামী দু'জনকে অন্তর্ভুক্ত করেনা, তবুও কেয়াস দ্বারা তারা ব্যভিচারীর পর্যায়ভুক্ত।
তৃতীয় মত: আবু হানিফা, আল মুয়াইয়াদ বিল্লাহ, আল মুরতাযা ও শাফেয়ি সমকামিকে তাযীর তথা ব্যভিচারের শাস্তির চেয়ে লঘুতর শাস্তি দেয়ার পক্ষপাতী। তাদের যুক্তি হলো, সমকাম আর ব্যভিচার এক জিনিস নয়। সুতরাং উভয়ের একই বিধি হতে পারেনা।
ইমাম শওকানি যারা হত্যার পক্ষে মত দিয়েছেন, তাদের মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং শেষোক্ত মতকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এটা হাদিসের পরিপন্থী। দ্বিতীয় মতটির পর্যালোচনা করে তিনি বলেছেন: ঢালাওভাবে উভয় সমকামিকে হত্যার পক্ষে যে হাদিস উল্লেখ করা হয়, তা শুধু সমকামির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ ব্যভিচারের শাস্তি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিস বিবাহিত ও অবিবাহিতের মধ্যে পার্থক্য করে। তাই ব্যভিচার সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিসের আওতায় সমকামকে আনা হলে সে ক্ষেত্রেও ঐ পার্থক্য ধর্তব্য হবে। কেয়াস করে সমকামকে এর আওতা বহির্ভূত করা যাবেনা। কেননা হাদিস বা কুরআনের সুস্পষ্ট বাণীর উপস্থিতিতে কেয়াসের অবকাশ থাকেনা।
📄 হস্ত মৈথুন
পুরুষের হস্ত মৈথুন সচ্চরিত্র ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী। ফকীহগণ এর সম্পর্কে বিভিন্ন মত পোষণ করেন: কেউ বলেছেন: এটা হারাম। কারো মতে, অবস্থাভেদে হারাম এবং অবস্থাভেদে ওয়াজিব। কারো মতে, এটা মাকরূহ। যারা একে হারাম মনে করেন তারা হচ্ছেন মালেকি, শাফেয়ি ও যায়দি। এ ব্যাপারে তাদের প্রমাণ এই যে, আল্লাহ বিবাহিত স্ত্রী ও দাসী ব্যতীত আর কোথাও কাম চরিতার্থ করতে নিষেধ করেছেন এবং সর্বাবস্থায় লজ্জাস্থানকে হেফাযত করতে বলেছেন। এ দুটি ব্যতিক্রমী অবস্থার বাইরে কেউ যখন হস্ত মৈথুন করে, তখন সে আল্লাহর হালালের সীমা অতিক্রম করে হারাম কাজে লিপ্ত হয়। আল্লাহ সূরা মুমিনুনের ৫, ৬ ও ৭নং আয়াতে বলেন: وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرَ مَلُومِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعُدُونَ "যারা নিজেদের যৌন অংগকে সংযত রাখে, নিজেদের স্ত্রী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। এতে তারা নিন্দনীয় হবেনা। কেউ এদের ছাড়া অন্য কাউকে কামনা করলে তারা হবে সীমালঙ্ঘনকারী।"
যারা একে অবস্থাভেদে হারাম ও অবস্থাভেদে ওয়াজিব বলেছেন, তারা হচ্ছেন হানাফি। তারা বলেন: হস্ত মৈথুন না করলে যার ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে, তার জন্য হস্ত মৈথুন ওয়াজিব। কেননা দুটি ক্ষতিকর কাজের মধ্যে যেটি অপেক্ষাকৃত হালকা, তা করা বৈধ।” তারা আরো বলেছেন: কামোত্তেজনা সৃষ্টির জন্য এটা করা হারাম। তারা আরো বলেন: যখন কামোত্তেজনা অদম্য হয়ে ওঠে, তার কাছে স্ত্রী বা দাসী থাকেনা এবং শুধু উত্তেজনা প্রশমিত করার উদ্দেশ্যেই হস্ত মৈথুন করে, তখন এটা জায়েয। হাম্বলীদের মত হলো, কেবলমাত্র ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া অথবা স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার আশংকা রয়েছে, অথচ কাছে স্ত্রী বা দাসী নেই- এবং বিয়ে করারও সামর্থ্য নেই এরূপ অবস্থায় ব্যতিত এ কাজ হারাম। ইবনে হাযমের মতে, এটা মাকরূহ এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। কেননা বাম হাত দিয়ে পুরুষাংগ স্পর্শ করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। এটুকু যখন বৈধ, তখন এরপর বীর্যপাত ঘটানো হারাম হবেনা। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
وَقَدْ فَصْلَ اللَّهُ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ
"আল্লাহ তোমাদের উপর যা যা হারাম করেছেন, তা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন”। এ কাজটি এ ধরনের কাজসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়, যার হারাম হওয়ার কথা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এটা হালাল। কারণ আল্লাহ বলেছেন "পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” হস্ত মৈথুন মাকরূহ হওয়ার কারণ হলো, এটা কোনো মহৎ নৈতিক গুণ নয়। বর্ণিত আছে যে, প্রাচীন মনীষীদের কেউ কেউ একে বৈধ এবং অন্যরা মাকরূহ মনে করতেন। যারা মাকরূহ মনে করতেন তাদের মধ্যে ইবনে উমর ও আতা রয়েছেন। আর ইবনে আব্বাস, হাসান ও কতক শীর্ষস্থানীয় সাহাবি একে বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। হাসান বলেন: সাহাবিগণ যুদ্ধবিগ্রহ চলাকালে এটা করতেন। মুজাহিদ বলেছেন: অতীতের লোকেরা যুবকদেরকে হস্ত মৈথুন করার আদেশ দিতেন, যাতে তারা ব্যভিচার থেকে বিরত থাকে। এ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের উভয়ের জন্য একই বিধি প্রযোজ্য।