📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 হদ মাসে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে

📄 হদ মাসে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে


বিবাহিত মহিলা যদি বিয়ের ছয় মাস পর সন্তান প্রসব করে তবে তার উপর হদ কার্যকরী করা হবেনা। ইমাম মালেক বলেন : আমি জানতে পেরেছি, উসমান রা. এর নিকট বিয়ের ছয় মাস পর সন্তান প্রসবকারিণী জনৈক মহিলাকে আনা হলে তিনি তাকে রজম করার আদেশ দিলেন। আলী রা. এর বিরোধিতা করে বললেন : এই মহিলার উপর রজম কার্যকর হবেনা। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে বলেছেন:
وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًاه
"তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও স্তন্য ছাড়াতে ত্রিশ মাস লাগে।" আল্লাহ আরো বলেন:
وَالْوَالِدت يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ .
"যে ব্যক্তি স্তন্যদানের মেয়াদ পূর্ণ করতে ইচ্ছুক, তার জন্য জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু'বছর স্তন্য পান করাবে।" এ থেকে প্রমাণিত হয়, ছয় মাসে সন্তান হওয়া সম্ভব। কাজেই তার উপর রজম কার্যকর করা চলেনা।" একথা শুনে উসমান ঐ মহিলার কাছে দূত পাঠালেন। কিন্তু দূত দেখলো, মহিলাকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করা হয়েছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 হদ কার্যকর করার সময়

📄 হদ কার্যকর করার সময়


বিদায়াতুল মুজতাহিদ গ্রন্থে বলা হয়েছে: অধিকাংশ ফকিহর মতে প্রচণ্ড গরমে, শীতকালে ও অভিযুক্তের রোগাক্রান্ত থাকাকালে হদ কার্যকর করা হবেনা। ইমাম আহমদ ও ইসহাকের মতে হদ কার্যকর করা হবে। তারা প্রমাণ দর্শান যে, উমর রা. কুদামার উপর তার রুগ্নাবস্থায় হদ কার্যকর করেছিলেন। এই মতভেদের কারণ হলো হলো 'হদ' এর তাৎপর্য সম্পর্কে যাহেরি মাযহাবের ফকিহদের বিরোধিতা। তারা বলেন: হদ এমন অবস্থায় কার্যকর করা হবেনা, যখন 'হদ' প্রয়োগকারীদের মনে এরূপ ধারণা প্রবল হবে যে, হদ কার্যকর করা হলে অপরাধী মারা যাবে। যারা মনে করেন যে, হদ কার্যকর করার আদেশটি শর্তহীন ও ব্যতিক্রমবিহীন, তারা বলেন, রুগ্নাবস্থায়ও হদ কার্যকর করা হবে। আর যারা হদের তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি দেন তারা বলেন: রোগী রোগমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে শাস্তি দেয়া হবেনা। অনুরূপ প্রচণ্ড গরমে এবং ঠাণ্ডায়ও শাস্তি দেয়া হবেনা। শওকানি বলেন: এটা সর্বসম্মত মত যে, শীত ও গরমের তীব্রতা হ্রাস পাওয়া পর্যন্ত অবিবাহিত অপরাধীর হদ কার্যকর করা স্থগিত থাকবে। কিন্তু যদি সে আশা না থাকে, তাহলে শাফেয়ি মাযহাব মতে, রুগ্ন অপরাধীর জন্য সহনীয় হলে খেজুরের কাঁদির থোকা দিয়ে তাকে প্রহার করা হবে। নাসের ও মুয়াইয়িদ বিল্লাহ বলেন: রোগমুক্তির আশা না থাকলেও রুগ্নাবস্থায় হদ কার্যকর করা হবেনা। তবে প্রথমোক্ত মতটিই অগ্রগণ্য। আবু উমামার হাদিস এর প্রমাণ। উপরোক্ত মতামত ছিলো বেত্রদণ্ড নিয়ে। পক্ষান্তরে রজমযোগ্য অপরাধী যদি রুগ্ন হয় বা অনুরূপ অন্য কোনো অস্বাভাবিক অবস্থায় থাকে, তাহলে শাফেয়ি, হানাফি ও মালেকের মতে, রোগ বা অন্য কোনো কারণে রজম স্থগিত থাকবেনা। কারণ তাকে নিপাত করাই অভিপ্রেত।
মারুযী বলেছেন: অপরাধ অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি দ্বারা প্রমাণিত হোক বা সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হোক, শীত বা গরমের তীব্রতা বা অসুস্থতার কারণে রজম স্থগিত থাকবে। ইসফারাইনি বলেছেন: শুধুমাত্র অসুস্থতার কারণে রজম স্থগিত করা হবে। আর গর্ভবতীকে ততক্ষণ পর্যন্ত রজম করা হবে না, যতক্ষণ সে সন্তান প্রসব এবং তার ধাত্রী না পাওয়া গেলে তাকে স্তন্য পান না করায়। আলী রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. এর জনৈক দাসী ব্যভিচার করেছিল। তিনি আমাকে আদেশ দিলেন যেন তাকে বেত্রাঘাত করি। যখন তার নিকট গেলাম, দেখলাম তার সবেমাত্র নেফাস (প্রসবোত্তর স্রাব) শুরু হয়েছে। আমার আশংকা হলো, তাকে বেত্রাঘাত করলে সে মারা যাবে। রসূলুল্লাহ সা.কে জানালাম। তিনি বললেন: “বেশ করেছ। সে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে অব্যাহতি দাও।" -আহমদ, মুসলিম, তিরমিযি।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 যাকে রজম করা হবে তার জন্য গর্ত খুঁড়তে হবে কিনা

📄 যাকে রজম করা হবে তার জন্য গর্ত খুঁড়তে হবে কিনা


যাকে রজম করা হবে, তার জন্য গর্ত খোঁড়া লাগবে কিনা সে সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিসে বিভিন্ন রকম বর্ণনা এসেছে। কতক হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তার জন্য গর্ত খুড়তে হবে। অন্যান্য হাদিসে এ বিষয়ে স্পস্ট করে কিছু বলা হয়নি। ইমাম আহমদ বলেছেন: অধিকাংশ হাদিস অনুসারে গর্ত খোঁড়া লাগবেনা। হাদিসের এই বিভিন্নতার কারণে ফকিহদের মধ্যেও মতভেদ হয়েছে। ইমাম মালেক ও আবু হানিফার মতে গর্ত খোঁড়া হবেনা। আবুস্ সাওর বলেন: খুঁড়তে হবে। আলী রা. থেকে বর্ণিত আছে, আলী রা.কে যখন শুরাহা হামদানিয়া নাম্মী মহিলাকে রজম করার আদেশ দেয়া হলো, তখন তিনি তাকে বাইরে নিয়ে এলেন, তার জন্য একটা গর্ত খোঁড়া হলো, তাকে তার মধ্যে প্রবেশ করানো হলো এবং জনগণ তার উপর পাথর নিক্ষেপের দৃশ্য দেখতে লাগলো। শাফেয়ির মতে, গর্ত খোঁড়া ও নাখোঁড়া দু'টোই জায়েয। তবে ইমাম শাফেয়ির মতে, বিশেষভাবে মহিলাদের জন্য গর্ত খোঁড়া লাগবে। পুরুষের নাভি ও মহিলার স্তন পর্যন্ত গর্ত খোঁড়া মুস্তাহাব। মহিলার পোশাক এমনভাবে গুটিয়ে বেঁধে দেয়া হবে, যাতে গর্তে না ঢুকিয়ে নিলে তার অস্থিরতার দরুন শরীরের গোপনীয় স্থানগুলো খুলে না যায়। আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, নারীকে বসিয়ে রজম করা হবে। পুরুষকে অধিকাংশের মতে দাঁড় করিয়ে ও মালেকের মতে বসিয়ে রজম করা হবে। অন্যদের মত এই যে, এ ব্যাপারে শাসকের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 শাসক ও সাক্ষীদের রজমে উপস্থিত থাকা

📄 শাসক ও সাক্ষীদের রজমে উপস্থিত থাকা


ইমাম আবু হানিফার মতে, হদ যখন সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয়, তখন বিবাহিত ব্যভিচারীর উপর প্রথম পাথর নিক্ষেপ করবে সাক্ষী এবং এজন্য শাসক সাক্ষীকে বাধ্য করবে। এতে শরিয়তের বিধানের প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শনের বিরুদ্ধে সতর্কতা ও সচেতনতার সৃষ্টি হবে এবং শরিয়তের শাস্তি কার্যকর করার উপর দৃঢ়তার জন্ম নেবে। তবে যদি স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে হদ প্রমাণিত হয়, তাহলে শাসক বা তার প্রতিনিধির উপর রজম শুরু করার দায়িত্ব বর্তাবে।
নাইলুল আওতারে বলা হয়েছে: ইমাম শাফেয়ির মতে রজমে শাসকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। এটা সঠিক মত। কেননা এটা বাধ্যতামূলক সাব্যস্ত করে এমন কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া ইতিপূর্বে উদ্ধৃত হাদিসে জানা গেছে যে, রসূলুল্লাহ সা. মায়েযকে রজম করার আদেশ দিলেন। কিন্তু নিজে জনতার সাথে মাঠে বের হননি। অথচ তার স্বীকারোক্তি দ্বারাই ব্যভিচার প্রমাণিত হয়েছিল। তিনি গামেদীর রজমেও উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা যায়। তালখীস নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে: উভয় হাদিসের কোনোটি থেকেই জানা যায়না যে, তিনি উপস্থিত থেকেছেন। বরং কোনো বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি উপস্থিত থাকেননি। ইমাম শাফেয়ি একথা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন। তিনি বলেছেন: গামেদী সম্পর্কে সুনান আবু দাউদ ইত্যাদিতে বলা হয়েছে, তিনি উপস্থিত থাকেননি। সুতরাং এদ্বারা প্রমাণিত হলো যে, সাক্ষী বা শাসকের উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে ফকিহগণ মনে করেন, স্বীকারোক্তি দ্বারা ব্যভিচার প্রমাণিত হলে শাসকের হাত দিয়ে রজম শুরু হওয়া মুস্তাহাব আর সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হলে সাক্ষীদের উপস্থিতি মুস্তাহাব।"

ফন্ট সাইজ
15px
17px