📄 গর্ভ দ্বারা কি ব্যভিচার প্রমাণিত হয়?
অধিকাংশ আলেমের মত হচ্ছে, কেবলমাত্র গর্ভবতী হওয়া দ্বারা হদ কার্যকর করা যাবেনা। বরং অপরাধীর স্বীকারোক্তি অথবা সাক্ষ্য অপরিহার্য। এর প্রমাণস্বরূপ তারা সেই হাদিস উদ্ধৃত করেন, যাতে সন্দেহ দেখা দিলেই হদ রহিত হবে বলা হয়েছে। অধিকন্তু আলী রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি জনৈক গর্ভবতী মহিলাকে বলেছিলেন: "তোমাকে কি বলাৎকার করা হয়েছে? সে বললো না। তিনি বললেন: তাহলে সম্ভবত: তুমি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কেউ তোমার কাছে এসেছিল।" তাছাড়া উমর রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, জনৈক মহিলা তাকে জানালো, সে অত্যন্ত গাঢ় ঘুমে অভ্যস্ত। এক ব্যক্তি গভীর রাতে তার কাছে এসেছিল। তাকে সে চিনতে পারেনি। উমর রা. ঐ মহিলার এই ওযর গ্রহণ করে তাকে 'হদ' থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।
পক্ষান্তরে ইমাম মালেক ও তার শিষ্যরা বলেন : যে মহিলার স্বামী আছে বলে জানা যায়না, সে যদি গর্ভবতী হয় এবং তাকে বলাৎকার করার হয়েছিল বলেও জানা যায়না, তাকে শাস্তি দেয়া হবে। সে যদি দাবি করে, তাকে বলাৎকার করা হয়েছে, তাহলে তাকে অবশ্যই এমন কোনো আলামত বা সাক্ষ্য পেশ করতে হবে, যা দ্বারা তার উপর বলাৎকার হয়েছে প্রমাণিত হয়, যেমন সে কুমারী ছিলো এবং ধর্ষণের পর তার রক্তপাত শুরু হয়েছে, অথবা বলাৎকারের প্রতিক্রিয়ায় সে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে। অনুরূপ সে যদি নিজের বিয়ে হয়েছে বলে দাবি করে, তবে সেই দাবি বিনা সাক্ষ্য প্রমাণে গ্রহণ করা হবেনা। এই মতটির স্বপক্ষে উমর রা. এর এই উক্তিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয় : “নারী হোক বা পুরুষ হোক, প্রত্যেক বিবাহিত ব্যভিচারীর উপর হদ কার্যকর করা ওয়াজিব, যদি সাক্ষ্য অথবা গর্ভ অথবা স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়।” আর আলী রা. বলেছেন : হে জনতা, ব্যভিচার দু'রকমের। গোপন ও প্রকাশ্য। গোপন ব্যভিচার হলো, যা সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা প্রকাশ পায়। আর প্রকাশ্য ব্যভিচার হলো যা স্বীকারোক্তি বা গর্ভ দ্বারা প্রকাশ পায়। এসব হচ্ছে সাহাবীদের উক্তি এবং তাঁদের আমলে কেউ তাদের এসব উক্তির বিরোধিতা করেনি। সুতরাং এটা অবশ্যই ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
📄 অভুক্তকে নিষ্পাপ প্রমাণিত করে এমন আলামত পাওয়া গেলে হদ রহিত হবে
ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত নারী বা পুরুষের মধ্যে যখন এমন কোনো আলামত পাওয়া যায়, যা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, তাদের কারো দ্বারা ব্যভিচার সংগঠিত হয়নি, তখন হদ রহিত হবে। যেমন কুমারী মেয়ের কুমারিত্ব অক্ষুণ্ণ থাকা, কিংবা যোনিদ্বার বন্ধ থাকা, অথবা পুরুষের নপুংসকত্ব বা পুরুষাংগ কর্তিত থাকা। রসূলুল্লাহ সা. আলী রা.কে এমন এক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করতে পাঠিয়েছিলেন, যে জনৈক মহিলার কাছে যাতায়াত করতো। আলী রা. গিয়ে দেখলেন, সে পুকুরে গোসল করছে। তিনি তাকে স্বহস্তে পাকড়াও করলেন এবং পানি থেকে টেনে বের করলেন। দেখলেন, তার পুরুষাংগ কর্তিত। অগত্যা তাকে রেখে তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট ফিরে গেলেন এবং তাকে বিষয়টি জানালেন।
📄 হদ মাসে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে
বিবাহিত মহিলা যদি বিয়ের ছয় মাস পর সন্তান প্রসব করে তবে তার উপর হদ কার্যকরী করা হবেনা। ইমাম মালেক বলেন : আমি জানতে পেরেছি, উসমান রা. এর নিকট বিয়ের ছয় মাস পর সন্তান প্রসবকারিণী জনৈক মহিলাকে আনা হলে তিনি তাকে রজম করার আদেশ দিলেন। আলী রা. এর বিরোধিতা করে বললেন : এই মহিলার উপর রজম কার্যকর হবেনা। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে বলেছেন:
وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًاه
"তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও স্তন্য ছাড়াতে ত্রিশ মাস লাগে।" আল্লাহ আরো বলেন:
وَالْوَالِدت يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ .
"যে ব্যক্তি স্তন্যদানের মেয়াদ পূর্ণ করতে ইচ্ছুক, তার জন্য জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু'বছর স্তন্য পান করাবে।" এ থেকে প্রমাণিত হয়, ছয় মাসে সন্তান হওয়া সম্ভব। কাজেই তার উপর রজম কার্যকর করা চলেনা।" একথা শুনে উসমান ঐ মহিলার কাছে দূত পাঠালেন। কিন্তু দূত দেখলো, মহিলাকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করা হয়েছে।
📄 হদ কার্যকর করার সময়
বিদায়াতুল মুজতাহিদ গ্রন্থে বলা হয়েছে: অধিকাংশ ফকিহর মতে প্রচণ্ড গরমে, শীতকালে ও অভিযুক্তের রোগাক্রান্ত থাকাকালে হদ কার্যকর করা হবেনা। ইমাম আহমদ ও ইসহাকের মতে হদ কার্যকর করা হবে। তারা প্রমাণ দর্শান যে, উমর রা. কুদামার উপর তার রুগ্নাবস্থায় হদ কার্যকর করেছিলেন। এই মতভেদের কারণ হলো হলো 'হদ' এর তাৎপর্য সম্পর্কে যাহেরি মাযহাবের ফকিহদের বিরোধিতা। তারা বলেন: হদ এমন অবস্থায় কার্যকর করা হবেনা, যখন 'হদ' প্রয়োগকারীদের মনে এরূপ ধারণা প্রবল হবে যে, হদ কার্যকর করা হলে অপরাধী মারা যাবে। যারা মনে করেন যে, হদ কার্যকর করার আদেশটি শর্তহীন ও ব্যতিক্রমবিহীন, তারা বলেন, রুগ্নাবস্থায়ও হদ কার্যকর করা হবে। আর যারা হদের তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি দেন তারা বলেন: রোগী রোগমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে শাস্তি দেয়া হবেনা। অনুরূপ প্রচণ্ড গরমে এবং ঠাণ্ডায়ও শাস্তি দেয়া হবেনা। শওকানি বলেন: এটা সর্বসম্মত মত যে, শীত ও গরমের তীব্রতা হ্রাস পাওয়া পর্যন্ত অবিবাহিত অপরাধীর হদ কার্যকর করা স্থগিত থাকবে। কিন্তু যদি সে আশা না থাকে, তাহলে শাফেয়ি মাযহাব মতে, রুগ্ন অপরাধীর জন্য সহনীয় হলে খেজুরের কাঁদির থোকা দিয়ে তাকে প্রহার করা হবে। নাসের ও মুয়াইয়িদ বিল্লাহ বলেন: রোগমুক্তির আশা না থাকলেও রুগ্নাবস্থায় হদ কার্যকর করা হবেনা। তবে প্রথমোক্ত মতটিই অগ্রগণ্য। আবু উমামার হাদিস এর প্রমাণ। উপরোক্ত মতামত ছিলো বেত্রদণ্ড নিয়ে। পক্ষান্তরে রজমযোগ্য অপরাধী যদি রুগ্ন হয় বা অনুরূপ অন্য কোনো অস্বাভাবিক অবস্থায় থাকে, তাহলে শাফেয়ি, হানাফি ও মালেকের মতে, রোগ বা অন্য কোনো কারণে রজম স্থগিত থাকবেনা। কারণ তাকে নিপাত করাই অভিপ্রেত।
মারুযী বলেছেন: অপরাধ অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি দ্বারা প্রমাণিত হোক বা সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হোক, শীত বা গরমের তীব্রতা বা অসুস্থতার কারণে রজম স্থগিত থাকবে। ইসফারাইনি বলেছেন: শুধুমাত্র অসুস্থতার কারণে রজম স্থগিত করা হবে। আর গর্ভবতীকে ততক্ষণ পর্যন্ত রজম করা হবে না, যতক্ষণ সে সন্তান প্রসব এবং তার ধাত্রী না পাওয়া গেলে তাকে স্তন্য পান না করায়। আলী রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. এর জনৈক দাসী ব্যভিচার করেছিল। তিনি আমাকে আদেশ দিলেন যেন তাকে বেত্রাঘাত করি। যখন তার নিকট গেলাম, দেখলাম তার সবেমাত্র নেফাস (প্রসবোত্তর স্রাব) শুরু হয়েছে। আমার আশংকা হলো, তাকে বেত্রাঘাত করলে সে মারা যাবে। রসূলুল্লাহ সা.কে জানালাম। তিনি বললেন: “বেশ করেছ। সে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে অব্যাহতি দাও।" -আহমদ, মুসলিম, তিরমিযি।