📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিচারক কি নিজের জ্ঞাত তথ্য মোতাবেক রায় দিতে পারে?

📄 বিচারক কি নিজের জ্ঞাত তথ্য মোতাবেক রায় দিতে পারে?


যাহেরি মাযহাবের মতানুসারে রক্তপাত, কিসাস, অর্থনৈতিক বিষয়াদি, ব্যভিচার ও হুদুদ সংক্রান্ত বিষয়ে বিচারকের নিজের জানা তথ্য অনুযায়ী বিচার করা ফরয, চাই বিচারক নিযুক্ত হওয়ার আগে জানুক বা পরে জানুক। নিজের জানা তথ্য অনুযায়ী যে বিচার করবে, সেটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিচার, তারপর অপরাধীর স্বীকারোক্তি এবং সর্বশেষে সাক্ষ্য অনুযায়ী সম্পাদিত বিচার। কেননা আল্লাহ সূরা নিসার ১৩৫ নং আয়াতে বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ .
"হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে।" আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ কোনো অন্যায় দেখবে, সে যেন স্বহস্তে তা প্রতিহত করে, তা না পারলে মুখ দিয়ে যেন প্রতিহত করে।"
সুতরাং ন্যায়বিচার তথা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যে বিচারকের কর্তব্য, তা সত্য। যালেমকে জেনে শুনে তার যুলুমের উপর বহাল থাকতে দেয়া ও প্রতিহত না করা ন্যায়বিচার নয়। বিচারকের জ্ঞাত যে কোনো অন্যায়কে স্বহস্তে প্রতিহত করা এবং প্রত্যেক হকদারকে তার হক দেয়া বিচারকের কর্তব্য। নচেত সে বিচারক যালিম অত্যাচারী গণ্য হবে।
কিন্তু অধিকাংশ ফকিহর মতে বিচারকের নিজের জানা তথ্য অনুযায়ী বিচার করার অধিকার নেই। আবু বকর রা. বলেছেন: "আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে কোনো অপরাধ করতে দেখি, তবে যতক্ষণ আমার কাছে সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত না হবে ততক্ষণ আমি তার উপর শাস্তি কার্যকর করবোনা।" তাছাড়া এর আরো একটা কারণ এই যে, বিচারক দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতোই একজন নাগরিক। তাই তার কাছে পূর্ণ সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত সাক্ষীর দেয়া সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কিছু বলা তার জন্য বৈধ নয়। বিচারক কোনো ব্যভিচারীকে যে অবস্থায় দেখেছে, তদনুযায়ী তাকে যদি ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত করে, অথচ সেই অভিযোগের স্বপক্ষে তার কাছে পূর্ণ সাক্ষ্য প্রমাণ নেই, তাহলে সে অপবাদদাতা গণ্য হবে এবং তার উপর অপবাদের শাস্তি কার্যকর করা অপরিহার্য হবে। সুতরাং বিচারকের জন্য যখন তার জ্ঞাত তথ্য মোতাবেক কথা বলা নিষিদ্ধ, তখন সে অনুসারে কাজ করা নিষিদ্ধ হওয়া অধিকতর যুক্তিসংগত। এই মতের ভিত্তি হচ্ছে সূরা নূরের ১৩ নং আয়াতের এই অংশ:
فَإِذَا لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ .
"তারা যখন সাক্ষীগণকে উপস্থিত করায়নি, তখন আল্লাহর নিকট তারা মিথ্যাবাদী।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 গর্ভ দ্বারা কি ব্যভিচার প্রমাণিত হয়?

📄 গর্ভ দ্বারা কি ব্যভিচার প্রমাণিত হয়?


অধিকাংশ আলেমের মত হচ্ছে, কেবলমাত্র গর্ভবতী হওয়া দ্বারা হদ কার্যকর করা যাবেনা। বরং অপরাধীর স্বীকারোক্তি অথবা সাক্ষ্য অপরিহার্য। এর প্রমাণস্বরূপ তারা সেই হাদিস উদ্ধৃত করেন, যাতে সন্দেহ দেখা দিলেই হদ রহিত হবে বলা হয়েছে। অধিকন্তু আলী রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি জনৈক গর্ভবতী মহিলাকে বলেছিলেন: "তোমাকে কি বলাৎকার করা হয়েছে? সে বললো না। তিনি বললেন: তাহলে সম্ভবত: তুমি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কেউ তোমার কাছে এসেছিল।" তাছাড়া উমর রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, জনৈক মহিলা তাকে জানালো, সে অত্যন্ত গাঢ় ঘুমে অভ্যস্ত। এক ব্যক্তি গভীর রাতে তার কাছে এসেছিল। তাকে সে চিনতে পারেনি। উমর রা. ঐ মহিলার এই ওযর গ্রহণ করে তাকে 'হদ' থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।
পক্ষান্তরে ইমাম মালেক ও তার শিষ্যরা বলেন : যে মহিলার স্বামী আছে বলে জানা যায়না, সে যদি গর্ভবতী হয় এবং তাকে বলাৎকার করার হয়েছিল বলেও জানা যায়না, তাকে শাস্তি দেয়া হবে। সে যদি দাবি করে, তাকে বলাৎকার করা হয়েছে, তাহলে তাকে অবশ্যই এমন কোনো আলামত বা সাক্ষ্য পেশ করতে হবে, যা দ্বারা তার উপর বলাৎকার হয়েছে প্রমাণিত হয়, যেমন সে কুমারী ছিলো এবং ধর্ষণের পর তার রক্তপাত শুরু হয়েছে, অথবা বলাৎকারের প্রতিক্রিয়ায় সে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে। অনুরূপ সে যদি নিজের বিয়ে হয়েছে বলে দাবি করে, তবে সেই দাবি বিনা সাক্ষ্য প্রমাণে গ্রহণ করা হবেনা। এই মতটির স্বপক্ষে উমর রা. এর এই উক্তিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয় : “নারী হোক বা পুরুষ হোক, প্রত্যেক বিবাহিত ব্যভিচারীর উপর হদ কার্যকর করা ওয়াজিব, যদি সাক্ষ্য অথবা গর্ভ অথবা স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়।” আর আলী রা. বলেছেন : হে জনতা, ব্যভিচার দু'রকমের। গোপন ও প্রকাশ্য। গোপন ব্যভিচার হলো, যা সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা প্রকাশ পায়। আর প্রকাশ্য ব্যভিচার হলো যা স্বীকারোক্তি বা গর্ভ দ্বারা প্রকাশ পায়। এসব হচ্ছে সাহাবীদের উক্তি এবং তাঁদের আমলে কেউ তাদের এসব উক্তির বিরোধিতা করেনি। সুতরাং এটা অবশ্যই ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অভুক্তকে নিষ্পাপ প্রমাণিত করে এমন আলামত পাওয়া গেলে হদ রহিত হবে

📄 অভুক্তকে নিষ্পাপ প্রমাণিত করে এমন আলামত পাওয়া গেলে হদ রহিত হবে


ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত নারী বা পুরুষের মধ্যে যখন এমন কোনো আলামত পাওয়া যায়, যা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, তাদের কারো দ্বারা ব্যভিচার সংগঠিত হয়নি, তখন হদ রহিত হবে। যেমন কুমারী মেয়ের কুমারিত্ব অক্ষুণ্ণ থাকা, কিংবা যোনিদ্বার বন্ধ থাকা, অথবা পুরুষের নপুংসকত্ব বা পুরুষাংগ কর্তিত থাকা। রসূলুল্লাহ সা. আলী রা.কে এমন এক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করতে পাঠিয়েছিলেন, যে জনৈক মহিলার কাছে যাতায়াত করতো। আলী রা. গিয়ে দেখলেন, সে পুকুরে গোসল করছে। তিনি তাকে স্বহস্তে পাকড়াও করলেন এবং পানি থেকে টেনে বের করলেন। দেখলেন, তার পুরুষাংগ কর্তিত। অগত্যা তাকে রেখে তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট ফিরে গেলেন এবং তাকে বিষয়টি জানালেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হদ মাসে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে

📄 হদ মাসে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে


বিবাহিত মহিলা যদি বিয়ের ছয় মাস পর সন্তান প্রসব করে তবে তার উপর হদ কার্যকরী করা হবেনা। ইমাম মালেক বলেন : আমি জানতে পেরেছি, উসমান রা. এর নিকট বিয়ের ছয় মাস পর সন্তান প্রসবকারিণী জনৈক মহিলাকে আনা হলে তিনি তাকে রজম করার আদেশ দিলেন। আলী রা. এর বিরোধিতা করে বললেন : এই মহিলার উপর রজম কার্যকর হবেনা। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে বলেছেন:
وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًاه
"তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও স্তন্য ছাড়াতে ত্রিশ মাস লাগে।" আল্লাহ আরো বলেন:
وَالْوَالِدت يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ .
"যে ব্যক্তি স্তন্যদানের মেয়াদ পূর্ণ করতে ইচ্ছুক, তার জন্য জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু'বছর স্তন্য পান করাবে।" এ থেকে প্রমাণিত হয়, ছয় মাসে সন্তান হওয়া সম্ভব। কাজেই তার উপর রজম কার্যকর করা চলেনা।" একথা শুনে উসমান ঐ মহিলার কাছে দূত পাঠালেন। কিন্তু দূত দেখলো, মহিলাকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00