📄 কোনো মহিলার সাথে ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি করে এবং মহিলা অস্বীকার করে
কোনো ব্যক্তি যখন কোনো নির্দিষ্ট মহিলার সাথে ব্যভিচার করেছে মর্মে স্বীকারোক্তি করে এবং ঐ মহিলা তা অস্বীকার করে, তখন শুধু পুরুষটির উপর হদ কার্যকর করা হবে, মহিলার উপর নয়। কেননা আহমদ ও আবু দাউদ সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণনা করেছেন : এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এলো এবং জনৈকা মহিলার নামোল্লেখ করে তার সাথে ব্যভিচার করেছে বলে জানালো। তৎক্ষণাৎ রসূলুল্লাহ সা. দূত পাঠিয়ে ঐ মহিলাকে ডাকলেন। মহিলা এলে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন। সে অস্বীকার করলো। রসূলুল্লাহ সা. মহিলাকে ছেড়ে দিলেন এবং পুরুষটির উপর হদ কার্যকর করলেন। এটা ছিলো তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ব্যভিচারের শাস্তি। ইমাম মালেক ও শাফেয়ির মত অনুযায়ী অপবাদ আরোপের শাস্তি নয়। আওযায়ি ও আবু হানিফা বলেছেন: তাকে শুধু অপবাদের জন্য শাস্তি দেয়া হবে। কেননা মহিলার অস্বীকৃতি সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। এই মতটির উপর আপত্তি তুলে বলা হয়েছে যে, মহিলার অস্বীকৃতি পুরুষের স্বীকারোক্তিকে বাতিল করেনা। হাদাবি, মুহাম্মদ ও শাফেয়ির মতে তাকে ব্যভিচার ও অপবাদ উভয়টার জন্য শাস্তি দেয়া হবে। কেননা আবু দাউদ ও নাসায়ী ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: বকর গোত্রের এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এসে জনৈক মহিলার সাথে ব্যভিচার করেছে মর্মে চারবার স্বীকারোক্তি করলো। লোকটি ছিলো অবিবাহিত। তিনি তাকে একশো বেত্রাঘাত করলেন। এরপর তিনি তাকে মহিলা সম্পর্কে সাক্ষী উপস্থাপন করতে বললেন। তখন মহিলা বললো: হে রসূলুল্লাহ সা. এই ব্যক্তি মিথ্যা বলেছে। তখন তিনি তার উপর অপবাদের শাস্তি ৮০ বেত্রাঘাতও কার্যকর করলেন।
📄 সাক্ষ্য দ্বারা ব্যভিচার প্রমাণিত হওয়া
পুরুষ কিংবা নারী যেই হোক না কেন, ব্যভিচারের অভিযোগ বা অপবাদ তার, তার পরিবারের ও বংশধরের মানমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে, সুনাম ও সুখ্যাতি বিনষ্ট করে ও কলংক লেপন করে। এক কথায় তার সার্বিক পতন ঘটায়। এজন্য ইসলাম এই অপরাধ প্রমাণে অত্যধিক কড়াকড়ি আরোপ করেছে, যাতে নিরপরাধ ব্যক্তিকে আনুমানিক ও ভিত্তিহীনভাবে অথবা সামান্য ক্রোধ ও বিদ্বেষের কারণে অভিযুক্ত করা বা অপবাদ আরোপের মাধ্যমে চিরদিনের জন্য কলংকিত করার পথ রুদ্ধ হয়। এ কারণে ব্যভিচারের সাক্ষ্য দানে নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ জরুরি:
প্রথমত: চারজন সাক্ষী অপরিহার্য। অথচ অন্যান্য অভিযোগ প্রমাণে চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন হয়না। আল্লাহ বলেন: وَالَّتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِنْ نِّسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةٌ مِنْكُمْ ، فَإِنْ شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنْ سَبِيلاه অর্থ: তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য হতে চারজন সাক্ষী তলব করো। যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তবে তাদেরকে গৃহে অবরুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না তাদের মৃত্যু হয়, অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা করেন।" (সূরা নিসা: আয়াত ১৫)।
আল্লাহ সূরা নূরের ৪নং আয়াতে বলেন: وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُ وَهُمْ ثَمِنِينَ جَلْدَةً . "আর যারা সতী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করেনা, তাদেরকে আশিটি কষাঘাত করবে।”
সাক্ষী চারজনের কম হলে তা গ্রহণ করা হবেনা।
সাক্ষী চারজনের কম হলে তারা কি অপবাদের শাস্তি পাবে? হানাফি, মালেকি, অগ্রগণ্য শাফেয়ি ফকিহগণ ও ইমাম আহমদের মতে তারা অপবাদের শাস্তি পাবে। কেননা যে তিনজন সাক্ষী মুগীরার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিল, উমর রা. তাদের উপর হদ কার্যকর করেছিলেন। অন্যেরা বলেন: তাদেরকে অপবাদের শাস্তি দেয়া হবেনা। কেননা তাদের উদ্দেশ্য ছিলো সাক্ষ্য দেয়া, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা নয়। শাফেয়ি, হানাফি ও যাহেরি মাযহাবের দৃষ্টিতে এ মতটি অগ্রহণযোগ্য।
দ্বিতীয় শর্ত হলো: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِن رِّجَالِكُمْ : فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَينِ فَرَجُلٌ وَ أَمْرَأَتُنِ مِمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ . 。 "সাক্ষীদের মধ্যে যাদের উপর তোমরা রাযী, তাদের মধ্যে দুইজন পুরুষ সাক্ষী রাখবে, যদি দুইজন পুরুষ সাক্ষী না থাকে তবে একজন পুরুষ ও দুইজন স্ত্রীলোক।" (বাকারা: ২৮২)
সাক্ষী যদি প্রাপ্তবয়স্ক না হয়, তবে তার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। কেননা সে পুরুষ হিসেবেও গণ্য নয়, যাদের সাক্ষ্য দেয়ায় সাধারণ মানুষ রাযী বা সন্তুষ্ট থাকে তাদেরও অন্তর্ভুক্ত নয়। সাক্ষ্য দানের কাজটি বাহ্যত: তার দ্বারা সম্ভবপর হলেও তাতে কিছু যায় আসেনা। তাছাড়া রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তিন ব্যক্তি দায়মুক্ত: বালক যতক্ষণ না প্রাপ্তবয়স্ক হয়, ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হয় এবং পাগল যতক্ষণ না সুস্থ মস্তিষ্ক হয়।"
বালক যেহেতু নিজের সম্পত্তি সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণেরও যোগ্য নয়, কাজেই সে অন্যের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ারও যোগ্য নয়। সাক্ষ্য দান একটা অভিভাবকসুলভ কাজ।
তৃতীয় শর্ত হলো: সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া। তাই পাগল ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকের সাক্ষ্য যখন তার বুদ্ধি অপরিণত থাকার কারণে গৃহীত হয়না, তখন পাগল ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর সাক্ষ্য গৃহীত না হওয়া তো অধিকতর যুক্তিসংগত।
চতুর্থ শর্ত হলো: সাক্ষীর ন্যায়পরায়নতা ও সত্যবাদিতা: কেননা আল্লাহ বলেছেন: "তোমাদের মধ্য হতে দু'জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে।" (সূরা তালাক ২) আল্লাহ আরো বলেছেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَةٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَدِمِينَ "হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের নিকট কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত: তোমরা কোনো সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।" (সূরা হুজুরাত: ৬)
পঞ্চম শর্ত হলো: সাক্ষীর মুসলমান হওয়া চাই। চাই কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করা হোক বা অমুসলমানের বিরুদ্ধে। এ বিষয়টিতে সকল ইমাম একমত।
ষষ্ঠ শর্ত হলো: সাক্ষীর চাক্ষুস প্রত্যক্ষ করা চাই। অর্থাৎ সাক্ষী তার সাক্ষ্যে সুস্পষ্টভাবে বলবে, সে সুর্মার শলাকা যেমন সুর্মাদানিতে ঢুকে যায়, ঠিক সেইভাবে পুরুষটির লজ্জাস্থান মহিলাটির লজ্জাস্থানে ঢুকে যেতে দেখেছে। কেননা রসূলুল্লাহ সা. মায়েযকে বলেছিলেন: "হয়তো তুমি শুধু চুমু খেয়েছ, কিংবা স্পর্শ করেছ কিংবা নযর দিয়েছ।" সে বললো: হে রসূলুল্লাহ সা., না, তা নয়। এরপর রসূলুল্লাহ সা. আভাস ইংগিত বাদ দিয়ে সুস্পষ্ট ভাষায় তাকে জিজ্ঞাসা করলেন। সে বললো: হাঁ। পুনরায় তিনি বললেন: সুর্মার শলাকা যেভাবে সুর্মাদানিতে অদৃশ্য হয়ে যায়, ঠিক সেইভাবে? সে বললো: হাঁ।
এরূপ ক্ষেত্রে মানুষের শরীরের গোপনীয় অংশে দৃষ্টি দেয়ার অনুমিত দেয়া হয়েছে কেবল প্রয়োজনের খাতিরে সাক্ষ্য দানের উদ্দেশ্যে, যেমন ডাক্তার ও ধাত্রীর জন্য অনুমতি আছে।
সপ্তম শর্ত হলো: নারীর জননেন্দ্রিয়ে পুরুষের জননেন্দ্রিয়ের প্রবেশের বিষয়টি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করতে হবে, আভাসে ইংগিতে নয়।
অষ্টম শর্ত হলো: একই বৈঠকে সাক্ষ্যদান সম্পন্ন হওয়া চাই। অধিকাংশ ফকিহর মতে এই সাক্ষ্যের অন্যতম শর্ত হলো, একই স্থানে ও একই সময়ে সকল সাক্ষীর সাক্ষ্য দিতে হবে। তারা যদি আলাদা আলাদাভাবে আসে, তবে তাদের সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা।
শাফেয়ি, যাহেরি ও যায়দি মাযহাব এই শর্ত আরোপ করেনা। একই বৈঠকে বা একাধিক বৈঠকে বিচ্ছিন্নভাবে বা একত্রে সাক্ষ্য দিলে তাদের মতে সাক্ষ্য গৃহীত হবে। কেননা আল্লাহ সাক্ষীর উল্লেখ করেছেন, বৈঠক বা স্থানের উল্লেখ করেননি। তাছাড়া, সকল সাক্ষ্য যদি একই রকম হয় এবং কোনো গরমিল না থাকে, তাহলে বৈঠক একাধিক হলেও অন্য সকল সাক্ষ্যের মতোই তা গৃহীত হয়।
নবম শর্ত হলো: সাক্ষীদের সকলের পুরুষ হওয়া শর্ত। এ ক্ষেত্রে মহিলাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইবনে হাযম বলেন: প্রত্যেক পুরুষের পরিবর্তে দু'জন মুসলমান ন্যায়পরায়ণ মহিলার সাক্ষ্য গৃহীত হবে। কাজেই তিনজন পুরুষ ও দু'জন মহিলা, দুইজন পুরুষ ও চারজন মহিলা, একজন পুরুষ ও ছয়জন মহিলা বা কোনো পুরুষ ছাড়া আটজন মহিলার সাক্ষ্য গৃহীত হবে।
দশম শর্ত হলো: সাক্ষ্য দানে বিলম্ব না করা: কেননা উমর রা. বলেছেন: কোনো দল যদি কোনো হদ-এর জন্য সাক্ষ্য দেয় এবং ঘটনার অব্যবহিত পরেই সাক্ষ্য না দেয়, তবে তারা কোনো বিদ্বেষের কারণেই সাক্ষ্য দিয়েছে বুঝতে হবে এবং তাদের সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা।"
সাক্ষীরা যদি কোনো ব্যভিচারের ঘটনা পুরানো হয়ে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, তবে হানাফি মাযহাব অনুসারে তাদের সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। তাদের যুক্তি এই যে, কোনো দর্শক কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর দুইটি কাজের যে কোনো একটি করার ব্যাপারে তার স্বাধীনতা থাকে: হয় সে সওয়াব পাওয়ার আশায় তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। অথবা অপরাধীর অপরাধ লুকিয়ে রাখবে। যখন সে ঘটনা সম্পর্কে নিরবতা অবলম্বন করে এবং এর ফলে ঘটনাটা পুরানো হয়ে যায়, তখন প্রমাণিত হয় যে সে লুকানোর পন্থাটা অবলম্বন করেছে। এরপর যখন সে সাক্ষ্য দেয়, তখন বুঝা যায় যে, বিদ্বেষই তাকে সাক্ষ্য দিতে প্ররোচিত করেছে। এ ধরনের মানুষের সাক্ষ্য গৃহীত হয়না বিদ্বেষপ্রসূত অভিযোগ আরোপের কারণে যেমন উমর রা. বলেছেন: উমর রা. এর এ উক্তির কেউ বিরোধিতা করেছে বলে শোনা যায়নি। কাজেই এটা ইজমা বা মতৈক্য বলে গণ্য হবে। অবশ্য বিলম্বিত সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা শুধু তখনই, যখন সাক্ষীর এমন কোনো ওযর থাকবেনা যা তাকে বিলম্বে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করে। যদি বিলম্বে সাক্ষ্য দানের পক্ষে দৃশ্যমান কোনো ওযর থাকে, যেমন বিচারালয় থেকে সাক্ষীর দূরে অবস্থান, অথবা সাক্ষীর অসুস্থতা ইত্যাদি, তাহলে সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা এবং ঘটনা পুরানো হওয়াতে বাতিল হবেনা। যে সকল হানাফি ফকিহ এই শর্তটির প্রবক্তা, তারা এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করেননি। বরঞ্চ তারা বিষয়টিকে বিচারকের হাতে সমর্পণ করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যাপারে পরিস্থিতির আলোকে সময় নির্ধারণ করবেন। কেননা বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন রকমের ওযর থাকায় ঢালাওভাবে সময় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে কোনো কোনো হানাফি ফকিহ এই বিলম্বকে এক মাস এবং কেউ কেউ ছয় মাস নির্ধারণ করেছেন। তবে মালেকি, শাফেয়ি, যাহেরি ও যায়দি শীয়াদের অধিকাংশ ফকিহ সাক্ষী যত বিলম্বেই সাক্ষ্য দিক, তা গ্রহণ করাতে কোনো বাধা নেই বলে মনে করেন। হাম্বলিদের মধ্যে দু'টি মত প্রচলিত আছে। একটি হানাফিদের এবং অপরটি অধিকাংশ ফকিহদের মতের অনুরূপ।
📄 বিচারক কি নিজের জ্ঞাত তথ্য মোতাবেক রায় দিতে পারে?
যাহেরি মাযহাবের মতানুসারে রক্তপাত, কিসাস, অর্থনৈতিক বিষয়াদি, ব্যভিচার ও হুদুদ সংক্রান্ত বিষয়ে বিচারকের নিজের জানা তথ্য অনুযায়ী বিচার করা ফরয, চাই বিচারক নিযুক্ত হওয়ার আগে জানুক বা পরে জানুক। নিজের জানা তথ্য অনুযায়ী যে বিচার করবে, সেটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিচার, তারপর অপরাধীর স্বীকারোক্তি এবং সর্বশেষে সাক্ষ্য অনুযায়ী সম্পাদিত বিচার। কেননা আল্লাহ সূরা নিসার ১৩৫ নং আয়াতে বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ .
"হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে।" আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ কোনো অন্যায় দেখবে, সে যেন স্বহস্তে তা প্রতিহত করে, তা না পারলে মুখ দিয়ে যেন প্রতিহত করে।"
সুতরাং ন্যায়বিচার তথা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যে বিচারকের কর্তব্য, তা সত্য। যালেমকে জেনে শুনে তার যুলুমের উপর বহাল থাকতে দেয়া ও প্রতিহত না করা ন্যায়বিচার নয়। বিচারকের জ্ঞাত যে কোনো অন্যায়কে স্বহস্তে প্রতিহত করা এবং প্রত্যেক হকদারকে তার হক দেয়া বিচারকের কর্তব্য। নচেত সে বিচারক যালিম অত্যাচারী গণ্য হবে।
কিন্তু অধিকাংশ ফকিহর মতে বিচারকের নিজের জানা তথ্য অনুযায়ী বিচার করার অধিকার নেই। আবু বকর রা. বলেছেন: "আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে কোনো অপরাধ করতে দেখি, তবে যতক্ষণ আমার কাছে সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত না হবে ততক্ষণ আমি তার উপর শাস্তি কার্যকর করবোনা।" তাছাড়া এর আরো একটা কারণ এই যে, বিচারক দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতোই একজন নাগরিক। তাই তার কাছে পূর্ণ সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত সাক্ষীর দেয়া সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কিছু বলা তার জন্য বৈধ নয়। বিচারক কোনো ব্যভিচারীকে যে অবস্থায় দেখেছে, তদনুযায়ী তাকে যদি ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত করে, অথচ সেই অভিযোগের স্বপক্ষে তার কাছে পূর্ণ সাক্ষ্য প্রমাণ নেই, তাহলে সে অপবাদদাতা গণ্য হবে এবং তার উপর অপবাদের শাস্তি কার্যকর করা অপরিহার্য হবে। সুতরাং বিচারকের জন্য যখন তার জ্ঞাত তথ্য মোতাবেক কথা বলা নিষিদ্ধ, তখন সে অনুসারে কাজ করা নিষিদ্ধ হওয়া অধিকতর যুক্তিসংগত। এই মতের ভিত্তি হচ্ছে সূরা নূরের ১৩ নং আয়াতের এই অংশ:
فَإِذَا لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ .
"তারা যখন সাক্ষীগণকে উপস্থিত করায়নি, তখন আল্লাহর নিকট তারা মিথ্যাবাদী।"
📄 গর্ভ দ্বারা কি ব্যভিচার প্রমাণিত হয়?
অধিকাংশ আলেমের মত হচ্ছে, কেবলমাত্র গর্ভবতী হওয়া দ্বারা হদ কার্যকর করা যাবেনা। বরং অপরাধীর স্বীকারোক্তি অথবা সাক্ষ্য অপরিহার্য। এর প্রমাণস্বরূপ তারা সেই হাদিস উদ্ধৃত করেন, যাতে সন্দেহ দেখা দিলেই হদ রহিত হবে বলা হয়েছে। অধিকন্তু আলী রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি জনৈক গর্ভবতী মহিলাকে বলেছিলেন: "তোমাকে কি বলাৎকার করা হয়েছে? সে বললো না। তিনি বললেন: তাহলে সম্ভবত: তুমি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কেউ তোমার কাছে এসেছিল।" তাছাড়া উমর রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, জনৈক মহিলা তাকে জানালো, সে অত্যন্ত গাঢ় ঘুমে অভ্যস্ত। এক ব্যক্তি গভীর রাতে তার কাছে এসেছিল। তাকে সে চিনতে পারেনি। উমর রা. ঐ মহিলার এই ওযর গ্রহণ করে তাকে 'হদ' থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।
পক্ষান্তরে ইমাম মালেক ও তার শিষ্যরা বলেন : যে মহিলার স্বামী আছে বলে জানা যায়না, সে যদি গর্ভবতী হয় এবং তাকে বলাৎকার করার হয়েছিল বলেও জানা যায়না, তাকে শাস্তি দেয়া হবে। সে যদি দাবি করে, তাকে বলাৎকার করা হয়েছে, তাহলে তাকে অবশ্যই এমন কোনো আলামত বা সাক্ষ্য পেশ করতে হবে, যা দ্বারা তার উপর বলাৎকার হয়েছে প্রমাণিত হয়, যেমন সে কুমারী ছিলো এবং ধর্ষণের পর তার রক্তপাত শুরু হয়েছে, অথবা বলাৎকারের প্রতিক্রিয়ায় সে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে। অনুরূপ সে যদি নিজের বিয়ে হয়েছে বলে দাবি করে, তবে সেই দাবি বিনা সাক্ষ্য প্রমাণে গ্রহণ করা হবেনা। এই মতটির স্বপক্ষে উমর রা. এর এই উক্তিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয় : “নারী হোক বা পুরুষ হোক, প্রত্যেক বিবাহিত ব্যভিচারীর উপর হদ কার্যকর করা ওয়াজিব, যদি সাক্ষ্য অথবা গর্ভ অথবা স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়।” আর আলী রা. বলেছেন : হে জনতা, ব্যভিচার দু'রকমের। গোপন ও প্রকাশ্য। গোপন ব্যভিচার হলো, যা সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা প্রকাশ পায়। আর প্রকাশ্য ব্যভিচার হলো যা স্বীকারোক্তি বা গর্ভ দ্বারা প্রকাশ পায়। এসব হচ্ছে সাহাবীদের উক্তি এবং তাঁদের আমলে কেউ তাদের এসব উক্তির বিরোধিতা করেনি। সুতরাং এটা অবশ্যই ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।