📄 ফকিহদের মতামত
মুসলিম দেশের অনুগত নাগরিক নয় এমন অমুসলিম ব্যভিচারী অবিবাহিত হলে তাকে বেত্রদণ্ড দেয়া হবে। এ ব্যাপারে ফকিহগণ একমত। তবে বিবাহিত হলে তাকে রজম করা হবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ি, আবু ইউসুফ ও কাসেমির মতে বিবাহিত কাফের যদি প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক হয়, স্বাধীন হয় এবং তার ধর্ম অনুসারে বিশুদ্ধভাবে বিয়ে করে থাকে, তাহলে তাকে রজম করা হবে। আবু হানিফা, মুহাম্মদ, যায়দ বিন আলী, নাসের ও ইমাম ইয়াহিয়ার মতে তাকে বেত্রদণ্ড দেয়া হবে, রজম নয়। কেননা তাদের নিকট রজমের জন্য মুসলমান হওয়া শর্ত। রসূলুল্লাহ সা. যে দু'জন ইহুদীকে রজম করেছিলেন, সেটি তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত অনুসারে করেছিলেন। ইমাম মালেকের মতে তার উপর কোনো হদই কার্যকর করা হবেনা। তবে যে অমুসলিম মুসলিম দেশের অনুগত না হয়েও তার নিকট আশ্রয় প্রার্থী, তার উপর শাফেয়ি ও আবু ইউসুফ হদ কার্যকর করার পক্ষপাতী। কিন্তু মালেক, আবু হানিফা ও মুহাম্মদ হদ কার্যকর না করার পক্ষপাতী। ইবনে আব্দুল বার বলেছেন, রজমের জন্য অবশ্যই মুসলমান হওয়া শর্ত। তবে শাফেয়ি ও আহমদ এই শর্ত আরোপ করেন না। রবীয়া ও শাফেয়ি মাযহাবের একাংশ মুসলমান হওয়ার শর্ত আরোপ করেন।
📄 বেত্রাঘাত ও রজম উভয়টি কার্যকর করার কারণ
ইবনে হাযম, ইসহাক বিন রাহওয়াই ও হাসান বসরীর মতে বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচার করলে তাকে প্রথমে একশো বেত্রাঘাত করা হবে, তারপর মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত রজম (পাথর নিক্ষেপ) করা হবে। তারা প্রমাণ দর্শান মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযি কর্তৃক উবাদা ইবনে সামেত থেকে বর্ণিত এ হাদিস থেকে: "অবিবাহিত পুরুষ অবিবাহিত নারীর সাথে ব্যভিচার করলে একশো বেত্রাঘাত ও এক বছর নির্বাসন। আর বিবাহিত পুরুষ বিবাহিত নারীর সাথে ব্যভিচার করলে একশো বেত্রাঘাত ও রজম।"
আলী রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি শুরাহা নাম্মী মহিলাকে বৃহস্পতিবারে বেত্রাঘাত করলেন এবং শুক্রবারে রজম করলেন। তিনি বললেন তাকে বেত্রদণ্ড দিচ্ছি আল্লাহর কিতাব অনুসারে আর রজম করছি রসূলুল্লাহ সা.-এর কথা অনুসারে। আবু হানিফা, মালেক ও শাফেয়ি বলেন: তাদের উপর বেত্রাঘাত ও রজম উভয়টা কার্যকর করা হবেনা। কেবল রজম করা জরুরি। আর ইমাম আহমদ থেকে দুটি মত বর্ণিত আছে। একটি মত উভয়টি কার্যকর করার পক্ষে অপরটি বিপক্ষে। তাদের প্রমাণ এই যে, রসূলুল্লাহ সা. মায়েয ও গামেদীকে এবং ইহুদীদ্বয়কে শুধু রজম করেছিলেন, বেত্রাঘাত করেননি। তিনি আনিস আসলামিকে বলেছিলেন, "মহিলা যদি স্বীকার করে তাহলে তাকে রজম করো।" তাকে রজম করতে বলেননি। আর এটাই তার সর্বশেষ আদেশ। কেননা এ হাদিসের বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা, যিনি বিলম্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কাজেই তার বর্ণিত হাদিস দ্বারা রজম ও বেত্রাঘাত এ দুটির মধ্যে যেটি প্রথম চালু হয়েছে তা রহিত হবে। তারপর আবু বকর ও উমর রা. তাদের খিলাফতকালে রজম কার্যকর করেছেন, রজম ও বেত্রাঘাত উভয়টি কার্যকর করেননি। শায়খ দেহলবী মনে করেন, দুই হাদিসে কোনো বৈপরিত্য নেই এবং কোনো আদেশ রহিতও হয়নি। ব্যাপারটা শাসকের হাতে ন্যস্ত করা হবে। তিনি উভয়টি প্রয়োগ করলে করতে পারেন। তবে শুধু রজম করা মুস্তাহাব। কেননা রসূলুল্লাহ সা. শুধু রজম কার্যকর করেছেন। এর যৌক্তিকতা আমার দৃষ্টিতে এই যে, রজম অপরাধীর মৃত্যু ঘটায়। কাজেই প্রকৃত দমনমূলক পদক্ষেপ এ দ্বারাই গৃহীত হয়েছে। বেত্রাঘাত একটা বাড়তি শান্তি, যা বাদ দেয়ার অনুমতি আছে। এটাই আমার আমার মতে রজমকে যথেষ্ট মনে করার কারণ।
📄 ব্যভিচারের শাস্তি প্রয়োগের শর্তাবলি
ব্যভিচারের শাস্তি কার্যকর করার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ জরুরি: ১. সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া ২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ৩. স্বাধীন হওয়া ৪. ব্যভিচার হারাম একথা জানা।
সুতরাং অপ্রাপ্তবয়স্ককে ব্যভিচারের শাস্তি দেয়া হবেনা, (তবে অপেক্ষাকৃত হাল্কা দমনমূলক শাস্তি দেয়া হবে) পাগলকে শাস্তি দেয়া হবেনা এবং যাকে ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়েছে তাঁকেও শাস্তি দেয়া হবেনা। কেননা আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তিন ব্যক্তি দায়মুক্ত: ১. ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ জাগ্রত না হয় ২. অপ্রাপ্তবয়স্ক যতক্ষণ প্রাপ্তবয়স্ক না হয় ৩. পাগল যতক্ষণ সুস্থ মস্তিষ্ক না হয়। ব্যভিচার হারাম জানা শর্ত এ জন্য যে, শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তি বা 'হদ' হারাম কাজের জন্যই নির্দিষ্ট। অথচ সে হারাম কাজ করেনি। রসূলুল্লাহ সা. মাযেয়কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি জানো ব্যভিচার কী? তাছাড়া বর্ণিত হয়েছে, জনৈকা নিগ্রো দাসীকে উমর রা. এর নিকট আনা হলো এবং অভিযোগ করা হলো যে, সে ব্যভিচার করেছে। উমর রা. তাকে চাবুক দিয়ে ক'টা আঘাত করে বললেন: “কোন্ ইতরর সাথে যেনা করেছিস?” সে বললো : গাউসের সাথে দুই দিরহামের বিনিময়ে। (গাউস এক ব্যক্তির নাম) উমর রা. তার পাশে থাকা আলী, উসমান ও আবদুর রহমান বিন আওফকে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনারা কী মনে করেন? আলী রা. বললেন: আমি মনে করি, ওকে রজম করুন। আবদুর রহমান বললেন: আলী যা বললেন ওটাই আমার মত। উসমান রা. বললেন : আমার মনে হচ্ছে দাসীটি যা করেছে, তাকে আপনি সহজভাবে গ্রহণ করুন। কারণ সে একে দূষণীয় মনে করেনি। আল্লাহ তার জন্যই 'হদ' নির্ধারণ করেছেন, যে আল্লাহর বিধান জানে।" উমর রা. বললেন : আপনি সঠিক বলেছেন।
📄 ব্যভিচার কিভাবে প্রমাণিত হবে
ব্যভিচার স্বীকারোক্তি অথবা সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হবে।