📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ব্যভিচারের শাস্তিতে মুসলমান ও অমুসলমান সমান

📄 ব্যভিচারের শাস্তিতে মুসলমান ও অমুসলমান সমান


ব্যভিচার প্রমাণিত হলে মুসলমানের উপর যেমন 'হদ' কার্যকর করতে হবে, তেমনি অমুসলিম বা ইসলাম ত্যাগীর উপরও। কেননা মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকও দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সা. দু'জন ইহুদী বিবাহিত ব্যভিচারীকে রজম করেছেন। ইসলাম ত্যাগীর (মুরতাদ) উপর ইসলামের আইন কানুন কার্যকর হবে। তার মুরতাদ হওয়ার কারণে সে আইন কানুনের দায়মুক্ত নয় এবং তার কার্যকরিতা থেকে সে অব্যাহতি পাবেনা।
ইবনে উমর রা. থেকে বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন: ইহুদীরা তাদের মধ্য থেকে দু'জন ব্যভিচারী নারী ও পুরুষকে নিয়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এলো। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমাদের কিতাবে কী আছে? তারা বললো: উভয়ের মুখে কালি মেখে অপমাণিত করা হবে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমরা মিথ্যা বলেছ। নিশ্চয়ই তাতে রজম রয়েছে। যাও, তাওরাত নিয়ে এসো এবং তা পাঠ করো, যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো। তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজন পাঠকও নিয়ে এলো। সে পাঠ করলো। একটা জায়গায় এলে সে তার উপর হাত রাখলো। তাকে বলা হলো তোমার হাত উঠাও। সে হাত উঠালে জায়গাটিতে যা লেখা ছিলো বেরিয়ে পড়লো। সে বললো: হে মুহাম্মদ, এখানে রজম রয়েছে। তবে আমরা এটিকে নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে রাখতাম। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা.-এর আদেশে উভয়কে রজম করা হলো। ইবনে উমর রা. বলেন: পুরুষটিকে আমি দেখলাম মহিলাটির উপর কুজো হয়ে তাকে পাথর থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
জাবের বিন আবদুল্লাহ বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বনু আসলাম গোত্রের একজনকে ও ইহুদীদের একজনকে রজম করেছেন।-আহমদ ও মুসলিম।
বারা ইবনে আযেব রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছ দিয়ে জনৈক বেত্রাঘাতপ্রাপ্ত ও মুখে কালি মাখানো ইহুদীকে নিয়ে যাওয়া হলো। রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে ডেকে বললেন : তোমরা কি তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারের শাস্তি এ রকমই পাও? তারা বললো: হাঁ। রসূলুল্লাহ সা. তাদের মধ্য থেকে একজন আলেমকে ডাকলেন। তারপর তাকে বললেন: যে আল্লাহ মূসা আ. এর উপর তাওরাত নাযিল করেছেন, তার কসম দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি: তোমরা কি তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারীর শাস্তি এ রকমই পাও? সে বললো: না। আপনি যদি কসম দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা না করতেন, তবে আপনাকে রজমের শাস্তি সম্পর্কে জানাতামনা। কিন্তু আমাদের অভিজাত লোকদের মধ্যে এটা ব্যাপক হয়ে পড়েছে যে, যখন আমরা কোনো অভিজাত ব্যক্তিকে ধরতাম, তাকে ছেড়ে দিতাম। আর দুর্বলকে পেলে তার উপর শাস্তি কার্যকর করতাম। অবশেষে আমরা বললাম : এসো, আমরা এমন একটি জিনিসের উপর একমত হই, যা কুলীন ও অকুলীন উভয়ের উপর কার্যকর করতে পারবো। অতপর আমরা মুখে কালি মাখানো ও বেত্রাঘাতকে রজমের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করলাম। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: “হে আল্লাহ, ওরা যখন তোমার বিধানকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছিল, তখন আমিই সর্বপ্রথম তা পুনরুজ্জীবিত করলাম।" অতপর সেই ব্যক্তিকে রজম করার নির্দেশ দিলেন এবং রজম করা হলো। তখন এ আয়াত নাযিল হলো:
يَأَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن مِنْ قُلُوبُهُمْ .
“হে রাসূল, তোমাকে যেন দুঃখ না দেয় যারা কুফরীর দিকে দ্রুত ধাবিত হয়- যারা মুখে বলে "ঈমান এনেছি”, অথচ তাদের অন্তর ঈমান আনেনা এবং ইহুদীদের মধ্যে যারা অসত্য শ্রবণে তৎপর, তোমার নিকট আসেনা এমন এক ভিন্ন দলের পক্ষে যারা কান পেতে থাকে। শব্দগুলো যথাযথ সুবিন্যস্ত থাকার পরেও তারা সেগুলোর অর্থ বিকৃত করে; তারা বলে: এই রকম বিধান দিলে গ্রহণ করো এবং তা না দিলে বর্জন করো।” অর্থাৎ তারা বলে: (ব্যভিচারীর বিচারের জন্য) মুহাম্মদের নিকট এসো। মুহাম্মদ সা. যদি তোমাদেরকে মুখে কালি লেপন ও বেত্রদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেয় তবে তা মেনে নিও, আর যদি রজম করার আদেশ দেয় তবে তা বর্জন করো। এই পর্যায়ে আল্লাহ নাযিল করলেন:
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَفِرُونَ ، وَمَن لَمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفُسِقُونَ
(যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করেনা, সে কাফের। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করেনা সে যালেম। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করেনা সে ফাসেক।) ইবনে উমর রা. বলেন: এটা সকল কাফেরের বেলায়ই প্রযোজ্য। (আহমদ, আবু দাউদ ও মুসলিম) ইমাম নববী বলেন : ইহুদীদ্বয়কে রজম করা হয়েছিল তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে। রজম সম্পর্কে তাওরাতে যেসব উক্তি রয়েছে তার কিছু উদ্ধৃতি: "যখন কোনো পুরুষকে অন্য কোনো পুরুষের স্ত্রীর সাথে শায়িত দেখা যাবে, তখন দু'জনকেই হত্যা করা হবে। তাহলে ইসরাইলের অমংগল দূরীভূত হবে। আর যখন কারো বাগদত্তা কুমারী যুবতীকে শহরে একাকিনী পেয়ে কোনো ব্যক্তি তার সাথে শয়ন করে, তখন তাদের উভয়কে শহরের বাইরে নিয়ে যাও ও পাথর মেরে হত্যা করো। যুবতীকে এজন্য যে সে চিৎকার করে শহরবাসীর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেনি। আর পুরুষকে এজন্য যে, সে তার বন্ধুর বাগদত্তাকে অপমানিত করেছে। তাদেরকে শান্তি দিলে শহর থেকে দুর্বৃত্তপনা দূর হয়ে যাবে।" এটা তাওরাতের বাণী। বাইবেলে এই বাণীর বিরোধী কিছু নেই। তাই এটা মান্য করা খৃস্টানদের জন্যও জরুরি।)

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ফকিহদের মতামত

📄 ফকিহদের মতামত


মুসলিম দেশের অনুগত নাগরিক নয় এমন অমুসলিম ব্যভিচারী অবিবাহিত হলে তাকে বেত্রদণ্ড দেয়া হবে। এ ব্যাপারে ফকিহগণ একমত। তবে বিবাহিত হলে তাকে রজম করা হবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ি, আবু ইউসুফ ও কাসেমির মতে বিবাহিত কাফের যদি প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক হয়, স্বাধীন হয় এবং তার ধর্ম অনুসারে বিশুদ্ধভাবে বিয়ে করে থাকে, তাহলে তাকে রজম করা হবে। আবু হানিফা, মুহাম্মদ, যায়দ বিন আলী, নাসের ও ইমাম ইয়াহিয়ার মতে তাকে বেত্রদণ্ড দেয়া হবে, রজম নয়। কেননা তাদের নিকট রজমের জন্য মুসলমান হওয়া শর্ত। রসূলুল্লাহ সা. যে দু'জন ইহুদীকে রজম করেছিলেন, সেটি তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত অনুসারে করেছিলেন। ইমাম মালেকের মতে তার উপর কোনো হদই কার্যকর করা হবেনা। তবে যে অমুসলিম মুসলিম দেশের অনুগত না হয়েও তার নিকট আশ্রয় প্রার্থী, তার উপর শাফেয়ি ও আবু ইউসুফ হদ কার্যকর করার পক্ষপাতী। কিন্তু মালেক, আবু হানিফা ও মুহাম্মদ হদ কার্যকর না করার পক্ষপাতী। ইবনে আব্দুল বার বলেছেন, রজমের জন্য অবশ্যই মুসলমান হওয়া শর্ত। তবে শাফেয়ি ও আহমদ এই শর্ত আরোপ করেন না। রবীয়া ও শাফেয়ি মাযহাবের একাংশ মুসলমান হওয়ার শর্ত আরোপ করেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বেত্রাঘাত ও রজম উভয়টি কার্যকর করার কারণ

📄 বেত্রাঘাত ও রজম উভয়টি কার্যকর করার কারণ


ইবনে হাযম, ইসহাক বিন রাহওয়াই ও হাসান বসরীর মতে বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচার করলে তাকে প্রথমে একশো বেত্রাঘাত করা হবে, তারপর মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত রজম (পাথর নিক্ষেপ) করা হবে। তারা প্রমাণ দর্শান মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযি কর্তৃক উবাদা ইবনে সামেত থেকে বর্ণিত এ হাদিস থেকে: "অবিবাহিত পুরুষ অবিবাহিত নারীর সাথে ব্যভিচার করলে একশো বেত্রাঘাত ও এক বছর নির্বাসন। আর বিবাহিত পুরুষ বিবাহিত নারীর সাথে ব্যভিচার করলে একশো বেত্রাঘাত ও রজম।"
আলী রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি শুরাহা নাম্মী মহিলাকে বৃহস্পতিবারে বেত্রাঘাত করলেন এবং শুক্রবারে রজম করলেন। তিনি বললেন তাকে বেত্রদণ্ড দিচ্ছি আল্লাহর কিতাব অনুসারে আর রজম করছি রসূলুল্লাহ সা.-এর কথা অনুসারে। আবু হানিফা, মালেক ও শাফেয়ি বলেন: তাদের উপর বেত্রাঘাত ও রজম উভয়টা কার্যকর করা হবেনা। কেবল রজম করা জরুরি। আর ইমাম আহমদ থেকে দুটি মত বর্ণিত আছে। একটি মত উভয়টি কার্যকর করার পক্ষে অপরটি বিপক্ষে। তাদের প্রমাণ এই যে, রসূলুল্লাহ সা. মায়েয ও গামেদীকে এবং ইহুদীদ্বয়কে শুধু রজম করেছিলেন, বেত্রাঘাত করেননি। তিনি আনিস আসলামিকে বলেছিলেন, "মহিলা যদি স্বীকার করে তাহলে তাকে রজম করো।" তাকে রজম করতে বলেননি। আর এটাই তার সর্বশেষ আদেশ। কেননা এ হাদিসের বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা, যিনি বিলম্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কাজেই তার বর্ণিত হাদিস দ্বারা রজম ও বেত্রাঘাত এ দুটির মধ্যে যেটি প্রথম চালু হয়েছে তা রহিত হবে। তারপর আবু বকর ও উমর রা. তাদের খিলাফতকালে রজম কার্যকর করেছেন, রজম ও বেত্রাঘাত উভয়টি কার্যকর করেননি। শায়খ দেহলবী মনে করেন, দুই হাদিসে কোনো বৈপরিত্য নেই এবং কোনো আদেশ রহিতও হয়নি। ব্যাপারটা শাসকের হাতে ন্যস্ত করা হবে। তিনি উভয়টি প্রয়োগ করলে করতে পারেন। তবে শুধু রজম করা মুস্তাহাব। কেননা রসূলুল্লাহ সা. শুধু রজম কার্যকর করেছেন। এর যৌক্তিকতা আমার দৃষ্টিতে এই যে, রজম অপরাধীর মৃত্যু ঘটায়। কাজেই প্রকৃত দমনমূলক পদক্ষেপ এ দ্বারাই গৃহীত হয়েছে। বেত্রাঘাত একটা বাড়তি শান্তি, যা বাদ দেয়ার অনুমতি আছে। এটাই আমার আমার মতে রজমকে যথেষ্ট মনে করার কারণ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ব্যভিচারের শাস্তি প্রয়োগের শর্তাবলি

📄 ব্যভিচারের শাস্তি প্রয়োগের শর্তাবলি


ব্যভিচারের শাস্তি কার্যকর করার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ জরুরি: ১. সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া ২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ৩. স্বাধীন হওয়া ৪. ব্যভিচার হারাম একথা জানা।
সুতরাং অপ্রাপ্তবয়স্ককে ব্যভিচারের শাস্তি দেয়া হবেনা, (তবে অপেক্ষাকৃত হাল্কা দমনমূলক শাস্তি দেয়া হবে) পাগলকে শাস্তি দেয়া হবেনা এবং যাকে ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়েছে তাঁকেও শাস্তি দেয়া হবেনা। কেননা আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তিন ব্যক্তি দায়মুক্ত: ১. ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ জাগ্রত না হয় ২. অপ্রাপ্তবয়স্ক যতক্ষণ প্রাপ্তবয়স্ক না হয় ৩. পাগল যতক্ষণ সুস্থ মস্তিষ্ক না হয়। ব্যভিচার হারাম জানা শর্ত এ জন্য যে, শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তি বা 'হদ' হারাম কাজের জন্যই নির্দিষ্ট। অথচ সে হারাম কাজ করেনি। রসূলুল্লাহ সা. মাযেয়কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি জানো ব্যভিচার কী? তাছাড়া বর্ণিত হয়েছে, জনৈকা নিগ্রো দাসীকে উমর রা. এর নিকট আনা হলো এবং অভিযোগ করা হলো যে, সে ব্যভিচার করেছে। উমর রা. তাকে চাবুক দিয়ে ক'টা আঘাত করে বললেন: “কোন্ ইতরর সাথে যেনা করেছিস?” সে বললো : গাউসের সাথে দুই দিরহামের বিনিময়ে। (গাউস এক ব্যক্তির নাম) উমর রা. তার পাশে থাকা আলী, উসমান ও আবদুর রহমান বিন আওফকে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনারা কী মনে করেন? আলী রা. বললেন: আমি মনে করি, ওকে রজম করুন। আবদুর রহমান বললেন: আলী যা বললেন ওটাই আমার মত। উসমান রা. বললেন : আমার মনে হচ্ছে দাসীটি যা করেছে, তাকে আপনি সহজভাবে গ্রহণ করুন। কারণ সে একে দূষণীয় মনে করেনি। আল্লাহ তার জন্যই 'হদ' নির্ধারণ করেছেন, যে আল্লাহর বিধান জানে।" উমর রা. বললেন : আপনি সঠিক বলেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00