📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ব্যভিচারীদের শ্রেণীভেদ

📄 ব্যভিচারীদের শ্রেণীভেদ


ব্যভিচারী দু'রকমের : বিবাহিত ও অবিবাহিত। উভয়ের জন্য পৃথক পৃথক বিধান রয়েছে:

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অবিবাহিতের শাস্তি

📄 অবিবাহিতের শাস্তি


ফকিহগণ একমত হয়ে বলেছেন: স্বাধীন অবিবাহিত পুরুষ বা নারী ব্যভিচার করলে তাকে একশো বেত্রাঘাত করা হবে। কেননা আল্লাহ সূরা নূরে বলেছেন:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِلٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ، وَلَا تَأْخُنْ كُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَيَعْمَلْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . "ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী এদের প্রত্যেককে একশত কষাঘাত করবে, আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও, মুমিনদের একটি দল যেনো তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।"
এ আয়াতে শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তিকে অকার্যকর রাখার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা উচ্চারিত হয়েছে। কারো কারো মতে, প্রহারকে এতটা হাল্কা করতে নিষেধ করা হয়েছে, যাতে অপরাধী গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যথা অনুভব না করে। শাস্তি কার্যকর করার সময় কতজন তা প্রত্যক্ষ করবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন: তিনজন বা তার বেশি। কেউ বলেন: সাক্ষীরা ছাড়া চারজন থাকা চাই। আবু হানিফা বলেন: শাস্তি যদি সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হয়, তাহলে শাসক ও সাক্ষীরা থাকলে চলবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বেত্রাঘাত ও নির্বাসনের একত্রিকরণ

📄 বেত্রাঘাত ও নির্বাসনের একত্রিকরণ


ফকিহগণ যদিও বেত্রাঘাতের অপরিহার্যতা সম্পর্কে একমত হয়েছেন, কিন্তু তারা এর সাথে নির্বাসন দণ্ডের সংযোজন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন: ১. শাফেয়ি ও আহমদ বলেছেন: একশকোটি বেত্রাঘাতের সাথে এক বছরের নির্বাসনও দিতে হবে। কেননা বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত:
"জনৈক বেদুইন রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট এলো এবং বললো: হে রসূলুল্লাহ, আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, আমার ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফায়সালা করে দিন। তার অপর প্রতিপক্ষ তার চেয়ে অধিক অভিজ্ঞ ছিলো। সে বললো: জ্বি হা, আমারও একই কথা। আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করে দিন এবং আমাকে ঘটনার বিবরণ বলার অনুমতি দিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: বলো। সে বললো: আমার ছেলে এই ব্যক্তির বাড়িতে মজুর খাটতো। সে তার স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করেছে। আমি শুনেছি, আমার ছেলের 'রজম' এর শাস্তি প্রাপ্য। তাকে সে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য আমি একশো ছাগল ও একজন ক্রীতদাসী মুক্তিপণ হিসেবে এনেছি। পরে জ্ঞানীজনদেরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, আমার ছেলের প্রাপ্য শাস্তি রজম নয়, একশো বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন। আর এই ব্যক্তির স্ত্রীর প্রাপ্য রজম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: আমি অবশ্যই তোমাদের দু'জনের ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করবো। ছাগলের পাল ও ক্রীতদাসী তুমি ফেরত পাবে। আর তোমার ছেলে পাবে একশো বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন। আর বনু আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বললেন: "হে উজাইস, তুমি এই ব্যক্তির স্ত্রীর নিকট যাও, সে যদি ব্যভিচারের কথা স্বীকার করে, তবে তাকে রজম করো। লোকটি তার স্ত্রীর কাছে গেলো এবং সে স্বীকারোক্তি করলো। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. তাকে রজম করার আদেশ দিলেন এবং রজম করা হলো।"
বুখারি আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন: "রসূলুল্লাহ সা. অবিবাহিত ব্যভিচারীকে এক বছরের জন্য নির্বাসন ও তার উপর 'হদ' (বেত্রাঘাত) কার্যকর করার আদেশ দিয়েছেন।"
খুলাফায়ে রাশেদীনের সকলেই নির্বাসন দণ্ড কার্যকর করেছেন। কেউ এর বিরোধিতা করেনি। আবু বকর সিদ্দীক রা. ফিদিক অঞ্চলে, উমার ফারুক রা. সিরিয়ায়, উসমান রা. মিশরে ও আলী রা. বসরায় নির্বাসিত করতেন। বেত্রদণ্ড ও নির্বাসন দণ্ড এ দুটির কোন্টি আগে ও কোন্টি পরে কার্যকর করা হবে, সে ব্যাপারে শাফেয়িরা কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম মানা জরুরি মনে করেন না। যে কোনোটা আগে বা পরে করা যায়। তবে নির্বাসনের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপিত হয়েছে যে, নামায কসর করা যায় এতটা দূরত্বে করা চাই। কেননা এর উদ্দেশ্য হলো, তার নিজ আবাসিক এলাকা ও আপনজনদের থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়া। নামাযের কসর হয়না এমন দূরত্বকে নিজের আবাসিক এলাকা গণ্য করা হয়। শাসক যদি তাকে আরো বেশি দূরত্বে নির্বাসন করা ভালো মনে করেন, তবে করতে পারেন। মহিলাকে নির্বাসিত করতে হলে স্বামী কিংবা মুহাররম ব্যক্তিকে তার সাথে পাঠাতে হবে। যদি সে মজুরি ব্যতীত যেতে না চায়, তবে মজুরি দেয়া বাধ্যতামূলক হবে এবং তা মহিলার সম্পদ থেকে আদায় করে দেয়া হবে।
২. ইমাম মালেক ও আওযায়ি বলেছেন: অবিবাহিত স্বাধীন পুরুষ ব্যভিচারীকে নির্বাসন দেয়া ওয়াজিব, অবিবাহিত স্বাধীন নারী ব্যভিচারিণীকে নয়। নারীকে নির্বাসিত করা হবেনা। কেননা নারী পর্দার বিধানের অধীন। (অজানা বিদেশ ভূমিতে পর্দা মেনে চলার সম্ভাবনা অনিশ্চিত।)
৩. আবু হানিফা র. বলেছেন: নারীর ক্ষেত্রে বেত্রদণ্ডের সাথে নির্বাসন দণ্ড যুক্ত করা হবেনা। অবশ্য শাসক এটাকে ভালো মনে করলে যত দূরত্বে পাঠানো ভালো মনে করেন পাঠাতে পারেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিবাহিত ব্যক্তির হদ

📄 বিবাহিত ব্যক্তির হদ


বিবাহিত ব্যক্তির ব্যাপারে ফকিহগণ একমত, সে ব্যভিচার করলে তাকে 'রজম' (পাথর নিক্ষেপ) করে হত্যা করা ওয়াজিব, চাই সে পুরুষ হোক বা স্ত্রী হোক। এর প্রমাণ হিসাবে তারা উল্লেখ করেন:
১. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. মসজিদে নববীতে ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমি ব্যভিচার করেছি। রসূলুল্লাহ সা. তার কথা উপেক্ষা করলেন। সে চারবার তার কথা পুনরাবৃত্তি করলো। সে যখন চারবার নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলো, তখন রসূলুল্লাহ সা. তাকে কাছে ডাকলেন এবং বললেন: তুমি কি পাগল? সে বললো: না। তিনি আবার বললেন: তুমি কি বিবাহিত? সে বললো: হাঁ। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমরা ওকে নিয়ে যাও এবং রজম করো। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলেছেন: এই লোকটিকে যারা রজম করেছিল, আমিও তাদের মধ্যে ছিলাম। আমরা তাকে ঈদের নামাযের মাঠে রজম করছিলাম। পাথরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে এক সময়ে সে দৌড়ে পালাতে লাগলো। আমরা তাকে হাররাতে ধরে ফেললাম এবং রজম করে হত্যা করলাম। (বুখারি ও মুসলিম)। এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, একবার স্বীকারোক্তি করলেই বিবাহিত হওয়া প্রমাণিত হয় এবং 'হাঁ' বলা দ্বারাই স্বীকারোক্তি করা হয়।
২. ইবনে আব্বাস রা. বলেন: উমর রা. ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন: আল্লাহ মুহাম্মদ সা.কে সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন এবং তাঁর উপর কিতাব নাযিল করেছেন। তাঁর উপর যা কিছু নাযিল হয়েছে, তার মধ্যে রজমের আয়াত ছিলো। আমরা সে আয়াত পড়েছি এবং অনুধাবন ও মুখস্থ করেছি। রসূলুল্লাহ সা. রজম কার্যকর করেছেন, আমরাও করেছি। আমার আশংকা হয়, দীর্ঘকাল পেরিয়ে গেলে কেউ বলে বসে কিনা: "আল্লাহর কিতাবে তো আমরা রজম পাইনা।" তারপর তারা আল্লাহর নাযিলকৃত একটা ফরয কাজ পরিত্যাগ করে বিপথগামী হয়ে না যায়! নারী বা পুরুষ যেই হোক, সে যদি বিবাহিত হয় ও ব্যভিচার করে এবং যদি তার বিরুদ্ধে সাক্ষী, স্বীকারোক্তি অথবা গর্ভ পাওয়া যায়, তবে তার উপর রজম কার্যকর করা অপরিহার্য। আল্লাহর কসম, এ আশংকা যদি না থাকতো যে, জনগণ বলবে, উমর আল্লাহর কিতাবে একটি আয়াত সংযোজন করেছে, তাহলে আমি এ আয়াতটা লিখে দিতাম।"-বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী।
নাইলুল আওতারে বলা হয়েছে: রজম এমন একটি বিষয় যার উপর ইজমা (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) হয়েছে। কেবল খারেজীদের সম্পর্কে জানা যায়, তারা এটিকে নিষ্প্রয়োজন মনে করতো। কিছু কিছু মুতাযেলীও একটি নিষ্প্রয়োজন মনে করতো। তবে "কুরআনে এর উল্লেখ নেই" বলা ছাড়া এর স্বপক্ষে আর কোনো যুক্তি প্রমাণ তারা দিতে পারেনি। অথচ এই যুক্তি বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা সর্বস্বীকৃত মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত। কেননা উমর রা. বিপুল সংখ্যক লোকের সামনে বলেছেন: "রসূলুল্লাহ সা. এর উপর নাযিলকৃত ওহির মধ্যে রজমের আয়াতও ছিলো, আমরা সেটি পড়েছি এবং মুখস্থও করেছি। রসূলুল্লাহ সা. নিজেও রজম কার্যকর করেছেন, আর তাঁর পরবর্তী সময়ে আমরাও এটি কার্যকর করেছি।"
কোনো আয়াতের তেলাওয়াত রহিত হলেই তার বিধিও রহিত হবে, এটা অপরিহার্য নয়। আবু দাউদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে এ উক্তি বর্ণনা করেছেন। আহমদ ও তাবরানি বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর নাযিলকৃত কুরআনে এ আয়াতটি ছিলো: الشَّيْعُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَلَيَا فَارْجُمُوهُمَا البَتَّةَ بِمَا قَضَيَا مِنَ اللَّهِ . Ο “কোনো বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা যখন ব্যভিচার করে, তখন তারা যে আনন্দ উপভোগ করেছে অদ্ররূপ তাদের উভয়কে অবশ্যই রজম করবে।" আর ইবনে হাব্বান উবাই বিন কা'ব এর এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন: "সূরা আহযাব ইতিপূর্বে সূরা বাকারার মতো বড় ছিলো এবং তাতে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা সংক্রান্ত আয়াতটি ছিলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00